প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার).djvu/১৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


দেনা-পাওনা টাকাকড়ি দিয়ে সেই যে বিদায় করা হয়, আর কখনো কেউ তার ছায়া পৰ্য্যস্ত দেখতে পায় না । এই-ই নিয়ম, এ-ই চিরকাল ধরে হয়ে আসচে। জীবানন্দ সহাস্তে কহিলেন, বল কি এককড়ি, এক্কেবারে দেশান্তর ? ভৈরবী মানুষ, রাত্রে নিরিবিলি একপাত্র সুরা ঢেলে দেওয়া—গরম মশলা দিয়ে চাট্রি মহাপ্রসাদ রোধে খাওয়ানে—একেবারে কিছুই করতে পায় না ? এককড়ি মাথা নাড়িয়া বলিল, না হুজুর, মায়ের ভৈরবীকে স্বামী স্পর্শ করতে নেই। কিন্তু তাই বলে কি স্বামী ছাড়া গায়ে আর পুরুষ নেই ? মাতু ভৈরবীকেও দেখেচি, ষোড়শী ভৈরবীকেও দেখেচি । লোকগুলো কি আর খামক তার পায়ে পায়ে জড়ায় । কথায় কথায় হুজুরের সঙ্গেই মামলা-মকদ্দমা বাধিয়ে দেয় । জীবানন্দ হাসিয়া কহিলেন, মেয়ে-মাহস্ত আর কি ! তার দোধ নেই ; কিন্তু মাতুর পরে ইনি জুটলেন কি ক’রে ? এককড়ি বলিল, চক্কোত্তিমশাই হচ্চেন মাতঙ্গিনীর ভাগ্নে । ঢাকা না কোথায় কোন মহাজনের আড়তে খাতা লিখেছিলেন, চিঠি পেয়ে চলে এলেন, সঙ্গে একটা বছর দশেকের মেয়ে। কোথা থেকে একটা পাএও জুটিয়ে আনলেন—কি জাত, কার ছেলে, কোথায় ঘর--রাতারাতি বিয়ে হ’ল, রাতারাতি চালান দিয়ে দিলেন—তারপর দিবি। গদিতে বসিয়ে রাজভোগে আছেন । কেবা কথা কয়, কেবা জিজ্ঞেস করে ? গায়েও মানুষ নেই, রাজারও শাসন নেই ! বলিয়া সে জমিদারকেই কটাক্ষ করিল ; কিন্তু চাহিয়া বুঝিল এ বক্রোক্তি নিস্ফল হইয়াছে। রাজা নির্মীলিত-চক্ষে এক নিমেষেই যেন তন্দ্রাভিভূত হইয়া পড়িয়াছেন। অনেকক্ষণ পৰ্য্যন্ত কোন কথা নেই–পাছে তাহার কিছুমাত্র অবিবেচনায় এই তন্দ্রা ভাঙিয়া যায়, এই ভয়ে সে পুত্তলিকার দ্যায় নিশ্চল দাড়াইয়। মনে মনে মাতালের পিতৃপুরুষের আদ্যশ্রাদ্ধ করিয়া নিঃশব্দে বাহির হইয়া যাইবে কিন। ভাবিতেছিল, এমনি সময়ে জীবানন্দ ঠিক সহজ মানুষের মতই পুনরায় কথা কহিলেন । বলিলেন, বছর পোনের পূৰ্ব্বে না? আচ্ছা, এই তারাদ সি লেকিট কি দেখতে খুব বেঁটে আর ফরসা ? এককড়ি কহিল, না হুজুর, চক্কোত্তিমশায়ের রঙ ফরসা বটে, কিন্তু ইনি খুব দীর্ঘাঙ্গ । দীর্ঘাঙ্গ ? আচ্ছা, লোকটা যে ঢাকায় মহাজনের গদিতে খাতা লিখত এ তুমি জানলে কি করে ? এমন ত হ’তে পারে সে কলকাতায় রাধুনি বামুনের কাজ করত ? এককড়ি মাথা নাড়িয়া বলিল, না হুজুর, সত্যিই তিনি খাতা লিখতেন । তার ছ’মাদের মাইনে বাকি ছিল, আমিই নালিশ করবার ভয় দেখিয়ে চিঠি লিখে টাকাটা আদায় করে দিই ।