প্রধান মেনু খুলুন

বাখতিন/বাখতিন, এসময়ে/এক


বাখতিন, এসময়ে

বহু শতাব্দী ধরে যিনি মানুষের চিন্তাবিশ্বকে আলোকিত করবেন, তাঁর চূড়ান্ত-বিন্দুহীন যাত্রায় এক শতাব্দী মাত্র পূর্ণ হলো চোদ্দ বছর আগে। প্রতীচ্যের তত্ত্বভাবনা, বিশেষত উপন্যাস-চিন্তা, গত তিন দশকে নিরবচ্ছিন্ন উন্মোচনের সূত্রে কেবলই ভাবনার নতুন নতুন অণুবিশ্ব নির্মাণ করে চলেছে। আমাদের পাঠাভ্যাস ও চিন্তাপদ্ধতির সংস্কার এত দৃঢ়প্রোথিত যে একে ধারণ করার মতো ক্ষমতা অর্জন করতে হলে চাই আত্মবিনির্মাণের স্পৃহা। কিন্তু হায়, আমাদের বৌদ্ধিকতার অহংকার এবং নিজস্ব অবস্থানের অনমনীয়তা বাস্তিল দুর্গের চেয়েও বেশি দুর্ভেদ্য। তার ওপর সাম্প্রতিক কালে বিশ্বাসহীনতার চোরাবালি এত সর্বগ্রাসী যে ইতিহাস-ভাবাদর্শ-তাৎপর্য প্রভৃতিও প্রয়োগ-শূন্য তত্ত্ববীজ হিসেবে ধিক্কৃত ও প্রত্যাখ্যাত। ইদানীং বিকেন্দ্রায়নের নামে চরম নৈরাজ্য আমাদের এত বেশি অধিকার করে রেখেছে যে কোনো প্রতিবেদনের স্বত-উৎসারিত যুক্তি-শৃঙ্খলায় আমরা কিছুতেই আস্থা রাখতে পারি না। নিজেদের অবিশ্বাস-দীর্ণ অস্তিত্ব থেকে সংক্রামিত নিরলম্বতার পাণ্ডুরোগ মহামারীর মতো ছড়িয়ে দিচ্ছি চিন্তাবিশ্বের নানা অভিব্যক্তিতে। বিশেষত আধুনিকোত্তরবাদের জটিল সন্দর্ভগুলির আংশিক ও অযথার্থ গ্রহণ কেবলই বিড়ম্বিত করছে আমাদের। তাই বাখতিনের অনন্যতাকে ঈপ্সিত মাত্রায় উপলব্ধি করতে পারছি না সম্ভবত। চিন্তার ইতিহাসের ওপর যেহেতু নিজেদের পূর্বনির্ধারিত কেন্দ্রচ্যুত অবস্থানের ছায়া চাপিয়ে দিচ্ছি, বাখতিনের ভাববিশ্ব থেকে অর্জিত সম্বোধ্যমানতার প্রক্রিয়ায় নিজেদের সম্পৃক্তও করতে পারছি না।

 বিশ শতকের শেষে আধুনিকোত্তরবাদ ও নয়া উপনিবেশবাদের উদ্ধত যুগলবন্দি জীবন থেকে ক্রমাগত মানবিক নির্যাস শুষে নিয়েছে। পরিসর থেকে হারিয়ে যাচ্ছে গভীরতা আর সময় থেকে ব্যাপ্তির বোধ। তাহলে প্রত্যুত্তর-যোগ্যতা বা সম্বোধ্যমানতাকে কীভাবে জাগিয়ে রাখব আজ? কীভাবেই বা বাখতিনের চিন্তাবীজ পুষ্পিত হবে আমাদের অনিকেত এবং পারম্পর্যহীন অবস্থানে? পরিবর্তনের স্রোতে আমরা এখন দিগ্বিদিকশূন্য হয়ে ভেসে যাচ্ছি। বাখতিনের জীবনেও মুহুর্মুহু পরিবর্তন ঘটেছিল, ইতিহাসের কত বিচিত্র পর্যায়ের মধ্য দিয়ে তাঁকে যেতে হয়েছিল—ইতিমধ্যে তা জেনেছি আমরা। তাঁর জীবন ও মননের নিরবচ্ছিন্ন দ্বিরালাপের গ্রন্থনায় ইতিহাসের বহুস্বরিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বাখতিন নিজে যাকে মহাসময় (Great time) বলেছেন, তাঁর জীবন অতিবাহিত হয়েছিল তারই মধ্যে। কিন্তু আমরা যারা আধুনিকোত্তর ভাবনার নিরিখে ইতিহাসকে মহাসন্দর্ভ বলে প্রত্যাখ্যান করতে শিখেছি, বাখতিনের জীবন-নিষ্পন্ন প্রত্যয় কি আমাদের কাছে অপ্রাসঙ্গিক বিবেচিত হবে! বাখতিন চিন্তা-প্রস্থানের আলোচনায় অতিউদ্ভাসিত প্রথম বিশ্বের বুদ্ধিজীবীদের উৎসাহ যেহেতু সবচেয়ে বেশি, তাদের আধিপত্যবাদী সাংস্কৃতিক রাজনীতির অভিপ্রায় ও রণকৌশল কি আদৌ ভুলে থাকা সম্ভব? তৃতীয় বিশ্বের জিজ্ঞাসুরা কীভাবে বিশ্বাস করবেন যে প্রথম বিশ্বের বাখতিন-ভাষ্য—‘প্রতিটি সত্তাই সহযোগী সত্তা’ কিংবা ‘সত্তা মানে সমান্তরালতার বোধ’ বা অংশীদার হওয়ার প্রত্যয়’—এইসব মহাবাক্য আন্তরিকভাবে স্বীকৃত হবে? কার্নিভাল তত্ত্বে অন্তর্বৃত প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের নির্যাসকে কিংবা বাখতিনীয় তাৎপর্যতত্ত্বে সংগ্রামের অপরিহার্যতাকে কীভাবে গ্রহণ করতে পারে একবাচনিক আভিজাত্যে অভ্যস্ত জনেরা?

 কোনাে তত্ত্বপ্রস্থান বা সেই তত্ত্বপ্রস্থানের পাঠ ও বিশ্লেষণ ইতিহাসের বাইরে যেতে পারে না। ইতিহাসকে অস্বীকার করলে গােলকধাঁধা তৈরি হয়ে মাত্র। অন্যত্র লিখেছি, দ্বিবাচনিকতা নিছক নান্দনিক কৃৎকৌশল নয়; তা জীবনদর্শনের সারাৎসার। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স্তরে তাকে উপেক্ষা কিংবা কুঠারাঘাত করলে নিছক বৌদ্ধিক চর্চায় তা আলােচনার অধিকার থাকে না। এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার পর্যায়ে যাবতীয় অপর পরিসরের স্বাতন্ত্র্য, সার্বভৌমত্ব ও সমান্তরাল অবস্থানের অধিকার যারা ক্রমাগত কেড়ে নিচ্ছে এবং নিজেদের প্রয়ােজন-মাফিক সত্য উৎপাদন করছে—তাদের প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষ পৃষ্ঠপােষকতায় পুষ্ট বুদ্ধিজীবীরা দ্বিবাচনিক বিশ্ববীক্ষাকে কেনই বা সমর্থন করবেন? তাদের ‘নিরপেক্ষ’ সত্য সন্ধান আমাদের কোথায় নিয়ে যেতে পারে—তা সহজেই অনুমেয়। অন্তত যে-পৃথিবীতে ইরাক-বসনিয়া-কসভাে-সােমালিয়া-আফগানিস্থানের ঘটনাবলি সম্ভব, সেই পৃথিবীর উন্নততম তথ্য-প্রযুক্তির সমর্থনধন্য বৌদ্ধিকবর্গ বাখতিনের ভ্রান্ত পাঠই করতে পারেন শুধু।

 বিখ্যাত বাখতিন-আলােচক ক্যারিল এমার্সন The first hundred years of Mikhail Bakhtin বইয়ের প্রাক্‌কথনে লিখেছেন: ‘The Bakhtin industry has known its share of gossip, turfwars, unsubstantiated rumour, dialogue in bad faith, nostalgic fantasy and willful misreadings.’ (১৯৯৭: দশ)। এই যে ইচ্ছাকৃত ভ্রান্ত পাঠের কথা বলা হলাে, তাতে তৃতীয় বিশ্বের যেসব ভাষ্যকারেরা জড়িয়ে পড়েন, এর মূলে রয়েছে প্রথম বিশ্বের বৌদ্ধিক বর্গের প্রতি নির্বিচার আনুগত্য ও অবিশ্লেষণাত্মক পাঠের আভাস। স্বয়ং এমার্সনের বক্তব্য সম্পর্কে একই কথা প্রযােজ্য। আমরা যারা তুলনামূলক ভাবে ছােট সময়ের অধিবাসী, জীবনবৃত্তের সীমাবদ্ধতা বা অভিজ্ঞতার অতিসংলগ্নতা সত্ত্বেও খােলা মনে চিন্তাবিশ্বের মুখােমুখি হতে আমাদের কোনাে বাধা হওয়ার কথা নয়। এমার্সন-কথিত মিথ্যা বিশ্বাসের চাপ অবশ্যই অনস্বীকার্য বাস্তব। তবু তাৎপর্য অর্জনের সংগ্রামী প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতেই হয়। নব্বই-এর দশকে প্রতিবিপ্লব-পরবর্তী খণ্ডীকৃত রাশিয়ার তথাকথিত উত্তর-সমাজতন্ত্রী পর্যায়ে বাখতিন কীভাবে পুনঃপঠিত হচ্ছেন, এ সম্পর্কে এমার্সন তথ্য-সমৃদ্ধ মনােজ্ঞ আলােচনা করেছেন। প্রমাণ করার চেষ্টা চলেছে যে সমাজতান্ত্রিক ভাবাদর্শ তাে নয়ই, কোনাে রাজনীতিও তাঁর চিন্তাজীবনকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করতে পারেনি। নিষ্ঠুর অত্যাচারী শাসকের পীড়ন সত্ত্বেও তিনি কীভাবে রয়ে গেলেন চিরমুক্ত, গৃহহীন ও অসম্পৃক্ত—তা অনুসন্ধান করে আলােচকেরা বাখতিন সম্পর্কে কার্যত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন। অথচ তাঁরই বিখ্যাত তত্ত্ববীজ অনুযায়ী (‘জীবন ও সাহিত্যের প্রতিবেদন কখনও চূড়ান্ত করা যায় না’) আলােচকদের ঐ প্রবণতা সমর্থন করা যায় না।

 তাঁর মধ্যে কেউ কেউ দেখতে পেয়েছেন সাম্যবাদ-উত্তর আধুনিকোত্তর চিন্তাধারার পূর্বাভাস। প্রকৃতপক্ষে তাঁর অবস্থান খোঁজা হচ্ছে ‘Somewhere between a classic and cliche’ (তদেব: ৩)। বিশেষত আধুনিকোত্তর ভাবনার প্রেক্ষিতে বাখতিনের চিন্তাবিশ্বের বিবর্তন ব্যাখ্যা করার চেষ্টাও লক্ষ করা যায়। তবু রুশ ভাষ্যকার ভি. এল. মাখলিন-এর মতে বাখতিনকে বুঝতে হবে নেতি নেতি করে। তাঁকে বলা যায় ‘non-Marxist, nonformalist, Non Freudian, non-structuralist, nonexistentialist, noncollectivist, nonutopian, nontheologian, in a word a non-modernist’ (তদেব: ৪) তাত্ত্বিক। আসলে এত দৃষ্টিকোন থেকে বিশ্লেষণ করার পরেও বাখতিন রয়ে গেছেন রহস্যময়, এমনকী কিছুটা প্রহেলিকাও। তাঁর তত্ত্ববিশ্ব কতটা স্ববিরােধী কিংবা অসম্পূর্ণ—এই আলােচনাও কম হয়নি। বিশেষত সাম্প্রতিক বঙ্গীয় আলােচকদের একটা অংশ এ-বিষয়ে অত্যন্ত উৎসাহী। প্রতিবেদনের মধ্যে অন্ধবিন্দু থাকাটা অবশ্য অস্বাভাবিক নয়। স্বয়ং বাখতিন সার্থক বয়ানকে মুক্ত পরিসরের দ্যোতক বলে ভাবতেন। নিরন্তর প্রত্যুত্তর-যােগ্যতা অর্জনের ওপর গুরুত্ব আরােপ করেছেন বলে তাঁর কাছে শেষ কথা বলে কিছু ছিল না।