প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (দ্বিতীয় সম্ভার).djvu/৮১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


স্ত্রীকান্ত অর্থ কি এই যে, যার স্বামী এত বড় অপরাধ করেচে তার স্ত্রীকে সেই অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে সারাজীবন জীবন্মত হয়ে থাকাই তার নারী-জন্মের চরম সার্থকতা ? একদিন আমাকে দিয়ে বিয়ের মন্ত্র বলিয়ে নেওয়া হয়েছিল—সেই বলিয়ে নেওয়াটাই কি আমার জীবনে একমাত্র সত্য, আর সমস্তই একেবারে মিথ্যা ? এত বড় অন্যায়, এত বড় নিষ্ঠুর অত্যাচার কিছুই আমার পক্ষে একেবারে কিছু না? আর আমার পত্নীত্বের অধিকার নেই, আমার মা হবার অধিকার নেই —সমাজ, সংসার, আনন্দ কিছুতেই আর আমার কিছুমাত্র অধিকার নেই? একজন নির্দয়, মিথ্যাবাদী, কদাচারী স্বামী বিনা দোষে তার স্ত্রীকে তাড়িয়ে দিলে বলেই কি তার সমস্ত নারীত্ব ব্যর্থ, পঙ্গু হওয়া চাই ? এই জন্যেই কি ভগবান মেয়েমানুষ গড়ে তাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন ? সব জাত, সব ধর্মেই এ অবিচারের প্রতিকার আছে—আমি হিন্দুর ঘরে জন্মেচি বলেই কি আমার সকল দিক বন্ধ হয়ে গেছে শ্ৰীকান্তবাবু ? আমাকে মৌন দেখিয়া অভয়া বলিল, জবাব দিন না শ্ৰীকাস্তবাবু ? বলিলাম, আমার জবাবে কি যায় আসে ? অামার মতামতের জন্য ত আপনি অপেক্ষা করেননি ? অভয়া কহিল, কিন্তু তার ত সময় ছিল না। কহিলাম, তা হবে। কিন্তু আপনি যখন আমাকে দেখে পালিয়ে গেলেন, তখন আমিও চলে যাচ্ছিলুম। কিন্তু আবার ফিরে এলুম কেন জানেন ? না । ফিরে আসবার কারণ, আজ আমার ভারী মন খারাপ হ’য়ে আছে। আপনাদের চেয়ে ঢের বেশী নিষ্ঠুর আচরণ একটি মেয়ের উপর হতে আজই সকালে দেখেচি। এই বলিয়া জাহাজ-ঘাটের সেই বৰ্ম্ম মেয়েটির সমস্ত কাহিনী বিবৃত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, এই মেয়েটির কি উপায় হবে, আপনি বলে দিতে পারেন ? অভয়া শিহরিয়া উঠিল। তার পরে ঘাড় নাড়িয়া বলিল, না, আমি বলতে পারিনে । কহিলাম, আপনাকে আরও দুটি মেয়ের ইতিহাস আজ শোনাব। একটি আমার অন্নদাদিদি, অপরটির নাম পিয়ারী বাইজী । দুঃখের ইতিহাসে এদের কারুর স্থানই আপনার নীচে নয়। অভয়া চুপ করিয়া রহিল। আমি অন্নদাদিদির সমস্ত কথা আগাগোড়া বলিয়া চাহিয়া দেখিলাম, অভয়া কাঠের মূৰ্ত্তির মত স্থির হইয়া বসিয়া আছে, তাহার দুই চক্ষু দিয়া জল পড়িতেছে! কিছুক্ষণ এইভাবে থাকিয় সে মাটিতে মাথা ঠেকাইয়া নমস্কার করিয়া উঠিয়া বসিল। আঁচল দিয়া চোখ মুছিয়া কহিল, তার পরে ? ዓ©