পাতা:সুকুমার রায় রচনাবলী-প্রথম খন্ড.djvu/১৮৪

এই পাতাটির মুদ্রণ সংশোধন করা হয়েছে, কিন্তু বৈধকরণ করা হয়নি।


 আর হোম্‌রা বুড়ো ঝোপের মধ্যে থেকে আঁক্‌শিটা উঁচিয়ে তুলল। ল্যাজওয়ালা বিরক্ত হয়ে বলল, “কি আপদ! মশাই, ল্যাজ ধরে টানেন কেন? ছিঁড়ে যাবে যে?”

 সর্দার বলল, “তুমি কেন ব্যাঙের ছাতায় চড়েছ? আর পা দিয়ে ছাতা মাড়াচ্ছ?” জন্তুটা তখন আকাশের দিকে গোল গোল চোখ করে অনেকক্ষণ তাকিয়ে বলল, “কি বললেন? কিসের কি?” সর্দার বলল, “বললাম যে ব্যাঙের ছাতা।”

 যেমনি বলা, অমনি সে খ্যাক খ্যাক খ্যাক খ্যাক খ্যাক খ্যাক করে হাসতে হাসতে হাসতে, একেবারে মাটির ওপর গড়িয়ে পড়ল। তার গায়ে লাল নীল হলদে সবুজ রামধনুর মতো অদ্ভুত রঙ খুলতে লাগল। সবাই ব্যস্ত হয়ে দৌড়ে এল, “কি হয়েছে? কি হয়েছে?” কেউ বলল, “জল দাও,” কেউ বলল, “বাতাস কর।” অনেকক্ষণ পর জন্তুটা ঠান্ডা হয়ে, উঠে বলল, “ব্যাঙের ছাতা কিহে? ওটা বুঝি ব্যাঙের ছাতা হল? যেমন বুদ্ধি তোমাদের! ওটা ছাতাও নয়, ব্যাঙেরও কিছ নয়। যারা বোকা, তারা বলে ব্যাঙের ছাতা।” শুনে কেউ কোন কথা বলতে পারল না, সবাই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল। শেষকালে ছোকরা মতো একজন জিজ্ঞাসা করল, “আপনি কে মশাই?” ল্যাজওয়ালা বলল “আমি বহুরূপী—আমি গিরগিটির খড়তুত ভাই, গোসাপের জ্ঞাতি। এটা এখন আমার হল—আমি বাড়ি নিয়ে যাব।”

 এই বলে সে “ব্যাঙের ছাতা”টাকে বগলদাবা করে নিয়ে, গম্ভীরভাবে চলে গেল। আর সবাই মিলে হাঁ করে তাকিয়ে রইল।

সন্দেশ—১৩২৬


ব্যাঙের রাজা

 রাজবাড়িতে যাবার যে পথ, সেই পথের ধারে প্রকান্ড দেয়াল, সেই দেয়ালের পাশে ব্যাঙেদের পুকুর। সোনাব্যাঙ, কোলাব্যাঙ, গেছোব্যাঙ, মেঠোব্যাঙ—সকলেরই বাড়ি সেই পুকুরের ধারে। ব্যাঙেদের সর্দার যে বুড়ো ব্যাঙ, সে থাকে দেয়ালের ধারে, একটা মরা গাছের ফাটলের মধ্যে, আর ভোর হলে সবাইকে ডাক দিয়ে জাগায়—“আয় আয় আয়—গ্যাঁক্‌ গ্যাঁক্‌ গ্যাঁক্‌—দেখ দেখ দেখ—ব্যাঙ ব্যাঙ ব্যাঙ—ব্যাঙাচি।” এই বলে সে অহংকারে গাল ফলিয়ে জলের মধ্যে ঝাঁপ দিয়ে পড়ে, আর ব্যাঙগুলো সব “যাই যাই যাই—থাক থাক থাক” ব’লে, ঘুম ভেঙে মুখ ধুয়ে দাঁত মেজে, পুকুরপারের সভায় বসে।

 একদিন হয়েছে কি, সর্দার ব্যাঙ ফুর্তির চোটে লাফ দিয়েছে উলটোমুখে ডিগবাজি খেয়ে—আর পড়বি তো পড়, এক্কেবারে দেয়াল টপকে রাজপথের মধ্যিখানে। রাজা তখন সভায় চলেছেন, সিপাইশান্ত্রী লোকলস্কর দলবল সব সঙ্গে চলছে। মোটা মোটা সব নাগরাই জুতো, খটমট ঘ্যাঁচম্যাঁচ করে ব্যাঙ বুড়োর মাথার ওপর দিয়ে

নানা গল্প
১৭৯