প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (একাদশ সম্ভার).djvu/১০০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ সতীশ বলিল, নাম মনে নেই। গ্রন্থকারের নামটাও ঠিক মনে পড়ে ন!—কিন্তু খুব বড়লোক । কিন্তু গল্পটা স্পষ্ট মনে আছে—এমনি স্বন্দর। উপেন্দ্র কৌতুহলী হইয়া তাহার দিকে চাহিয়া বহিলেন। সতীশ অমুযোগের স্বরে বলিল, চিরকাল ইংরেজী পড়েই দিন কাটালে উপীনদা, কোনও দিন বাঙলায় দিকে চাইলে না । কিন্তু আমাদের দেশে এমন সব বই আছে যে, একবার পড়লে জ্ঞান জন্মে যায়। এই বলিয়া সে একটা স্বদীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া চুপ করিয়া রহিল। উপেন্দ্র বিরক্ত হইয়া বলিলেন, আগে গল্পট বল শুনি, তার পরে দেখা যাবে, কতটা জ্ঞান জন্মায় । . . সতীশ হাসিল, কহিল, রাগ করবে না বল ? ন—তুই বল । সতীশ বলিল, অতি স্বন্দর গল্প । বইতে লেখা আছে, একজন বড়লোক জমিদার নৌকা করিয়া যাইতেছিলেন। একদিন সন্ধ্যাবেলা হঠাৎ মেঘ করিয়া ভয়ানক ঝড়বৃষ্টি শুরু হইয়া গেল। তিনি ত ভয়ে ডাঙায় উঠিয়া পড়িলেন। স্বমুখের একটা মস্তবড় ভাঙা-বাড়ি, বৃষ্টির ভয়ে তাহাতেই ঢুকিলেন, বাড়িটার ঘরে ঘরে অন্ধকার— জনমনুষ্য নাই। সমস্ত বাড়িময় ঘুরিয়া ঘুরিয়া শেষে উপরের একটা ঘরে দেখিলেন, মিটমিটু করিয়া প্রদীপ জলিতেছে এবং ছেড়া-বিছানায় একটা লোক মর-মর হইয়া পড়িয়া আছে এবং তাহার পদ্মাপলাশাক্ষি রূপসী স্ত্রী লুটিয়া লুটিয়া কাদিতেছে। সে রাত্রে সে কি একটা ভয়ঙ্কর স্বপ্ন দেখিয়াছিল। আচ্ছা উপীনদী, তুমি স্বপ্ন বিশ্বাস করো ? উপেন্দ্র সংক্ষেপে বলিলেন, না । তার পরে ? সতীশ বলিল, তার পরে সেই রাত্রেই লোকটা মারা গেল। জমিদারবাবু সেই পদ্মপলাশাক্ষি বিধবাকে ঘরে আনিয়া জোর করিয়া বিবাহ করিয়া ফেলিলেন। চতুর্দিকে ছিছি পড়িয়া গেল। আর সেই দুঃখে তার প্রথম স্ত্রী বিষ খাইয়া আত্মঘাতী হইলেন । পুনঃ পুনঃ পদ্মপলাশাক্ষির উল্লেখে উপেন্দ্ৰ বুঝিলেন, সতীশ বিষবৃক্ষের পক্ষোদ্ধার করিতেছে এবং সতীশের এই অদ্ভূত স্মৃতি-শক্তির পরিচয়ে অন্য সময়ে বোধ করি খুব হাসিতেন, কিন্তু এখন হাসি আসিল না । এই এলোমেলো আখ্যানের ভিতর হইতে একটা কুৎসিত ইঙ্গিত তীরের মত আসিয়া তাহার বুকে বিধিল । এ ত সতীশের স্থতি নয়—এ তাহার আশঙ্কা। এই আশঙ্কা যে কি, এবং কাহাকে আশ্রয় করিয়া বিষবৃক্ষের ভালাপাল ভাঙিয়া নীচের ছাচে গড়িয়া তুলিয়াছে, সেই কথাটা মনে করিয়া উপেন্দ্র গভীর লজ্জায় কুঞ্চিত হইয়া উঠিলেন।