বিবিধ কাব্য/ভারতবৃত্তান্ত




ভারত-বৃত্তান্ত
দ্রৌপদীস্বয়ম্বর

VERSAILLES,
 
9th September, 1863.
 

কেমনে রথীন্দ্র পার্থ স্ববলে লভিলা
পরাভবি রাজবৃন্দে চারুচন্দ্রাননা
কৃষ্ণায়, নবীন ছন্দে সে মহাকাহিনী
কহিবে নবীন কবি বঙ্গবাসী জনে,
বাগ্দেবি! দাসেরে যদি কৃপা কর তুমি।
না জানি ভকতি স্তুতি, না জানি কি ক’রে
আরাধি হে বিশ্বারাধ্যা তোমায়; না জানি
কি ভাবে মনের ভাব নিবেদি ও পদে!
কিন্তু মার প্রাণ কভু নারে কি বুঝিতে
শিশুর মনের সাধ, যদিও না ফুটে
কথা তার? উর তবে, উর মা, আসরে।
আইস মা এ প্রবাসে বঙ্গের সঙ্গীতে
জুড়াই বিরহজ্বালা, বিহঙ্গম যথা
রঙ্গহীন কুপিঞ্জরে কভু কভু ভুলে
কারাগারদুখ সাধি কুঞ্জবনস্বরে।
সত্যবতীসতীসুত, হে গুরু, ভারতে
কবিতা-সুধার সরে বিকচিত চির
কমল দ্বিতীয় তুমি; কৃতাঞ্জলিপুটে
প্রণমে চরণে দাস, দয়া কর দাসে।
হায় নরাধম আমি! ডরি গো পশিতে
যথায় কমলাসনে আসীনা দেউলে
ভারতী; তেঁই হে ডাকি দাঁড়ায়ে দুয়ারে,
আচার্য্য। আইস শীঘ্র দ্বিজোত্তম সূরি।

দাসের বাসনা, ফুলে পুজি জননীরে,
বর চাহি দেহ ব্যাস, এই বর মাগি।
 গভীর সুড়ঙ্গপথে চলিলা নীরবে
পঞ্চ ভাই সঙ্গে সতী ভোজেন্দ্রনন্দিনী
কুন্তী; স্বরচিত-গৃহে মরিল দুর্ম্মতি
পুরোচন; * *   *

দ্রৌপদীস্বয়ম্বর



কেমনে রথীন্দ্র পার্থ পরাভবি রণে
লক্ষ রণসিংহ শূরে পাঞ্চাল নগরে
লভিলা দ্রুপদবালা কৃষ্ণ মহাধনে,
দেবের অসাধ্য কর্ম্ম সাধি দেববরে,—
গাইব সে মহাগীত। এ ভিক্ষা চরণে,
বাগ্দেবি! গাইব মা গো নব মধুস্বরে,
কর দয়া, চিরদাস নমে পদাম্বুজে,
দয়ায় আসরে উর, দেবি শ্বেতভুজে!
  * * *
বিঁধিলা লক্ষ্যেরে পার্থ, আকাশে অপ্সরী
গাইল বিজয়গীত, পুষ্পবৃষ্টি করি
আকাশসম্ভবা দেবী সরস্বতী আসি
কহিলা এ সব কথা কৃষ্ণারে সম্ভাষি।
লো পঞ্চালরাজসুতা কৃষ্ণা গুণবতি,
তব প্রতি সুপ্রসন্ন আজি প্রজাপতি।
এত দিনে ফুটিল গো বিবাহের ফুল।
পেয়েছ সুন্দরি! স্বামী ভুবনে অতুল।

চেন কি উহারে উনি কোন্‌ মহামতি,
কত গুণে গুণবান জানো কি লো সতি?
না চেনো না জানো যদি শুন দিয়া মন,
ছদ্মবেশী উনি ধনি, নহেন ব্রাহ্মণ।
অত্যুচ্চ ভারতবংশশিরে শিরোমণি
কুন্তীর হৃদয়নিধি বিখ্যাত ফাল্গুনি।
ভস্মরাশি মাঝে যথা লুপ্ত হুতাশন
সেইরূপ ক্ষত্রতেজ আছিল গোপন।
আগ্নেয়গিরির গর্ভ করি বিদারণ
যথা বেগে বাহিরয় ভীম হুতাশন,
অথবা ভেদিয়া যথা পূরব গগন
সহসা আকাশে শোভে জ্বলন্ত তপন,
সেইরূপ এত দিনে পাইয়া সময়,
লুপ্ত ক্ষত্রতেজ বহ্নি হইল উদয়।



মৎস্যগন্ধা

চেয়ে দেখ, মোর পানে, কলকল্লোলিনি
যমুনে! দেখিয়া, কহ, শুনি তব মুখে,
বিধুমুখি, আছে কি গো অখিল জগতে,
দুঃখিনী দাসীর সম? কেন যে সৃজিলা,—
কি হেতু বিধাতা, মোরে, বুঝিব কেমনে?
তরুণ যৌবন মোর! না পারি লড়িতে
পোড়া নিতম্বের ভরে। কবরীবন্ধন
খুলি যদি, পোড়া চুল পড়ে ভূমিতলে।
কিন্তু, কে চাহিয়া কবে দেখে মোর পানে?

না বসে গুঞ্জরি সখি, শিলীমুখ যথা
শ্বেতাম্বরা ধুতুরার নীরস অধরে,
হেরি অভাগীরে দূরে ফিরে অধোমুখে
যুবকুল; কাদি আমি বসি লো বিরলে!