পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/৭১

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
৩১
তৃতীয় পরিচ্ছেদ

হেয়ারের ঐ প্রকার বন্দোবস্ত ছিল। বিদ্যালঙ্কার; বালক রামতনুকে সেই মিঠাইওয়ালার দোকানে বসাইয়া রাখিয়া, হেয়ারের নিকটে গেলেন এবং তাঁহাকে ভর্ত্তি করিবার জন্য সাধ্যসাধনা করিতে লাগিলেন। হেয়ার এরূপ অনুরোধ উপরোধে উত্যক্ত হইয়া উঠিয়াছিলেন। তথন স্বীয় স্বীয় বালকদিগকে ইংরাজী শিখাইবার জন্য লোকের এমন ব্যগ্রতা জন্মিয়াছিল যে হেয়ারের পক্ষে বাটীর বাহির হওয়া কঠিন হইছিল। বাহির হইলেই দলে দলে বালক —“me poor boy, have pity on me, me take in your school” বলিয়া তাহার পাল্কীর দুই ধারে ছুটিত। তদ্ভিন্ন পথে ঘাটে বয়োবৃদ্ধ ব্যক্তিগণ তাঁহাকে অনুরোধ উপরোধ করিতেন। যে সময়ে বিদ্যালঙ্কার বালক রামতনুকে লইয়া উপস্থিত হন, সে সময়ে হেয়ার ফ্রী বালক লওয়া এক প্রকার বন্ধ করিয়াছিলেন; যে কয়টী ফ্রী রাখিয়াছিলেন সমুদয় পূর্ণ হইয়া গিয়াছিল। সুতরাং তিনি বিদ্যালঙ্কারের অনুরোধ রক্ষা করিতে পারিলেন না, বলিলেন—“খালি নাই, এখন লইতে পারিব না।”

 বিদ্যালঙ্কার হেয়ারের নারীসুলভ কোমল প্রকৃতি বিলক্ষণ বুঝিতেন। তিনি নিরাশ না হইয়া লাহিড়ী মহাশয়কে বলিয়া দিলেন—“হেয়ারের পাল্কীর সঙ্গে সঙ্গে কিছুদিন ছুটিতে হইবে।” বালক রামতনু তাহাই করিতে লাগিলেন। তিনি হাতিবাগানে বিদ্যালঙ্কারের বাসা হইতে সকাল সকাল আহার করিয়া, কোনও দিন বা অনাহারে, হেয়ার বহির্গত হইবার পূর্ব্বেই, গ্রে সাহেবের ভবনের দ্বারে গিয়া উপস্থিত হইতেন; এবং তাঁহার পাল্কীর সহিত ছুটিতে আরম্ভ করিতেন। হেয়ারের পাল্কী নানা স্থানে বাইত, এবং এক এক স্থানে অনেকক্ষণ বিলম্ব করিত। রামতনু সর্ব্বত্রই যাইতেন ও অপেক্ষা করিতেন। একদিন অপরাহ্নে হেয়ার স্বীয় ভবনে ফিরিয়া আসিয়া পাল্কী হইতে অবতরণ করিয়া দেখিলেন বালকটীর মুখ শুকাইয়া গিয়াছে। অনুমানে বুঝিলেন সেদিন তাহার আহার হয় নাই। জিজ্ঞাসা করিলেন—“তোমার কি ক্ষুধা পাইয়াছে? কিছু আহার করিবে?” বালক রামতনু আহারের কথা শুনিয়াই ভয় পাইলেন; বিদেশীয় ও বিধর্ম্মী লোকের ভবনে আহার করিলে পাছে জাতিচ্যুত হইতে হয়, তাই ভয়ে ভয়ে বলিলেন,—“না, আমার ক্ষুধা পায় নাই।” হেয়ার তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া বলিলে—“আমাকে সত্য বল, আমার বাটীতে তোমাকে খাইতে হইবে না, ঐ মিঠাইওয়ালা তোমাকে খাইতে দিবে। সত্য করিয়া বল আজ আহার করেছ কি না?”