প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (একাদশ সম্ভার).djvu/৯৩

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চরিত্রহীন উপীনা! আমার বিস্তে চাণক্য-শ্লোকের বেশী নয় জানি, কিন্তু এটুকু শিখেটি যে আত্মরক্ষা অতি শ্রেষ্ঠ ধৰ্ম্ম । - স্ত্রীলোকটির পানে চাহিয়া বলিল, আচ্ছ, আপনিই বলুন দেখি, আত্মরক্ষার্থে একটু নিরাপদ জায়গা বেছে নেওয়া কি অন্যায় কাজ হয়েছে ? আপনার শ্বশুরের ভিটার অসম্মান করা আমাদের সাধ্য নয়, বরং যথেষ্ট সম্মানের সঙ্গেই আপনার আশ্ৰিত প্রজাপুঞ্জের পথ ছেড়ে দিয়ে এইটুকু জায়গায় দুজনে দাড়িয়ে আছি। তিনজনেই হাসিয়া উঠিলেন। ইহার পরিহাস যে এই দরিদ্র গৃহলক্ষ্মীটিকে ব্যথিত করে নাই, বরং ইহার ভিতর যে সরলতা ও সমবেদনা প্রচ্ছন্ন ছিল, এই তরুণী অতি সহজেই তাহ গ্রহণ করিতে পারিয়াছেন, তাহার হাতোজ্জল মুখের পরে ইহার স্বম্পষ্ট প্রকাশ দেখিতে পাইয়া উপেন্দ্র মনে মনে অত্যন্ত আরাম বোধ করিলেন। তাহার মুখপানে চাহিয়া মৃদ্ধ হাসিয়া বলিলেন, প্রজাপুঞ্জ আপনার স্বমুখে কখনই ওর উপরে অত্যাচার করতে সাহস করবে না। এখন ওই লোকটি বোধ করি নেমে আসতে পারে। নিশ্চয়, বলিয়া কেরোসিনের ডিবাট হাতে তুলিয়া লইয়া বন্ধু সতীশের দিকে চাহিয়া ভুবনমোহন হাসি হাসিয়া বলিল, এখন নিৰ্ভয়ে রাজদর্শনে চলুন। এইটুকু হাস্ত-পরিহাসেই অপরিচিতের দূরত্বট যেন একেবারেই কমিয়া গেল, এবং তিনজনেই প্রফুল্ল-মুখে ঘর হইতে বাহির হইয়া গেলেন। রাজ-দর্শনেচ্ছু উপেন্দ্র ও সতীশ হাণি-মুখে আর একটি ঘরে ঢুকিয়াই শিহরিয়া স্তন্ধ হইয়া দাড়াইয়া পড়িলেন। ক্রুদ্ধ গুরুমশায়ের অতর্কিত চড় খাইয়া হাস্ত-নিয়ত শিশু-ছাত্রের মুখের ভাবটা যেমন করিয়া বদলায়, এই দুজনের মুখের হাসি তেমনি করিয়া একনিমিষে কালি হইয়া গেল । ক্ষণেক পরে লাঞ্ছিত ভাবটা কাটিয়া গেলে উপেন্দ্র অদূরবর্তী শয্যার নিকটে গিয়া ডাকিলেন,—হারানদা ! হারান নিজীবের মত পড়িয়াছিলেন, অক্ষুটে বলিলেন, এস ভাই, এস। আর উঠতে বসতে পারিনে, তোমাকেও ক্লেশ দিলাম। এইটুকু বলিয়াই তিনি হাপাইতে লাগিলেন । উপেন্দ্র ধপ করিয়া বিছানার একদিকে বসিয়া পড়িলেন । দুই চোখ র্তাহার জলে ভরিয়া গেল এবং সমস্ত বক্ষপঞ্জর দুলাইয়া দিয়া একটা অদম্য বাম্পোচ্ছাস র্তাহার কণ্ঠের প্রাস্তসীমা পৰ্য্যন্ত ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল । কথা কহিতে সাহস করিলেন না—দাতের উপর দাত চাপিয়া শক্ত হইয়া বসিয়া রহিলেন । ওদিকে সতীশচন্দ্র মস্ত একটা কাঠের সিন্দুকের উপর শুকমুখে বসিয়া রহিল ।