প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (প্রথম সম্ভার).djvu/২২৬

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


এমন কিছু আর নেই, যা থেকে সেই বাকি ঋণটা পরিশোধ হতে পারবে। এখন আর তাঁর খোঁজ করা—

কে আপনাকে বললে আমি দেনার জন্যেই তাঁর অনুসন্ধান করছি?

তা ছাড়া আর যে কি হতে পারে, আমি ত ভাবতে পারিনে। তিনিও আপনাকে চেনেন না, আপনিও তাঁকে চেনেন না!

তিনিও আমাকে চেনেন, আমিও তাঁকে চিনি।

নরেন হাসিল, কহিল, তিনি আপনাকে চেনেন, এ কথা সত্যি, কিন্তু আপনি তাঁকে চেনেন না। ধরুন, আমিই যদি বলি, আমার নাম নরেন, তা হলেও ত আপনি—

বিজয়া ঘাড় নাড়িয়া কহিল, তা হলেও আমি বিশ্বাস করি, এবং বলি এই সত্যি কথাটা অনেকদিন পূর্বেই আপনার মুখ থেকে বার হওয়া উচিত ছিল।

ফুঁ দিয়া আলো নিবাইলে ঘরের চেহারা যেমন বদল হয়, বিজয়ার প্রত্যুত্তরে চক্ষুর নিমেষে নরেনের মুখ তেমনি মলিন হইয়া গেল। বিজয়া তাহা লক্ষ্য করিয়াই পুনশ্চ কহিল, অন্য পরিচয়ে নিজের আলোচনা শোনা, আর লুকিয়ে আড়ি পেতে শোনা, দুটোই কি সমান বলে আপনার মনে হয় না? আমার ত হয়। তবে কিনা আমরা ব্রাহ্ম, এই যা বলেন।

নরেনের মলিনমুখ এইবার লজ্জায় কালো হইয়া উঠিল। একটুখানি মৌন থাকিয়া বলিল, আপনার সঙ্গে অনেক রকম আলোচনার মধ্যে নিজের অলোচনাও ছিল বটে, কিন্তু তাতে মন্দ অভিপ্রায় কিছুই ছিল না।শেষ দিনটায় পরিচয় দেব মনেও করেছিলাম, কিন্তু হয়ে উঠল না। এতে আপনার কোন ক্ষতি হয়েছে কি?

এ প্রশ্ন গোড়াতেই করিয়া বসিলে এ পক্ষেও উত্তর দেওয়া নিশ্চয়ই শক্ত হইত। কিন্তু যে আলোচনা একবার শুরু হইয়া গেছে, নিজের ঝোঁকে সে অনেক কঠিন স্থান আপনি ডিঙাইয়া যায়। তাই সহজেই বিজয়া জবাব দিতে পারিল। কহিল, ক্ষতি একজনের ত কতরকমেই হতে পারে। আর যদি হয়েও থাকে, সে ত হয়েই গেছে, আপনি ত এখন তার উপায় করতে পারবেন না। সে যাক। আপনার নিজের সম্বন্ধে কোন কথা জানতে চাইলে কি—

রাগ করব? না না। বলিয়াই তৎক্ষণাৎ প্রশান্ত নির্মল হাস্যে তাহার সমস্ত মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। এতদিন এত কথাবার্তাতেও এই লোকটির যে পরিচয় বিজয়া পায় নাই, একমুহূর্তের হাসিটুকু তাহাকে সে খবর দিয়া গেল। তাহার মনে হইল, ইহার সমস্ত অন্তর-বাহির একেবারে যেন স্ফটিকের মত স্বচ্ছ।