পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/৪৪৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৩৬৮
রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ

 একজন বন্ধু ভাগলপুর হইতে, লিখিয়াছেন, যে আর হইতে ইন্দুমতীকে কৃষ্ণনগরে লওয়ার পর তিনি লাহিড়ী মহাশয়ের পত্রে সৰ্ব্বদা ইন্দুর সংবাদ পাইতেন। একবার লাহিড়ী মহাশয় এই মৰ্ম্মে লিখিলেন—“তুমি শুনিয়া স্বর্থী হইবে, ইন্দুমতীর রোগ যন্ত্রণা অ’র নাই, সে এখন বেশ সুখে আছে।” পত্র পড়িয় তাহার মনে হইল, সৌভাগ্যক্রমে কোনও অতর্কিত উপায়ে বোধ হয়, ইন্দুমতীর রোগের উপশম হইয়াছে। পরে অনুসন্ধানে জানিলেন যে ঐ সংবাদ ইন্দুর মৃত্যু সংবাদ। গীতাকার জ্ঞানী মানুষকে বিগত-শোক হইবার জন্য উপদেশ দিয়াছেন ; এই ত সেই উপদেশ জীবনে ফলিত দেখিয়াছি! বিশেষ আশ্চর্যের বিষয় এই যিনি মনের আবেগ বশতঃ ব্রহ্মোপাসনাস্থলে তাল করিয়া বসিতে পারিতেন না, ধিনি কাহারও সামান্ত ক্লে শ দেখিলে এত উত্তেজিত হইতেন, নিজের শোকের সময় তাহার এই ধীরতা ! প্রকৃত বিশ্বাসী ও ঈশ্বর-প্রেমিক মানুষে অসম্ভব সম্ভব হয় !

 বলিতে, কি, ঈশ্বরের মঙ্গলস্বরূপে র্তাহার এরূপ প্রগাঢ় বিশ্বাস ছিল যে কেহ শোকে অতিরিক্ত কাতর হইয়া কঁদিলে তাহার সহ হইত না । সে ব্যক্তিকে ঈশ্বরের মঙ্গল-স্বরূপের কথা শুনাইবার জন্ত ব্যগ্র হইতেন। এ বিষরে একদিনকার একটা ঘটনা আমার স্মরণ আছে। নবকুমাকের ও ইন্দুমতীর মৃত্যুর পর তিনি কলিকাতায় আদিয়া চাপাতলাতে একটা বাড়ী ভাড়া করিয়৷ কিছু কাল ছিলেন। সেই সময় একদিন আমি র্তাহায় সহিত সাক্ষাৎ করিতে গেলে আমাকে বলিলেন—“আমাদেয় পাশের বাড়ীতে এঘটী ছেলে মারা গিয়াছে, বাড়ীর লোক, পুরুষ স্ত্রী লোক, মিলিয়া কয়দিন কাদিতেছে । দেখ ঈশ্বরের মঙ্গল-স্বরূপে বিশ্বাস না থাকলে মাহুষের কি দশা হয়! আমি ওঁদের বাড়ীর পুরুষদগকে বুঝাতে গিয়েছিলাম। আমি গিয়ে বললাম, আপনারা ত পরকাল মানেন, একজন মঙ্গলকর্তা আছেন তাও ত মানেন, তবে এতদিন ধরে এত কাল্লা কাটি কেন করেন ? তাতে র্তার পুনর্জন্ম ও শাস্ত্রের কথা তুলেন ; আমি বললাম আমি মুর্থ মামুব, শাস্ত্র টাস্ত্র জানি না; এই বলে পালিয়ে এসেছি, তুমি শাস্ত্র জান, তুমি কি শাস্ত্রের বচন টচন তুলে ওদিগকে বুঝিয়ে দিতে পার, অতিরিক্ত শোক করা ধাৰ্ম্মিক লোকের পক্ষে উচিত নয় ?” আমি বলিলাম,—“ওঁরা যখন তর্ক তুলেছেন তখন বুঝাতে যাওয়া বৃথা।” বুঝাইতে আর যাওয়া হইল না। আমি এই সাধু পুরুষের ভাব দেখিয়া মনে মনে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়। ঘরে আসিলাম ।