বিবিধ প্রবন্ধ (চিত্তরঞ্জন দাশ)/বাঙ্গালীর বঙ্কিমচন্দ্র

বাঙ্গালীর বঙ্কিমচন্দ্র

আপনারা অনেকে হয় ত জানন অথবা শুনিয়াছেন যে, আমি বাঙ্গলার ও বাঙ্গালী সভাতার পক্ষপাতী বলিয়া সাহিত্যে আমার একটা দুৰ্ণাম আছে। এজন্য অনেক সাহিত্যরথী আমার মধ্যে বিশ্বাত্মবোধের একান্ত অভাব। নিরীক্ষণ করিয়া অতিশয় ক্ষুঃ হইয়াছেন এবং উত্মার সহিত সে কথা তাহারা। ভাষায় ব্যক্ত করিতে কুষ্টিত হন নাই। আমি সেজন্য লজ্জিত নই। এমন কি আজ বাজলার যুগ-সাহিত্যের একজন শ্রষ্টী, নেতা ও ত্রাতার স্বতি-শেখরের দিকে উেকরজোড়ে তাকাইয়া বাঙ্গালীকে আবার আমি বলিতে সাহস করিতেছি যে, ভাই বাঙ্গালী,-তুমি তোমার বাগলাকে ভুলিও না। বঙ্কিমচন্দ্র বাঙ্গালীকে বাঙ্গালী হইতে বলিয়া গিয়াছেন। যদি তুমি বাঙ্গাকে ভুল, বাঙ্গলার অতীতের ইতিহাস খুজিয়া না দেখালোর শৈব, শাক্ত, বৈষ্ণব ধর্মের মর্ম না বুব, বাঙ্গলার ্যায়, গর্শন, বাংলার স্মৃতি, বাললার তত্ত্ব ও দীক্ষাপ্রণালীবাদলার সমাজবিন্যাস, বাললার সাহিত্য-ঐক কথায় বাংলার সভ্যতাকে প্রাণপাত করিয়া বুৰিবার বিবিধ প্ৰবন্ধ ১৫৭ চেষ্টা না কর, তবে তুমি বাঙ্গালী হইলেও বঙ্কিম-নৃতিকে অপমান করিবার জন্ট এ সভায় উপস্থিত থাকিও না। মনে রাখিও—"বন্দেমাতরম’ বাঙ্গলার গান, ভারতবর্ষের নহে। বাংলার আধুনিক উপন্যাস-সমূদ্র ঘদি কেহ মন্থন করিতে চান, তবে দেখিবেন রিরিংসার বিয়ে,—এবং তাহাও স্বামি বলি ফেরজ-রিরিংসা,~বাঙ্গলার তরুণ-তরুণী আকণ্ঠ নিমজমান। আমন্দমঠসীতারাম, দেবী চৌধুরাণী বাঙ্গালীর বৈশিষ্ট্যে পরিপূর্ণ,~ভারতের অন্য কোন প্রদেশের নামগন্ধ ইহাতে নাই। ইহাতে। Comte-এর Positivism থাকিতে পারে, Europeএর ছদ্ধর্ষ Nation-idea থাকিতে পারে, Middle age-এর সন্ন্যাস থাকিতে পারে—পারিপার্ষিক অবস্থা চিত্রণে। অসঙ্গতি থাকিতে পারে, বিলাতী Romanticism থাকিতে পারে, আর্টের মাপ কাঠিতে একটা উদ্দেশ্য লইয়া উপন্যাস রচনার অপরিহার্য ত্রুটি থাকিতে পারে,পারে কি, হয় ত আছে। কিন্তু তথাপি ইহাতে বাঙ্গালী আছে,—এমন বাঙ্গালী আছে যে অসুশীলন করিলে প্রাদেশিক আদর্শে এমন কি ভারতীয় আদর্শে কাহারও নিকট মাথা নত না করিয়া সে ধাড়াইতে পারে। আমি আবার বলি বঙ্কিমচন্দ্র বাঙ্গালীকে বাঙ্গালী হইতে বলিয়াছেন— অ্য কিছু হইতে বলেন নাই। রবীন্দ্রনাথ ( যদিও এই সভার সভাপতিত্বের সম্মান প্তাহার জীবিতকালে একমাত্র তাহারই প্রাপ্য এবং মৰ্ম্মান্তিক দুঃখের বিষয় যে সম্প্রতি কোনমতেই তাহার নাগাল আমরা পাইতেছি না) একস্থানে লিখিয়াছেন “আধুনিক বাঙ্গলা সাহিত্যে বাঙ্গালা দেশের বা বাঙ্গালীর বিশেষ পরিচয় পাওয়া যায় না। আজকাল কেবল ম্যাপেই বাংলা দেশ আছে। যদি কখনও বাঙ্গলা দেশের অস্তিত্ব লুপ্ত হয়, তাহা হইলে তখন বাঙ্গলা সাহিত্য পড়িয়া এরূপ প্রশ্ন উঠিতে পারে যে, বাঙ্গলা এমন একটা দেশের সাহিত্য, যে দেশ কোনও কালে বর্তমান ছিল না।” আমি আপনাদের নিকট নিবেদন করিতে চাই যে, বঙ্কিম সাহিত্য এইরূপ বক্ষ্যমান আধুনিক বাংলা সাহিত্য নয়। ইহা এমন একটা সাহিত্য যে বঙ্গদেশ লুপ্ত হইলেও এই সাহিত্য পড়িয়া জ্ঞানীরা নিশ্চিত বুঝিতে পারিবেন যে হ্যা, বাগলা নামে একটা দেশ ছিল। বঙ্কিমসাহিত্যের ইহাই গৌরব-ইহাই মস্ত, বিশেষত্ব। সাহিত্যক্ষেত্রে=বিশেষতঃ ব্যক্তিগত মত ও সিদ্ধান্তে বঙ্কিম ও গিরিশচত্রে যতই পার্থক্য থাকুক—দ্ধিম:ও গিরিশযুগের মধ্যে একটা সেতু নির্মাণ বড়ই ৮ দেশবন্ধু রচনাসমগ্র প্রয়োগন হইয়া পড়িয়াছে। কারণ প্রতিভার বরপুত্র এই দুই মহাকবিই Europeএর দ্বারা অয়ুপ্রাণিত হইয়াও সাহিত্যের দুইটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায় একই সময়ে দণ্ডায়মান হইয়া সব্যসাচীর মত বাঙ্গালীর যুগসাহিত্য সৃষ্টি করিয়া গিয়াছেন। ইহার উভয়ের সম্রষ্টা ও কবি। বাঙ্গলা—এমন কি জগতের সাহিত্যের ইতিহাসেও ইহার উভয়ে অত্যন্ত উচ্চস্তরের কবি। ইহার স্থবিধা মত পাশ্চাত্যকে হুবহু নকল করেন নাই; যেমন ইহাদের পরবর্তী উপন্যাসিক ও নাটক-রচয়িতাগণ করিয়াছেন ও করিতেছেন এবং মহাঃখের বিষয় যে তাহা। করিয়াও তাহারা বাহব। পাইতেছেন। বাগল Europe নহে। বাঙ্গালীর সাহিত্য কেবল Europeএর সাহিত্যের প্রতিধবনি হইতে পারে না। বাঙ্গলা সাহিত্যের এ রকম দুর্ভাগ্য আমি কল্পনাও করিতে পারি না। বাঙ্গলা তাহার সুরে ও রাপে ফুটিয়া উঠিবে। সেই প্রস্টিত, পূর্ণ বিকশিত বাঙ্গলা সাহিত্যের গন্ধে বাঙ্গালী ও জগৎ ভরপুর হইবে। যদি তা না হয়, যদি বাঙ্গলার নিজস্ব বলিয়া কিছু না থাকে, তবে—বাগলা সাহিত্য লুপ্ত হইলেই বা ক্ষতি কি? ভাই বাঙ্গালী, বঙ্কিমচন্দ্র কি সত্যই অরণ্যে রোধন করিয়া গিয়াছেন? বঙ্কিম-সাহিত্য বাঙ্গালীর জাতীয়জীবন গঠন করিয়াছে। যতই অপপ্রয়োগ হউক,—স্বদেশী যুগে। বঙ্কিম-সাহিত্য বাগলার। তাহাই করিয়াছে যাহা ফরাসীর পেশে voltaire ও Rousseau সাহিত্য করিয়াছিল। বঙ্কিমচন্দ্র ‘বাঙ্গালীর ম্য’ সম্পর্কে বড় অপেক্ষা করিয়া গিয়াছেন। যে মাসুদ নয়, সে বাঙ্গালী হইবে কি করিয়া? ১২ •৩ সাল হইতে বঙ্কিমচন্দ্র দিবস গণনা করিয়া গিয়াছেন। দিবস মাস হইয়াছে,9মাস বৎসর হইয়াছে,~বৎসর শতাবীও ফিরিয়া ফিরিয়া সাত বার তিমি গণিয়াছেন। কিন্ধ যাহা তিনি চাহিয়াছিলেন তাহ৷ তাঁহার মিলে নাই। “মহুয়াং মিলিল কই? এক জাতীয়ত্ব মিলিল কই? ঐক্য কই? বিগা কই? গৌরব কই? শ্ৰীহৰ্ষ কই? ভট্টনারায়ণ কই? হলায়ুধ কই? লক্ষ্মণসেন কই? আর কি মিলিবে না? হায়। সবারই ইন্দিত যিলে, কমলাকান্তের মিলিবে না৷?” এখন আপনারা বুরূন বঙ্কিমচন্দ্র কি চাহিয়া গিয়াছেন এবং আমাদের কি পাইতে হইবে। তিনি আমাদিগকে কেবল ‘ধ্যান ধ্যান' করিতে নিষেধ করিয়াছেন-~মামাদের "মধু সংগ্রহ’ করিতে বলিরাছেন—এবং আবশ্যকমত “স্থল’ ফুটাইতেও বলিয়াছেন। দেশ ও জগতের জয় জয়-বস্ত্রের সংস্থান আমাদিগকে করিতেই হইবে এবং প্রয়োজনবোধে হলও স্টাইতে হইবে।