প্রধান মেনু খুলুন

বাখতিন/বাখতিন, এসময়ে/দুই


দুই

সুতরাং বাখতিন কী করতে পারেননি, সেই অপূর্ণতার ওপর বেশি মনােযােগ না দিয়ে আমরা তাঁর দ্রষ্টাচক্ষুর ব্যাপ্তি ও গভীরতার পরিমাপ করতে পারি। লক্ষ করতে পারি, কীভাবে যথাপ্রাপ্ত বাস্তবের মধ্যেই তিনি আবিষ্কার করেছিলেন স্বর ও স্বরান্তরের অজস্র সম্ভাবনা, খুঁজে পেয়েছিলেন বস্তু ও ক্রিয়ার বিনির্মাণের তাগিদ। চিন্তার ঔচিত্য নয়, চিন্তার স্বভাবই অন্বিষ্ট ছিল তাঁর। কীভাবে ভাবনার সীমান্তগুলি অনবরত মুছে যাচ্ছে এবং তার ফলে তৈরি হচ্ছে নানা ধরনের কূটাভাস—বাখতিন আমাদের সেদিকে মনােযােগী হতে প্রাণিত করেন। ভারতীয় উপমহাদেশের বাঙালির আস্তিত্বিক পরিসরে কীভাবে গৃহীত হচ্ছেন বাখতিন—তার প্রকৃত মূল্যায়ন করা সহজ নয়। তবে জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিসরে প্রতীচ্যের ভাষ্যকারদের চোখ দিয়ে বাখতিনকে দেখার ফলে কিছু কিছু নেতিবাচক মনােভঙ্গি নিঃসন্দেহে তৈরি হয়েছে। এর সমাধান যদি করতে চাই, কর্তৃত্ববাদের কৃৎকৌশল থেকে তাৎপর্য সন্ধানের প্রক্রিয়াকে আগে মুক্ত করতে হবে। সারা জীবন ধরে যিনি বাচনবিশ্বের যােগ্যতা পরীক্ষা করে গেছেন, তাঁকে টুকরাে করে দেখা চলে না কখনো। ভরসার কথা, কোনাে কোনাে বাঙালি তত্ত্বজিজ্ঞাসু ও আলােচক এবিষয়ে ক্রমশ অবহিত হয়ে উঠেছেন। এই উপলব্ধি উত্তরােত্তর গাঢ়তর হয়ে উঠছে যে এই জগৎ যতটা বাস্তব ততটাই রূপক। চিহ্নায়িত জগতে সত্যে পৌঁছানাের পথে সবচেয়ে বড়ো বিঘ্ন হলাে প্রাতিষ্ঠানিকতা বা সরকারি বয়ানের রক্ষণশীলতা। বহুস্তরান্বিত পাঠকৃতিতে সমস্ত অন্তর্বয়ন প্রকাশ্য নয়, রয়েছে বহু গােপন বা অনতিগােপন গৌণ পাঠও। গত দশ বছরে বেশ কয়েকজন সমালােচক বাখতিন চর্চায় অংশগ্রহণ করেছেন।

 কিন্তু তা সত্ত্বেও একথা বলা যাচ্ছে না যে তৃতীয় বিশ্বের অপর পরিসরের উপযােগী যথাপ্রাপ্ত স্থিতির গভীর তাৎপর্য বাঙালি ভাবুকেরা ঈপ্সিত মাত্রায় নিঙ্‌ড়ে নিতে পেরেছেন। বাখতিনের যে-সমস্ত ভাববীজ বাঙালির নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির জমিতে বহুধা-অঙ্কুরিত হতে পারত, তা হয়নি। তবে এটা ঠিক যে দেবেশ রায় প্রবর্তিত উপন্যাসতত্ত্বমূলক আলােচনার প্রভাব নবীন প্রজন্মের কয়েকজন প্রাবন্ধিকের মধ্যে দেখা যাচ্ছে। উপন্যাসের নতুন ধরনের খোঁজে ব্যাপৃত হয়েছেন কয়েকজন উজ্জ্বল কথাকার। কিন্তু আবারও লিখছি, বাখতিনীয় দ্বিরালাপ থেকে যে নবায়মান প্রত্যুত্তরযােগ্যতার বহুমুখী কর্ষণ হতে পারত, তা এখনও অপেক্ষিত। তেমনই কার্নিভালের সাংস্কৃতিক রাজনীতির তাৎপর্য এবং সেই তাৎপর্যের বিস্ফোরক তাত্ত্বিক ও প্রায়ােগিক সম্ভাবনা আমাদের অভিনিবেশ পায়নি। জীবন-জগৎ-সাহিত্যের প্রতিবেদন কীভাবে অনবরত পুনঃপাঠ করে যেতে হয়, সেই ভাবনার উদ্ভাসন আমাদের মানববিশ্বের প্রতীতিকেই সমৃদ্ধতর করতে পারত। বিশেষত ভারতীয় চিত্তাকাশের শরিক হয়েও আমরা বাখতিনীয় ভাবকল্পকে আমাদের মানবিক মহাকাশে উত্তীর্ণ হওয়ার যাত্রায় কোনাে অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায় হিসেবে ব্যবহার করতে পারি কি না, তা গভীর বিবেচনার বিষয়। গত কয়েক বছরের সাহিত্যপ্রেক্ষিত পর্যবেক্ষণ করে মনে হয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও অপ্রাতিষ্ঠানিক জীবনবীক্ষার মধ্যবর্তী জলবিভাজনরেখা ক্রমশ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। পক্ষ-প্রতিপক্ষের দ্বন্দ্ব যেন প্রাসঙ্গিক নয় আর, বিচিত্র সমগ্রায়নের প্রবণতায় কেন্দ্রাতিগ ও কেন্দ্রাভিগ বয়ানের পার্থক্য অবান্তর হয়ে যাচ্ছে। আধুনিকোত্তর পরিস্থিতির নামে আরােপিত প্রতিনন্দনের কাছে স্বেচ্ছায় সমর্পিত হচ্ছে বাঙালির লিখন-প্রণালী। বাখতিনের কার্নিভাল সংক্রান্ত ভাবনার নির্যাস থেকে এক্ষেত্রে হয়তাে আমরা প্রতিরােধের ভিন্ন প্রকরণ খুঁজে নিতে পারতাম।

 না, এসব কোনাে আক্ষেপের কথা নয়। বিশ্বব্যাপ্ত নির্মাণবায়ন প্রবণতার মধ্যে আমাদের অজস্র স্ববিরােধিতা-লাঞ্ছিত সাংস্কৃতিক সমাজ কীভাবে আত্মরক্ষা করতে পারে—এটাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন। এ ব্যাপারে কতটা সাহায্য করতে পারেন বাখতিন, সেটাই আমাদের ভেবে দেখতে হবে এখন। ইতিহাসই বাঙালির পরিসরকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। ফলে অসংখ্য উচ্চাবচতা, কৌনিকতা ও অনিশ্চয়তা সম্বল করে বাস্তুহীন মানুষের প্রব্রজন আজও অব্যাহত। ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার মাত্রা যেহেতু আলাদা, জীবনবীক্ষায় ভিন্নতার অভিব্যক্তিও অনিবার্য। বস্তুত প্রাক্-আধুনিক, আধুনিক ও আধুনিকোত্তর চিন্তাপ্রণালীর সহাবস্থান তাই বাঙালির ভাববিশ্বকে গ্রন্থিল করে তুলেছে। সাহিত্যকর্মে আধার ও আধেয়ের দ্বিরালাপ নানাভাবে ব্যক্ত হচ্ছে। স্বভাবত প্রত্যুত্তরযােগ্যতা অর্জনের প্রশ্নটি সমস্ত বাঙালির দ্বারা একই ভাবে মীমাংসিত হতে পারে না। বিভিন্ন অবস্থানের সীমান্তগুলিকে কীভাবে গ্রহণ করতে পারি আমরা, এ-বিষয়ে বাখতিনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ নেওয়া সম্ভব। বিশেষত বাস্তব ও অধিবাস্তব, বস্তুবিশ্ব ও চিহ্নবিশ্ব ইদানীং যেভাবে সাহিত্যিক প্রতিবেদনে একাকার হয়ে যাচ্ছে, নতুনভাবে দ্বিরালাপের যৌক্তিকতা নির্ণয় করা অবশ্যকৃত্য হয়ে পড়েছে। বাংলা সাহিত্যে আখ্যানের স্বরান্তর সম্পর্কে সাম্প্রতিক কালে যে অভিনব সচেতনতার সূচনা হয়েছে, তাকে বাখতিনীয় ভাবকল্প দিয়েই যথার্থ বিনির্মাণ করা সম্ভব। একটু আগে বাঙালির বাধ্যতামূলক প্রব্রজনজনিত চিন্তা ও অভিব্যক্তির যে অনেকান্তিকতার প্রতি ইঙ্গিত করেছি, সেই সূত্রে বলা যায়, বিচিত্র অভিজ্ঞতাকে সৃজনশীলতার কৃত্যে রূপান্তরিত করার পথ-নির্দেশ বাখতিনই দিতে পারেন। তাৎপর্যের রূপান্তর ঘটানাের ক্ষেত্রে নৈঃশব্দ্য ও অনুপস্থিতির যত ভূমিকাই থাক, কৃত্যের নির্মিতিপ্রকরণ শুধুমাত্র তাদের ওপর নির্ভর করে না। এখানেই বাখতিন-কথিত সক্রিয় পর্যবেক্ষকের ভূমিকা আমাদের মনে পড়ে।

 বাখতিনীয় ভাবকল্পকে সম্প্রসারিত করে ক্যারিল এমার্সন ‘co-existent options in space’ (প্রাগুক্ত: ১৬)-এর কথা বলেছেন। এই কথাটি বহুধাবিচ্ছিন্ন বাঙালির সাম্প্রতিক অবস্থানে খুব জরুরি চিন্তাসূত্র হয়ে উঠতে পারে। আরেকজন বাখতিন-বিশেষজ্ঞ, মিখায়েল এপস্টাইন, ১৯৯৩ সালে একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন: ‘Post-humanism, post-communism, post-modernism—the river of time has entered an ocean and lost its fluency altogether.’ (তদেব)। এ হয়তাে বাঙালির পৃথিবী সম্পর্কে প্রযােজ্য নয়; কিন্তু তবু আজকের অধিপরিসর শাসিত নব্য-বহুত্বের পর্যায়ে এই ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতেই হয়। লিখন-বিশ্ব ও তার বিচিত্রগামী ভাষ্যকে যদি সংহত ও গভীরতা-সন্ধানী করতে চাই, তাহলে বাখতিনের দ্বিবাচনিক ভাষাদর্শনের ওপর আস্থা রাখতে হবে। রচনাকর্ম, সমালােচনা ও তত্ত্বসন্ধানে আমরা আজ কেবল বর্তমানকেই গুরুত্ব দেব না, অতীত অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধির পুনঃপাঠও করব। অর্থাৎ বাখতিন আমাদের সময় ও পরিসরের আবহমান পর্যায়ক্রমগুলিকে পুনর্বিন্যস্ত করেন। এই সূত্রটির প্রণালীবদ্ধ অধ্যয়ন থেকে আমরা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকে পুনর্বিবেচনা করার রসদ সংগ্রহ করে নিতে পারি। গ্রেগরি ক্লার্ক তাঁর Dialogue, Dialectic and Conversation বইতে লিখেছেন: ‘for people studying rhetoric and compostion as well as for those studying literature, Bakhtin’s work provides perhaps our most comprehensive explanation of the process through which social knowledge is constructed in a co-operative exchange of texts. However diverse its particular applications. Bakhtin’s explanation persistently and explicitly affirms the two complementary assumptions about language that support a social constructionist point of view: that our language creates rather than conveys our reality. …and that it does so in a process that is collaborative rather than individual.’ (পৃ. ৮-৯)।

 এই মন্তব্যের প্রতিটি অংশ বাংলা সাহিত্যের নিবিড় পাঠে দিক্‌দর্শক বলে বিবেচিত হতে পারে। সামাজিক নির্মিতিবাদী দৃষ্টিকোন ছাড়া নান্দনিক সত্য ও সেই সত্যের ঐতিহাসিক তাৎপর্য বােঝা সম্ভব নয়। বাখতিনের কাছে পাওয়া নির্মিতিবিজ্ঞান সম্পর্কিত ধারণা কিংবা ‘speech genre’-গুলির অন্তর্নিহিত সামাজিক মাত্রা নির্ণয়ের পদ্ধতি বিশ্লেষণ করে আমরা বাংলা সাহিত্যের বিভিন্ন পর্যায়ে রূপান্তরিত প্রতিবেদনের যথার্থ তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারব। এটা ঠিক যে বাংলা বিদ্যাচর্চা, বিশেষভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে, অত্যন্ত মন্থর গতিতে বিবর্তিত হলেও বহুকাল ধরে প্রচলিত রক্ষণশীলতা একটু একটু করে বিচলিত হতে শুরু করেছে। বাখতিন বিশ্বাস করতেন, আমাদের লিখিত বা মৌখিক অভিব্যক্তির কৃত্য বা উদ্যম দুরূহ অন্তর্বৃত সংগ্রামের পরিণতি। আমাদের ব্যক্তিগত ও সামূহিক অতীত ও বর্তমানের অজস্র উচ্চারণ অন্যোন্য-সম্পৃক্ত হয়ে ভাষার সামাজিক ঊর্ণাতন্তু গড়ে তােলে এবং গড়ার ঐ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই প্রাগুক্ত সংগ্রামে যুক্ত হয়ে যায়। এইসব উচ্চারণে যাবতীয় অপর পরিসরের উপস্থিতি স্বতঃসিদ্ধ ও অন্তরীকৃত। স্বর ও স্বরান্তরের বিন্যাস-প্রতিন্যাসের গ্রন্থনা স্বভাবে দ্বিবাচনিক। সাহিত্যের বিভিন্ন পর্যায়ে অন্তহীন দ্বিরালাপের উপস্থিতি ভিন্ন ভিন্ন ভাবে অনুভূত হয়ে থাকে।