প্রথম দৃশ্য

বাড়ির সম্মুখে পথে বসিয়া পা ছড়াইয়া বনমালী পরমানন্দে সন্দেশ আহার করিতেছেন।

বয়স সাত। তিনকড়ির প্রবেশ। বয়স পনেরো

সন্দেশের প্রতি সলোভ দৃষ্টিপাত করিয়া

তিনকড়ি । কী হে বটকৃষ্ণবাবু , কী করছ ?

বনমালীর নিরুত্তরে অবাক হইয়া থাকন

তিনকড়ি । উত্তর দিচ্ছ না যে ? তোমার নাম বটকৃষ্ণ নয় ?

বনমালী । ( সংক্ষেপে) না ।

তিনকড়ি । অবিশ্যি বটকৃষ্ণ । যদি হয়? আচ্ছা , তোমার নাম কী বলো ।

বনমালী । আমার নাম বনমালী ।

তিনকড়ি । ( হাসিয়া উঠিয়া) ছেলেমানুষ , কিচ্ছু জান না । বনমালীও যা বটকৃষ্ণও তাই , একই । বনমালীর মানে জান ?

বনমালী । না ।

তিনকড়ি । বনমালীর মানে বটকৃষ্ণ । বটকৃষ্ণের মানে জান ?

বনমালী । না ।

তিনকড়ি । বটকৃষ্ণের মানে বনমালী । — আচ্ছা , বাবা তোমাকে কখনো আদর করেও ডাকে না বটকৃষ্ণ ?

বনমালী । না ।

তিনকড়ি । ছি ছি! আমার বাবা আমাকে বলে বটকৃষ্ণ , মোধোর বাবা মোধোকে বলে বটকৃষ্ণ -তোমার বাবা তোমাকে কিচ্ছু বলে না! ছি ছি!

পার্শ্বে উপবেশন

বনমালী । ( সগর্বে) বাবা আমাকে বলে ভুতু ।

তিনকড়ি । আচ্ছা ভুতুবাবু , তোমার ডান হাত কোন্‌টা বলো দেখি ।

বনমালী । ( ডান হাত তুলিয়া) এইটে ডান হাত ।

তিনকড়ি । আচ্ছা, তোমার বাঁ হাত কোন্‌টা বলো দেখি ।

বনমালী । ( বাম হাত তুলিয়া) এইটে ।

তিনকড়ি । ( খপ্‌ করিয়া পাত হইতে একটা সন্দেশ তুলিয়া নিজের মুখের কাছে ধরিয়া) আচ্ছা ভুতুবাবু , এইটে কী বলো দেখি ।

বনমালীর শশব্যস্ত হইয়া কাড়িয়া লইবার চেষ্টা

তিনকড়ি । ( সরোষে পৃষ্ঠে চপেটাঘাত করিয়া) এতবড়ো ধেড়ে ছেলে হলি , এইটে কী জানিস নে! এটা সন্দেশ । এটা খেতে হয় ।

তিনকড়ির মুখের মধ্যে সন্দেশের দ্রুত অন্তর্ধান

বনমালী । ( পৃষ্ঠে হাত দিয়া ) ভ্যাঁ —

তিনকড়ি । ছি ছি ভুতুবাবু , তোমার জ্ঞান কবে হবে বলো দেখি । এইটে জান না যে , পেটে খেলে পিঠে সয় ?

আর-একটা সন্দেশ মুখের ভিতর পুরণ

বনমালী । ( দ্বিগুণ বেগে ) ভ্যাঁ —

তিনকড়ি । তবে , তুমি কি বল পেটে খেলে পিঠে সয় না ? এই দেখো-না কেন , পেটে খেলে ( আর-একটা সন্দেশ খাইয়া) পিঠে সয়-

বনমালীর পৃষ্ঠে চপেটাঘাত

সয় না ?

বনমালী । ( সরোদনে চীৎকারপূর্বক ) না ন্না ন্না ।

তিনকড়ি । ( শেষ সন্দেশটি নিঃশেষ করিয়া) তা হবে । তোমার তা হলে সয় না দেখছি । যার যেমন ধাত । তবে থাক্‌ , তবে আর কাজ নেই । তবে এই স্থির হল কারো বা পেটে সমস্তই সয় , কারো বা পিঠে কিছুই সয় না । যেমন আমি আর তুমি ।

সহসা বনমালীর পিতার প্রবেশ

পিতা । কী রে ভুতু , কাঁদছিস কেন ?

পিতাকে দেখিয়া বনমালীর দ্বিগুণ ক্রন্দন

তিনকড়ি । ( বনমালীর পৃষ্ঠে হাত বুলাইয়া অতি কোমল স্বরে) বাবা জিগ্‌গেস করছেন , কথার উত্তর দাও ।

বনমালী । ( সরোদনে) আমাকে মেরেছে. ।

তিনকড়ি । আজ্ঞে , পাড়ার একটা ডানপিটে ছেলে খামকা মেরে গেল , বেচারার কোনো দোষ নেই-সন্দেশগুলি খেয়ে ভুতুবাবু ঠোঙাটি নিয়ে খেলা করছিল-

পিতা । ( সরোষে) ভুতু , কে মেরেছে রে ?

বনমালী । ( তিনকড়িকে দেখাইয়া ) ও মেরেছে ।

তিনকড়ি । আজ্ঞে হাঁ , আমি তাকে খুব মেরেছি বটে । কার না রাগ হয় বলুন দেখি । ছেলেমানুষ খেলা করছে-খামকা ওকে মেরে ওর ঠোঙাটা কেড়ে নেও কেন বাপু ? আপনি থাকলে আপনিও তাকে মারতেন ।

পিতা । আমি থাকলে তার দুখানা হাড় একত্তর রাখতেম না । যত-সব ডানপিটে ছেলে এ পাড়ায় জুটেছে ।

বনমালী । বাবা , ও আমার সন্দেশ —

তিনকড়ি । ( নিবৃত্ত করিয়া) আরে , আরে , ও কথা আর বলতে হবে না ।

পিতা । কী কথা ?

তিনকড়ি । আজ্ঞে , কিছুই নয় । আমি ভুতূবাবুকে আনা-দুয়েকের সন্দেশ কিনে খাইয়েছি । সামান্য কথা । সে কি আর বলবার বিষয় ?

পিতা । ( পরম সন্তোষে) তোমার নাম কী বাপু ?

তিনকড়ি । ( সবিনয়ে) আজ্ঞে , আমার নাম তিনকড়ি মুখোপাধ্যায় ।

পিতা । ঠাকুরের নাম ?

তিনকড়ি । খুদিরাম মুখোপাধ্যায় ।

পিতা । তুমি আমার পরমাত্মীয় । খুদিরাম যে আমার পিসতুতো ভাই হয় ।

তিনকড়ির ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম

পিতা । চলো বাবা, বাড়ির ভিতর চলো । জলখাবার খাবে । আজ পৌষপার্বণ , পিঠে না খাইয়ে ছাড়ব না ।

তিনকড়ি । যে আজ্ঞে ।

পিতা । আজ রাত্রে এখানে থাকবে । কাল মধ্যাহ্নভোজন করে বাড়ি যেয়ো ।

তিনকড়ি । যে আজ্ঞে ।

দ্বিতীয় দৃশ্য

অন্তঃপুরে তিনকড়ি পিষ্টক-আহারে প্রবৃত্ত

তিনকড়ি । ( স্বগত ) ডান হাতের ব্যাপারটা আজ বেশ চলছে ভালো ।

ভুতুর মা । ( পাতে চারটে পিঠে দিয়া) বাবা , চুপ করে বসে থাকলে হবে না , এ চারখানাও খেতে হবে ।

তিনকড়ি । যে আজ্ঞে । ( আহার)

ভুতুর বাপের প্রবেশ

পিতা । ওকি ও! পাত খালি যে! ওরে , খান-আষ্টেক পিঠে দিয়ে যা ।

পিঠে-দেওন

বাবা , খেতে হবে । এরই মধ্যে হাত গুটোলে চলবে না ।

তিনকড়ি । যে আজ্ঞে । ( আহার )

পিসিমার প্রবেশ

পিসিমা । ( ভুতুর মা'র প্রতি) ও বউ , তিনকড়ির পাত খালি যে! হাঁ করে দাঁড়িয়ে দেখছ কী ? ওকে খান-দশেক পিঠে দাও । লজ্জা কোরো না বাবা , ভালো করে খাও ।

তিনকড়ি । যে আজ্ঞে ।

পিসেমহাশয়ের প্রবেশ

পিসেমহাশয় । বাপু , তোমার খাওয়া হল না দেখছি । দিয়ে যা , দিয়ে যা , এ দিকে দিয়ে যা । পাতে খান-পনেরো পিঠে দে।

তোমাদের বয়েসে আমরা খেতুম হাঁসের মতো । সবগুলি খেতে হবে তা বলছি ।

তিনকড়ি । যে আজ্ঞে ।

দিদিমার প্রবেশ

দিদিমা । ( ভুতুর মা'র প্রতি অন্তরালে) ও বউ , পিঠে তো সব ফুরিয়ে গেছে , আর একখানাও বাকি নেই ।

ভুতুর মা । কী হবে!

দিদিমা । কী আর হবে ?

তিনকড়ির পাশে গিয়া পরিহাস করিয়া পিঠে এক কিল মারিয়া

পিঠে আর খাবে!

তিনকড়ি । আজ্ঞে না।

দিদিমা । সে কী কথা! আর দুটো খাও ।

আরো দুটো কিল

তিনকড়ি । ( গাত্রোত্থান করিয়া) আজ্ঞে না । আর আবশ্যক নেই ।

তৃতীয় দৃশ্য

পরদিন তিনকড়ি শয্যাগত। পাশে বনমালী

তিনকড়ি । ( ক্ষীণকন্ঠে) ভুতুবাবু , তোমার বাবা কোথায় হে ?

বনমালী । বদ্যি ডাকতে গেছে ।

তিনকড়ি । ( কাতর স্বরে) আর বদ্যি ডেকে কী হবে! ওষুধ খাব যে তার জায়গা কোথায় ?

বনমালী । তোমার পেটে কী হয়েছে তিনকড়িদা ?

তিনকড়ি । যাই হোক গে , কাল তোমাকে যা শিখিয়েছিলুম মনে আছে কি ?

বনমালী । আছে ।

তিনকড়ি । কী বলো দেখি ।

বনমালী । পেটে খেলে পিঠে সয় ।

তিনকড়ি । আজ আর-একটা শেখাব । কথাটা মনে রেখো — ‘ পিঠে খেলে পেটে সয় না ' ।