পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (দ্বিতীয় সম্ভার).djvu/২৪৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


বিরাজ-বে। একখণ্ড কালো পাথর সমীপন্থ সমাধিস্তুপের প্রাচীর-গাত্র হইতে কোন এক অতীত দিনের বর্ষার খরস্রোতে স্খলিত হইয়া আসিয়া পড়িয়াছিল। এই বাড়ির বধুরা প্রতি সন্ধ্যায় তাহারই একাংশে মৃতাত্মার উদ্দেশে দীপ জালিয়া দিয়া যাইত। সে পাথরখানির একধারে আসিয়া নীলাম্বর ছোটবোনটির হাত ধরিয়া বসিল । নদীর উভয় তীরেই বড় বড় আমবাগান এবং বঁাশঝাড়। দুই-একটা বহু প্রাচীন অশ্বখ বট নদীর উপর পর্য্যন্ত ঝুঁকিয়া পডিয়া শাখা মেলিয়া দিয়াছে। ইহাদের শাখায় কতকাল কত পাখি নিরুদ্বেগে বাস৷ বধিয়াছে, কত শাবক বড় করিয়াছে, কত ফল খাইয়াছে, কত গান গাহিয়াছে, তাহারই ছায়ায় বসিয়া, ভাই-বোন ক্ষণকাল চুপ করিয়া রহিল। হঠাৎ হরিমতি দাদার ক্রোড়ের কাছে আরও একটু সরিয়া আসিয়া বলিল, আচ্ছা দাদা, বৌদি কেন তোমাকে বোষ্টমঠাকুর বলে ডাকে ? নীলাম্বর গলায় তুলসীর মালা দেখাইয়া হাসিয়া বলিল, আমি বোষ্টম বলে ডাকে ? হরিমতি অবিশ্বাস করিয়া বলিল, যা:–তুমি কেন বোষ্টম হবে ? তারা ত ভিক্ষে করে । আচ্ছা, ভিক্ষে কেন করে দাদা ? নেই ব’লেই করে । হরিমতি মুখপানে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিল, কিছু নেই তাদের? তাদের পুকুর নেই, বাগান নেই, ধানের গোলা নেই—কিছুটি নেই ? নীলাম্বর সঙ্গেহে হাত দিয়া বোনটির মাথার চুলগুলি নাড়িয়া দিয়া বলিল, কিচ্ছুটি নেই দিদি, কিচ্ছুটি নেই—বোষ্টম হ’লে কিচ্ছুটি থাকতে নেই। হরিমতি বলিল, তবে সবাই কেন তাদের কিছু কিছু দেয় না ? নীলাম্বর বলিল, তোর দাদাই কি কিছু তাদের দিয়েছে রে ? কেন দাও না দাদা, আমাদের ত এত আছে ? নীলাম্বর সহস্তে বলিল, তবুও তোর দাদা দিতে পারে না ; কিন্তু তুই যখন রাজার বেী হবি দিদি, তখন দিস। হরিমতি বালিকা হইলেও কথাটায় লঙ্গ পাইল । দাদার বুকে মুখ লুকাইয়া বলিল, যাঃ । নীলাম্বর দুই হাতে চাপিয়া ধরিয়া তাহার মস্তক চুম্বন করিল। মা-বাপ মরা এই ছোটবোনটিকে সে যে কত ভালবাসিত তাহার সীমা ছিল না। তিন বছরের শিশুকে বড়-বে-ব্যাটার হাতে সঁপিয়া দিয়া তাহাদের বিধবা জননী সাত বৎসর পূৰ্ব্বে স্বারোহণ করেন। সেইদিন হইতে নীলাম্বর ইহাকে মাহৰ করিয়াছে। সমস্ত এায়ের রোগীর সেবা করিয়াছে, মড়া পোড়াইয়াছে, কীর্তন গাহিয়াছে, গাঙ্গা খাইয়াছে; কিন্তু জননীর শেষ আদেশটুকু এক মুহূর্তের জন্য অবহেলা করে নাই। २♚? تابسst