প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (দ্বিতীয় সম্ভার).djvu/৩২২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰন্থ জমিদারের স্বত্র বজরা বিরাজকে লইয়া তীর ছাড়িয়া ত্রিবেণী অভিমুখে যাত্র করিল। দাড়ের শব্দ ছাপাইয়া বাতাস চাপিয়া আসিল। দূরে একধারে মৌন রাজেন্দ্র নতমুখে বসিয়া মদ খাইতে লাগিল, বিরাজ পাষাণ মূৰ্ত্তির মত জলের দিকে চাহিয়া বসিয়া রহিল। আজ রাজেন্দ্র অনেক মদ খাইয়াছিল। মদের নেশা তাহার দেহের রক্তকে উত্তপ্ত এবং মগজকে উন্মত্তপ্রায় করিয়া আনিতেছিল। বজরা যখন সপ্তগ্রামের সীমানা ছাড়িয়া গেল, তখন সে উঠিয়া আসিয়া কাছে বসিল। বিরাজের রুক্ষ চুল এলাইয়া লুটাইতেছে, মাথার আঁচল খসিয়া কাধের উপর পড়িয়াছে— কিছুতেই তাহার চৈতন্ত নাই। কে আসিল, কে কাছে বসিল, সে ভ্রক্ষেপ করিল না। কিন্তু রাজেন্দ্রর এ কি হইল ? একাকী কোন ভয়ঙ্কর স্থানে হঠাৎ আসিয়া পড়িলে ভূত-প্রেতের ভয় মানুষের বুকের মধ্যে যেমন তোলপাড় করিয়া উঠে তাহারও সমস্ত বুকজুড়িয়া ঠিক তেমনই আতঙ্কের ঝড় উঠিল । সে চাহিয়া রহিল, ডাকিয়া আলাপ করিতে পারিল না । অথচ এই রমণীটির জন্য সে কি না করিয়াছে ! দুই বৎসর অহনিশ মনে মনে অনুসরণ করিয়া ফিরিয়াছে, নিদ্রায় জাগরণে ধ্যান করিয়াছে, চোখের দেখা দেখিবার লোভে আহার-নিদ্ৰা ভুলিয়। বনে-জঙ্গলে লুকাইয়া থাকিয়াছে—তাহার স্বপ্নের অগোচর এই সংবাদ, আজ যখন স্বন্দরী ঘুম ভাঙাইয়া তাহার কানে কানে কহিয়াছিল, সে ভাবের আবেশে অভিভূত হইয়া বহুঙ্কণ পৰ্যন্ত এ সৌভাগ্য হৃদয়ঙ্গম করিতে পারে নাই। স্বমুখে নদী বাকিয়া গিয়া উভয় তীরে দুই প্রকাণ্ড বঁাশ ঝাড়, বহু প্রাচীন বট ও পাকুড় গাছের ভিতর দিয়া গিয়াছিল, স্থানে স্থানে বঁাশ, কঞ্চি ও গাছের ডাল জলের উপর পধ্যস্ত ঝুকিয়া পড়িয়া সমস্ত স্থানটাকে নিবিড় অন্ধকার করিয়া রাখিয়াছিল। বজয়। এখানে প্রবেশ করিবার পূর্বক্ষণে রাজেন্দ্র সাহস সঞ্চয় করিয়া, কণ্ঠের জড়তা কাটাইয়। কোনমতে বলিয়া ফেলিল, তুমি—আপনি—তেতরে গিয়ে একবার বম্বন— গায়ে ডালপালা লাগবে ! বিরাজ মুখ ফিরাইয়া চাহিল। স্বমুখে একটা ক্ষুদ্র দীপ জলিতেছিল, তাহারই ক্ষীণ আলোকে চোখাচোখি হইল, পূর্কেও হইয়াছে। তখন দুৰ্ব্বত্ত পরের জমির উপর দাড়াইয়াও সে দৃষ্টি সহিতে পারিয়াছিল। কিন্তু আজ নিজের অধিকারের মধ্যে নিজেকে মাতাল করিয়াও সে এ চাহনির স্বমুখে মাথা সোজা রাখিতে পারিল না—ঘাড় ইেট করিল। কিন্তু বিরাজ চাহিয়া রহিল । তাহার এত কাছে পর-পুরুষ বসিয়া অথচ মুখে তাহার আবর্ণ নাই। মাথায় এতটুকু আঁচল পৰ্য্যন্তও নাই। এ সময়ে বজব্ল খন ছায়াচ্ছন্ন ঝোপের মধ্যে ঢুকিতেই দাড়ীর দাড় ছাড়িয়া ডালপালা সরাইতে ব্যস্ত হইল। নদী অপেক্ষাকৃত সঙ্কীর্ণ হওয়ায় ভাটার টানও এখানে অত্যন্ত প্রখর। ওরে 3১৬