পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/৪৪

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
২০
রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ।

দুইটী কন্যাসন্তান জন্মিল। দ্বারকানাথ যখন বিষয় কর্ম্মে ব্যাপৃত ছিলেন, তখন ধর্ম্ম বিষয়ে সর্ব্বদা চিন্তা করিতেন; এবং ধর্ম্মতত্ত্ব নির্ণয়ের জন্য নানা শাস্ত্র অধ্যয়ন করিতেন। এই সময়ে একজন উপরিতন কর্ম্মচারীর সংশ্রবে আসিয়া তাঁহার খৃষ্টীয় ধর্ম্মের প্রতি আস্থা জন্মিল; এবং তিনি প্রকাশ্যভাবে উক্ত ধর্ম্মে দীক্ষিত হইলেন। ইহার পর যতদিন তিনি জীবিত ছিলেন, তাঁহার আরাধ্যা জননী দেবীর প্রতিকূলতাবশতঃ তাঁহার জীবন ঘোর নির্য্যাতনময় হইয়াছিল। তাঁহার কনিষ্ঠা কন্যা সেই নির্য্যাতনের ও স্বীয় পিতার অপরাজিত ধৈর্য্যের যে বিবরণ দিয়াছেন তাহার কিয়দংশ নিম্নে উদ্ধৃত করিতেছি।

 “জননীর বিশ্বাস ছিল বাইবেল প্রভৃতি ধর্ম্মশাস্ত্র পোড়াইয়া দিলে, উপাসনা কালে ব্যাঘাত জন্মাইলে, মত বিপর্য্যয় ঘটিবার সম্ভাবনা; এবং এই ভ্রমবশতঃ যতদূর সম্ভব পুত্রের ধর্ম্মসাধনায় বাধা জন্মাইতে অবহেলা করিতেন না। কত যে ধর্ম্মশাস্ত্র প্রভৃতি দগ্ধ করিয়াছেন তাহা কি বলিব! কতবার বাইবেল লুকাইয়া রাখিতেন। আর প্রায় এমন দিন যাইত না, যাহাতে মাতার দুর্ব্যবহারে ও কঠোর পীড়নে সন্তান কষ্ট না পাইতেন। মাতা যতদিন জীবিত ছিলেন ক্রমাগত বলিতেন—“এমন ছেলে বিধর্ম্মী এ কি প্রাণে সয়?” বহুকালব্যাপী এই ঘোর নির্য্যাতনেও সে প্রকৃতি কখনও চঞ্চল হয় নাই; ধর্ম্মবিশ্বাস বিন্দুমাত্রও বিচলিত হয় নাই; এবং একদিনের জন্যও কেহ কখনও মাতার প্রতি তাঁহাকে অসম্মান বা অশ্রদ্ধা প্রকাশ করিতে দেখে নাই। সেই সদানন্দ শান্তমূর্ত্তি সব প্রতিকুল অবস্থায় সমান ধীর থাকিত। তিরস্কার উৎপীড়ন অম্লানভাবে অটল ধৈর্য্যের সহিত বহন করিয়াছেন। এমন গভীর মাতৃভক্তির দৃষ্টান্ত অতি বিরল! উপার্জ্জনের সমুদয় টাকাই মাতার হস্তে দিতেন। মাতা হাতে তুলে যা দিতেন তাতে কখনও দ্বিরুক্তি ছিল না। খৃষ্টের ত্যাগস্বীকার, স্বর্গীয় অতুলন ধৈর্য্য, ক্ষমাশীলতা, তিনি জীবনের প্রতি কার্য্যে, তাঁহার প্রভুর আদর্শ যেন প্রতিফলিত করার জন্যই তদীয় শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন! এমন খ্রীষ্টগত জীবন জগতে দুর্লভ! রবিবারগুলি তাঁহার জীবনের যেন আরও পরীক্ষা ও কষ্টের দিন ছিল। রবিবার যে খ্রীষ্টশিষ্যের কি সাধনার দিন তাহা তাঁহার জীবনে সুস্পষ্ট দেখেছি। বিশেষ আহারাদি সে দিন হইত না; কেবল নির্জ্জনে বসে শাস্ত্র পাঠে ও প্রার্থনাদিতে সময় যাপিত হইত। আর মাতাও সে দিন যেন অধিক বিষাদে, মনঃক্ষোভে, তিরস্কার পীড়নে, সন্তানের সংশোধন করিবেন ভেবে সকল প্রকার কষ্ট