পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/৮১

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
৫১
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

সহরের বাবুদের অনুকরণের প্রয়াস পাইত; চরস গাঁজা প্রভৃতি খাইতে শিখিত; এবং অনেক সময়ে তদপেক্ষাও গুরুতর পাপে লিপ্ত হইত।

 বালক রামতনু বিদ্যালঙ্কারের হাতিবাগানস্থ বাসাতে এইরূপ সংসর্গে বাস করিতে লাগিলেন। শুনিয়াছি বিদ্যালঙ্কারের নিজের স্বভাব চরিত্র ভাল ছিল না; সুতরাং তাহার বাসাটী আরও ভয়ঙ্কর স্থান ছিল। বাসার লোকে বালক রামতনুকে সর্ব্বদা রাঁধাইত এবং অপরাপর প্রকারে খাটাইত, সেজন্য তাঁহার পাঠেরও অত্যন্ত ব্যাঘাত হইত।

 ক্রমে এই কথা কেশবচন্দ্রের কর্ণগোচর হওয়াতে তিনি কনিষ্ঠকে লইয়া শ্যামপুকুর নামক স্থানে স্বীয় পিতার মাতুল-পুত্র রামকান্ত খাঁ মহাশয়ের ভবনে রাখিয়া দিলেন। খাঁ মহাশয় সে সময়ে নীলের দালালি করিতেন। এখানে আসিয়া রামতনু একটু স্নেহ ও যত্ন পাইতে লাগিলেন। খাঁ মহাশয় সপরিবারে সহরে বাস করিতেন। তাঁহার গৃহিণী বালক রামতনুকে ভালবাসিতেন। কেশবচন্দ্র কনিষ্ঠের দুগ্ধ ও টিফিনের ব্যয় দিতেন, কিন্তু তদ্ব্যতীত আর সকলই তিনি ঐ গৃহে পাইতেন। কেবল তাহা নহে, শ্যামপুকুরে আসিয়া তাহার আর একটা লাভ হইল। তাঁহার সহপাঠী বালক দিগম্বর মিত্র তখন শ্যামপুকুরের নিকটস্থ শ্যামবাজারে নিজের মাতুলালয়ে বাস করিতেন। রামতনু দিগম্বরের সহিত সাক্ষাৎ করিবার জন্য তাঁহার মাতুলালয়ে গেলে দিগম্বরের মাতার সহিত তাঁহার আলাপ পরিচয় হয়। দিগম্বরের জননী তাহাকে স্বীয় পুত্রের ন্যায় স্নেহ করিতেন এবং সর্ব্বদা সংবাদ লইতেন। পিতার গৃহে ভাল দ্রব্য কিছু হইলেই ডাকিয়া খাওয়াইতেন, এবং সময়ে সময়ে যথাসাধ্য সাহায্য করিতেন। সংক্ষেপে বলিতে গেলে তিনি বিদেশে তাঁহার মাসীর কাজ করিতেন। এই স্নেহ ভালবাসার কথা চিরদিন লাহিড়ী মহাশয়ের স্মৃতিতে জাগরূক ছিল। তিনি কৃতজ্ঞতাপূর্ণ-হৃদয়ে অনেকবার এই স্নেহের বিষয় উল্লেখ করিতেন।

 তখন সহাধ্যায়ীদিগের মধ্যে এরূপ প্রণয় সর্ব্বদা জন্মিত। সহরস্থ সহাধ্যায়ী বন্ধুদিগের জননীরা অনেক সময়ে বাস্তবিক মাতৃস্বসার কাজ করিতেন। অনেক সময়ে প্রবাসবাসী বালকগণকে অনেক বিপদ ও প্রলোভন হইতে বাঁচাইতেন। আমাদেরই বালককালে এরূপে কতবার সুরক্ষিত হইয়াছি। অনেক স্থলে প্রবাসবাসী বালকগণ সহাধ্যায়ীদিগের জননীদিগকে মা বা মাসী ও তাঁহাদের ভগিনীদিগকে দিদি বা বোন বলিয়া ডাকিত, এবং যথার্থই সেই প্রকার ব্যবহার পাইত। যাহারা জননী ও ভগিনীগণের স্নেহ ও ভালবাসা