পাতা:শ্রীকান্ত (তৃতীয় পর্ব).djvu/৭১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


কালো, কিন্তু চোখমুখ সাধারণ ভদ্র গৃহস্থঘরের মেয়েদের মতই। রুক্ষতার কোথাও কিছু নাই, আছে শুধু সর্বাঙ্গ ব্যাপ্ত করিয়া গভীর দারিদ্র্য ও অনশনের চিহ্ন আঁক—চোখ মেলিয়া চাহিলেই তাহা পড়ে । কহিলেন, কাল আঁধারে দেখতে পাইনি বাবা, কিন্তু আমার বড়চ্চেলে বেঁচে থাকলে তার তোমার বয়সই হ’ত । ইহার আর উত্তর কি। তিনি হঠাৎ কপালে হাত ঠেকাইয়া বলিলেন, জ্বরটা এখনও খুব রয়েচে । আমি চোখ বুজিয়া ছিলাম, চোখ বুজিয়াই কহিলাম, কেউ একটুখানি সাহায্য করলে বোধ হয় হাসপাতালে যেতে পারল—সে ত আর বেশি দূর নয়। র্তাহার মুখ দেখিতে পাইলাম না, কিন্তু আমার কথায় তাহার কণ্ঠস্বর যেন বেদনায় ভরিয়া গেল । বলিলেন, দুঃখের জ্বালায় কাল কি একটা বলেচি বলেই বাবা, রাগ করে ওই যমপুরীতে চলে যাবে? আর যাবে বললেক্ট আমি যেতে দেব ? এই বলিয়া তিনি ক্ষণকাল চুপ করিয়া থাকিয়া ধীরে ধীরে কহিলেন, আতুরের নিয়ম নেই বাবা । এই যে লোকে হাসপাতালে গিয়ে থাকে সেখানে কাদের ছোওয়া খেতে হয় বল ত ? কিন্তু তাতে কি জাত যায়? আমি সাগু বালি তৈরি করে দিলে কি তুমি খাবে না ? আমি ঘাড় নাড়িয়া জানাইলাম যে, বিন্দুমাত্র আপত্তি নাই এবং শুধু পীড়িত বলিয়া নয়, অত্যন্ড নীরোগ শরীরেও আমার হইতে বাধা হয় না। অতএব রহিয়া গেলাম। বোধ হয় সর্বসমেত দিন-চারেক ছিলাম। তথাপি সেই চারিদিনেন স্মৃতি সহজে ভুলিবার নয়! জুর একদিনেই গেল, কিন্তু বাকী দিন-কয়টা দুর্বল বলিয়া তাহারা নড়িঙে দিলেন না। কি ভয়ানক দারিদ্র্যের মধ্যে দিয়াই এই ব্রাহ্মণ-পরিবারের দিন কাটিতেছে এবং দুৰ্গতিকে সহস্ৰগুণে মধ্যেও এতটুকুও অবসর পাইলে আমার কাছে আসিয়া বসিতেন। মাথায়, কপালে হাত বুলাইয়া দিবার কি ঐকাস্তিক চেষ্টাই না তাহার দেখিতে পাইতাম। পূর্বে অবস্থা সচ্ছল ছিল, জমিজমাও মন্দ ছিল না, কিন্তু তাহার নিৰ্ব্বেধ স্বামীকে লোকে প্রতারিত করিয়াই এই দুঃখে ফেলিয়াছে। তাহারা আসিয়া স্মণ চাহিত, ললিত, দেশে বড়লোক ঢের আছে, কিন্তু এত বড় বুকের পাট কয়জনের আছে? অতএব এই বুকের পাট সপ্রমাণ করিতে তিনি গুণ করিয়া ঋণ দিতেন। প্রথমে হ্যান্ডনোট কাটিয়া এবং পরে স্ত্রীকে গোপন করিয়া সম্পত্তি বন্ধক দিতেন। ইহার ফল অধিকাংশ স্থলেই যাহা হয় এখানেও তাহাই হইয়াছে। এ কুকার্য যে চক্রবর্তীর • সাধা নয় তাহা একটা রাত্রির অভিজ্ঞতা হইতেই সম্পূর্ণ বিশ্বাস করিলাম। বুদ্ধির দোষে বিষয় সম্পত্তি অনেকেরই যায় এবং তাহার পরিণামও অত্যন্ত দুঃখের হয়, কিন্তু এই দুঃখ যে সমাজের অনাবশ্যক, অন্ধ নিষ্ঠুরতায় কতখানি বাড়িতে বতাহ চক্রবর্তীগৃহিণীর প্রতি কথায় অস্থি-মজ্ঞায় অনুভব করিলাম। তাহদের দুইটি মাত্র শোবার ঘর, একটিতে ছেলেমেয়েরা থাকে এবং অন্যটি সম্পূর্ণ অপরিচিতও বাহিরের লোক হইয়াও আমি অধিকার করিয়া আছি। ইহাতে আমার সঙ্কোচের অবধি ছিল না। বলিলাম, আজ ত আমার জুর ছেড়েচে এবং আপনাদেরও ভারি কষ্ট হচ্ছে। যদি বাইরের ঘরে একটা বিছানা করে দেন ত আমি ভারি তৃপ্তি পাই। গৃহিণী ঘাড় নাড়িয়া কহিলেন, সে কি হয় বাছা, আকাশে মেঘ করে আছে, বৃষ্টি যদি হয় ত ও ঘরে এমন ঠাই নেই যে মাথাটুকু রাখা যায়। তুমি রোগা মানুষ, এ আরস্য ত করতে পারিনে বাবা। তাহাদের প্রাঙ্গণের একধারে কিছু খড় সঞ্চিত ছিল তাহ লক্ষ্য ক্ষরিয়াছিলাম, তাছাই ইঙ্গিত করিয়া জিজ্ঞাসা করিলাম, সময়ে মেরামত করে নেননি কেন ? ভীম - wiব ত দিন এসে পড়চে । ইহার প্রত্যুত্তরে জানিলাম যে, তাহ সহজে হইবার নয়। পতিত ব্রাহ্মণ বলিয় এ অঞ্চলের চাষীরা তাহাদের কাজ করে না । গ্রামাঞ্জরে মুসলমান ঘর ' আছে, তাহারাই ঘর ছাইঞ্জা দেয়। যে-কোন কারণে হোক, এ বৎসর তাহারা আসিতে পারে নাই। এই প্রসঙ্গে তিনি সহসা কামিয়া ফেলিয়া কহিলেন, বাৰী, আমাদের দুঃখের কি সীমা আছে? সে বছর আমার সাত-আট বছরের মেয়েটা হঠাৎ কলেরায় মারা গেল ; পূজোর সময় আমার ভাইয়েরা গিয়েছিল কাশী বেড়াতে, তাই আর লোক পাওয়া গেল না, ছোট ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে একা একেই শ্মশানে নিয়ে যেতে হ’ল। তাও কি সৎকার করা গেল?