পাতা:শ্রীকান্ত (তৃতীয় পর্ব).djvu/১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


শ্রীকাত্ত তৃতীয় পর্ব এক একদিন যে ভ্রমণকাহিনীর মাঝখানে অকস্মাৎ যবনিকা টানিয়া দিয়া বিদায় লইয়াছিলাম, আবার একদিন তাহাকেই নিজের হাতে উদঘাটিত করিবার আর আমার প্রবৃত্তি ছিল না। আমার সেই পল্লীগ্রামের যিনি ঠাকুরদাদা তিনি যখন আমার সেই নাটকীয় উক্তির প্রত্যুত্তরে শুধু একটু মুচকিয়া হাসিলেন এবং রাজলক্ষ্মীর ভূমিষ্ঠ প্ৰণামের প্রত্যুত্তরে শুধু যেভাবে শশব্যস্তে দুই পা হটিয়া গিয়া বলিলেন, তাই নাকি? আহা, বেশ বেশ–বেঁচেবর্তে থাকো! বলিয়া সকৌতুকে ডাক্তারটিকে সঙ্গে করিয়া বাহির হইয়া গেলেন, তখন রাজলক্ষ্মীর মুখের যে ছবি দেখিয়াছিলাম সে ভুলিবার বস্তু নয়, ভুলিও নাই ; কিন্তু ভাবিয়ছিলাম সে আমারই একান্ত আমার—বহির্জগতে তাহার যেন কোন প্রকাশ কোনদিনই না থাকে-কিন্তু এখন ভাবিতেছি, এ ভালই হইল যে, সেই বহুদিবসের বন্ধদুয়ার আবার আমাকে আসিয়াই খুলিতে হইল। যে অজানা রহস্যের উদ্দেশে বাহিরের ক্রুদ্ধ সংশয় অবিচারের রূপ ধরিয়া নিরস্তপ ধাক্কা দিতেছে-এ ভালই হইল যে, সেই অবরুদ্ধ দ্বার নিজের হাতেই অর্গলমুক্ত করিবাৰ অবকাশ পাইলাম । ঠাকুরদাদা চলিয়া গেলেন । লাঙলক্ষ্মী ক্ষণকাল স্তব্ধভাবে তাহার দিকে চাহিয়া রহিল, তারপর মুখ তুলিয়া একটুখানি নিষ্ফল হাসির চেষ্টা করিয়া বলিল, পায়ের ধূলা নিতে গিয়ে আমি তাকে ছুয়ে ফেলতুম না ; কিন্তু কেন তুমি ও কথা বলতে গেলে । তার ত কোন দরকার ছিল না! এ শুধু— বাস্তবিক এ শুধুই কেবল আপনাদের আপনি অপমান করিলাম। ইহার কোন প্রয়োজন ছিল না। বাজারের কুইঞ্জী অপেক্ষ বিধবা-বিবাহের পত্নী যে ইহাদের কাছে উচ্চ আসন পায় না—সুতরাং নীচেই নামিলাম, কাহাকেও এতটুকু তুলিতে পাকিলাম না, এই কথাটাই বলিতে গিয়া রাজলক্ষ্মী অর শেষ করিতে পারিল মা ! সমস্তই বুঝিলাম। আর এই অবমানিতার সম্মুখে বড় কথার আস্ফালন করিয়া কথা বাড়াইতে প্রবৃত্তি হইল না। যেমন নিঃশব্দে পড়িয়াছিলাম, তেমনি নারবেই পড়িয়া লাম। রাজলক্ষ্মী অনেকক্ষণ পর্যস্ত আর একটা কথাও কহিল না, ঠিক যেন আপনার ভাবনার মধ্যে মগ্ন হইয়া বসিয়া রহিল , তার পরে সহসা অত্যস্ত কাছে কোথাও ডাক শুনিয়া যেন চমক ভাঙ্গিয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। রতনকে ডাকিয়া কহিল, গাড়িটা শীগগির ঠিক করতে বলে দে রতন, নইলে সেই রান্ত্রি এগারটার ট্রেনে আবাধ যেতে হবে । কিন্তু সে হলে কিছুতেই চলবে না—ভারি হিম লাগবে। মিনিট-দশেকের মধ্যেই রতন আমার বাগটা লইয়া গাড়ির মাথায় তুলিয়া দিল এবং আমার শোবার বিছানাটা বাধিয়া লইবার ইঙ্গিত জানাইয়া নিকটে আসিয়া দাড়াইল। তখন হইতে আর আমি একটা কথাও কহি নাই, এখনও কোন প্রশ্ন করিলাম না। কোথায় যাইতে হইবে, কি করিতে হইবে, কিছুই জিজ্ঞাসা না করিয়া নিঃশব্দে উঠিয়া ধীরে ধীরে গাড়িতে খি দিলাম। দিনকয়েক পূর্বেই এমনি এক সদ্ধাবেলায় নিজের বাটীতে প্রবেশ করিয়ছিলাম। আজ আবার তেমনি এক সাহাহ-বেলায় নীরবে বট হইতে বাহির হই - গেলাম। সেদিনও কেহ অঙ্গির করিয়া গ্রহণ করে নাই, আজিও কেহ সন্নেহে বিদায় মিতে অগ্রসর হইযা আসিল না। সেদিনও এমনিই ঘরে ঘরে তখন শাখ বাজিঙে আরও করিয়াছিল, এমনিই বসুমল্লিকদের গোপাল-মন্দির হইতে আরতির কাসরঘন্টার রব অস্পষ্ট হইয়া বাতাসে ভাসিযা আসিতেছিল। তথাপি সেদিনের সঙ্গে আজিকার প্রভেদট যে কত বড়, সে কেবল আকাশের দেবতারাই দেখিতে লাগিলেন।