প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (একাদশ সম্ভার).djvu/২৫৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চরিত্রহীন নতশিরে বহন করিয়া স্নানের জন্ত নীরবে বাহির হইয়া গেল। শূন্ত কক্ষে কিরণময়ীও স্তন্ধ হইয়া বসিয়া রহিল। তাহার বিদ্রুপের শূল শুধু দিৰাক্ষরকেই বিদ্ধ করিল না, তাহা সহস্ৰগুণিত হইয়া নিজের বক্ষের মাঝে ফিরিয়া আসিল । বাহিরে আসিয়া দিবাকর ইতস্তত: ঘুরিয়া বেড়াইতে বেড়াইতে জাহাজের যেঅংশে তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীরা জড়-সড় হইয়া বসিয়াছিল সেইখানে নামিয়া গেল, এবং বিভিন্ন প্রদেশের নানা বর্ণের যাত্রীদের মধ্যে নিজেকে ভুলাইয়া রাখিবার পথ খুজিয়া ফিরিতে লাগিল। এই ভারতবর্ষের মধ্যে কত বিভিন্ন জাতি, কত বিচিত্র পোষাকপরিচ্ছদ, কত অজ্ঞাত ভাষা যে প্রচলিত রহিয়াছে, দিবাকর এই তাহা প্রথম দেখিয়া অত্যন্ত বিস্ময়াপন্ন হইল। জাহাজের খোলের মধ্যের সেই জনতা এবং নানাবিধ ভাষার সংমিশ্রণে যে অপরূপ শব্দরাশি উত্থিত হইতেছে তাহাই বা কি বিচিত্র ! সে • সিড়ি বাহিয়া তথায় নামিয়া গেল এবং নিৰ্ব্বাক-বিস্ময়ে স্তব্ধ হইয়া রহিল । অল্প একটুখানি স্থান দখল করিয়া লইতে যাত্রীদের মধ্যে ইতিপূৰ্ব্বে যে প্রবল ঠেলাঠেলি রেষারেষি এবং তর্জন-গর্জন চলিয়াছিল, তখন তাহ থামিয়া আসিয়াছে। যাত্রীরা নিজেদের অধিকৃত স্থানটুকুর উপর শষ্য বিছাইয়। জিনিস-পত্রের বেড়া দিয়া যথাসাধ্য নিরাপদ হইয়া এইবার প্রতিবেশীর প্রতি মনোযোগ দিবার সময় পাইয়াছে । প্রত্যেকেই প্রত্যেকের একটা সন্তোষজনক পরিচয় গ্রহণে উৎসুক । এক অংশে দিবাকরের দৃষ্টি পড়িতেই একজন বাঙালী দাড়াইয়া উঠিয়া চীৎকার করিয়া ডাকিতে লাগিল, বাবুমহাশয়, একবার এদিকে আস্বন, এদিকে আহন— লোকটির পাশে একজন মজবুত গোছের স্ত্রীলোক বসিয়াছিল, সেও সোত্মকনেত্রে সেই অনুরোধেরই সমর্থন করিল। দিবাকর বহু পরিশ্রমে বহু লোকের তিরস্কার ও চোখ-রাঙানি মাথায় করিয়া ভীড়ের মধ্যে সাবধানে পা ফেলিয়া নিকটে আসিয়া উপস্থিত হইতেই লোকটি নিকটস্থ তোরঙ্গের উপর স্থান নির্দেশ করিয়া বলিল, এটা আমার টিনের পেট নয় মশাই, আসল লোহার,--আপনি স্বচ্ছদে বন্ধন। মশায়, আপনারা ? দিবাকর বলিল, ব্রাহ্মণ। তৎক্ষণাৎ লোকটি দুই হস্ত প্রসারিত করিয়া দিবাকরের জুতার উপর হইতেই পদধূলি সংগ্ৰহ করিয়া লইয়া জিহ্বায়, কণ্ঠে ও মস্তকে স্থাপন করিয়া বলিল, ভাবছিলাম এ ক’টা দিন বুঝি বা বৃথায় যায়। মশায় আছেন কোথায় ? দিবাকর অঙ্গুলি নির্দেশ করিয়া উপরে দেখাইয়া দিলে, সে বলিল, কেবিনে আছেন ? তা যেখানেই থাকুন দিনান্তে একটিবার পদধূলি থেকে বঞ্চিত না। যাবেন কোথায়, রেজুনে । -