পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/৬১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।
৩৫
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

প্রাকৃতিক সৌন্দর্ঘ্য ছিল, যে কিছু সুম্ভোগ্য পদার্থছিল, আমরা কিছুই দেখিতে বা সম্ভোগ করিতে ছাড়ি নাই। বালক রামতনু ও তাহার বয়স্তগণও ছাড়েন নাই । সে সকল সম্ভোগের বস্তু এখনও বিদ্যমান রহিয়াছে কিন্তু হায় সে সম্ভোগের শক্তি হারাইয়াছি। জীবনের ক্ষুদ্র সুখে সে অভিনিবেশ চলিয়া গিয়াছে ! বোধ হয় হৃদয়ের প্রসন্নতা ও নিৰ্ম্মলতা হারাইয়াছি বলিয়াই তাহা চলিয়া গিয়াছে। জগদীশ্বরের এই সৌন্দৰ্য্যময় জগতে মুখের আয়োজন যথেষ্ট আছে ; কিন্তু সে মুখ বোধ হয় কেবল পবিত্র-চিত্ত ব্যক্তির জন্যই আছে, অপরের জন্য. নহে। ক্ষিতীশবংশাবলী-চরিতকার তাহারই স্বপ্রণীত আত্ম-জীবনচরিতে ক্ষোভ করিয়া বলিয়াছেন ;–“ বোধ হয় যেন যৌবনের সঙ্গে সঙ্গে সকল সুখই তিরোহিত হইয়াছে। পূৰ্ব্বকালে যে সকল সুখ ভোগ করিয়াছি, সে সব মুখের দিকে দৃষ্টিপাত করি বা মাত্ৰ যেন পলাইয়া যায়। ধরিবার সহস্ৰ চেষ্টা করিলেও আর ধরা যায় না । সেই শ্ৰীবন, সেই লালবাগ অদ্যাপি বর্তমান আছে ; কিন্তু তৎসমুদয় ত আর আমাদের কাহারও দেখিতে স্পৃহা হয় না। স্পৃহা দূরে থাকুক তাহার নাম ও উল্লেখ করা যায় না।”

 যাহা হউক বিবিধ প্রাকৃতিক শোভার মধ্যে নিৰ্ম্মল বাল্য সুখে রামতনুর বাল্যকাল গত হইয়াছিল। দক্ষিণ বঙ্গের অধিকাংশ ভূভাগ গঙ্গার তরঙ্গধৌত বালুক-রাশির দ্বারা নিৰ্ম্মিত এবং অপেক্ষাকৃত অল্প কাল হইল মানবের আবাস ভূমিরূপে ব্যবহৃত হইয়াছে। চীনদেশীয় পরিব্রাজক ফাহিয়ান যখন ৩৯৯ খ্ৰীষ্টাব্দে ভারত-ভ্রমণের জন্ত আগমন করেন, তখন তাম্রলিপ্তক বা তমলুক নগরকে সমুদ্রতটে দেখিয়াছিলেন। এই নগর উৎকলের সৰ্ব্ব প্রধান বন্দর ও বৌদ্ধগণের একটা প্রধান স্থান ছিল। তিনি এখানে সহস্ৰাধিক বৌদ্ধ যতিকে, দর্শন করিয়াছিলেন। সেই তমলুক এখন সমুদ্রতর হইতে কতদূরে পড়িয়া রহিয়াছে! গঙ্গার তরঙ্গ-ধৌত বালুকারাশি দ্বারা গঙ্গার মুখভাগ ক্রমশঃ সমুন্নত হইয়া বঙ্গদেশের পরিসর কতই বৰ্দ্ধিত হইতেছে! সাগরগামিনী’ নদী সকলের তরঙ্গানীত বালুকারাশির ও সাগরতরঙ্গানীত বালুকারাশির ঘাত প্রতিঘাতে বালুশৈল সকল উত্থিত হইয়া নদী সকলের মুখে কি পরিবর্তনই ঘটাইতেছে। অনুমান করি, সমগ্র দক্ষিণ বঙ্গ এই প্রকার সাগর-গর্ভ হইতে সমুখিত হইয়া মানবের বাসাপযোগ হইয়া থাকিৰে। সে অধিক দিনের কথা নহে। ইতিহাসের গণনার বহু পূৰ্ব্বে হইলেও মানব-সমাজের যুগ গণনাতে বহু দূৰ নহে। . সুতরাং বঙ্গভূমির দক্ষিণ বিভাগের ভূমির উৎপাদিকাশক্তি