প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার).djvu/৪৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ করে। দার ইহাকে খাতির করে, এককড়ি ইহার হাত-ধরা ; অনাদারী বৎসরে ইনিই জমিদারের সদর খাজনার যোগান দেন। দুই শত বিম্বা ইহার নিজ চাষ, এবং ধান-চাল-গুড় হইতে তেজারতী ও বন্ধকী কারবার ইহার একচেটে বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। অথচ, এই বড়কৰ্ত্তাই একদিন অতি নিঃস্ব ছিলেন। জনশ্রুতি এইরূপ যে, এ সমস্তই তাহার মধ্যম জামাতা মিস্টার বসুর টাকা । তিনি পশ্চিমের কোন একটা হাইকোটের বড় ব্যারিস্টার । বিলাত হইতে ফিরিয়া প্রায়শ্চিত্ত করিয়া জাতিতে উঠিয়াছেন। আজ তাহারই একমাত্র পুত্রের সর্ববিধ মঙ্গল-কামনায় চণ্ডীর পূজার আয়োজন হইতেছে। এবং আয়োজন কেবল আজ নয়, মাসাধিক কাল হইতেই গ্রামের মধ্যে ইহার কথাবাৰ্ত্ত চলিয়াছে। বড়কৰ্ত্তার যে মেয়েটি এত বড় ঘরে পড়িয়াছে, সেই হৈমবতীকে ষোড়শী ছেলেবেলায় চিনিত । তাহার চেয়ে বয়সে সামান্য কিছু ছোটই হইবে। মন্দির-প্রাঙ্গণে যে ছোট পাঠশালাটি এখনও বসে, সকলের সঙ্গে সেও পড়িতে আসিত ; এবং খেলাচ্ছলে যদি কোনদিন ষোড়শী উপস্থিত হইত, দেবীর ভৈরবী বলিয়া সকলের সঙ্গে সেও প্রণাম করিয়া পদধূলি লইত। আজ সে বড় ঘরের ঘরণী । আজ হয়ত তাহার দেহে সৌন্দর্ঘ্য এবং ঐশ্বর্ঘ্যের মণিমাণিক্য ধরে না, আজ হয়ত সে তাহাকে চিনতেও পারিবে না ; কিন্তু একদিন এমন ছিল না। সেদিন তাহার রূপ এবং বয়স কোনটাই বেশি ছিল না ; তবু যে সে এতবড় ঘরে পড়িয়াছে, শুনা যায়, সে কেবল এই দেবীর মাহীত্ম্যে। কোন এক অমাবস্তায় নাকি এক সিদ্ধ তান্ত্রিক দেবী-দর্শনে আসিয়াছিলেন ; রায় মহাশয় গোপনে এই কন্যার কল্যাণেই কি সব যাগ-যজ্ঞ করাইয়া লইয়াছিলেন। এই পুত্রটিও নাকি র্তাহারই করুণায়। হতাশ হইয়া হৈম বিদেশে এই দেবীকেই মানত করিয়া পুত্ৰলাভ করিয়াছে। দাসী কাজ করিতে করিতে কহিল, মা, মন্দিরে আজ হঠাৎ কখন ডাক পড়ে বলা যায় না, এই বেলা কেন চানটানগুলো সেরে নিলে না ? ষোড়শী অগ্নমনস্ক হইয়া ভাবিতেছিল, মন্দিরের ডাক-পড়ার নামে চমকিয়া উঠিল। কিন্তু সেজন্য না হোক, বেলা বাড়িবার পূৰ্ব্বেই নিভৃতে স্নান করিয়া আসাই ভাল মনে করিয়া সে কালবিলম্ব না করিয়া খিড়কির দ্বার দিয়া পুষ্করিণীতে চলিয়া গেল । এই পুকুরটায় পাড়ার কেহ বড় একটা আসে না, তাই সেখানে কাহারও সহিত সাক্ষাৎ হইল না। ফিরিয়া আসিয়া ভিজা কাপড় ছাড়িবার দ্বিতীয় বস্ত্র নাই, গা-মাথা মুছিবার একটা গামছা পৰ্য্যন্ত বাহিরে নাই। রাণীর মা লক্ষ্য করিয়া ক্ষুন্ন হইল। সে তারাদাসকে দেখিতে পারিত না, রাগ করিয়া কহিল, বিটুলে খড়কুটোট পৰ্যন্ত তালাবদ্ধ করে গেছে—আমার একখানি কাচা মটকার কাপড় আছে মা, নে আসবো ? তাতে ত দোষ নেই ?