প্রধান মেনু খুলুন

বাখতিন/সম্ভাব্য জবাবের নির্মিতি/এক


সম্ভাব্য জবাবের নির্মিতি

সওয়াল-জবাব। এই শব্দবন্ধকে বিতর্কসভা আর বিচারালয়ের অনুষঙ্গ ছাড়া ভাবতেই পারি না। যদিও ভারতীয় দর্শনের উপস্থাপনা-পদ্ধতিতে পূর্বপক্ষ-উত্তরপক্ষ নামক বিন্যাস-প্রতিন্যাস খুব গুরুত্বপূর্ণ। পূর্বপক্ষের প্রত্যুত্তর হিসেবে সুপরিকল্পিত ও প্রণালীবদ্ধ ভাবে নির্মিত হয় উত্তরপক্ষ। অতএব নিশ্ছিদ্র যুক্তি ও পিনদ্ধ বিশ্বাস তার মুখ্য অবলম্বন। কিন্তু এইসঙ্গে এটাও মনে রাখতে হয় যে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের যৌক্তিক উপস্থাপনা হিসেবে পরিকল্পিত পূর্বপক্ষও মূলত মীমাংসা-প্রয়াসীর নির্মিতি। ফলে পূর্বপক্ষের বাচনে পদে-পদে প্রচ্ছন্ন থাকে প্রতিবাচন যা নিরাকৃত হওয়ার জন্যেই উত্থাপিত। কারণ, মীমাংসা-প্রয়াসী নিগূঢ় মনস্তাত্ত্বিক কারণে প্রতিপক্ষের হাতে কখনও তেমন অস্ত্র তুলে দেবে না যাকে প্রতিহত করা অসম্ভব। তার মানে, যাকে ভাবছি পূর্বপক্ষের সওয়াল, তার প্রত্যাখ্যান পূর্ব-নির্ধারিত। দার্শনিক প্রতিবেদন নির্মাণ ও বিনির্মাণের এই পরম্পরায় গঠিত হয়ে থাকে। সাহিত্যিক প্রতিবেদনে বিন্যাস-প্রতিন্যাসের এই ধরন হয়তো প্রকাশ্য নয়। কিন্তু প্রচ্ছন্নভাবে, ইশারায়, ব্যক্ত ও অব্যক্তের ধূসর সীমান্তে প্রশ্নমালার বিস্তার ও সম্ভাব্য মীমাংসার প্রতি আগ্রহ ফুটে ওঠে। আসলে আমাদের জীবন নামক পাঠকৃতিও তাই। পর্যায়ে পর্যায়ে কখনও সোচ্চার আর কখনও নিরুচ্চারভাবে জেগে থাকে জিজ্ঞাসার উত্থাপন আর সম্ভাব্য প্রত্যুত্তরের উন্মোচন।

 মিখায়েল বাখতিন নেভেল শহর থেকে প্রকাশিত ‘The Day of Art’ নামক একটি পত্রিকার সেপ্টেম্বর, ১৯১৯ সংখ্যায় ‘Art and Answerability’ নামে ছোট্ট প্রবন্ধ লিখেছিলেন। চিন্তা-জীবনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে রচিত হলেও নানা কারণে এই প্রবন্ধটি বাখতিন-চিন্তাবিশ্বে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ১৯১৮ থেকে ১৯২৪-এর মধ্যে বাখতিনের চিন্তাজগৎ যখন সংগঠিত হচ্ছিল, বাচন-মূলক সৃষ্টি-প্রকরণ সম্পর্কে নান্দনিক ও দার্শনিক ভাববীজ নানাভাবে অঙ্কুরিত হচ্ছিল। বাচনিক সৃষ্টির অন্তর্বস্তু, উপাদান ও প্রকরণ সম্পর্কিত সমস্যা নিয়ে ভাবছিলেন বাখতিন। ঐসময়কার রচনায় তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। ডস্টয়েভস্কির নন্দন সম্পর্কিত তাঁর বিখ্যাত বইয়ের প্রস্তুতিও চলছিল তখন। নৈতিক দর্শন, বিষয়ীসত্তা, আইন, নন্দনভাবনা: নানা দিকে তাঁর অভিনিবেশ ছিল। ঐ সময়কার যেসব খসড়া উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে, তাদের মধ্যে কোনো তারিখ বা শিরোনাম পাওয়া যায়নি। বাখতিন বিভিন্ন বিষয়ে নানা সময়ে যা-কিছু ভেবেছেন, সেই সব তাঁর চিন্তার প্রধান আকল্পগুলিকে বুঝতে আমাদের সাহায্য করে। এদের বলা যায়, প্রাক্-সন্দর্ভ স্তরের রচনা।

 বাখতিনের চিন্তাবিশ্ব সম্পর্কে যাঁরা বিশেষভাবে অবহিত, তাঁদের কাছে ‘Art and Answerability’ শীর্ষক রচনাটির আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কারণ, এটি তাঁর প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ। এতে ঐক্য-বিষয়ক দুটি ভিন্ন ধারণার বিরোধিতা দিয়ে লেখক তাঁর বয়ান শুরু করেছেন। প্রথম ধরনের ঐক্য হলো যান্ত্রিক; যে-সব অংশ কোনো সমগ্রকে নির্মাণ করে, তাদের পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত করে দেয় পুরোপুরি বহির্বৃত উচ্চারণ। এরা বিচ্ছিন্ন একক ও ভ্রামণিক; স্বয়ংসম্পূর্ণ বলেই অন্য অংশের পক্ষে নিতান্ত পরবাসীর মতাে সুদূর। দ্বিতীয় ধরনের ঐক্যে যান্ত্রিকতা নেই; বিভিন্ন অংশ পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতীতিতে, ধারণার নিরিখে। ব্যক্তি-অস্তিত্বের চিন্তন-প্রক্রিয়ায় যেমন বিবিধ উৎসজাত ভাববীজ সম্পৃক্ত হয়, প্রতিটি অংশ একে অপরের সম্পর্কে সংবেদনশীল এবং মিথষ্ক্রিয়ায় উন্মুখ। বাখতিন লক্ষ করেছেন, শিল্পে অভিব্যক্ত সময় ও পরিসর এমন-এক জগতের ইঙ্গিত দেয় যা বাস্তব অভিজ্ঞতায় প্রতিফলিত সময় ও পরিসর থেকে অনেক স্বতন্ত্র। এই দুইয়ের মধ্যে তিনি বিচ্ছেদ ভেবে নিয়েছেন: ‘When a man is in art, he is not in life and vice versa!’ তাঁর মতে, শিল্প-স্বভাবে এবং মানবব্যক্তিত্বের স্বভাবে কিছুই যথাপ্রাপ্ত নয়; তাই স্বতশ্চল ভাবে এদের মধ্যে তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক নিশ্চিত হয় না। সম্পর্ক গড়ে তুলতে হয়, দিতে হয় আকার ও চরিত্র, নির্দিষ্ট ধারণাভিত্তিক সমর্থন। মন যেহেতু নির্মিতি-নিপুণ কারুকৃৎ, শুধুমাত্র তারই প্রণালীবদ্ধ সক্রিয়তায় সৃষ্টি হয় ঐক্যবােধ। শিল্প ও জীবনের সম্পর্ক রচিত হয় তখনই যখন কোনাে পর্যবেক্ষক মানুষ তা গড়ে তােলে। সম্পর্কের প্রতিষ্ঠা হওয়া সম্ভব যখন ঐ পর্যবেক্ষক উপস্থাপনার মধ্যে খুঁজে পায় প্রত্যুত্তর-সম্ভাবনা। আর, সম্ভাবনা মানে যােগ্যতা, অনবরত যােগ্য হয়ে ওঠা।

 শিল্পের প্রতিবেদন যেন প্রশ্নমালা আর জীবন সেইসব জিজ্ঞাসার সম্ভাব্য প্রত্যুত্তর। শিল্প থেকে যে-অভিজ্ঞতা ও প্রতীতি অর্জন করি, জীবনে তার জবাব দিয়ে যেতে হয়। নইলে জীবন উদ্ভাসিত হবে না। ব্যক্তিগত প্রত্যুত্তর-যােগ্যতার এই নন্দন সামূহিক ভূমিকার চেয়ে স্পষ্টত বেশি গুরুত্ব দেয় একক অস্তিত্বের সংগঠনকে। সেইসঙ্গে শিল্প ও জীবনের সম্পর্ক বিষয়ক চিরাগত ধারণা থেকে অনেক দূরে সরে যায়। নিঃসন্দেহে শিল্প এবং অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের সক্রিয়তা; তবে তাদের মধ্যে অন্তত একটি ক্ষেত্রে সাদৃশ্য রয়েছে। শিল্প-প্রকরণ সৃষ্টি বা জীবন-সৃষ্টির প্রক্রিয়া একে অপরের জটিল অস্তিত্ব উপেক্ষা করে নিজের কাজকে সরলীকৃত করতে চায়: ‘For it is certainly easier to create without answering for life and easier to live without any consideration for art. Art and life are not one, but they must become united in myself in the unity of my answerability’ (১৯৯৫: ২)।

 আমাদের অভিজ্ঞতা থেকেও বুঝি, শিল্প-সাহিত্যের স্রষ্টারা নান্দনিক দায়বােধের নামে জীবন থেকে উত্থাপিত প্রশ্নমালা সম্পর্কে নিরুত্তর থাকাকে গরীয়ান করেন। তেমনি শিল্প-সাহিত্য বিষয়ে পুরােপুরি উদাসীন থেকে জীবন নির্বাহ করাটা অধিকাংশ মানুষের কাছে সহজ ও স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয়। এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানাে খুব গুরুত্বপূর্ণ যে শিল্প ও জীবন এক নয়; কিন্তু গ্রহীতা সত্তার মধ্যে তাদের অন্যোন্য-সম্পৃক্ত হতেই হবে। এ কেবল আকাঙ্ক্ষা নয়, এ হলাে ঔচিত্যের ঘােষণা। গ্রহীতার প্রত্যুত্তর-যােগ্যতা থেকে উৎসারিত ঐক্যবােধে শিল্প ও জীবন প্রকৃত তাৎপর্যপ্রসূ হয়ে ওঠে। জীবন সাবভৌম ও আত্মদীপ, শিল্প-ও তা-ই। কিন্তু তাদের প্রকাশ ও বিচ্ছুরণ, অবস্থান ও প্রতীতির প্রকরণে রয়েছে আপেক্ষিক স্বাতন্ত্র্য।

 মাত্র ছ’টি ছােট-ছােট অনুচ্ছেদে বিন্যস্ত এই বয়ান যেন চিন্তাসূত্র হিসেবে পরিবেশিত হয়েছে। পরবর্তী কালে যে গভীর মনন-ঋদ্ধ প্রতিবেদন রচিত হবে, বাখতিন এখানে যেন বীজাকারে তার মুখ্য ভাববস্তু উপস্থাপিত করেছেন। নিবিড় পাঠে অন্তর্বৃত অনেকান্তিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের কাছে। ‘The Architectonics of Answerabiltiy’ বা প্রত্যুত্তরযােগ্যতার নির্মিতিবিজ্ঞান সংক্রান্ত বহুস্বরিক প্রতিবেদনের উৎস এই ক্ষুদ্র নিবন্ধ। প্রতীচ্যের অধিবিদ্যার তিনটি প্রধান শাখা—জ্ঞানতত্ত্ব, নীতিশাস্ত্র ও নন্দনতত্ত্ব—তখন বাখতিনের চিন্তায় সমন্বিত হয়ে একটি অভিন্ন তাত্ত্বিক আকরণে বিন্যস্ত হতে শুরু করেছিল। শিল্পের অভিজ্ঞতা ও প্রায়ােগিক ক্রিয়াকে কীভাবে অন্যান্য ধরনের অভিজ্ঞতা ও প্রয়ােগের সঙ্গে সম্পর্কিত করা যায়—এ বিষয়ে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণী ভাবনার সূত্রপাত হয়েছিল। সমসাময়িক আরাে কয়েকজন চিন্তাবিদ তখন জীবনে শিল্পের ভূমিকা নির্ণয় করতে চেষ্টা করেছিলেন। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অব্যবহিত পরে বৌদ্ধিক ঘরানাগুলিতে যে বিপুল আলােড়ন ও পুনর্বিবেচনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার সমস্ত অভিঘাত তখনও স্পষ্ট হয়নি। তবে বিভিন্ন চিন্তা-প্রস্থানে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার প্রতিক্রিয়া অস্বীকার করাও সম্ভব হচ্ছিল না। একদিকে পরস্পরের দার্শনিক স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখার রক্ষণশীল প্রয়াস এবং অন্যদিকে রূপান্তর-প্রবণ সময়স্বভাবের সঙ্গে সমঝােতার চেষ্টা: এর ফলে পারস্পরিক পার্থক্য ও অনন্বয়ের বােধ থেকে বিতর্কও তৈরি হচ্ছিল। প্রকরণবাদীদের সঙ্গে সমাজতাত্ত্বিক সমালােচকদের বিরােধ কিংবা ভবিষ্যবাদী ও প্রতীকবাদী কবিদের বিতর্ক সমকালীন বৌদ্ধিক প্রেক্ষিতের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছিল। এই পরিবেশে বাখতিনের চিন্তাজগতে তৈরি হলাে নতুন নতুন বাঁক তৈরির প্রবণতা।