প্রধান মেনু খুলুন

পাতা:সিমার - শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়.pdf/৬১

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা প্রয়োজন।


ফসল কেটে নেওয়া ফাঁকা মাঠের শূন্যতায় দু-চারটি বিরল বাবলা তাল খেজুরের নির্জনতা । দু-চারটে উন্মনা গোরু চরছে। পেছনে তাকালে চোখে পড়ে ইলেকট্রিক তার আর তার শাল কাঠের খুঁটির দূরত্ব, পাকা সড়কে ছুটন্ত শহরমুখো লরি। রাবেয়ার দিকে চেয়ে দেখি, মুখে ক্লান্ত ঘামের ফোঁটা। পায়ে ধুলো-মাখা চটি । নদীর স্রোতের দিকে চেয়ে আছে যেন এক বিষধ প্রতিমা । মানুষ ভাবতে পারে, এই রকমই তুচ্ছ কাব্যের লোভে আমি তাকে চিতির কুলে কাঙালের মতো টেনে এনেছি। কবুল করব আমি লোভী। এর জন্য মানুষ সংসারের তিরস্কার সইতে দুঃখ পায় না। এ মুহুর্তে আমি সুখী । এ সুখের অবধি নেই। ওপারের নীেকের দিকে চেয়ে বললাম, মাঝি নীেকো বেঁধে বাড়ি গেছে । স্নান-খাওয়া করে তামাক টেনে জিরোবে, তারপর ফিরবে । রাবেয়া ব্যথিত বিষাদে তন্ময় হয়ে হয়তো কোনো অকুলে নিজেকে হারিয়ে বসেছিল, চমকে উঠে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বললে, তাই বুঝি ? বললাম, তালেব মিঞার নাও, বুঝলে ! ধান পাটের মরশুমে ধান পাট, গমের মরশুমে গম মসুরী, সরষে তিসির পাঁজা দেয় লোকে । চাকুরে যারা, বৎসরান্তে দশ পনেরো বিশ পাঁজা বাবদ মেটায় । রাবেযার তন্ময়তার ঘোর এখনো যায়নি। আপন মনে বললে, তাই বুঝি ! বললাম, ঐ যে কুঁড়েঘর দেখছ, ওটাই হচ্ছে ডেরা। এখান থেকে চেচিয়ে ডাকলেও শুনতে পাবে না । শুনতে পেলেও সাড়া দেয় না । তামাক টানার সময় বেটা মাঝি কানে তুলো দেয় । কোনো তোয়াক্কা রাখে না । রাবেয়া ফের বলে, তাই ? বললাম, তা ছাড়া কী ! --তবে তো বেশ লোক । সব খেয়াঘাটই কি এ রকম ? সব মাঝিই কি সমান ? সব নদীই মনে হয় চেনা । এতে যারা পারে যায়, তারাও কি সব এক ? ঐ দেখ দু জন এসেছে। পেছনে চেয়ে দেখলাম, একজন পাকা প্রৌঢ় আর একটি নব্য যুবতী এসে বট পাকুড়ের শেকড়ে ঠেক নিল । লোকটির কানে আধা-খাওয়া পোড়া বিড়ি । মুখে প্রাচীন বসন্তের দাগ । ফুটুকি ফুটুকি নকশা। মাথার চুলে দাড়িতে গোঁফে রুপোব ঝিলিক। তোবড়ানো গালে প্রৌঢ়ত্বের ভাঙা নিরাশা। চোখে কঠিন ক্রুর দৃষ্টিতে কেমন বিহ্বলতা। পরনে তার সন্তা নতুন কেনা ঝিলমিলানো নকশাদার লুঙ্গি, গা-পিছলানো রঙ । গায়ে পুরনো সাদা জ্যাকেট, কাঁধের কাছে পট্টি মারা । পায়ে টায়ারের ছেড়া মাখন-চটি । ܣܛܪ