প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (দশম সম্ভার).djvu/২১৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


হরিলক্ষ্মী পানে চেয়ে চেয়ে গেলাম, একবার ছায়াটুকু চোখে পড়ল না। রোগা বোন চলে যাচ্ছে, একটুখানি মায়াও কি হ’লো না মেজবোঁ ? এমনি পাষাণ তুমি ? মেজবৌয়ের চোখ ছল ছল করিয়া আসিল, কিন্তু সে কোন উত্তর দিল না । লক্ষ্মী বলিল, আমার আর যা দোষই থাক মেজবে, তোমার মত কঠিন প্রাণ আমার নয় । ভগবান না করুন, কিন্তু আমন সময়ে আমি তোমাকে না দেথে থাকতে পারতাম না । মেজবেী এ অভিযোগের কোন জবাব দিল না, নিরুত্তরে দাড়াইয়া রহিল। লক্ষ্মী আর কখনও আসে নাই, আজ এই প্রথম এ-বাড়িতে প্রবেশ করিয়াছে। ঘরগুলি ঘুরিয়া ফিরিয়া দেখিয়া বেড়াইতে লাগিল। শতবর্ষের জরাজীর্ণ গৃহ, মাত্র তিনখানি কক্ষ কোনমতে বাসোপযোগী রহিয়াছে। দরিদ্রের আবাস, আসবাবপত্র নাই বলিলেই চলে, ঘরের চুন-বালি খসিয়াছে, সংস্কার করিবার সামর্থ্য নাই, তথাপি অনাবশুক অপরিচ্ছন্নতা এতটুকু কোথাও নাই। স্বল্প বিছানা ঝর ঝর করিতেছে, দুই-চারিখানি দেব-দেবীর ছবি টাঙানো আছে, আর আছে মেজবোঁয়ের হাতের নানাবিধ শিল্পকৰ্ম্ম । অধিকাংশই পশম ও মুতার কাজ, তাহা শিক্ষানবীশের হাতের লাল ঠোঁটওয়ালা সবুজ রঙের টিয়াপাখী অথবা পাচ-রঙা বেড়ালের মূৰ্ত্তি নয়। মূল্যবান ফ্ৰেম আঁটা লাল-নীল বেগুনী-ধূসর পাশুটে নানা বিচিত্র রঙের সমাবেশ পশমে বোন ওয়েল-কম্ ‘আস্থন বস্থন’ অথবা বানান ভুল গীতার শ্লোকার্দ্ধও নয়। লক্ষ্মী সবিস্ময়ে জিজ্ঞাসা করিল, ওটি কার ছবি মেজবোঁ, চেন চেনা ঠেকচে ? মেজবে সলজে হাসিয়া কহিল, ওটি তিলক মহারাজের ছবি দেখে বোনবার চেষ্টা করেছিলাম দিদি, কিন্তু কিছুই হয়নি। এই কথা বলিয়া সম্মুখের দেয়ালে টাঙানো ভারতের কৌস্তুভ মহাবীর তিলকের ছবি অঙ্গুলি দিয়া দেখাইয়া দিল। লক্ষ্মী বহুক্ষণ সেইদিকে চাহিয়া থাকিয়া আস্তে আস্তে বলিল, চিনতে পারিনি, সে আমারই দোষ মেজবেী, তোমার নয়। আমাকে শেখাবে ভাই ? ও-বিদ্যে শিখতে যদি পারি ত তোমাকে গুরু বলে মানতে আমার আপত্তি নেই। মেজবে হাসিতে লাগিল। সেদিন ঘণ্টা তিন-চার পরে বিকেলে যখন লক্ষ্মী বাড়ি ফিরিয়া গেল তখন এই করাই স্থির করিয়া গেল যে, কলা-শিল্প শিখিতে কাল হইতে সে প্রত্যহ আসিবে। আসিতেও লাগিল, কিন্তু দশ-পনেরো দিনেই স্পষ্ট বুঝিতে পারিল, এ-বিদ্যা শুধু কঠিন নয়, অর্জন করিতেও স্বদীর্ঘ সময় লাগিবে। একদিন লক্ষ্মী কহিল, কই মেজবোঁ, তুমি আমাকে ষত্ব করে শেখাও না। ३● १