প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (পঞ্চম সম্ভার).djvu/৮৭

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


দেনা-পাওনা এই কুড়িটা বছর প্রবাহিত হইয়া গেছে, ইহাকে ভৈরবীর জীবন বলিয়াই সে অসংশয়ে গ্রহণ করিয়াছে ; একটা দিনের তরেও আপনার জীবন নারীর জীবন বলিয়া ভাবে নাই। চওঁীর সেবায়েত বলিয়া সে নিকটে ও দূরের বহু গ্রাম ও জনপদের গণনাতীত নর-নারীর সহিত সুপরিচিত । কত সংখ্যাতীত রমণী—কেহ ছোট, কেহ বড়, কেহ বা সমবয়সী—তহিীদের কত প্রকারের মুখ-দুঃখ, কত প্রকারের আশা-ভরসা, কত ব্যর্থতা, কত অপরূপ আকাশ-কুমুমেরনিৰ্ব্বাক ও নিৰ্ব্বিকার সাক্ষী হইয়া আছে; দেবীর অনুগ্রহলাভের জন্য কতকাল ধরিয়া কত কথাই না ইহারা গোপনে মৃদু-কণ্ঠে তাহাকে ব্যক্ত করিয়াছে, দুঃখী-জীবনের নিভৃততম অধ্যায়গুলি অকপটে তাহার চোখের উপর মেলিয়া ধরিয়া প্রসাদ-ভিক্ষণ চাহিয়াছে ; এ সমস্তই তাহার চোখে পড়িয়াছে, পড়ে নাই কেবল রমণী-হৃদয়ের কোন অস্তঃস্তল ভেদিয়া এই সকল সকরুণ অভাব ও অমুযোগের স্বর উখিত হইয়া এতকাল ধরিয়া তাহার কানে আসিয়া পশিয়াছে। ইহাদের গঠন ও প্রবৃত্তি এমনি কোন এক বিভিন্ন জগতের বস্তু, যাহাকে জানিবার ও চিনিবার কোন হেতু, কোন প্রয়োজন তাহার হয় নাই। সেই প্রয়োজনের প্রথম আঘাত এইখানে এই পরিত্যক্ত অন্ধকার আলয়ে এই প্রথম তাহার গায়ে লাগিল । দুৰ্য্যোগের রাত্ৰে নিৰ্ম্মলের হাত ধরিয়া নদী পার করিয়া আনিয়া সে তাহাকে গৃহে পৌছাইয়া দিয়াছিল ; হয়ত দুটি লোক ছাড়া এ-কথা আর কেহ জানে না, এবং এখন এইমাত্র সেই স্বল্প-দৃষ্টি লোকটির আহবানে হৈম যে তাহার হাত ধরিয়া নি:শব্দে অগ্রসর হইল, এ-কথাও বোধ করি কয়েকটি লোক ছাড়া আর কেহ জানিবে না, কিন্তু কাল এবং আজিকার এই কৰ্ত্তব্যের কত বড়ই না পার্থক্য । আজ একবার তাহার চোখের উপর হৈমর কাপড়ের পাড়টুকু হইতে, তাহার আঙুলের সবুজরঙের আঙটি হইতে তাহার কানের হীরের দুল পৰ্য্যস্ত সমস্ত পেলিয়া গেল, এবং সৰ্ব্বপ্রকার দুর্ভেদ্য আবরণ ও অন্ধকার অতিক্রম করিয়া তাহার অভ্রান্ত অতীন্দ্রির দৃষ্টির বাহিরে ওই মেয়েটির প্রত্যেক পদক্ষেপ যেন অনুসরণ করিয়া চলিল। সে দেখিতে পাইল, স্বামীর হাত ছাড়িয়া এইবার তাহাকে লুকাইয়া বাড়ি ঢুকিতে হইবে, সেখানে তাহার চিন্তিত ও ব্যাকুল পিতা-মাতার শত-সহস্র তিরস্কার ও কৈফিয়ত নিরুত্তরে মাথায় করিয়া লজ্জিত দ্রুতপদে নিজের ঘরে গিয়া আশ্রয় লইতে হইবে, সেখানে হয়ত তাহার নিদ্রিত পুত্র ঘুম ভাঙিয়া বিছানায় উঠিয়া বসিয়৷ কাদিতেছে—তাহাকে শাস্ত করিয়া আবার ঘুম পাড়াইতে হইবে, কিন্তু ইহাতেই কি অবসর মিলিবে ? তখনও কত কাজ বাকী থাকিয়া যাইবে । অন্তরাল হইতে স্বামীর খাওয়াটুকু পর্যবেক্ষণ করা চাই -ক্রট না হয় ; ছেলেকে তুলিয়া দুধ খাওয়াইতে হইবে—সে অভূক্ত না থাকে, পরে নিজেও খাইয়া লইয়া যেমন-তেমন করিয়া বাকি রাতটুকু কাটাইয়। আবার প্রত্যুষে উঠিয়া যাত্রার জন্য প্রস্তুত হওয়া চাই ।