পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (দ্বিতীয় সম্ভার).djvu/৫৯

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ঐকাপ্ত পরদিন হইতে পুনরায় নিজের চাকরির উমেদারিতে লাগিয়া গেলাম। কিন্তু সহস্ৰ চিন্তার মধ্যেও অভয়ার চিন্তাকে মনের ভিতর হইতে ঝাড়িয়া ফেলতে পারিলাম না! কিন্তু চিস্ত . যাই করি না কেন, দিনের পর দিন সমভাবেই গড়াইয়া চলতে লাগিল। এদিকে অদৃষ্টবাদী দাঠাকুরের প্রফুল্ল মুখ মেঘাচ্ছন্ন হইয়া উঠতে লাগিল । ভাতের তরকারি প্রথমে পরিমাণে, এবং পরে সংখ্যায় বিরল হইয়া উঠতে লাগিল, কিন্তু চাকরি আমার সম্বন্ধে লেশমাত্র মত পরিবর্তন করিলেন না ; যে চক্ষেই প্রথম দিনটিতে দেখিয়াছিলেন, মাদাধিককাল পরেও ঠিক সেই চক্ষে দেখিতে লাগিলেন। কাহার পরে জানি না, কিন্তু ক্রমশ: উৎকণ্ঠিত এবং বিরক্ত হইয়া উঠতে লাগিলাম। কিন্তু তখন ত জানিতাম না, চাকরি পাবার যথেষ্ট প্রয়োজন না হইলে আর ইনি দেখা দেন না। এই জ্ঞানটি লাভ করিলাম হঠাৎ একদিন রোহিণীবাবুকে পথের মধ্যে দেখিয়া। তিনি বাজারে পথের ধারে তরি-তরকারি কিনিতেছিলেন। আমি অনতিদূরে দাড়াইয়া নিঃশব্দে দেখতে লাগিলাম -যদচ তাহার গায়ের জামকাপড় জুতা জীর্ণতার প্রায় শেষ সীমায় পৌঁছিয়াছে—তীক্ষ্ণ রৌদ্রে মাথায় একটা ছাত পৰ্য্যন্ত নাই, কিন্তু আহাৰ্য্য প্ৰব্যগুলি তিনি বড়লোকের মতই ক্রয় করিয়াছেন ; সেদিকে তাহার খোঁজাখুজি ও যাচাই-বাছাইয়ের অবধি নাই। হাঙ্গম ও পরিশ্রম যতই হোক, ভাল জিনিসটি সংগ্ৰহ করিবার দিকে যেন তাহার প্রাণ পড়িয়া আছে। চক্ষের পলকে সমস্ত ব্যাপারটা আমার চোখে পড়য় গেল। এই সব কেনাকাটার ভিতর দিয়া তাহার ব্যগ্র ব্যাকুল স্নেহ যে কোথায় গিয়া পৌঁছিতেছে, এ যেন আমি হুর্য্যের আলোর মত সুস্পষ্ট দেখিতে পাইলাম। কেন যে এই সকল লইয়া তাহার বাড়ি পৌঁছানো একান্তই চাই, কেন যে এই সকলের মূল্য দিবার জন্য চাকরি তাহাকে পাইতেই হইল, এ সমস্তার মীমাংসা করিতে আর লেশমাত্র বিলম্ব হইল না। আজ বুঝিলাম ; কেন সে এই জনারণ্যের মধ্যে পথ খুজিয়া পাইয়াছে, এবং আমি পাই নাই। ঐ যে শীর্ণ লোকটি রেঙ্গুনের রাজপথ দিয়া একরাশ মোট হাতে লইয়া, শতচ্ছিন্ন মলিন বাসে গৃহে চলয়াছে—আড়ালে থাকিয়া আমি তাহার পরিতৃপ্ত মুখের পানে চাহিয়া দেখিলাম। নিজের প্রতি দৃকপাত করিবার তাহার যেন অবসরমাত্র নাই। হৃদয় তাহার যাহাতে পরিপূর্ণ হইয়া আছে, তাহাতে তাহার কাছে জাম-কাপড়ের দৈন্ত যেন একেবারেই অকিঞ্চিৎকর হইয়া গেছে। আর আমি ? বস্ত্রের সামান্ত মলিনতায় প্রতিপদেই যেন সঙ্কোচে জড়-সড় হইয়া উঠিতেছি ; পথচারী একান্ত অপরিচিত লোকেরও দৃষ্টিপাতে লজ্জায় মািরয়া যাইতেছি । রোহিণীদা চলিয়া গেলেন--আমি তাহাকে ফিরিয়া ডাকিলাম না, এবং পরক্ষণেই লোকের মধ্যে তিনি অদৃপ্ত হইয়া গেলেন। কেন জানি না, এইবার অশ্রুজলে । @@