প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:শরৎ সাহিত্য সংগ্রহ (সপ্তম সম্ভার).djvu/২২২

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ রামবাৰু উৎকণ্ঠার পরিবর্তে লজ্জা পাইয়াই ক্রমাগত বলিতে লাগিলেন, গাড়ির আবগুক নেই—না গেলেও ক্ষতি নেই—কেবল প্রত্যুষে স্টেশনে গিয়ে হাজির হতে পারলেই চলবে । আমি রাত্রে কিছুই খাইনে, আমার সে ঝঞ্চাটও নেই—শুধু তুমি দুটি খেয়ে নিয়ে শুতে যাও মা, কথায় কথায় বড় রাত হয়ে গেছে—বড় অন্যায় হয়ে গেছে। এই বলিয়া এরকম জোর করিয়াই তাহাকে নীচে খাইবার জন্য পাঠাইয়া দিলেন এবং মিনিট-পনের পরে সে উপরে আসিতেই ব্যগ্র ও উংস্থক হইয়া বলিতে লাগিলেন, আর এক মিনিট দেরি নয় মা, তুমি গুতে যাও। আমি এই বসবার ঘরের কোচখানার উপর দিব্যি শুতে পারব, আমার কোন কষ্ট, কোন অসুবিধা হবে না —শুধু তুমি শুতে যাও স্বরম, আমি দেখি । বৃদ্ধের সনিৰ্ব্বন্ধ আবেদন ও নিবেদন এবং পুনঃ পুন: উত্তেজনা অচলাকে যেন আচ্ছন্ন করিয়া ধৰিল । যে মিথ্যা সন্মান, প্রীতি ও শ্রদ্ধা সে তাহার এই নিত্য শুভাকাঙ্ক্ষী পিতৃব্যসম বুদ্ধের নিকট হইতে এতকাল শুধু প্রতারণার দ্বারাই পাইয়া আসিয়াছে, সেই লোভই এই তাহার একান্ত দুঃসময়ে কণ্ঠরোধ করিয়া অপ্রতিহত বলে মুরেশের নির্জন শয়নমন্দিরের দিকে ঠেলিতে লাগিল। তাহার মনে পড়িল, এমনি এক ঝড়-জল-দুদিনের রাত্রিই একদিন তাহাকে স্বামীহারা করিয়াছিল, আজ আবার তেমনি এক দুর্দিনের দুরতিক্রম্য অভিশাপ তাহাকে চিরদিনের মত সীমাহীন অন্ধকারে ডুবাইতে উষ্ঠত হইয়াছে। কাল অসহ অপমানে, লজ্জার গভীরতর পক্ষে তাহার আকণ্ঠ মগ্ন হইয়া যাইবে, ইহা সে চোখের উপর স্পষ্ট দেখিতে লাগিল, কিন্তু তবুও আজিকার মত ওই মিথ্যাটাই জয়মাল্য করিয়া তাহাকে কোনমতেই সত্য প্রকাশ করিতে দিল না। আজ জীবনের এই চরম মুহূৰ্ত্তে অভিমান ও মোহই তাহার চিরজয়ী হইয়া রহিল। সে বাধা দিল না, কথা কহিল না, একবার পিছনে চাহিয়াও দেখিল না—নিঃশব্দে ধীরে ধীরে স্বরেশের শয়ন-কক্ষে গিয়া উপস্থিত হইল । বাহিরের মত প্রকৃতি তেমনি মাতলামি করিতে লাগিল, প্রগাঢ় অন্ধকারে বিদ্যুৎ তেমনি হাসিয়া হাসিয়া উঠিতে লাগিল, সারারাত্রির মধ্যে কোথাও তাহার লেশমাত্র ব্যতিক্রম হইল না । নূতন স্থানে রামবাবুর স্বনিদ্রা হয় নাই, বিশেষতঃ মনের মধ্যে চিন্তা থাকায় অতি প্রতুবেই তাহার ঘুম ভাঙ্গিয়াছিল। বাহিরে আসিয়া দেখিলেন, বৃষ্টি থামিয়াছে বটে কিন্তু, ঘোর কাটে নাই । চাকরেরা কেহ উঠিয়াছে কি না, দেখিবার জন্ত বারান্দার এক প্রাস্তে আসিয়া হঠাৎ চমকিয়া গেলেন। কে ষেন টেবিলে মাখা পাতিয়া চেয়ারে বসিয়া আছে। কাছে আসিয়া বিশ্বয়ে বলিয়া উঠিলেন, স্বরমা, তুমি যে ? এত ভোরে উঠেচ কেন মা ? ३98