প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (দ্বাদশ সম্ভার).djvu/৫৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শেষের পরিচয় আপনি নিজেই সেদিন হাসপাতালে বলেছিলেন। আপনার মনে নেই। অনেকক্ষণ তো কিছু খাননি, তৈরী করে আনবো ? একটুখানি বসবেন ? ? কিন্তু চায়ের ব্যবস্থা তো তোমার ঘরে নেই, কোথায় পাবে ? সে আমি খুব পাবো, বলিয়া সারদা দ্রুতপদে উঠিয়া যাইতেছিল, রাখাল তাহাকে নিষেধ করিয়া বলিল, এমন সময়ে চা আমি খাইনে সারদা, আমার সহ হয় না। তবে কিছু খাবার আনিয়ে দিই—দেবো ? অনেকক্ষণ কিছু থাননি, নিশ্চয় । আপনার খুব ক্ষিদে পেয়েচে । কিন্তু কে এনে দেবে ? তোমার তো লোক নেই। আছে। হারু আমার খুব কথা শোনে, তাকে বললেই ছুটে যাবে। বলিয়াই সে আবার তেমনি ব্যস্ত হইয়া উঠিতে যাইতেছিল, কিন্তু এবারও রাখাল বারণ করিল। সারদা জিদ করিল না বটে, কিন্তু তাহার বিষন্ন মুখের পানে চাহিয়া রাখালের সেই সকল বহু-পরিচিত মেয়েদের মুখ মনে পড়িল। ইহাদের মধ্যে তাহার অনেক আনাগোনা, অনেক জানাশুনা, অনেক সভ্যতার ভদ্রতার দেনা-পাওনা, কিন্তু ঠিক এই জিনিসটি সে যেন অনেকদিন হইল ভুলিয়া আছে। তাহার নিজের জননীর স্মৃতি অত্যন্ত ক্ষীণ, অতি শৈশবেই তিনি স্বর্গারোহণ করিয়াছেন—একখানি খোড়ে ঘরের দাওয়ায় বেড়া দিয়ে ঘেরা একটু ছোট্ট রান্নাঘর, সেখানে রাঙা-পাড়ের কাপড়-পরা কে যেন রন্ধন করিতেছেন—হয়তো ইহার সবটুকুই তাহার কল্পনা—কিন্তু সে তাহার মা— সেই মায়ের একান্ত অস্ফুট মুখের ছবিখানি আজ হঠাৎ যেন তাহার চোখে পড়িতে লাগিল। মনের ভিতরটা কেমনধারা করিয়া উঠিতে সে তাড়াতড়ি উঠিয়া দাড়াইয়া বলিল, কিছু মনে করো না সারদা, আজ আমি যাই। আবার যেদিন সময় পাবে। আমি নিজে চেয়ে তোমার চা, জল-খাবার খেয়ে যাবো । সারদা গলবস্ত্রে প্রণাম করিয়া বলিল, আমার লেখার কাজটা কবে এনে দেবেন ? এর মধ্যে একদিন দিয়ে যাবো। আচ্ছা । তথাপি কিসের জন্য সে ইতস্তত: করিতেছে অনুমান করিয়া রাখাল জিজ্ঞাসা করিল, তুমি আর কিছু বলবে? সারদা ক্ষণকাল মেন থাকিয়া ধীরে ধীরে কহিল, প্রথমে হয়তো আমার ঢের ভুল হবে। আপনি কিন্তু রাগ করবেন না। রাগ করে আমাকে ফেলে দিলে আর আমার দাড়াবার জায়গা নেই। তাহার সভয় কণ্ঠের সকাতর প্রার্থনায় করুণায় বিগলিত হইয়া রাখাল বলিল, না সারদা, আমি রাগ করবো না। তুমি কিন্তু শিখে নেবার চেষ্টা কোরো। প্রত্যুত্তরে এবার সে শুধু মাথানাড়িয়া সায় দিল। তারপর চুপ করিয়া দাড়াইয়া রহিল। 86.