পাতা:রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ.djvu/৮৩

এই পাতাটিকে বৈধকরণ করা হয়েছে। পাতাটিতে কোনো প্রকার ভুল পেলে তা ঠিক করুন বা জানান।
৫৩
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

 হায়! বর্ত্তমানকালে সহাধ্যায়ীদিগের ও তাঁহাদের পরিবারবর্গের সহিত সে সখ্যভাব আর দেখা যায় না। এক্ষণে এক একটী শ্রেণীতে ৬০৷৭০ এরও অধিক বালক বসে, সুতরাং সম্বৎসরের মধ্যে বালকে বালকে আলাপ পরিচয় হওয়া কঠিন, সখ্যস্থাপন ত দূরের কথা। লোকে মনে করিয়া থাকে, লিখিয়া পড়িয়া কৃতী ও কার্য্যক্ষম হওয়ার নামই শিক্ষা, কিন্তু গুরু শিষ্যে ভক্তির সম্বন্ধ, বালকে বালকে সখ্যভাব যে শিক্ষার একটা প্রধান অঙ্গ তাহা অনেকে জানে না, সেই জন্য বর্ত্তমান শিক্ষা-প্রণালীতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বা রামতনু লাহিড়ীর ন্যায় মানুষ প্রস্তুত হওয়া এক প্রকার অসম্ভব হইয়া উঠিতেছে।

 অতঃপর কলিকাতার তদানীন্তন স্বাস্থ্যের অবস্থার বিষয়ে কিছু বলা আবশ্যক। বর্ত্তমান গ্যাসালোকে আলোকিত, প্রশস্ত-রাজ-বর্ত্ম-মণ্ডিত, ড্রেণ-সমন্বিত কলিকাতাতে যাঁহারা বাস করিতেছেন, তাহারা সে সময়কার স্কুলের বালকগণের কঠোর তপস্যার ভাব কল্পনাতেও আনিতে পারিবেন না। তখন কলিকাতায় আসিলে অধিকাংশ বালকই এক বৎসরের মধ্যে অন্ততঃ একবার গুরুতর পীড়ার দ্বারা আক্রান্ত হইত। এই পীড়া সচরাচর অজীর্ণতাদোষ রূপ দ্বার দিয়া প্রবেশ করিত; পরে জ্বর বিকার দিয়া উপসংহার করিত। দেওয়ান কার্ত্তিকেয় চন্দ্র রায়, ইহারই কয়েক বৎসর পরে বিদ্যাশিক্ষার্থ আসিয়া কিছু দিন রামতনু বাবুর বাসাতেছিলেন। তিনি সে সময়কার কলিকাতার অবস্থা যাহা বর্ণনা করিয়াছেন তাহা উদ্ধৃত করিতেছি—

 “তৎকালে মফঃস্বলের যে সকল লোক প্রথমে কলিকাতা যাইতেন তাহাদের মধ্যে অনেকেরই অজীর্ণ রোগ হইত। এ পীড়াকে ‘লোণা লাগা’ কহিত। যাঁহারা তথায় অল্পকাল থাকিয়াই প্রত্যাগমন করিতেন, তাঁহারা বাটী আসিয়া লোণ কাটাইবার নিমিত্ত কাঁচা, থোড় খাইতেন, ঘোল ও কল্মির ঝোল পান করিতেন, এবং গাত্রে কাঁচা হরিদ্রা মাখিতেন। অত্যল্প গুরুপাক দ্রব্যেই আমার অসুখ হইত, একারণ আমি আহারের বিষয়ে অত্যন্ত সাবধান থাকিতাম। তুথাপি দুই মাসের মধ্যে আমার অরুচি জন্মিল; এবং ক্রমশঃ বল এককালে গেল। মৃৎপাত্রে অধিক দিন লবণ থাকিলে, যেমন তাহা জীর্ণ হইয়া যায়, আমার শরীর ঠিক সেইরূপ হইল। অত্যল্প আঘাতেই আমার গাত্রের ত্বক্‌ উঠিতে লাগিল। শরীরের বর্ণ শ্বেত হইয়া গেল। ঔষধ সেবনে কোনও উপকার না হওয়াতে