বিবিধ কাব্য/সুভদ্রা-হরণ

সুভদ্রা-হরণ
প্রথম সর্গ

কেমনে ফাল্গুনি শূর স্বগুণে লভিলা
(পরাভবি যদু-বৃন্দে) চারু-চন্দ্রাননা
ভদ্রায়;—নবীন ছন্দে সে মহাকাহিনী
কহিবে নবীন কবি বঙ্গবাসি-জনে,
বাগ্দেবি, দাসেরে যদি কৃপা কর তুমি।
না জানি ভকতি, স্তুতি; না জানি কি কয়ে,
আরাধি, হে বিশ্বারাধ্যে, তোমায়; না জানি
কি ভাবে মনের ভাব নিবেদি ও পদে!
কিন্তু মার প্রাণ কভু নারে কি বুঝিতে
শিশুর মনের সাধ, যদিও না ফুটে
কথা তার? কৃপা করি উর গো আসরে।
আইস, মা, এ প্রবাসে, বঙ্গের সঙ্গীতে
জুড়াই বিরহ-জ্বালা, বিহঙ্গম যথা,
কারাবদ্ধ পিঁজিরায়, কভু কভু ভুলে
কারাগার-দুখ, স্মরি নিকুঞ্জের স্বরে!
ইন্দ্রপ্রস্থে পঞ্চ ভাই পাঞ্চালীরে লয়ে
কৌতুকে করিলা বাস। আদরে ইন্দিরা
(জগত-আনন্দময়ী) নব-রাজ-পুরে

উরিলা; লাগিল নিত্য বাড়িতে চৌদিকে
রাজ-শ্রী, শ্রীবরদার পদের প্রসাদে!—
এ মঙ্গলবার্ত্তা শুনি নারদের মুখে
শচী, বরাঙ্গনা দেবী, বৈজয়ন্ত-ধামে
রুষিলা। জ্বলিল পুনঃ পূর্ব্বকথা স্মরি,
দাবানল-রূপ রোষ হিয়া-রূপ বনে,
দগধি পরাণ তাপে! “হা ধিক্‌!”—ভাবিলা
বিরলে মানিনী মনে—“ধিক্ রে আমারে!
আর কি মানিবে কেহ এ তিন ভুবনে
অভাগিনী ইন্দ্রাণীরে? কেন তাকে দিলি
অনন্ত-যৌবন-কান্তি, তুই, পোড়া বিধি?
হায়, কারে কব দুখ? মোরে অপমানি,
ভোজ-রাজ-বালা কুন্তী—কুল-কলঙ্কিনী,—
পাপীয়সী—তার মান বাড়ান কুলিশী?
যৌবন-কুহকে, ধিক্‌, যে ব্যভিচারিণী
মজাইল দেব-রাজে, মোরে লাজ দিয়া।
অর্জ্জুন-জারজ তার—নাহি কি শকতি
আমার—ইন্দ্রাণী আমি—মারি সে অর্জ্জুনে,
এ পোড়া চখের বালি?—দুর্য্যোধনে দিয়া
গড়াইনু জতুগৃহ; সে ফাঁদ এড়ায়ে
লক্ষ্য বিঁধি, লক্ষ রাজে বিমুখি সমরে
পাঞ্চালীরে মন্দমতি লভিল পঞ্চালে।
অহিত সাধিতে, দেখ, হতাশ হইনু
আমি, ভাগ্য-গুণে তার!—কি ভাগ্য? কে জানে
কোন্‌ দেবতার বলে বলী ও ফাল্গুনি?
বুঝি বা সহায় তার আপনি গোপনে
দেবেন্দ্র? হে ধর্ম্ম, তুমি পার কি সহিতে

এ আচার চরাচরে? কি বিচার তব!
উপপত্নী কুন্তীর জারজ পুত্র প্রতি
এত যত্ন? কারে কব এ দুখের কথা—
কার বা শরণ, হায়, লব এ বিপদে?”
কঙ্কণ-মণ্ডিত বাহু হানিলা ললাটে
ললনা! দুকূল সাড়ী তিঁতি গলগলে
বহিল আঁখির জল, শিশির যেমতি
হিমকালে পড়ি আর্দ্রে কমলের দলে!
“যাইব কলির কাছে” আবার ভাবিলা
মানিনী—“কুটিল কলি খ্যাত ত্রিভুবনে,—
এ পোড়া মনের দুঃখ কব তার কাছে,
এ পোড়া মনের দুখ সে যদি না পারে
জুড়াতে কৌশল করি, কে আর জুড়াবে?
যায় যদি মান, যাক্‌। আর কি তা আছে?”

ইত্যাদি।