প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (প্রথম সম্ভার).djvu/৪১০

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ দাদা, মন্ত্রীটা তোমাকে দিলাম, আর কখনও চাব না। পথে আসিতে যাহার সহিত দেখা হইল তাহাকেই এই স্থখবরটা জানাইয়া দিলেন। আজ সৰ্ব্বকৰ্ম্মেই বৃদ্ধের বড় উৎসাহ । কিন্তু কাজ করিতে কাজ পিছাইয়া পড়িতেছে। দাবাখেলার মত ভুলচুক হইয়া যাইতেছে। যত বেলা পড়িয়া আসিতে লাগিল ভুলচুক ততই বাড়িয়া উঠিতে লাগিল, সরযু তাহা দেখিয়া গোপনে শতবার চক্ষু মূছিল। বৃদ্ধের কিন্তু মুখের উৎসাহ কমে নাই, এমন কি সরযু যখন আড়ালে ডাকিয়া পদধূলি মাথায় লইয়া কাদিতে লাগিল, তখনও তিনি অশ্রুসংবরণ করিয়া হাসিয়া আশীৰ্ব্বাদ করিলেন, মা আমার, কাদিসনে। তোর বুড়ে জ্যাঠার আশীৰ্ব্বাদে তুই রাজরাণী হবি। আবার যদি কখনো আসিস, তোদের এই কুঁড়ে ঘরটিকে ভুলে যেন আর কোথাও থাকিসনে । সরযু আরও কাদিতে লাগিল, বুকের মাঝে শুধু সেই দিনের কথা কাদিয়া কাদিয়া উঠিতে লাগিল, যেদিন সে নিরাশ্রিত পথের ভিখারিণী হইয়া কাশীতে আসিয়াছিল। আর আজ ! সরযু বলিল, জ্যাঠামশাই, আমাকে ছেড়ে তুমি থাকতে পারবে না যে— কৈলাসচন্দ্ৰ কহিলেন, আর ক’টা দিন মা ? কিন্তু মনে মনে বলিলেন, এইবার ডাক পড়েছে, এতদিনে তপ্ত প্রাণটার জুড়োবার উপায় হয়েছে। সরযু চোখ মুছিতে মুছিতে আকুলভাবে বলিল, আমার মায়-দয়া নেই— বৃদ্ধ বাধা দিয়া বলিলেন, ছি মা, ও-কথা বোলো না—আমি তোমাকে চিনেচি। • রাত্রি দশটার সময় সকলে স্টেশনে আসিয়া উপস্থিত হইলেন । গাড়ির সময় ক্রমশ: নিকটবর্তী হইয়া আসিতেছে। বিশ্বেশ্বর ঘুমাইয়া পড়িয়াছিল, কিন্তু লাল মন্ত্রীট। তখনও বুকের উপর চাপিয়া ধরিয়া ছিল । বৃদ্ধ নাড়াচাড়া করিয়া তাহাকে জাগাইয়া তুলিলেন । সদ্য নিদ্রোখিত হইয়া প্রথমে সে কাদিবার উপক্ৰম করিল, কিন্তু যখন তিনি মুখের কাছে মুখ আনিয়া ডাকিলেন, বিশু, দাদা ! তখন সে হাসিয়া উঠিল,—দাদু। দাদাভাই আমার, কোথায় যাচ্চ ? বিশু বলিল, দাত্তি। তাহার পর মন্ত্রীটা দেখাইয়া কহিল, মনৃতী । কৈলাসচন্দ্ৰ কহিলেন, হ্যা দাদা ! মন্ত্রী হারিয়ো না যেন । এ গজদন্ত-নির্মিত রক্ত-রঞ্জিত পদার্থটা সম্বন্ধে কৈলাসচন্দ্র ইতিপূৰ্ব্বে তাহাকে অনেকবার সতর্ক করিয়া দিয়াছিলেন, সেও ঘাড় নাড়িয়া কহিল, হারাবো নী—মনৃতী । ট্রেন আলিলে সরযু পুনরায় তাহার পদধূলি মাথায় লইয়া গাড়িতে উঠিল। বৃদ্ধের আন্তরিক আশীৰ্ব্বচন ওষ্ঠাধরে র্কাপিয়া কাপিয়া ভিতরেই রহিয়া গেল।