পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/৩০১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
২৪৭
দশম পরিচ্ছেদ।

বঙ্গাকাশে উঠিতে লাগিলেন; এবং তাঁহাকে আবেষ্টন করিয়া ব্রাহ্মসমাজও সূৰ্য্যমণ্ডলের ন্যায় মানব-চক্ষুর গোচর হইল। ১৮৫৬ সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় ধ্যান ধারণাতে বিশেষ ভাবে কিছুকাল যাপন করিবার আশয়ে সহর ত্যাগ করিয়া হিমালয় শিখরে গমন করেন। ১৮৫৮ সালের শেষভাগে তিনি সহরে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। তিনি আসিয়া দেখেন যে তাহার সহাধ্যায়ী বন্ধু প্যারীমোহন সেনের দ্বিতীয় পুত্র কেশবচন্দ্র সেন ব্রাহ্মসমাজে যোগ দিয়াছেন। ইহাতে তাঁহার হৃদয় আনন্দে নৃত্য করিয়া উঠিল। তিনি কেশবকে আপনার প্রেমালিঙ্গনের মধ্যে গ্রহণ করিলেন। উভয়ের যোগ মণি-কাঞ্চনের যোগের ন্যায় হইল। উভয়ে মিলিত হইয়া নব নব কাৰ্য্যে হস্তার্পণ করতে লাগিলেন।

 ১৮৫৯ সাল হইতে ব্রাহ্মসমাজে নবশক্তির সঞ্চার দেথা গেল। এক দিকে দেবেন্দ্রনাথ তাঁহার শৈলবাসকালের সাধনার চরম ফল সকল তাঁহার চিরস্মরণীয় উপদেশগুলির মধ্যে ব্যক্ত করিতে লাগিলেন। বাঙ্গালার মানুষ অধ্যাত্মতত্ত্বের এরূপ ব্যাখ্যা পূৰ্ব্বে কখনও শোনে নাই। সুতরাং সহরে ত্বরায় এই জনরব ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল যে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর গিরিশৃঙ্গ হইতে নামিয়া ব্রাহ্মসমাজকে জাগাইয়া তুলিয়াছেন। এই সংবাদে নানাশ্রেণীর লোক ব্রাহ্মসমাজের উপাসনার দিনে ভাঙ্গিয়া পড়িতে লাগিল। একদিনের উপদেশ শুনিয়া আমরা সাতদিন মন স্থির রাখিতে পরিতাম না। হদয়ে কি নব ভাব জাগিত! চক্ষে কি নুতন জগত আসিত! এই সকল উপদেশ গ্রন্থাকারে নিবদ্ধ হইয়া বঙ্গসাহিত্যের অমূল্য সম্পত্তি রূপে রহিয়াছে। আজ তাঁহাদের আদর না হউক একদিন হইবেই হইবে। এমন সুন্দর ভাষার এরূপ উচ্চ সত্য সকল যে ব্যক্ত হইতে পারে, ইহাই বঙ্গভাষার অসীম স্থিতিস্থাপকতার নিদর্শন। কিছু না হইলে ভাষার দিক দিয়া এই উপদেশগুলি বঙ্গীয় সাহিত্য-সেবীর পাঠ্য।

 অপরদিকে যুবক কেশবচন্দ্রের উৎসাহাগ্নি সকলের দৃষ্টিগোচর হইল। তিনি একাকী ব্রাহ্মমাজে প্রবেশ করিলেন না। তাঁহার পদবীর অনুসরণ করিয়া তাঁহার যৌবন-সুহৃদগণের অনেকে ব্রাহ্মসমাজে আসিয়া প্রৰিষ্ট হইলেন। ইহাদের প্রেমোজ্জ্বল হৃদয়ের সংস্পর্শে ব্রাহ্মসমাজে এক প্রকার নবশক্তির সঞ্চার হইল। দেবেন্দ্রনাথ ও কেশবচন্দ্র মিলিত হইয়া এই সময়ে কয়েক প্রকার কার্য্যের আয়োজন করিলেন। প্রথম যুবকগণের ধৰ্ম্ম শিক্ষার্থ ব্রান্ধবিদ্যালয় নামে একটী বিদ্যালয় স্থাপিত হইল। প্রতি রবিবার প্রাতে ঐ বিদ্যালয়ের অধিবেশন হইত; তাহাতে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বাঙ্গালাতে এবং কেশবচন্ত্র সেন ইংরাজীতে