পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/৫২

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
২৬
রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ ।

সে সময়ে কুলীন জামাতৃগণ অনেক সময়ে শ্বশুরালয়েই বাস করিতেন। তদনুসারে রামকৃষ্ণ ও পরম সমাদরে চিরজীবন শ্বশুরালয়েই বাস করিতে পারিতেন। কিন্তু এরূপ শুনিতে পাওয়া যায়, জগদ্ধাত্রী তাহা পছন্দ করিতেন না। তিনি স্বীয় পতির আত্ম-সম্মানকে এত মূল্যবান জ্ঞান করিলেন, যে কিয়ৎকাল পরেই সন্তুষ্টচিত্তে পিতৃগৃহ ত্যাগ করিয়া কদমতলাতে পতিগৃহে নিতান্ত সাংসারিক অসচ্ছলতার মধ্যে বাস করিতে লাগিলেন। তখন তিনি গুরুজনের আদেশের বশবর্ত্তিনী থাকিয়া ঘর নিকাইতেন, জল তুলিতেন, ধান ভানিতেন, সমুদয় গৃহকার্য্য নির্ব্বাহ করিতেন; এবং তদুপরি এতগুলি পুত্র কন্যার পালনের দিকে দৃষ্টি রাখিতেন। অথচ একটী দিনের জন্য কেহ তাহাকে বিষণ্ণ দেখিত না। তিনি ধনীর কন্যা হইয়া কিরূপ দারিদ্র্যে বাস করিতেছেন তাহা দেখিয়া কেহ তাহার প্রতি দয়া প্রকাশ করিলে সে দয়া তিনি সহ্য করিতে পারিতেন না। একদা তিনি ধান ভানিতেছেন এমন সময়ে তাঁহার পিতৃগৃহের একজন প্রাচীন পরিচারিকা আসিয়া তাহাকে তদবস্থাতে দেখিয়া হায় হায় করিতে লাগিল। জগদ্ধাত্রী হাসিয়া বলিলেন,—“আমি এই খানে বড় সুখে আছি। তুমি মাকে বলিও আমার কোনও দুঃখ নাই। আমি কাজ করিতে বড় ভালবাসি।” তিনি রূপে গুণে লোকের চিত্তকে এমনি আকৃষ্ট করিয়াছিলেন যে যখন তিনি চলিয়া যাইতেন লোকে পশ্চাৎ হইতে বলিত—“যেন সাক্ষাৎ লক্ষ্মী।”

 এই লাহিড়ী ও রায়পরিবারদিগের একটী বিশেষ সদ্‌গুণ এখানেই উল্লেখযোগ্য। ইঁহাদের পরস্পরের মধ্যে প্রীতিবন্ধন অতীর স্পৃহণীয়। জগদ্ধাত্রী যখন সন্তুষ্টচিত্তে দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করিতেন, নিজ দুঃখের কথা কাহাকেও জানাইতেন না, তখন তাঁহার ভ্রাতারা তাহাকে ভুলিয়া থাকিতেন না। প্রায় প্রতিদিন নীলকুঠী হইতে ফিরিয়া গৃহে যাইবার সময় ভগিনীর গৃহে পদার্পণ করিতেন, এবং গোপনে যথাসাধ্য সাহায্য করিবার প্রয়াস পাইতেন। এইরূপ মাতামহকুলে রামতনু জন্মগ্রহণ করিলেন।

 লাহিড়ী মহাশয়ের জন্মকালে তাঁহার পিতা রামকৃষ্ণ সামান্য পৈতৃক বিষয়ের আয়ের দ্বারা ও নিজে তৎকাল-প্রসিদ্ধ, লাল বাবুদিগের ম্যানেজারি করিয়া যাহা কিছু পাইতেন তদ্দ্বারা কষ্টে সংসারযাত্রা নির্ব্বাহ করিতেন। নবদ্বীপাধিপতি রাজা শিবচন্দ্রের দৌহিত্রদ্বয়, হরিপ্রসন্ন রায় ও নন্দপ্রসন্ন রায়, সে সময়ে বড় লালা ও নূতন লালা নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। রামকৃষ্ণ ইঁহাদের