পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (দ্বিতীয় সম্ভার).djvu/৯৮

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ কি সত্য নয় ? গুরুদেব হাসিলেন। বলিলেন, সত্য বলেই ত তিনি দিতে পারেননি মা ! কিন্তু সে ভয় যার নাই, সে কেন দেবে না ? বলিলাম, ভয় নেই কেন ? তিনি পুনরায় হাসিয়া কছিলেন, একবাড়ির মধ্যে যে রোগের বীজ একজনকে মেরে ফেলে, আর একজনকে তা স্পর্শ করে না—কেন বলতে পারো ? কহিলাম, স্পর্শ হয়ত করে, কিন্তু যে সবল সে কাটিয়ে উঠে, যে দুৰ্ব্বল সেই মারা যায়। গুরুদেব আমার মাথার উপর আবার তার হাতটা রাখিয়া বলিলেন, এই কথাটি কোনদিন ভুলো না মা। যে অপরাধ একজনকে ভূমিসাৎ করে দেয়, সেই অপরাধই আর-একজন হয়ত স্বচ্ছদে উত্তীর্ণ হয়ে চলে যায়। তাই সমস্ত বিধিনিষেধই সকলকে এক দডিতে বাধতে পারে না। সঙ্কোচের সহিত আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করিলাম, যা অন্যায়, যা অধৰ্ম্ম, তা কি সবল-দুৰ্ব্বল উভয়ের কাছেই সমান অন্যায় অধৰ্ম্ম নয় ? না হলে সে কি অবিচার নয় ? গুরুদেব বলিলেন, না মা, বাইরে থেকে যেমনই দেখাক, তাদের ফল সমান নয়। তা হলে সংসারে সবলে-দুৰ্ব্বলে কোন প্রভেদ থাকত না। সে বিষ পাচ বছরের শিশুর পক্ষে মারাত্মক, সেই বিষ যদি একজন ত্রিশ বছরের লোককে মারতে না পারে, ত কাকে দোষ দেবে মা ? কিন্তু আজই যদি আমার কথা বুঝতে না পারো ত অস্তত: এটি স্মরণ রেখো যে, যাদের ভিতরে আগুন জলছে, আর যাদের শুধু ছাই জমা আছে তাদের কন্মের ওজন এক তুলাদণ্ডে করা যায় না। গেলেও তা ভুল হয়। শ্ৰীকান্তদা, তোমার চিঠি পড়িয়া আজ আমার গুরুদেবের সেই অস্তরের আগুনের কথাই মনে পড়িতেছে। অভয়াকে চক্ষে দেখি নাই, তবুও মনে হইতেছে—তার ভিতরে যে বহ্নি জলিতেছে, তাহার শিখার আভাস তোমার চিঠির মধ্যেও যেন দেখিতে পাইতেছি। র্তার কর্মের বিচার একটু সাবধানে করিও। আমাদের মত সাধারণ স্ত্রীলোকের বাটখারা লইয়া তার পাপ-পুণ্যের ওজন তাড়াতাড়ি সারিয়া দিয়া বসিয়ো না। চিঠিখান অভয়ার হাতে দিয়া বলিলাম, রাজলক্ষ্মী তোমাকে শত-সহস্ৰ নমস্কার জানাইয়াছে—এই নাও। অভয়া দুই-তিনবার করিয়া লেখাটুকু পড়িয়া কোনমতে তাহা আমার বিছানার উপর ছুড়িয়া ফেলিয়া দিয়া দ্রুতপদে বাহির হইয়া গেল। সংসারের চক্ষে তাহার যে নারীত্ব আজি লাস্থিত, অপমানিত, তাহারই উপরে শতযোজন দূর হইতে যে অপরিচিত নারী আজি অযাচিত সম্মানের পুপাঞ্জলি অর্পণ করিয়াছে, তাহারই অপরিসীম আনন্দ-বেদনাকে সে পুরুষের দৃষ্টি হইতে তাড়াতাড়ি আড়াল করিয়া লইয়া গেল । ֆի