প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (দ্বিতীয় সম্ভার).djvu/২১৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


পল্লী-সমাজ করিয়া বসিয়া আছে বলিয়া যখন সংবাদ দিয়া গেল, তখন তাহাকে যাইবার জন্য উঠতে হইল । কেন তাহ বলিতেছি । রমেশ সন্ধান লইয়া জানিয়াছিল, প্রত্যেক গ্রামেই কৃষকদিগের মধ্যে দরিদ্রের সংখ্যা অত্যন্ত অধিক ; অনেকেরই এক ফোটা জমি-জায়গা নাই ; পরের জমিতে খাজনা দিয়া বাস করে এবং পরের জমিতে 'জন' খাটিয়া উদরামের সংস্থান করে। দুদিন কাজ না পাইলে কিম্ব অসুখে-বিমুখে কাজ করিতে না পারিলেই সপরিবারে উপবাস করে। খোজ করিয়া আরও অবগত হইয়াছিল যে, ইহাদের অনেকেরই একদিন সঙ্গতি ছিল, শুধু ঋণের দায়েই সমস্ত গিয়াছে। ঋণের ব্যবস্থাও সোজা নয়। মহাজনের জমি বাধা রাখিয়া ঋণ দেয় এবং স্বদেব হার এত অধিক যে, একবার যেকোন কৃষক সামাজিক ক্রিয়া-কর্মের দায়েই হোক বা অনাবৃষ্টি অতিবৃষ্টির জন্যই হোক, ঋণ করিতে বাধ্য হয়, সে আর সামলাইয়া উঠিতে পারে না। প্রতি বৎসরেই তাহকে সেই মহাজনের স্বরে গিয়া হাত পাতিতে হয়। এ-বিষয়ে হিন্দু-মুসলমানের একই অবস্থা। কারণ মহাজনেরা প্রায় হিন্দু। রমেশ শহবে থাকিতে এ সম্বন্ধে বই পড়িয়া যাহা জানিয়াছিল, গ্রামে আসিয়া তাঁহাই চোখে দেখিয়া প্রথমটা একেবারে অভিভূত হইয়া পড়িল। তাহার অনেক টাকা ৰান্ধে পড়িয়াছিল। এই টাকা এবং আরও কিছু টাকা সংগ্ৰহ করিয়া এই সকল দুর্ভাগাদের মহাজনের কবল হইতে উদ্ধার করিতে সে কোমর বাধিয়া লাগিল। কিন্তু দুই-একটা কাজ করিয়াই ধাক্কা খাইয়া দেখিল যে, এই সকল দরিদ্রদিগকে সে যতটা অসহায় এবং রুপাপাত্র বলিয়া ভাবিয়াছিল, অনেক সময়েই তাছা ঠিক নয়। ইছারা দরিত্র, নিরুপায়, অল্পবুদ্ধিজীবী বটে, কিন্তু বজ্ঞাতি-বুদ্ধিতে ইছারা কম নকে। ধার করিয়া শোধ না দিবার প্রবৃত্তি ইহাদের যথেষ্ট প্রবল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সরলও নয়, সাধুও নয়। মিথ্যা বলিতে ইহারা অধোবদন হয় না এবং ফাকি দিতে জানে। প্রতিবেশীর স্ত্রীকন্যার সম্বন্ধে সৌন্দৰ্য-চৰ্চার শখও মদ নাই। পুরুষের বিবাহ হওয়া কঠিন ব্যাপার অথচ নানা বয়সের বিধবায় প্রতি গৃহস্থ ভারাক্রাস্ত । তাই নৈতিক স্বাস্থ্যও অতিশয় দুৰিত। সমাজ ইহাদিগের আছে- তাহার শাসনও কম নয়, কিন্তু পুলিশের সহিত চোরের যে সম্বন্ধ, সমাজের সহিত ইহারা ঠিক সেই সম্বন্ধ পাতাইয়া রাখিয়াছে। অথচ সৰ্ব্বসমেত ইহার এমন পীড়িত, এত দুৰ্ব্বল, এমন নিঃস্ব যে, রাগ করিয়া বলিয়া থাকীও অসম্ভব। বিদ্রোহী বিপথগামী সস্তানের প্রতি পিতার মনোভাব যা হয়, রমেশের অস্তুরটা ঠিক তেমনি করিতেছিল বলিয়াই আজিকার সন্ধায় সে পিয়পুরের নূতন ইস্থল-ঘরে পঞ্চায়েত আহ্বান করিয়াছিল। কিছুক্ষণ হইল সন্ধ্যার ঝান্স ঘোর কাটিয়া গিয়া দশমীর জ্যোৎস্নায় জানালার বাহিরে মুক্ত প্রান্তরের এদিক ওদিক ভরিয়া গিয়াছিল। সেই দিকে চাহিয়া রমেশ যাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়াও যাই-ফাই ২১৯