প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (প্রথম সম্ভার).djvu/৩৯৫

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


চন্দ্রনাথ সেদিন ভোলানাথ চাটুয্যের বাটতে ‘কথা’ হইত্তেছিল, কৈলাসচন্দ্র ডাকিলেন, বিশু, চল দাদা, ‘কথা’ শুনে আসি । বিশ্বেশ্বর তখন লাল কাপড় পরিয়া জাম গায়ে দিয়া টিপ পরিয়া, চুল অঙ্গচড়াইয়া দাজুর’ কোলে চড়িয়া ‘কথা’ শুনিতে গেল। কথকঠাকুর রাজা ভরতের উপাখ্যান কহিতেছিলেন। করুশকণ্ঠে গাহিতেছিলেন, কেমন করিয়া সেই বনবাসী মহাপুরুষের ক্রোড়ের নিকট হরিণ-শিশু ভাসিয়া আসিয়াছিল, কেমন করিয়া সেই সদ্যঃপ্রস্থত ३णশাবক কাতর-নয়নে আশ্রয় ভিক্ষা চাহিয়াছিল । আহা, রাজা ভরত নিরাশ্রয়কে আশ্রয় দিয়াছিলেন । এই সময় বিশু একটু সরিয়া বসিয়াছিল, কৈলাসচন্দ্র তাহাকে কোলের উপর টানিয়া লইলেন । তাহার পর কথক গাহিলেন, সেই মৃগ-শিশু কেমন করিয়া পলে পলে, দণ্ডে দণ্ডে, দিনে দিনে তা হার ছিন্ন স্নেহডোর আবার গাথিয়া তুলিতে লাগিল, কেমন করিয়া সেই শত-ভগ্ন মায়াশূঙ্খল তাহার চতুষ্পার্শ্বে জড়াইয়া দিতে লাগিল, কেমন করিয়া সেই মৃগশিশু নিত্যকৰ্ম্ম পূজাপাঠ, এমন কি, ঈশ্বর-চিন্তার মাঝে আসিয়াও ংশ লইয়া যাইত। ধান করিবার সময় মনশ্চক্ষে দেখিতে পাইতেন, সেই নিরাশ্রয় পশু-শাবকের সঙ্গলকরুণ-দৃষ্টি তাহার পানে চাহিয়া আছে। তাহার পর সে বড় হইতে লাগিল। ক্রমে কুটীর ছাড়িয়া প্রাঙ্গণে, প্রাঙ্গণ ছাড়িয়া পুষ্পকাননে, তাহার পর অরণ্যে, ক্রমে স্বদূর অরণ্যপথে স্বেচ্ছামত বিচরণ করিয়া বেড়াইত। ফিরিয়া আসিবার নির্দিষ্ট সময় অতিক্রাস্ত হইলে রাজা ভরত উৎকণ্ঠিত হইতেন। সঘনে ডাকিতেন, আয়, আয়, আয় ! তাহার পর কবি নিজে কাদিলেন, সকলকে কাদাইয়া উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে গাহিলেন, কেমন করিয়া একদিন সে আজন্ম মায়াবন্ধন নিমেষে ছিন্ন করিয়া গেল,—বনের পশু বনে চলিয়া গেল, মামুষের ব্যথা বুঝিল না। বৃদ্ধ ভরত উচ্চৈঃস্বরে ডাকিলেন ; আয়, আয়, আয়, আয় ! কেহ আসিল না, কেহ সে আকুল আহবানের উত্তর দিল না। তখন সমস্ত অরণ্য অন্বেষণ করিলেন, প্রতি কন্দরে কন্দরে, প্রতি বৃক্ষতলে, প্রতি লতাবিতানে কাদিয়া ডাকিলেন, আয়, আয়, আয়। কেহ আসিল না। এক দিন, দুই দিন, তিন দিন কাটিয়া গেল,—কেহ আসিল না। প্রথমে তাহার আহার-নিদ্র বন্ধ হইল, পূজাপাঠ উঠিয়া গেল—র্তাহার ধ্যান,চিন্তা—সব সেই নিরুদেশ স্বেহাস্পদের পিছে পিছে অমুদেশ বনপথে ছুটিয়া ফিরিতে লাগিল। কবি গাহিলেন, মৃত্যুর কালো-ছায়া ভুলুষ্ঠিত ভরতের অঙ্গ অধিকার করিয়াছে, কণ্ঠ রুদ্ধ হইয়াছে, তথাপি তৃষিত ওষ্ঠ ধীরে ধীরে কঁাপিয়া উঠিতেছে। যেন এখনও ডাকিতেছেন, ফিরে জায়, ফিরে আয়, ফিরে আয় । \రిyఫె