প্রধান মেনু খুলুন

পোকা-মাকড়/ষষ্ঠ শাখার প্রাণী/পতঙ্গ/পতঙ্গের স্নায়ুমণ্ডলী


স্নায়ুমণ্ডলী

 এ-পর্য্যন্ত যাহা বলিলাম, তাহা হইতে বুঝা যায়, বড় প্রাণীদের শরীরে যে-সব ব্যবস্থা আছে, অনেক স্থলে তাহারি উল্‌টা ব্যবস্থা পতঙ্গদের শরীরে দেখা যায়। আমাদের দেহে যেমন হাড় আছে, পতঙ্গের শরীরেও সেই রকম হাড় আছে। কিন্তু তাহা মাংসের ভিতরে থাকে না, পতঙ্গের হাড় চাম্‌ড়ার মত সমস্ত দেহকে ঢাকিয়া রাখে। আমাদের দেহের সমস্ত যন্ত্র শরীরের সম্মুখভাগে থাকে, পতঙ্গদের শরীর-যন্ত্র পিঠের উপরে থাকে। আমাদের কেবল দুইটি মাত্র চোখ, কিন্তু পতঙ্গদের চোখের সংখ্যা দশ হাজার বিশ হাজারের কম নয়। নাক কান প্রভৃতি ইন্দ্রিয় আমাদের শরীরের একএকটা নির্দ্দিষ্ট জায়গায় থাকে। কিন্তু যাহাদের কান পায়ের গোড়ায় এবং নাক শুঁয়োর আগায়, এরকম পতঙ্গও অনেক পাওয়া যায়। আবার এ-রকম পতঙ্গ অনেক আছে, যাহাদের নাক বা কান শরীরের কোন্ জায়গায় লুকাইয়া রহিয়াছে, তাহার সন্ধানই পাওয়া যায় না; অথচ তাহারা আমাদেরি মত শব্দ শুনিতে পায় এবং গন্ধ শুঁকিয়া খাবার সংগ্রহ করে।

 পতঙ্গদের স্নায়ুমণ্ডলীও আমাদের স্নায়ুমণ্ডলীর তুলনায় দেহে উল্‌টা রকমে সাজানো আছে। মেরুদণ্ড-যুক্ত প্রাণীদের প্রধান স্নায়ুর তারগুলি শাখা-প্রশাখা ছড়াইয়া পিঠের দিকে থাকে, কিন্তু পতঙ্গের স্নায়ু শরীরের নীচের দিকে ছড়ানো দেখা যায়। চিংড়ির স্নায়ুর কথা তোমরা আগেই শুনিয়াছ। পতঙ্গের স্নায়ু চিংড়ির স্নায়ুরই মত। দুইটা মোটা স্নায়ুর সূতা ইহাদের দেহের তল দিয়া আগাগোড়া বিস্তৃত থাকে এবং এই সূতার প্রত্যেকটি হইতে অনেক ছোট সূতা বাহির হইয়া দেহে ছড়াইয়া পড়ে। আবার মাঝে মাঝে ঐ-সকল স্নায়ুর সূতা জটলা পাকাইয়া স্নায়ুর কেন্দ্রের সৃষ্টি করে। এই সকল কেন্দ্র দিয়া কতকটা মস্তিষ্কের কাজ চলে। পতঙ্গদের মাথার আসল মস্তিষ্ক খুব ছোট। দেহের তলার সেই মোটা স্নায়ুর সূতা হইতে কয়েকটি সরু সূতা বাহির হইয়া মাথার এক জায়গায় একত্র হয় এবং তাহাই কোনো রকমে মস্তিষ্কের কাজ চালায়। পতঙ্গের শুঁয়ো ও চোখ এই মস্তিষ্কের সহিত যুক্ত থাকে।

 পিঁপ্‌ড়ে ও মৌমাছিরা খুব উন্নত প্রাণী। ইহার দলবদ্ধ হইয়া সমাজের সৃষ্টি করিতে জানে এবং সমাজের উন্নতির জন্য বুদ্ধিমান্ প্রাণীর মত অনেক বুদ্ধি খরচ করিয়া সমাজের কাজ চালায়। ইহাদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ু-মণ্ডলী অনেকটা উন্নত ও জটিল।

 তোমরা বোধ হয় দেখিয়াছ, বোল্‌তা, ফড়িং প্রভৃতির মাথা কাটিয়া ফেলিলে, ইহাদের কাটা মাথা ও দেহ অনেকক্ষণ জীবিত থাকে। কিন্তু মাথা কাটা গেলে মানুষ গরু ভেড়া অল্প ক্ষণেই মারা যায়। পতঙ্গদের মস্তিষ্ক নিতান্ত ছোট এবং তাহাদের দেহের জায়গায় জায়গায় মস্তিষ্কের মত স্নায়ু-কেন্দ্র ছড়াইয়া আছে, সেই জন্য মাথা কাটা গেলেও তাহাদিগকে অনেকক্ষণ বাঁচিয়া থাকিতে দেখা যায়।

 বড় প্রাণীদের দেহে স্নায়ু বেশি এবং পতঙ্গদের শরীরে স্নায়ু অল্প। এইজন্য আঘাত পাইলে বড় প্রাণীরা পতঙ্গদের চেয়ে বেশি বেদনা বোধ করে। আমাদের একটা আঙুলের ডগায় ছুরির খোঁচা লাগিলে, কত বেদনা হয়, তাহা মনে করিয়া দেখ। কত জলপটি, কত ওষুধ না দিলে বেদনা কমে না, হয় ত রাত্রে ঘুমই হয় না। আমাদের দেহের প্রায় সকল জায়গায় অনেক স্নায়ু আছে বলিয়া এই বেদনা বোধ করি। আবার শরীরের যে-সব জায়গায় খুব বেশি স্নায়ু আছে, সেখানে আঘাত লাগিলে বেদনাও খুব বেশি হয়। কিন্তু একটা আরসুলার যদি মাথাটা থেঁত্‌লাইয়া যায়, বা একখানা পা ভাঙিয়া যায়, সে এই আঘাত হঠাৎ গ্রাহ্য করে না—খোঁড়াইতে খোঁড়াইতে ঘরের কোণের দিকে ছুটিয়া পালায়। শরীরে বেশি স্নায়ু নাই বলিয়াই ইহারা ঐরকম আঘাতের বেদনা বুঝিতে পারে না,—এইজন্য আঘাতে আমাদের যত কাতর করে, পোকা-মাকড়দের তত কাতর করিতে পারে না। প্রতিদিনই আমাদের পায়ের চাপে কত পিঁপ্‌ড়ে, কত পোকা আঘাত পায়, তাহা একবার ভাবিয়া দেখ। তা ছাড়া আরো কত কারণে কত পতঙ্গ যে প্রতি-মুহূর্ত্তে খোঁড়া হইতেছে এবং অঙ্গহীন হইতেছে, তাহা গুণিয়া ঠিক করা যায় না। ইহাদের বেদনা-বোধের শক্তি যদি আমাদেরি মত হইত, তবে তাহারা কত কষ্ট পাইত, একবার ভাবিয়া দেখ। উহারা যদি আমাদের মত চেঁচাইয়া কাঁদিতে জানিত, তবে মশা, মাছি, পিঁপ্‌ড়ে আরসুলা প্রভৃতি পতঙ্গের কান্নার রোলে কান-পাতা যাইত না। ভগবান্ দয়া করিয়া চিত্র ৩২—পতঙ্গের স্নায়ু। উহাদের দেহে স্নায়ুর পরিমাণ অল্প রাখিয়াছেন বলিয়া উহাদের কষ্ট অনেক কমিয়া গিয়াছে। ভগবানের কেমন সুব্যবস্থা একবার ভাবিয়া দেখ।

 পতঙ্গের দেহে কি-রকমে স্নায়ুর সূতা ছড়ানো আছে, এখানে তাহার একটা ছবি দিলাম। ইহাদের শরীরে স্নায়ুর পরিমাণ কত অল্প, ছবি দেখিলেই তোমরা তাহা বুঝিতে পারিবে।