পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/৫০

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
২৪
রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ ।

তাহার বাটীতে হঠাৎ ডাকাইতি হয়। ডাকাইতির সময় আমাদের কয়েকজন চৌকিদারকে ডাকাইতের দলে দেখিয়াছে এবং জ্যেষ্ঠতাত ও তাঁহার ভ্রাতৃদ্বয় এই ডাকাইতির মূলে আছেন, এইরূপ বিচারালয়ে প্রকাশ করিল। কর্ত্তারা অত্যন্ত ভীত হইয়া রাজবাটীতে আশ্রয় লইলেন। গ্রামস্থ লোক তাহার এই অন্যায়াচরণে যারপরনাই বিরক্ত হইয়া দারোগার নিকট কহিলেন, যে তাঁহারা ডাকাইতির বিষয় কিছুই জানিতে পারেন নাই। সুতরাং দারোগা এ ডাকাইতি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলিয়া রিপোর্ট করিলেন। মাজিষ্ট্রেটের পেষকার কর্ত্তাদিগকে কহিয়া পাঠাইলেন যে “যৎকিঞ্চিৎ উদ্যোগ ও ব্যয় করিলেই তাহারা ছয়মাসের নিমিত্ত কারাবদ্ধ হইতে পারে।” তাহারা সমুচিত দণ্ড পায় ইহা সকলেরই ইচ্ছা হইল; কিন্তু জ্যেষ্ঠতাত মহাশয় কাহারও অনুরোধ রক্ষা না করিয়া কহিলেন;—“আমরা বিপদমুক্ত হওয়াতেই আমাদের অভীষ্ট সিদ্ধ হইয়াছে; এ নির্ব্বোধদিগকে বিপদ্‌গ্রস্ত করিলে আর কি ফল লাভ হইবে?” এতাদৃশ ক্ষমাগুণের দৃষ্টান্ত আমি প্রায় দেখি নাই।

 “এক শীতকালের রাত্রিতে তিনি রাজার নিকট হইতে বাসস্থানে আসিয়া দেখিলেন, তাহার পরিচারক ব্রাহ্মণ তদীয় শয্যায় শয়ন করিয়া ঘোর নিদ্রা যাইতেছে। প্রতি রাত্রিতেই তিনি আসিলে তাঁহার জলপানের আয়োজন করিয়া দিত এবং তাঁহার আহার সমাপনান্তে নিদ্রা যাইত। জ্যেষ্ঠতাত ভাবিলেন, যখন এ ব্যক্তি আমার আসিবার পূর্ব্বেই আমার শয্যায় নিদ্রিত হইয়াছে, তখন বোধ হয় ইহার কোনও অসুখ জন্মিয়াছে। কিঞ্চিৎকাল এইরূপ চিন্তা করিয়া দুইখানি কুশাসনের উপরে শয়ন করিলেন। গাত্রে যে বস্ত্র ছিল তাহাই তাঁহার শীত নিবারণের উপায় মাত্র হইল। নূতন সংবাদে রাজার বড় আহ্লাদ হইত বলিয়া, একজন প্রভাতকালে এবিষয় তাহার গোচর করিল। রাজা এই আশ্চর্য্যাবস্থার দর্শনোৎসুক হইয়া তৎক্ষণাৎ জ্যেষ্ঠতাতের সন্নিহিত হইলেন। জ্যেষ্ঠতাত মহাশয় তখনও সচ্ছন্দে নিদ্রা যাইতেছেন। রাজার আগমনে কিঞ্চিৎ গোলযোগ হওয়াতে জাগরিত হইয়া শশব্যস্তে উঠিয়া দাঁড়াইলেন। রাজা ঈষৎ হাস্যবদনে জিজ্ঞাসা করিলেন যে “তোমার শয্যায় পরিচারক সুখে শয়ন করিয়াছিল; আর তুমি এই কুশাসনে পড়িয়া কষ্ট পাইতেছিলে, ইহার কারণ কি?” তিনি উত্তর করিলেন “আমার কষ্ট হয় নাই, তবে উহার যদি অসুখ হইয়া থাকে তবে উহার কষ্ট হইত।” তাহার এই সহৃদয় ব্যবহারে রাজা বিস্ময়াপন্ন হইয়া