প্রধান মেনু খুলুন

পোকা-মাকড়/ষষ্ঠ শাখার প্রাণী/পতঙ্গ/পতঙ্গের আকৃতি-পরিবর্ত্তন


পতঙ্গের আকৃতি-পরিবর্ত্তন

 গোরু, ছাগল, কুকুর, বিড়াল প্রভৃতি বড় জন্তুদিগকে যদি জন্মের পর হইতে মৃত্যু পর্য্যন্ত পরীক্ষা করা যায়, তবে বয়সের সঙ্গে তাহাদের আকৃতির খুব বেশি পরিবর্ত্তন দেখা যায় না। বাছুর ও বুড়ো গাইয়ের চেহারায় বিশেষ তফাৎ নাই। বাছুর আকারে ছোট এবং বুড়ো গাই আকারে বড়, হয় ত তাহার শিং লম্বা,—ইহাই একমাত্র তফাৎ। মানুষের অবস্থাও তাই। জন্মিবার সময়ে মানুষের যে দুই হাত, দুই পা, একটা মাথা ইত্যাদি থাকে, বুড়ো বয়স পর্য্যন্ত ঠিক্ তাহাই থাকে। কেবল পুরুষদের মুখে দাড়ি গজায় মাত্র। বয়সের সঙ্গে মানুষের দুখানা হাত কখনই চারিখানা হয় না এবং দুটা চোখ কখনই তিনটা চোখ হইয়া দাঁড়ায় না।

 আমরা গোরু ও ছাগল-সম্বন্ধে যে কথাগুলি বলিলাম, মাছ পাখী সাপ ব্যাঙ্ সম্বন্ধে কিন্তু সে-কথা বলা চলে না। মাতার দেহ হইতে বাহির হইয়া তাহারা প্রথমে ডিমের ভিতরে থাকে, তার পরে সম্পূর্ণ আকার লইয়া ডিম হইতে বাহির হয়। তাহা হইলে দেখা যাইতেছে, মাছ ও পাখীরা মাতার দেহ ছাড়িয়া দুই রকম অবস্থায় থাকে।

 পতঙ্গেরা ডিম হইতে জন্মে তাহা তোমাদিগকে আগেই বলিয়াছি। কিন্তু ডিম হইতে বাহির হইয়াই ইহারা মাছ বা পাখীদের মত সম্পূর্ণ পতঙ্গের চেহারা পায় না। ডিম হইতে বাহির হইলে ইহাদের যে চেহারা হয়, তাহা দুইবার বদ্‌লাইয়া শেষে সম্পূর্ণ পতঙ্গের আকৃতি পায়। তাহা হইলে দেখা যাইতেছে—বয়স-অনুসারে একই পতঙ্গ তিন রকম চেহারা পায়। শেষ চেহারাটিই পতঙ্গদের সম্পূর্ণ আকৃতি।

 বিষয়টা একটু খোলসা করিয়া বলা যাউক। আজ যে প্রজাপতিটিকে বা মাছিটিকে তোমরা সম্মুখে উড়িয়া বেড়াইতে দেখিতেছ—সে ডিম হইতে বাহির হইয়াই প্রজাপতির আকার পায় নাই। ইহার জীবনের ইতিহাস খোঁজ করিলে জানিতে পারিবে, কয়েক মাস পূর্ব্বে ইহারি মত একটি প্রজাপতি চিত্র ৩৩—ডিম হইতে বাহির হইয়া শুঁয়ো-পোকা গাছের পাতায় বেড়াইতেছে। কোনো গাছের পাতায় অনেক ডিম প্রসব করিয়া রাখিয়াছিল এবং সেই ডিমের মধ্যে একটি হইতে তোমার সম্মুখের প্রজাপতিটি জন্মিয়াছে। তোমরা হয় ত ভাবিতেছ, পাখীরা যেমন ডিম হইতে চোখ মুখ ঠোঁট লইয়া বাহির হয়, প্রজাপতিও বুঝি সেই রকমে চোখ মুখ ডানা লইয়া বাহির হইয়াছে। কিন্তু তাহা নয়। ডিম হইতে প্রজাপতি কখনই প্রজাপতির আকারে বাহির হয় না। বাগানের গাছে, ঘাসে, লতাপাতায় তোমরা নিশ্চয়ই অনেক সময়ে শুঁয়ো-পোকা দেখিয়াছ। ইহাদের কাহারো রঙ্ সাদা, কাহারো রঙ্ পাটকিলে, কেহ সবুজ, কাহারো গায়ে আবার নানা রঙের ডোরা কাটা, কাহারো গা আবার লোমে ঢাকা। ইহাদের অনেকেই সম্মুখে তিন জোড়ায় ছয়খানা পা এবং পিছনে আরো অনেক পা থাকে এবং সম্মুখের ছয়খানা পায়ে কাহারো কাহারো নখও লাগানো থাকে। নখ দিয়া গাছের পাতা বা কচি ডাল ধরিয়া তাহারা ডালে ডালে পাতায় পাতায় চলিয়া বেড়ায়। গাছের কচি পাতা বা মরা ও পচা জীবজন্তুর দেহ ইহাদের খাদ্য। ছোট গাছে শুঁয়ো-পোকা ধরিলে গাছের কি রকম ক্ষতি হয়, তোমরা দেখ নাই কি? তাহারা গাছের কচি পাতা খাইতে আরম্ভ করে, ইহাতে গাছ মরিয়া যায়। পাখীরা খুঁজিয়া খুঁজিয়া গাছ হইতে শুঁয়ো পোকা বাহির করিয়া খাইয়া ফেলে। কিন্তু সব পোকা পাখীর খাদ্য নয়, যাহাদের গা চুলের মত লোম দিয়া ঢাকা থাকে, তাহাদিগকে পাখীরা খায় না। তা ছাড়া গায়ের রঙ্ দেখিয়াও কোন্ শুঁয়ো-পোকা খাদ্য এবং কোন্‌টা অখাদ্য, তাহা পাখীরা বুঝিয়া লইতে পারে। যাহা হউক, এই শুঁয়োপোকার দল কোথা হইতে কি-রকমে জন্মে, তোমরা খোঁজ করিয়া দেখিয়াছ কি? এইগুলিই প্রজাপতির এবং অন্য পতঙ্গদের বাচ্চা। ডিম ফুটিলেই এই রকম আকারে পতঙ্গেরা বাহির হয়। গোব্‌রে-পোকা, মশা, মাছি, সকলেই ডিম হইতে বাহির হইয়া এই রকম আকৃতি পায়।

 তোমরা যদি একটি শুঁয়ো-পোকা ধরিয়া পরীক্ষা কর, তবে দেখিবে, ইহার গায়ে তেরোটি আংটির মত দাগ কাটা রহিয়াছে। অনেক শুঁয়ো-পোকারই শরীরে এই রকম তেরোটি দাগ থাকে। কাহারো কাহারো আবার মাথায় চোখ থাকে, কিন্তু এই চোখ সাধারণ পতঙ্গের মত হাজার হাজার চোখের সমষ্টি নয়,—ইহা আমাদেরি চোখের মত সাদাসিদে ধরণের। তার পরে, আরো ভালো করিয়া পরীক্ষা করিলে ইহাদের মুখে দাঁতের মত অংশ দেখিতে পাইবে,—ইহা খাবার সংগ্রহের সাহায্য করে, আবার গাছের পাতা কামড়াইয়া চলাফেরারও সুবিধা করাইয়া দেয়।

 প্রজাপতি বা অপর পতঙ্গের বাচ্চা শুঁয়ো-পোকার আকারে কতদিন থাকে, তোমরা বোধ হয় ইহাই এখন জানিতে চাহিতেছ। কিন্তু ইহার উত্তর দেওয়া বড় কঠিন। তোমাদের ফুলের বাগানে কত রঙ্‌বেরঙের প্রজাপতি এবং আরো কত পতঙ্গ উড়িয়া বেড়ায় দেখ নাই কি? ইহাদের প্রত্যেকেই ভিন্ন জাতীয় পতঙ্গ। জাতি-অনুসারে ইহাদের বাচ্চারা শুঁয়ো-পোকার আকারে কেহ বিশ দিন, কেহ অল্প দিন থাকে। কোনো কোনো পতঙ্গকে এক বৎসর দুই বংসর এমন কি পাঁচ বৎসর পর্য্যন্ত শুঁয়ো-পোকার আকারে থাকিতে দেখা গিয়াছে। আমেরিকায় এক রকম পতঙ্গ আছে, যাহারা সতেরো বৎসর এই আকারে থাকে। আবার এক রকম পতঙ্গও আছে, যাহাদের বাচ্চারা শুঁয়ো-পোকার আকারে পাঁচ-ছয় দিন বা তাহা অপেক্ষাও অল্প দিন থাকে। কাজেই এ-সম্বন্ধে ঠিক কথা বলা যায় না।

 পাখীরা তাহাদের বাসায় ডিম পাড়ে, ডিমের উপরে বসিয়া তা দেয়, তার পরে ডিম ফুটিয়া বাচ্চা বাহির হয়। ইহার পরেও পাখীরা বাচ্চাদের জন্য অনেক কষ্ট স্বীকার করে। যতদিন উড়িতে না শিখে, ততদিন পাখীরা নানা জায়গা হইতে পোকা-মাকড় ধরিয়া আনিয়া ছানাদের খাওয়ায়। পতঙ্গেরা কিন্তু বাচ্চাদের মোটেই যত্ন করে না। যেখানে বাচ্চাদের খাবার আছে, এমন জায়গায় ডিম পাড়িয়াই তাহারা খালাস। ইহার পরে পতঙ্গদের সঙ্গে বাচ্চাদের কোনো সম্পর্কই থাকে না। জন্মে আর একটিবার দেখা-শুনাও হয় না; অনেক পতঙ্গ ডিম পাড়িয়াই মারা যায়।

 তোমরা হয় ত ভাবিতেছ, মায়ের আদর না পাইয়া পতঙ্গের বাচ্চাদের বুঝি খুবই কষ্ট হয়। কিন্তু তাহা হয় না। ডিম হইতে শুঁয়ো-পোকার আকারে বাহির হইয়াই সম্মুখের লতাপাতায় তাহারা অনেক খাদ্য পায় এবং একটু বিশ্রাম না করিয়াই সেই সকল খাবার অবিরাম খাইতে থাকে। কাহারো কাহারো মাথার উপরে চোখ থাকে, কিন্তু তাহা বেশি কাজে লাগে না। অন্ধ লোকেরা যেমন হাত-পা দিয়া কাছের জিনিস ছুঁইতে ছুঁইতে রাস্তা ঠিক করে, ইহারাও তেমনি শরীরের স্পর্শ দিয়া নিজের খাদ্য ও খাদ্যের কাছে যাইবার রাস্তা বাহির করে।

 পেটুক লোক যখন ভোজ খাইতে বসে, তখন সে কি রকমে গ্রাসে গ্রাসে খাদ্য মুখে দেয়, তোমরা দেখ নাই কি? তখন তাহারা নিশ্বাস লইবার জন্য মাঝে মাঝে থামে, আবার রাক্ষসের মত খাইতে আরম্ভ করে। পেটে যতক্ষণ একটুও জায়গা থাকে, ততক্ষণ খাওয়া বন্ধ করে না। কিছু জিজ্ঞাসা করিলে জবাব দেয় না,—মুখ খাবারে পূর্ণ—জবাব দিবে কি করিয়া? শুঁয়ো-পোকারা পেটুক লোকের মত একান্ত মনে আহার করে। দিবারাত্রি খাওয়া চলে, নিশ্বাস লইবার জন্যও খাওয়া ছাড়ে না। ইহাদের দেহের যে সরু নলের কথা আগে বলিয়াছি, তাহার ভিতর দিয়া আপনা হইতেই বাতাস যাওয়া-আসা করিয়া নিশ্বাসের কাজ চালায়।

 প্রয়োজন মত খাদ্য হজম করিতে পারিলে, প্রাণীর দেহ পুষ্ট হয়। শুঁয়ো-পোকারা যেমন খায়, তেমনি হজম করে। কাজেই শীঘ্র শীঘ্র তাহারা আকারে বড় হইয়া উঠে। চিংড়িমাছেরা যখন আকারে বাড়িতে থাকে, তখন তাহারা কি করে আগেই শুনিয়াছ। তাহারা গায়ের সেই কঠিন খোলা বদ্‌লাইয়া ফেলে এবং সঙ্গে সঙ্গে ছোট খোলার জায়গায় গায়ে বড় খোলা আপনা হইতেই উৎপন্ন হয়। খাইয়া মোটা হইলে পতঙ্গদের বাচ্চা অর্থাৎ শুঁয়ো-পোকারাও তাহাই করে, তখন তাহাদের গায়ের চামড়া ফাটিয়া বসিয়া পড়ে এবং পুরানো চামড়ার জায়গায় নূতন চামড়া জন্মে। চামড়া বদ্‌লাইবার কয়েক দিন আগে এবং পরে উহাদিগকে একটু অসুস্থ হইতে দেখা যায়। তখন তাহারা ভালো করিয়া খায় না, কয়েক দিন চুপ-চাপ কাটাইয়া দেয়। শুঁয়ো-পোকারা এই রকমে তিন চারিবার খোলস্ ছাড়ে; কোনো কোনো পোকা সাত-আটবার পর্য্যন্তও চামড়া বদ্‌লায়।

 ক্রমাগত আহার করিয়া গায়ের চামড়া বদ্‌লাইতে বদ্‌লাইতে শুঁয়ো-পোকারা যখন খুব বড় হয়, তখন তাহাদের আর এক পরিবর্ত্তনের সময় উপস্থিত হয়। এই সময়ে শুঁয়ো-পোকারা খাওয়া বন্ধ করিয়া খুব চঞ্চল হইয়া চলা-ফেরা করে। এবং শেষে একটা নিরিবিলি জায়গা খুঁজিয়া সেখানে চুপ করিয়া পড়িয়া থাকে। এই সময়ে ইহাদের গায়ের চামড়া শুকাইয়া উঠে এবং তাহা কৌটার মত হইয়া পোকাকে ভিতরে রাখিয়া দেয়। আবার কয়েক জাতীয় পোকার মুখ চিত্র ৩৪—পতঙ্গের পুত্তলি অবস্থা। হইতে ঐ-সময়ে আঠার মত লালা বাহির হয় এবং তাহা শুকাইলে রেশমী সূতা হইয়া দাঁড়ায়। ঐ পোকারা ঐ-সকল সূতা দিয়া গুটি বাঁধিয়া তাহার ভিতরে নিশ্চিন্ত হইয়া বাস করে।

 তোমরা যে রেশমী কাপড় ব্যবহার কর, তাহা এই রকম এক শুঁয়ো-পোকার গুটির সূতা দিয়া প্রস্তুত। আমরা যেমন গোরু ছাগল ইত্যাদি পালন করি, যাহারা রেশমের ব্যবসায় করে, তাহারাও সেই রকমে রেশমের প্রজাপতি পালন করে। প্রজাপতিরা ডিম পাড়ে এবং পরে সেই ডিম হইতে শুঁয়ো-পোকা বাহির হয়। ব্যবসায়ীরা খুব যত্নে তাহাদিগকে কচি পাতা খাওয়ায়। তার পরে সময় উপস্থিত হইলে, সেই পোকাগুলিরই প্রত্যেকে মুখ হইতে রেশমী সূতা বাহির করিয়া এক-একটি গুটি বাঁধে। রেশমের ব্যবসায়ীরা এই সকল গুটির সূতা সংগ্রহ করিয়া বিক্রয় করে। রেশমের কাপড় শুঁয়ো-পোকার এই রকম সূতা দিয়াই প্রস্তুত হয়।

 তাই বলিয়া সকল পতঙ্গ বা সকল প্রজাপতির বাচ্চারা যে রেশমী গুটি বাঁধে তাহা নয়। গোবরে-পোকার বাচ্চারা রেশমী গুটি বাঁধে না। তোমরা পথে-ঘাটে সর্ব্বদা যে-সব প্রজাপতি ও মাছিকে উড়িয়া বেড়াইতে দেখিতে পাও, তাহারাও রেশমী গুটি বাঁধে না। অনেক শুঁয়ো-পোকা শেষবারে গায়ের যে চামড়া বদ্‌লায়, তাহা গা হইতে ফেলিয়া দেয় না। পরে সেই আল্‌গা চামড়াতে তাহারা মুখের লালা মিশাইয়া শক্ত গুটি প্রস্তুত করে এবং তাহার মধ্যে বাস করে। কোনো কোনো পতঙ্গের শুঁয়ো-পোকারা শুক্‌নো পাতায় মুখের লালা মিশাইয়া গুটির মত ঘর প্রস্তুত করে। যাহা হউক, প্রজাপতি বা অন্য পতঙ্গের শুঁয়ো-পোকারা যখন গুটির মধ্যে চুপ-চাপ থাকে, তখন ইহাদের দেহের আর একটা পরিবর্ত্তন হয়। এই অবস্থাকে পুত্তলি-অবস্থা বলে। তখন তাহারা মড়ার মত হইয়া এমন ভাবে গুটির মধ্যে থাকে যে, দেখিলে কষ্ট হয়। গুটি ছিঁড়িয়া গায়ে হাত দিলে বা শরীরে আঘাত করিলে তাহাদের সাড়া পাওয়া যায় না। তখন তাহাদের দেহে রক্তের চলাচল এবং শ্বাস-প্রশ্বাস পর্য্যন্ত অনেক কমিয়া আসে।

 তোমরা হয় ত ভাবিতেছ পতঙ্গেরা পুত্তলির অবস্থায় দুই চারিদিন থাকিয়াই বুঝি গুটি কাটিয়া বাহির হয়। কিন্তু তাহা হয় না। কোনো কোনো পতঙ্গের শুঁয়ো-পোকারা প্রায় নয় দশ মাস পর্য্যন্ত এই রকমে মড়ার মত পড়িয়া থাকে। আবার কোনো পতঙ্গ শীঘ্রই পুত্তলি-অবস্থা ত্যাগ করে। পিঁপ্‌ড়ে ও মৌমাছিরা আট দশ দিনের বেশি এই অবস্থায় থাকে না।

 এক দিন কিছু না খাইলে মানুষ দুর্ব্বল হইয়া পড়ে। তিন-চারি দিন কিছু না খাইলে মানুষের বাঁচিয়া থাক দায় হয়। কিন্তু পতঙ্গের পুত্তলিরা আট-দশ মাস কিছু না খাইয়া কি রকমে বাঁচে, তাহা আমরা হঠাৎ বুঝিতে পারি না।

 একটা উদাহরণ দিলে এই কথাটা তোমরা বুঝিতে পারিবে। মনে কর, আমরা আগুন জ্বালাইতে যাইতেছি। কাঠ খড় তেল কয়লা জোগাড় করিয়া তাহাতে আগুন দিলাম। আগুন দাউ দাউ করিয়া জ্বলিল, এবং কাঠ খড় পুড়িয়া গেলে তাহা নিবিয়া গেল। প্রাণীর জীবন এই আগুনেরই মত নয় কি? আগুন জ্বালাইতে গেলে যেমন কাঠ বা খড়ের প্রয়োজন, তেমনি জীবনের কাজ চালাইতে গেলে খাবারের প্রয়োজন। এই খাবার শরীরে গিয়া যে শক্তির উৎপত্তি করে, তাহারি জোরে আমরা হাঁটিয়া বেড়াই, কাজকর্ম্ম করি ও শরীরকে পুষ্ট করি। কাজেই যদি আাহার বন্ধ করা যায়, তবে কাঠের অভাবে যেমন আগুন নিভিয়া যায়, সেই রকম অনাহারে আমাদের মৃত্যু ঘটে। চিত্র ৩৫—শুঁয়ো-পোকা গুটি কাটিয়া বাহির হইয়াছে। শুঁয়ো-পোকারা পুত্তলি হইয়া চলা-ফেরা একবারে বন্ধ করে, এমন কি শ্বাস-প্রশ্বাস পর্য্যন্ত রোধ করিয়া ফেলে। কাজেই জীবন-ধারণের জন্য তাহাদের অতি অল্প শক্তিরই প্রয়োজন হয়। এই জন্যই পতঙ্গেরা পুত্তলি-অবস্থায় অনাহারে অনেক দিন কাটাইতে পারে।

 খুব ভালো খাবার খাইয়া শরীর মোটা করিলে দেহের ভিতরে মাংস চর্ব্বি প্রভৃতি অনেক সারবান্ জিনিস জমা হয়। যখন বাহির হইতে খাবার পাওয়া যায় না, মোটা প্রাণীরা তখন নিজেদের দেহের সেই মাংস ও চর্ব্বি খরচ করিয়া অনেক দিন অনাহারে বাঁচিতে পারে। শুঁয়ো-পোকারা দিবারাত্রি আহার করিয়া কি-রকম মোটা হয়, তাহা আগে বলিয়াছি। কাজেই শরীরে যে মাংস ও চর্ব্বি জমা থাকে, তাহাও পুত্তলিদিগকে অনেক দিন বাঁচাইয়া রাখিতে পারে।

 পুত্তলি-অবস্থায় মড়ার মত গুটির মধ্যে পড়িয়া থাকিলেও চিত্র ৩৬—প্রজাপতি ডানা মেলিয়া উড়িবার উপক্রম করিতেছে। এই সময়ে শুঁয়ো-পোকাদের দেহে একটা বড় রকমের পরিবর্ত্তন হয়। আমরা কাদা দিয়া পুতুল গড়িয়া, পরে তাহা ভাঙিয়া যেমন আর একটি নূতন পুতুল গড়িয়া থাকি,—বিধাতা ঐ-সময়ে গুটির মধ্যের শুঁয়ো-পোকাগুলিকে ভাঙিয়া-চুরিয়া সেই রকমে তাহাদিগকে সম্পূর্ণ পতঙ্গের আকারে পরিণত করেন। শুঁয়ো-পোকার ডানা থাকে না, অনেকের পা থাকে না, এবং সেই বড় বড় চোখও থাকে না৷ গুটির মধ্যে উহারা যখন অজ্ঞাতবাস করে, তখনই তাহাদের মাথা, পা, ডানা, চোখ প্রভৃতি সকল অঙ্গেরই সৃষ্টি হয় এবং শেষে এক দিন সেই শুঁয়ো-পোকাই সুন্দর প্রজাপতি বা সম্পূর্ণ পোকার আকার পাইয়া গুটি কাটিয়া বাহির হয়। ইহাই পতঙ্গদের জীবনের তৃতীয় অবস্থা।

 আমরা ক্রমে ক্রমে পতঙ্গদের চারিখানি ছবি দিয়াছি। এইগুলি দেখিলে পতঙ্গদের তিন অবস্থার কথা তোমরা ভালো করিয়া বুবিবে।

 ডিম হইতে বাহির হইয়া শুঁয়ো-পোকা কি রকমে গাছের পাতায় বেড়াইতেছে, তাহা প্রথম ছবিতে আঁকা আছে। দ্বিতীয় চিত্রটি তাহারি পুত্তলি-অবস্থার ছবি। গায়ের চাম্‌ড়ায় লালা মিশাইয়া শুঁয়ো-পোকাটি কেমন গুটি পাকাইয়াছে এবং গুটির মধ্যে কেমন মড়ার মত পড়িয়া আছে, এই ছবিতে তাহা আঁকা হইয়াছে। তৃতীয় ছবিখানি সেই পোকারই গুটি কাটিয়া বাহির হওয়ার চিত্র। সম্পূর্ণ প্রজাপতির আকার পাইয়া সেই শুঁয়ো-পোকাই গুটি হইতে বাহির হইয়াছে, কিন্তু এখনো ডানা মেলিয়া উড়িতে পারিতেছে না। সেই প্রজাপতিই কি-রকমে ডানা মেলিয়া উড়িবার উপক্রম করিতেছে, তাহা চতুর্থ চিত্রে আঁকা রহিয়াছে।

 এখন বোধ হয় তোমরা বুঝিতে পারিয়াছ—পতঙ্গেরা মায়ের দেহ হইতে সম্পূর্ণ পতঙ্গের আকারে বাহির হয় না। প্রথমে তাহারা ডিম হইতে শুঁয়ো-পোকার আকারে বাহির হয়। তার পরে উহারা মড়ার মত গুটির মধ্যে বাস করে এবং শেষে তাহারা গুটি কাটিয়া সম্পূর্ণ পতঙ্গের আকারে বাহির হইয়া পড়ে। ইহাই পতঙ্গদের জীবনের তিন অবস্থা।