প্রধান মেনু খুলুন


ত্ৰিলাসনী পাকা দুই ক্রোশ পথ হাটিয়া স্কুলে বিদ্যা অর্জন করিতে যাই । আমি এক নই—দশবারোজন। যাহাদেরই বাটী পল্লীগ্রামে, তাহাদেরই ছেলেদের শতকরা আশি জনকে এমনি করিয়া বিদ্যালাভ করিতে হয় । ইহাতে লাভের অঙ্কে শেষ পর্য্যস্ত একেবারে শূন্ত না পড়িলেও, যাহা পড়ে তাহাতে হিসাব করিবার পক্ষে এই কয়টা কথা চিত্ত৷ করিয়া দেখিলেই যথেষ্ট হইবে যে, যে ছেলেদের সকাল আটটার মধ্যে বাহির হইয়া যাতায়াতে চার-ক্রোশ পথ ভাঙিতে হয়—চার-ক্রোশ মানে অটি মাইল নয়, ঢের বেশী —বধার দিনে মাথার উপর মেঘের জল ও পায়ের নীচে এক-হাটু কাদা এবং গ্রীষ্মের দিনে জলের বদলে কড়া স্বৰ্য্য এবং কাদার বদলে ধূলার সাগর সাতার দিয়া স্থল-ঘর করিতে হয়, সেই দুর্ভাগ্য বালকদের মা-সরস্বতী খুণী হইয়া বর দিবেন কি, তাহাদের যন্ত্রণ দেখিয়া কোথায় যে তিনি মুখ লুকাইবেন, ভাবিয়া পান না। তারপরে এই কৃতবিদ্য শিশুর দল বড় হইয়া একদিন গ্রামেই বসুন, অীর ক্ষুধার জ্বালায় অন্যত্রই যান—তাদের চার ক্রোশ-হাটা বিদ্যার তেজ আত্নপ্রকাশ করিবেই করিবে । কেহ কেহ বলেন শুনিয়াছি, আচ্ছ, যাদের ক্ষুধার জালা, তাদের কথা না হয় নাই ধরিলাম, কিন্তু র্যাদের সে জালা নাই, তেমন সব ভদ্রলোকেই বা কি সুখে গ্রাম ছাড়িয়া পলায়ন করেন ? তারা বাস করিতে থাকিলে ত পঞ্জীর এত দুর্দশা হয় না । ম্যালেরিয়ার কথাটা না হয় নাই পাড়িলাম। সে থাক, কিন্তু ঐ চার-ক্রোশ স্থাটার জালায় কত ভদ্রলোকেই যে ছেলে-পুলে লইয়া গ্রাম ছাড়িয়া সহরে পালান তাহার আর সংখ্যা নাই। তারপরে একদিন ছেলে-পুলের পড়াও শেষ হয় বটে, তখন কিন্তু সহরের স্থখ-সুবিধা রুচি লইয়া আর তাদের গ্রামে ফিরিয়া আসা চলে না। কিন্তু থাক এ-সকল বাজে কথা। ইস্কুলে যাই—দু'ক্রোশের মধ্যে এমন আরও ত ছ-তিনখানা গ্রাম পার হইতে হয়। কার বাগানে আম পাকিতে শুরু করিয়াছে, কোন বনে বঁইচি ফল অপৰ্য্যাপ্ত ফলিয়াছে, কার গাছে কাটাল এই পাকিল বলিয়া,

  • জনৈক পল্লী-বালকের ডায়েী হইতে নকল। তাহার আসল নামটা কাহারও श्रानिषाब्र यtबांजन नाहे, निरवक्षe जाटश् । छांकनायन्नै न ह्ब्र शृङ्गन छांछ ।

ቘ¢¢ শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ কায় মৰ্ত্তমান রপ্তার কঁাদি কাটিয়া লইবার অপেক্ষা মাত্র, কার কানাচে ঝোপের মধ্যে জানারসের গায়ে রঙ ধরিয়াছে, কার পুকুর-পাড়ের খেজুর-মেতি কাটিয়া খাইলে ধর পড়িবার সম্ভাবনা আল্প, এই সব খবর লইতেই সময় যায়, কিন্তু আসল যা বিভা— কামস্কটুকার রাজধানীর নাম কি, এবং সাইবেরিয়ার খনির মধ্যে রূপা মেলে, না সোনা মেলে—এ সকল দরকারি তথ্য অবগত হইবার ফুরসংই মেলে না। কাজেই এক্জামিনের সময় এডেন কি জিজ্ঞাসা করিলে বলি, পারসিয়ার বন্দর, আর হুমায়ুনের বাপের নাম জানিতে চাহিলে লিখিয়া দিয়া আসি তোগলক খা— এবং আজ চল্লিশের কোঠা পার হইয়াও দেখি, ও-সকল বিষয়ে ধারণা প্রায় এক রকমই আছে—তার পরে প্রোমোশনের দিন মুখ ভার করিয়া বাড়ি ফিরিয়া আসিয়া কখনো বা দল বঁrধিয়া মতলব করি, মাস্টারকে ঠ্যাঙানো উচিত, কখনো বা ঠিক করি, আমন বিশ্রী স্কুল ছাড়িয়া দেওয়াই কৰ্ত্তব্য । আমাদের গ্রামে একটি ছেলের সঙ্গে মাঝে মাঝে ইস্কুলের পথে দেখা হইত। তার নাম ছিল মৃত্যুঞ্জয় । আমাদের চেয়ে সে অনেক বড়। থার্ড ক্লাসে পড়িত। কবে যে সে প্রথম থার্ড ক্লাসে উঠিয়াছিল, এ খবর আমরা কেহই জানিতাম না—সম্ভবতঃ তাহ প্রত্নতাত্ত্বিকের গবেষণার বিষয়—আমরা কিন্তু তাহার থার্ড ক্লাসটাই চিরদিন দেখিয়া আসিয়াছি। তাহার ফোর্থ ক্লাসে পড়ার ইতিহাসও কখনো শুনি নাই, সেকেও ক্লাসে উঠিবার খবরও কখনো পাই নাই । মৃত্যুঞ্জয়ের বাপ-মা ভাই-বোন কেহই ছিল না, ছিল শুধু গ্রামের একপ্রাস্তে একটা প্রকাও আম-কঁঠালের বাগান, আর তার মধ্যে একটা প্রকাগু পোড়ো-বাড়ি, আর ছিল এক জ্ঞাতি খুড়া। খুড়ার কাজ ছিল ভাইপোয় নানাবিধ দুর্নাম রটনা করা—সে গাজা খায়, সে গুলি খায়, এমনি আরও কত কি ! র্তার আর একটা কাজ ছিল বলিয়া বেড়ানো, ঐ বাগানের অৰ্দ্ধেকটা তার নিজের অংশ; নালিশ করিয়া দখল করার অপেক্ষা মাত্র । অবশু দখল একদিন তিনি পাইয়াছিলেন বটে, কিন্তু সে জেলা-আদালতে নালিশ করিয়া নয় -উপরের আদালতের হুকুমে" কিন্তু সে-কথা পরে হইবে । - মৃত্যুঞ্জয় নিজে রান্না করিয়া খাইত এবং আমের দিনে ঐ আম-বাগানটা জমা দিয়াই তাহার সারা বৎসরের খাওয়া-পরা চলিত এবং ভাল করিয়াই চলিত। বেদিন দেখা হইয়াছে, সেই দিনই দেখিয়াছি, ছেড়া-খোড়া মলিন বইগুলি বগলে করিয়া পথের ধার দিয়া নীরবে চলিয়াছে। তাহাকে কখনো কাহারও সহিত যাচিয়া । जाणांन कब्रिटउ cमथेि माझे-वद्रक्ष् छे°शांछक श्ध कथा कहिउiय श्रांशद्राशे । उiशांद्र ●यं५ॉन कांद्र१ हिल ७हे ८ष, cनाकारनई श्रावांद्र किनिद्रां थींeहाँ३८७ यtrयह षट्षा

  • “ २१७ বিলাসী

তাহার জোড়া ছিল না। আর শুধু ছেলেরাই নয়। কত ছেলের বাপ কতবার যে গোপনে ছেলেকে দিয়া তাহার কাছে স্কুলের মাহিনী হারাইয়া গেছে, বই চুরি গেছে, ইত্যাদি বলিয়া টাকা আদায় করিয়া লইত, তাহ বলিতে পারি না। কিন্তু ঋণ স্বীকার করা ত দূরের কথা, ছেলে তাহার সহিত একটা কথা কহিয়াছে এ-কথাও কোন বাপ ভদ্র-সমাজে কবুল করিতে চাহিত না—গ্রামের মধ্যে মৃত্যুঞ্জয়ের ছিল এমনি স্বনাম । অনেকদিন মৃত্যুঞ্জয়ের দেখা নাই। একদিন শোনা গেল, সে মর-মর। আর এক দিন শোনা গেল, মালপাড়ায় এক বুড় মাল তাহার চিকিৎসা করিয়া এবং তাহার মেয়ে বিলাসী সেবা করিয়া মৃত্যুঞ্জয়কে যমের মুখ হইতে এ-যাত্র ফিরাইয়া আনিয়াছে। অনেকদিন তাহার অনেক মিষ্টাল্পের সদ্ব্যয় করিয়াছি—মনটা কেমন করিতে লাগিল, একদিন সন্ধ্যার অন্ধকারে লুকাইয় তাহাকে দেখিতে গেলাম। তাহার পোড়েবাড়িতে প্রাচীরের বালাই নাই। স্বচ্ছন্দে ভিতরে ঢুকিয়া দেখি, ঘরের দরজা খোলা, বেশ উজ্জল একটা প্রদীপ জলিতেছে, আর ঠিক স্বমুখেই তক্তাপোষের উপর পরিষ্কার ধপধপে বিছানায় মৃত্যুঞ্জয় শুইয়া আছে, তাহার কঙ্কালসার দেহের প্রতি চাহিলেই বুঝা যায়, বাস্তবিকই যমরাজ চেষ্টার ক্রটি কিছু করেন নাই, তবে যে শের পর্য্যস্ত স্ববিধ করিয়া উঠিতে পারেন নাই, সে কেবল ওই মেয়েটির জোরে । সে শিয়রে বসিয়া পাখার বাতাস করিতেছিল, অকস্মাং মাকুম দেখিয়া চমকিয়া উঠিয় দাড়াইল। এই সেই বুড়া সাপুড়ের মেয়ে বিলাসী । তাহার বয়স আঠারো কি আটাশ ঠাহর করিতে পারিলাম না। কিন্তু মুখের প্রতি চাহিবামাত্র টের পাইলাম, বয়স যাই হোক, খাটিয়া খাটিয়া আর রাত জাগিয়া জাগিয়া ইহার শরীরে আর কিছু নাই। ঠিক যেন ফুলদানীতে জল দিয়া ভিজাইয়া রাখা বাসি ফুলের মত। হাত দিয়া এতটুকু স্পর্শ করিলে, এতটুকু নাড়াচাড়া করিতে গেলেই ঝরিয়া পড়িবে। মৃত্যুঞ্জয় আমাকে চিনিতে পারিয়া বলিল, কে, তাড়া ? বলিলাম, হু । মৃত্যুঞ্জয় কহিল, ব’সো । মেয়েট ঘাড় হেঁট করিয়া দাড়াইয়া রহিল। মৃত্যুঞ্জয় দুই-চারিটা কথায় যাহা কহিল, তাহার মৰ্ম্ম এই যে, প্রায় দেড় মাস্ হইতে চলিল সে শয্যাগত। মধ্যে দশ-পনেরো দিন সে অজ্ঞান অচৈতন্য অবস্থায় পড়িয়াছিল, এই কয়েকদিন হইল সে লোক চিনিতে পারিতেছে এবং যদিচ এখনো সে বিছানা ছাড়িয়া উঠিতে পারে না, কিন্তু আর ভয় । *नांई. at 3 ‘. . "M-ow শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰন্থ ভয় নাই থাকুক। কিন্তু ছেলেমাছৰ হইলেও এটা বুঝিলাম, আজও যাহার শষ্য ত্যাগ করিয়া উঠিবায় ক্ষমতা হয় নাই, সেই রোগীকে এই বনের মধ্যে একাকী ৰে মেয়েটি বাচাইয়া তুলিবার ভার লইয়াছিল, সে কতবড় গুরুভায় ! দিনের পর দিন রান্ত্রির পর রাত্রি তাহার কত সেবা, কত শুশ্রষা, কত ধৈর্য্য, কত রাত-জাগা ! সে কত বড় সাহসের কাজ ! কিন্তু যে বস্তুটি এই অসাধ্য-সাধন করিয়া তুলিয়াছিল তাহার পরিচয় যদিচ লেদিন পাই নাই, কিন্তু আর একদিন পাইয়াছিলাম । কিরিবার সময় মেয়েটি আর একটি প্রদীপ লইয়া আমার আগে আগে ভাঙা প্রাচীরের শেষ পর্য্যন্ত আসিল । এতক্ষণ পৰ্য্যস্ত সে একটি কথাও কহে নাই, এইবার আস্তে আস্তে বলিল, রাস্ত পর্যন্ত তোমায় রেখে আসব কি ? বড় বড় আমগাছে সমস্ত বাগানটা যেন একটা জমাট অন্ধকারের মত বোধ হইতে ছিল, পথ দেখা ত দূরের কথা, নিজের হাতটা পৰ্য্যন্ত দেখা যায় না। বলিলাম, পৌছে দিতে হবে না, শুধু আলোটা দাও। সে প্রদীপটা আমার হাতে দিতেই তাহার উৎকণ্ঠিত মুখের চেহারাটা আমার চোখে পড়িল। আস্তে আস্তে সে বলিল, একলা যেতে ভয় করবে না ত ? একটু এগিয়ে দিয়ে জাসব ? মেয়েমানুষ জিজ্ঞাসা করে, ভয় করবে না ত! স্বতরাং মনে যাই থাকৃ, প্রত্যুত্তরে শুধু একটা কথা না বলিয়াই অগ্রসর হইয়া গেলাম। সে পুনরায় কহিল, ঘন-জঙ্গলের পথ, একটু দেখে দেখে পা ফেলে যেয়ে । সৰ্ব্বাঙ্গে কাটা দিয়া উঠিল, কিন্তু এতক্ষণে বুঝিলাম উদ্বেগটা তাহার কিসের জন্ত এবং কেন সে আলো দেখাইয়া এই বনের পথটা পার করিয়া দিতে চাহিতেছিল । হয়ত সে নিষেধ শুনিত না, সঙ্গেই যাইত, কিন্তু পীড়িত মৃত্যুঞ্জয়কে একাকী ফেলিয়া যাইতে বোধ করি তাহার শেষ পর্য্যন্ত মন সরিল না । কুড়ি-পচিশ বিঘার বাগান। সুতরাং পথটা কম নয় ! এই দারুণ অন্ধকারের মধ্যে প্রত্যেক পদক্ষেপই বোধ করি ভয়ে ভয়ে করিতে হইত, কিন্তু পরক্ষণেই মেয়েটির কথাতেই সমস্ত মন এমনি আচ্ছন্ন হইয়া রহিল যে, ভয় পাইবার তার সময় পাইলাম না। কেবল মনে হইতে লাগিল, একটা মৃতকল্প রোগী লইয়া থাকা কত কঠিন। মৃত্যুঞ্জয় ত যে কোন মুহূর্তেই মরিতে পারিত, তখন সমস্ত রাত্রি এই বনের মধ্যেমেয়েটি একাকী কি করিত ! কেমন করিয়া তাহার সে রাতটা কাটিত ৷ এই প্রসঙ্গের অনেকদিম পরের একটা কথা আমার মনে পড়ে। এক আত্মীয়ের মৃত্যুকালে আমি উপস্থিত ছিলাম। অন্ধকার রাজি-বাটীতে ছেলে-পুলে ঢাকা Rey বিলাসী ৰাক্ষর নাই, ঘরের মধ্যে শুধু তার সন্ত-বিধবা স্ত্রী, আর আমি । তার স্ত্রী ত শোকের আবেগে দাপ-দাপি করিয়া এমন কাও করিয়া তুলিলেন যে, ভয় হইল তাহারও প্রাণটা বুঝি বাহির হইয়া যায় বা । কাদিয়া কাদিয়া বার বার আমাকে প্রশ্ন করিতে লাগিলেন, তিনি স্বেচ্ছায় যখন সহমরণে যাইতে চাহিতেছেন, তখন সরকারের কি ? র্তায় যে আর তিলাৰ্ধ বাচিতে সাধ নাই, এ কি তাহারা বুঝিবে না ? তাহাদের ঘরে কি স্ত্রী নাই ? তাহারা কি পাষাণ ? আর এই রাত্রেই গ্রামের পাচজনে যদি নদীর তীরের কোন একটা জঙ্গলের মধ্যে তার সহমরণের যোগাড় করিয়া দেয় ত পুলিশের লোক জানিবে কি করিয়া ? এমন কত কি ! কিন্তু আমার ত আর বসিয়া বসিয়া র্তার কারা শুনিলেই চলে না। পাড়ায় খবর দেওয়া চাই—অনেক জিনিস যোগাড় করা চাই। কিন্তু আমার বাহিরে যাইবার প্রস্তাব শুনিয়াই তিনি প্রকৃতিস্থ হইয়া উঠিলেন। চোখ মুছিয়া বলিলেন, ভাই, যা হবার সে ত হয়েচে, আর বাইরে গিয়ে কি হবে ? রাতটা কাটুক না । 今 বলিলাম, অনেক কাজ, না গেলেই যে নয় । তিনি বলিলেন, হোক কাজ, তুমি বসে। বলিলাম, বসলে চলবে না, একবার খবর দিতেই হবে, বলিয়া পা বাড়াইবামাত্রই তিনি চীংকার করিয়া উঠিলেন, ওরে বাপ রে ! আমি একলা থাকতে পারব না। কাজেই আবার বসিয়া পড়িতে হইল। কারণ তখন বুঝিলাম, যে-স্বামী জ্যাস্ত থাকিতে তিনি নিৰ্ভয়ে পচিশ বৎসর একাকী ঘর করিয়াছিলেন, তার মৃত্যুটা যদি বা সহে, তার মৃতদেহটা এই অন্ধকার রাত্রে পাঁচ মিনিটের জন্যও সহিবে না। বুক যদি কিছুতে ফাটে ত সে এই মৃত স্বামীর কাছে একলা থাকিলে । কিন্তু দুঃখটা তাহার তুচ্ছ করিয়া দেখানও আমার উদ্বেগু নহে। কিংবা তাহ খাটি নয় এ-কথা বলাও আমার অভিপ্রায় নহে। কিংবা একজনের ব্যবহারেই তাহার চূড়ান্ত মীমাংসা হইয়া গেল তাহাও নহে। কিন্তু এমন আরও অনেক ঘটনা জানি, যাহার নাম উল্লেখ না করিয়াও আমি এই কথা বলিতে চাই যে, শুধু কর্তব্য-জানের জোরে অথবা বহুকাল ধরিয়া একসঙ্গে ঘর-করার অধিকারেই এই ভয়টাকে কোন মেয়েমানুষই অতিক্রম করিতে পারে না। ইহা আর একটা শক্তি, যাহা বহু স্বামী-স্ত্রী একশ বৎসর একত্রে ঘর-করার পরেও হয়ত তাহার কোন সন্ধান *ांच्च मां । কিন্তু সহসা সেই শক্তির পরিচয় যখন কোন নর-নারীর কাছে পাওয়া যায়, তখন সমাজের জালালতে আসামী করিয়া তাহাদের ও দেওয়া আৰপ্তক যদি হয় তহোক, Εξ ο শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ কিন্তু মামুষের যে বস্তুটি সামাজিক নয়, সে নিজে যে ইহাদের দুঃখে গোপনে অঙ্গ বিসর্জন না করিয়া কোন মতে থাকিতে পারে না। প্রায় মাস-দুই মৃত্যুঞ্জন্ধের খবর লই নাই। র্যাহারা পল্লীগ্রাম দেখেন নাই, কিংবা ওই রেলগাড়ির জানালায় মুখ বাড়াইয়া দেখিয়াছেন, তাহারা হয়ত সবিস্ময়ে বলিয়া উঠিলেন, এ কেমন কথা ! এ কি কখনও সম্ভব হইতে পারে যে, অত-ৰডু অসুখটা চোখে দেখিয়া আসিয়াও মাস-দুই আর তার কোন খবরই নাই ! তাহাদের অবগতির জন্য বলা আবশ্বক যে, এ শুধু সম্ভব নয়, এটা হইয়া থাকে। একজনের বিপদে পাড়াস্বদ্ধ ঝণক বাধিয়া উপুড় হইয়া পড়ে, এই যে একটা জনশ্রুতি আছে, জানি না তাহা সত্যযুগের পল্লীগ্রামে ছিল কি না, কিন্তু একালে ত কোথাও দেখিয়াছি বলির মনে করিতে পারি না। তবে তাহার মরার খবর যখন পাওয়া যায় নাই, তখন সে যে বঁাচিয়া আছে এ ঠিক । এমনি সময়ে হঠাৎ একদিন কানে গেল, মৃত্যুঞ্জয়ের সেই বাগানের অংশীদার খুড়া তোলপাড় করিয়া বেড়াইতেছেন যে, গেল গেল, গ্রামটা এবার রসাতলে গেল ! নালতের মিত্তির বলিয়া সমাজে আর তার মুখ বাহির করিবার জো রহিল না— অকালকুষ্মাওটা একটা সাপুড়ের মেয়ে নিকা করিয়া ঘরে আনিয়াছে। আর শুধু নিকা নয়, তাও না হয় চুলায় যাক, তাহার হাতে ভাত পৰ্য্যন্ত খাইতেছে। গ্রামে যদি ইহার শাসন না থাকে ত বনে গিয়া বাস করিলেই ত হয়। কোড়োল, হরিপুরের সমাজ এ-কথা শুনিলে যে—ইত্যাদি ইত্যাদি । তখন ছেলে-বুড়ো সকলের মুখেই ঐ এক কথা । আঁ্যা—এ হইল কি ? কলি কি সত্যই উন্টাইতে বসিল । খুড়া বলিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, এ যে ঘটিবে তিনি অনেক আগেই জানিতেন। তিনি শুধু তামাস দেখিতেছিলেন ; কোথাকার জল কোথায় গিয়া মরে । নইলে পর নয়, প্রতিবেশী নয়, আপনার ভাইপো ! তিনি কি বাড়ি লইয়া যাইতে পারিতেন না ? তাহার কি ডাক্তার-বৈদ্য দেখাইবার ক্ষমতা ছিল না ? তবে কেন যে করেন নাই, এখন দেখুক সবাই। কিন্তু আর ত চুপ করিয়া থাকা যায় না। এ যে মিত্তিরবংশের নাম ডুবিয়া যায় ! গ্রামের যে মুখ পোড়ে। তখন আমরা গ্রামের লোক মিলিয়া যে কাজটা করিলাম, তাহা মনে করিলে আমি আজও লজ্জায় মরিয়া যাই । খুড়া চলিলেন নালতের মিত্তির-বংশের অভিভাবক হইয়া, আর আমরা দশ-বারোজন সঙ্গে চলিলাম, গ্রামের বদন দক্ষ না হয় ७ड्रेजछ । θψε বিলাসী মৃত্যুঞ্জয়ের পোড়ো-বাড়িতে গিয়া যখন উপস্থিত হইলাম, তখন সবেমাত্র সন্ধ্যা হইয়াছে। মেয়েটি ভাঙা বারান্দার একধারে রুটি গড়িতেছিল, অকস্মাং লাঠি-সোট হাতে এতগুলি লোককে উঠানের উপর দেখিয়া ভয়ে নীলবর্ণ হইয়া গেল । খুড়া ঘরের মধ্যে উকি মারিয়া দেখিলেন, মৃত্যুঞ্জয় শুইয়া আছে। চট করিয়া শিকলটা টানিয়া দিয়া, সেই ভয়ে মৃতপ্রায় মেয়েটিকে সম্ভাষণ শুরু করিলেন। বলা বাহুল্য, জগতের কোন খুড়া কোনকালে বোধ করি ভাইপোর স্ত্রীকে ওরূপ সম্ভাষণ করে নাই । সে এমনি যে, মেয়েটি হীন সাপুড়ের মেয়ে হইয়াও তাহা সহিতে পারিল না, চোখ তুলিয়া বলিল, বাবা আমারে বাবুর সাথে নিকে দিয়েচে জানো ! খুড়া বলিলেন, তবে রে ! ইত্যাদি ইত্যাদি— এবং সঙ্গে সঙ্গেই দশ-বায়োজন বীরদৰ্পে হুঙ্কার দিয়া তাহার ঘাড়ে পড়িল । কেহ ধরিল চুলের মুঠি, কেহ ধরিল কান, কেহ ধরিল হাত-দুটো—এবং যাহাদের সে সুযোগ ঘটিল না, তাহারাও নিশ্চেষ্ট হইয়ারহিলনা। কারণ, সংগ্রাম-স্থলে আমরা কাপুরুষের ন্যায় চুপ করিয়া থাকিতে পারি, আমাদের বিরুদ্ধে অতবড় দুর্নাম রটনা করিতে বোধ করি নারায়ণের কর্তৃপক্ষেরও চক্ষুলজ হইবে। এইখানে একটা অবাস্তর কথা বলিয়া রাখি । শুনিয়াছি, নাকি বিলাত প্রভৃতি মেচ্ছদেশে পুরুষদের মধ্যে একটা কুসংস্কার আছে, স্ত্রীলোক দুৰ্ব্বল এবং নিরুপায় বলিয়া তাহার গায়ে হাত তুলিতে নাই। এ আবার একটা কি কথা! সনাতন হিন্দু এ কুসংস্কার মানে না। আমরা বলি, যাহারই গায়ে জোর নাই, তাহারই গায়ে হাত তুলিতে পারা যায়। তা সে নর-নারী যাই হোক না কেন। মেয়েটি প্রথমেই সেই যা একবার আর্তনাদ করিয়া উঠিয়াছিল, তারপরে একেবারে চুপ করিয়া গেল। কিন্তু আমরা যখন তাহাকে গ্রামের বাহিরে রাখিয়া আসিবার জন্য হিচড়াইয়া লইয়া চলিলাম, তখন সে মিনতি করিয়া বলিতে লাগিল, বাবুরা আমাকে একটিবার ছেড়ে দাও, আমি রুটিগুলো ঘরে দিয়ে আসি। বাইরে শিয়াল-কুকুরে খেয়ে যাবে—রোগ-মানুষ সমস্ত রাত খেতে পাবে না। মৃত্যুঞ্জয় রুদ্ধ ঘরের মধ্যে পাগলের মত মাথা কুটিতে লাগিল, স্বারে পদাঘাত করিতে লাগিল এবং প্রাব্য-অশ্ৰাব্য বহুবিধ ভাষা প্রয়োগ করিতে লাগিল । কিন্তু আমরা তাহাতে তিলাৰ্দ্ধ বিচলিত হইলাম না । স্বদেশের মঙ্গলের জন্য সমস্ত অকাতরে সঙ্ক করিয়া তাহাকে হিড় হিড় করিয়া টানিয়া লইয়া চলিলাম । চলিলাম বলিতেছি, কেননা আমিও বরাবর সঙ্গে ছিলাম, কিন্তু কোথায় আমার মধ্যে একটুখানি দুৰ্ব্বলতা ছিল, আমি তাহার গায়ে হাত দিতে পারি নাই। বরঞ্চ কেমন ষেন কাল্প পাইতে লাগিল ; সে যে অভ্যস্ত অস্কায় করিয়াছে এবং তাহাকে ર૭.8 শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ গ্রামের বাহির করাই উচিত বটে, কিন্তু এটাই যে আমরা ভাল কাজ করিতেছি, সেও কিছুতেই মনে করিতে পারিলাম না। কিন্তু আমার কথা যাক । আপনারা মনে করিবেন না, পল্পীগ্রামে উদারতার একান্ত অভাব । মোটেই না । বরঞ্চ বড়লোক হইলে আমরা এমন সব ঔদার্য্য প্রকাশ করি যে, শুনিলে আপনার च्षवाद् इद्देश्व याद्दे८वन ! এই মৃত্যুঞ্জয়টাই যদি না তাহার হাতে ভাত খাইয়া অমার্জনীয় অপরাধ করিত, তাহা হইলে ত আমাদের এত রাগ হইত না। আর কায়েতের ছেলের সঙ্গে সাপুড়ের মেয়ের নিকা—এ ত একটা হাসিয়া উড়াইবার কথা ! কিন্তু কাল করিল যে ঐ ভাত খাইয়া ! হোক না সে আড়াই মাসের রুগী, হোক না সে শয্যাশায়ী ! কিন্তু তাই বলিয়া ভাত । লুচি নয়; সন্দেশ নয়, পাঠার মাংস নয়। ভাত খাওয়া যে অন্ন-পাপ । সে ত আর সত্য সত্যই মাপ করা যায় না। তা নইলে, পল্লীগ্রামের লোক সকীর্ণ-চিত্ত নয় । চার-ক্রোশ-ইটো-বিদ্যা যে-সব ছেলের পেটে,তারাই ত একদিন ৰডু হইয়া সমাজের মাখা হয় । দেবী বীণাপাণির বরে সঙ্কীর্ণতা তাহাদের মধ্যে আসিবে কি করিয়া । এই ত ইহারাই কিছুদিন পরে, প্রাতঃস্মরণীয় স্বৰ্গীয় মুখোপাধ্যায় মহাশয়ের বিধবা পুত্রবধূ মনের বৈরাগ্যে বছর-দুই কাশীবাস করিয়া যখন ফিরিয়া আসিলেন, তখন নিন্দুকের কানাকানি করিতে লাগিল যে, অৰ্দ্ধেক সম্পত্তি ঐ বিধবার এবং পাছে তাহা বেহাত হয়, এই ভয়েই ছোটবাবু অনেক চেষ্টা অনেক পরিশ্রমের পর বৌঠানকে যেখান হইতে ফিরাইয়া আনিয়াছেন, সেটা কাশীই বটে ! যাই হোক, ছোটবাবু তাহার স্বাভাবিক ঔদার্য্যে, গ্রামের বারোয়ারী পূজা বাবদ দুইশত টাকা দান করিয়া, পাচখানা গ্রামের ব্রাহ্মণের সদক্ষিণ উত্তম ফলাহারের পর, প্রত্যেক সদব্ৰাহ্মণের হাতে যখন একটা করিয়া কাসার গেলাস দিয়া বিদায় করিলেন, তখন ধন্ত ধন্ত পড়িয়া গেল । এমন কি পথে আসিতে অনেকেই দেশের এবং দশের কল্যাণের নিমিত্ত কামনা করিতে লাগিলেন, এমন সব যারা বড়লোক, তাদের বাড়িতে বাড়িতে, মাসে মাসে এমন সব সদাঙ্গুষ্ঠানের আয়োজন হয় না কেন ? কিন্তু যাক। মহত্বের কাহিনী আমাদের অনেক আছে। যুগে যুগে সঞ্চিত হইয়া প্রায় প্রত্যেক পল্লীবাসীর দ্বারেই স্তুপাকার হইয়া উঠিয়াছে। এই দক্ষিণ বঙ্গের অনেক পল্লীতে অনেকদিন ঘুরিয়া গৌরব করিবার মত অনেক বড় বড় ব্যাপার প্রত্যক্ষ করিয়াছি। চরিত্রেই বল, ধর্শ্বেই বল, সমাজেই বল, আর বিদ্যাতেই বল, শিক্ষা একেবারেই পুৱা হইয়া আছে ; এখন শুধু ইংরাজকে কলিয়া গালিগালাজ করিতে পারিলেই দেশটা উদ্ধার হইয়া যায়। ૨ર્ષકર विलाखौं বসর খানেক গত হইয়াছে। মশার কানড় মার সঙ্ক করিতে না পারিয়া সবেমাত্র সন্ন্যাসীগিরিতে ইস্তফা দিয়া ঘরে ফিরিয়াছি ! একদিন দুপুরবেলা ক্রোশদুই দূরের মাল পাড়ার ভিতর দিয়া চলিয়াছি, হঠাৎ দেখি একটা কুটিরের দ্বারে বলিয়া মৃত্যুঞ্জয় । তার মাথায় গেরুয়া-রঙের পাগড়ী, বড় বড় দাড়ি-চুল, গলায় রুদ্রাক্ষ ও পুথির মালা—কে বলিবে এ আমাদের সেই মৃত্যুঞ্জয় ! কায়ন্থের ছেলে একটা বছরের মধ্যেই জাত দিয়া একেবারে পুরাদপ্তর সাপুড়ে হইয়া গেছে। মানুষ কত শীঘ্র যে তাহার চৌদ-পুরুষের জাতটা বিসর্জন দিয়া আর একটা জাত হইয়া উঠিতে পারে, সে এক আশ্চৰ্য্য ব্যাপার। ব্রাহ্মণের ছেলে মেথরাণী বিবাহ করিয়া মেথর হইয়া গেছে এবং তাহাদের ব্যবসা অবলম্বন করিয়াছে, এ বোধ করি আপনার সবাই শুনিয়াছেন। আমি সদব্ৰাহ্মণদের ছেলেকে এন্ট.ান্স পাশ করার পরেও ডোমের মেয়ে বিবাহ করিয়া ডোম হইতে দেখিয়াছি। এখন সে ধুচুনি কুলো বুনিয়া বিক্রয় করে, শূয়ার চরায় । ভাল ভাল কায়স্থ-সস্তানকে কসাইয়ের মেয়ে বিবাহ করিয়া কলাই হইয়া যাইতেও দেখিয়াছি । আজ সে স্বহস্তে গরু কাটিয়া বিক্রয় করে—তাহাকে দেখিয়া কাহার সাধ্য বলে, কোনকালে সে কসাই ভিন্ন আর কিছু ছিল ! কিন্তু সকলেরই ওই একই হেতু । আমার তাই ত মনে হয়, এমন করিয়া এত সহজে পুরুষকে যাহারা টানিয়া নামাইতে পারে, তাহারা কি এমনিই অবলীলাক্রমে তাহাদের ঠেলিয়া উপরে তুলিতে পারে না ? যে পল্লী গ্রামের পুরুষদের মুখ্যাতিতে আজ পঞ্চমুখ হইয়া উঠিয়াছি, গৌরবটা কি একা শুধু তাহাদেরই ? শুধু নিজেদের জোরেই এত দ্রুত নীচের দিকে নামিয়া চলিয়াছে। অন্দরের দিক হইতে কি এতটুকু উৎসাহ, এতটুকু সাহায্য আসে না ? কিন্তু থাক । ঝে*াকের মাথায় হয় ত বা অনধিকার চর্চা করিয়া বসিব । কিন্তু আমার মুস্কিল হইয়াছে এই যে, আমি কোনমতেই ভুলিতে পারি না, দেশের নবদুইজন নর-নারীই ঐ পল্লীগ্রামেরই মাহুষ এবং সেইজন্য কিছু একটা আমাদের করা চাই-ই। যাক। বলিতেছিলাম যে, দেখিয়া কে বলিবে এ সেই মৃত্যুঞ্জয় । কিন্তু আমাকে সে খাতির করিয়া বসাইল। বিলাসী পুকুরে জল আনিতে গিয়াছিল, আমাকে দেখিয়া সেও ভারী খুশী হইয় বারবার বলিতে লাগিল, তুমি না জাগ লালে সে রাত্তিরে আমাকে তারা মেরেই ফেলত। আমার জন্তে কত মারই না জানি তুমি খেয়েছিলে । কথায় কথায় শুনিলাম, পরদিনই তাহার এখানে উঠিয়া আসিয়া ক্রমশঃ ঘর বাধিয়া বাস করিতেছে এবং মুখে আছে। মুখে যে আছে, এ-কথা আমাকে বলার প্রয়োজন ছিল না, শুধু তাহাদের মুখের পানে চাহিয়াই আমি তাহা বুঝিয়াছিলাম। Ruచి শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ তাই শুনিলাম, আজ কোথায় নাকি তাহাদের সাপ-ধরার বায়না আছে এবং তাহারা প্রস্তুত হইয়াছে, আমিও অমনি সঙ্গে যাইবার জন্য লাফাইয়া উঠিলাম। ছেলেবেলা হইতেই দুটা জিনিসের উপর আমার প্রবল সখ ছিল । এক ছিল গোখরো কেউটে সাপ ধরিয়া পোষা, আর ছিল মন্ত্র-সিদ্ধ হওয়া । সিদ্ধ হওয়ার উপায় তখনও খুজিয়া বাহির করিতে পারি নাই, কিন্তু মৃত্যুঞ্জয়কে ওস্তাদ লাভ করিবার আশায় আনন্দে উৎফুর হইয়া উঠিলাম। সে তাহার নামজাদা শ্বশুরের শিষ্ট, স্বতরাং মস্ত লোক । আমার ভাগ্য যে অকস্মাং এমন স্বপ্রসন্ন হইয়া উঠিবে, তাহা কে ভাবিতে পারিত ! কিন্তু শক্ত কাজ এবং ভয়ের কারণ আছে বলিয়া প্রথমে তাহারা উভয়েই আপত্তি করিল, কিন্তু আমি এমনি নাছোড়বান্দী হইয়া উঠিলাম যে, মাসখানেকের মধ্যে আমাকে সাগরেদ করিতে মৃত্যুঞ্জয় পথ পাইল না। সাপ-ধরার মন্ত্র এবং হিসাব শিখাইয়া দিল এবং কজিতে ওষুধ-সমেত মাদুলি বাধিয়া দিয়া দস্তুরমত সাধুড়ে বানাইয়া তুলিল । মন্ত্রটা কি জানেন ? তার শেষটা আমার মনে আছে— ওরে কেউটে তুই মনসার বাহন— মনসা দেবী আমার মা— ওলট-পালট পাতাল ফেঁড়— টোড়ার বিষ তুই নে, তোর বিষ টোড়াৱে দে– —দুধরাজ, মণিরাজ ! কার আজ্ঞে—বিষহরির অাজে ! ইহার মানে যে কি, তাহা আমি জানি না । কারণ, যিনি এই মন্ত্রের স্রষ্টা ঋষি ছিলেন–নিশ্চয়ই কেহ না কেহ ছিলেন–র্তার সাক্ষাং কখনো পাই নাই । অবশেষে একদিন এই মন্ত্রের সত্য-মিথ্যার চরম মীমাংসা হইয়া গেল বটে, কিন্তু যতদিন না হইল, ততদিন সাপ-ধরার জন্য চতুর্দিকে প্রসিদ্ধ হইয়া গেলাম। সবাই বলাবলি করিতে লাগিল, হ্যা, স্তাড়া একজন গুণী লোক বটে। সন্ন্যাসী অবস্থায় কামাখ্যায় গিয়া সিদ্ধ হইয়া আসিয়াছে ; এতটুকু বয়সের মধ্যে এতবড় ওস্তাদ হইয়া অহঙ্কারে আমার আর মাটিতে পা পড়ে না, এমনি জে হইল । বিশ্বাস করিল না শুধু দুইজন। আমার শুরু যে, সে ত ভাল মন্দ কোন কথাই বলিত না । কিন্তু বিলাসী মাঝে মাঝে মুখ টিপিয়া হাসিয়া বলিত, ঠাকুর, এ-সব ভয়ঙ্কর জানোয়ার, একটু সাবধানে নাড়া-চাড়া করো। বস্তুতঃ বিষদাত ভাঙা, সাপের २धै७8 বিলাসী মুখ হইতে বিষ বাহির করা প্রভৃতি কাজগুলা এমনি অবহেলার সহিত করিতে শুরু করিয়াছিলাম যে, সে-সব মনে পড়িলে আজও আমার গা কাপে । আসল কথা হইতেছে এই যে, সাপ ধরা কঠিন নয়, এবং ধরা সাপ দুই-চারি দিন হাড়িতে পুরিয়া রাখার পরে তাহার বিষদাত ভাঙাই হোক অার নাই হোক, কিছুতেই কামড়াইতে চাহে না । চক্ৰ তুলিয়া কামড়াইবার ভান করে, ভয় দেখায়ু, কিন্তু কামড়ায় না । মাঝে মাঝে আমাদের গুরু-শিষ্যের সহি৩ বিলাসী তর্ক করি ত । সাপুড়েদের সবচেয়ে লাভের ব্যবসা হইতেছে শিকড় বিক্ৰী করা, যা দেখাইবামাত্র সাপ পলাইতে পথ পায় না । কিন্তু তার পূৰ্ব্বে সামান্ত একটু কাজ করিতে হইত। যে সাপট শিকড় দেখিয়া পলাইবে, তাহার মুখে একটা লোহার শিক পুড়াইয়া বার-কয়েক ছাকা দিতে হয় । তার পরে তাহাকে শিকড়ই দেখান হোক আর একটা কাঠিই দেখান হোক, সে যে কোথায় পলাইবে ভাবিয়া পায় না। এই কাজটার বিরুদ্ধে বিলাসী ভয়ানক আপত্তি করিয়া মৃত্যুঞ্জয়কে বলিত, দেখ, এমন করিয়া মানুষ ঠকাইয়ে না। মৃত্যুঞ্জয় কহিত, সবাই করে—এতে দোষ কি ? বিলাসী বলিত, করুক গে সবাই । আমাদের ত খাবার ভাবনা নেই, আমরা কেন মিছিমিছি লোক ঠকাতে যাই । 象 আর একটা জিনিস আমি বরাবর লক্ষ্য করিয়াছি । সাপ-ধরার বায়ুনা জাসিলেই বিলাসী নানা প্রকার বাধা দেবার চেষ্টা করিত—আজ শনিবার, অাজ মঙ্গলবার, এমনি কত কি। মৃত্যুঞ্জয় উপস্থিত না থাকিলে সে তো একেবারে ভাগাইয়া দিত, কিন্তু উপস্থিত থাকিলে মৃত্যুঞ্জয় নগদ টাকার লোভ সামলাইতে পারিত না । আর আমার ত একরকম নেশার মত হইয়া দাড়াইয়াছিল । নানা প্রকারে তাহাকে উত্তেজিত করিতে চেষ্টার ত্রুটি করিতাম না । বস্তুতঃ ইহার মধ্যে মজা ছাড়া ভয় যে কোথায় ছিল, এ আমাদের মনেই স্থান পাইত না । কিন্তু এই পাপের দণ্ড আমাকে একদিন ভাল করিয়াই দিতে হইল । সেদিন ক্রোশ-দেড়েক দূরে এক গোয়ালার বাড়িতে সাপ ধরিতে গিয়াছি। বিলাসী বরাবরই সঙ্গে যাইত, আজও সঙ্গে ছিল । মেটে ঘরের মেজে খানিকটা খুড়িতেই একটা গৰ্ত্তের চিহ্ন পাওয়া গেল। আমরা কেহই লক্ষ্য করি নাই, কিন্তু বিলাসী সাপুড়ের মেয়ে—সে ইেট হইয়া কয়েক টুকরা কাগজ তুলিয়া লইয়া আমাকে বলিল, ঠাকুর, একটু সাবধানে খুড়ে । সাপ একটা নয়, এক জোড়া ত আছে বটেই, হয়ত বা বেশীও থাকতে পারে । ২৬৫ > ०५--७8 * ब्र६-भाझिडा-ज९¢ह মৃত্যুদয় বলিল, এরা যে বলে একটাই এসে ঢুকেচে । একটাই দেখতে পাওয়া গেছে। বিলাসী কাগজ দেখাইয়া কহিল, দেখচ না বাসা করেছিল । মৃত্যুঞ্জয় কহিল, কাগজ ত ইদুরেও জানতে পারে ? বিলাসী কহিল, দুই-ই হতে পারে। কিন্তু দুটো জাছেই আমি বলচি । বাস্তবিক বিলাসীর কথাই ফলিল এবং মৰ্ম্মাস্তিকভাবেই সেদিন ফলিল। মিনিটদশেকের মধ্যেই একটা প্রকাও ধরিশ গোখরো ধরিয়া ফেলিয়া মৃত্যুঞ্জয় আমার হাতে দিল। কিন্তু সেটাকে ঝাপির মধ্যে পুরিয়া ফিরিতে না ফিরিঙেই মৃত্যুঞ্জয় উঃ করিয়া নিশ্বাস ফেলিয়া বাহিরে আসিয়া দাড়াইল । তাহার হাতের উন্ট পিঠ দিয়া ঝর ঝর করিয়া রক্ত পড়িতেছিল । প্রথমটা যেন সবাই হতবুদ্ধি হইয়া গেলাম ! কারণ সাপ ধরিতে গেলে সে পলাইবার জন্ত ব্যাকুল না হইয়া বরঞ্চ গৰ্ত্ত হইতে এক হাত মুখ বাহির করিয়া দংশন করে, এমন অভাবনীয় ব্যাপার জীবনে এই একটিবার মাত্র দেখিয়াছি। পরক্ষণেই বিলাসী চীৎকার করিয়া ছুটিয়া গিয়া আঁচল দিয়া তাহার হা ভটা বাধিয়া ফেলিল এবং ষত রকমের শিকড়-বাকড় সে সঙ্গে মানিয়াছিল সমস্তই তাহাকে চিবাইতে দিল । মৃত্যুঞ্জয়ের নিজের মাদুলি ত ছিলই, তাহার উপরেও আমার মাদুলিটাও খুলিয়া তাহার হাতে বাধিয়া দিলাম। আশা, বিষ ইহার উদ্ধে উঠিবে না। এবং আমার সেই “বিষ-হরির আঙ্গে” মন্ত্রটা সতেজে বার বার আবৃত্তি করিতে লাগিলাম। চতুৰ্দ্দিকে ভিড় জমিয়া গেল এবং এ-অঞ্চলের মধ্যে যেখানে যত গুণী ব্যক্তি আছেন সকলকে খবর দিবার জন্য দিকে দিকে লোক ছুটিল । বিলাসীর বাপকেও সংবাদ দিবার জন্ত লোক গেল । আমার মন্ত্র পড়ার আর বিরাম নাই, কিন্তু ঠিক মুবিধা হইতেছে বলিয়া মনে হইল না। তথাপি আবৃত্তি সমভাবেই চলিতে লাগিল । কিন্তু মিনিট পনের-কুড়ি পরেই যখন মৃত্যুঞ্জয় একবার বমি করিয়া দিল, তখন বিলাসী মাটির উপরে একেবারে আছাড় খাইয়া পড়িল । আমি বুঝিলাম, বিষহরির দোহাই বুঝি আর থাটে না । নিকটবর্তী আরও দুই-চারিজন ওস্তাদ আসিয়া পড়িলেন এবং আমরা কখনো বা একসঙ্গে, কখনো বা আলাদা তেত্রিশ কোটি দেব-দেবীর দোহাই পাড়িতে লাগিলাম । কিন্তু বিব দোতাই মানিল না, রোগীর অবস্থা ক্রমেই মন্দ হইতে লাগিল। যখন দেখা গেল, ভাল কথায় হইবে না, তখন তিন-চারজন রোজা মিলিয়া বিষকে এমনি অকথ্য অপ্রাব্য গালিগালাজ করিতে লাগিল যে, বিষের কান থাকিলে সে, মৃত্যুঞ্জয় ত মৃত্যুঞ্জয়, সেদিন দেশ ছাড়িয়া পলাইত। কিন্তু কিছুতেই কিছু হইল না। আরও আধঘণ্টা રાજી বিগাপী ধন্তা-ধ্বপ্তির পরে, রোগী তাহার বাপ-মায়ের দেওয়া মৃত্যুঞ্জয় নাম, তাহার শ্বশুরের দেওয়া মন্ত্রেীষধি, সমস্ত মিথ্যা প্রতিপন্ন করিয়া ইহলোকের লীলা সাঙ্গ করিল। বিলাপী তাহার স্বামীর মাথাটা কোলে করিয়া বসিয়াছিল, সে যেন একেবারে পাথর হইয়া গেল। যাক, তাহার দুঃখের কাহিনীটা আর বাড়াইব না। কেবল এইটুকু বলিয়া শেষ করিব যে, সে সাতদিনের বেশি বঁচিয়া থাকাটা সহিতে পারিল না। আমাকে শুধু একদিন বলিয়াছিল, ঠাকুর, আমার মাথার দিব্যি রইল, এসব তুমি আর কখনো ক’রে না । আমার মাদুলি-কবজ ত মৃত্যুঞ্জয়ের সঙ্গে কবরে গিয়াছিল, ছিল শুধু বিষহরির আজ্ঞা । কিন্তু সে আজ্ঞা ধে ম্যাজিস্ট্রেটের আজ্ঞা নয়, এবং সাপের বিষ যে বাঙালীর বিষ নয়, তাহ আমিও বুঝিয়াছিলাম । একদিন গিয়া শুনিলাম, ঘরে ত আর বিষের অভাব ছিল না, বিলাসী আত্মহত্য করিয়া মরিয়াছে এবং শাস্ত্রমতে সে নিশ্চয়ই নরকে গিয়াছে। কিন্তু যেখানেই যাক, আমার নিজের যখন যাইবার সময় আসিবে, তখন ওইরূপ কোন একটা নরকে যাইবার প্রস্তাবে পিছাইয়া দাড়াইব না, এইমাত্র বলিতে পারি। খুড়োমশাই বোল-আন বাগান দখল করিয়া অত্যস্ত . বিজ্ঞের মত চারিদিকে বলিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, ওর যদি না অপঘাতে মৃত্যু হবে, ত হবে কাৱ ? পুরুষমানুষ অমন একটা ছেড়ে দশটা করুক না, তাতে ত তেমন আসে-যায় না—ন হয় একটু নিন্দাই হ’তো। কিন্তু, হাতে ভাত খেয়ে মরতে গেলি কেন ? নিজে ম’লো, আমার পর্য্যস্ত মাথা ইেট করে গেল। না পেলে একফোটা আগুন, না পেলে একটা পিণ্ডি, না হ’লো একটা ভূজ্যি উচ্ছুণ্ড্য । গ্রামের লোক একবাক্যে বলিতে লাগিল, তাহাতে আর সন্দেহ কি ! অল্প-পাপ । বাপ রে । এর কি আর প্রায়শ্চিত্ত আছে। বিলাসীর আত্মহত্যার ব্যাপারটাও অনেকের কাছে পরিহাসের বিষয় হইল । আমি প্রায়ই ভাবি, এ অপরাধ হয়ত উহারা উভয়েই করিয়াছিল, কিন্তু মৃত্যুঞ্জয় ত পল্লীগ্রামেরই ছেলে, পাড়াগায়ের তেলে-জলেই ত মাছুষ । তবু এত বড় দুঃসাহসের কাজে প্রবৃত্ত করাইয়াছিল তাহাকে যে বস্তুটী, সেটা কেহ একবার চোখ মেলিয়া দেখিতে পাইল না ? . আমার মনে হয়, যে দেশের নর-নারীর মধ্যে পরস্পরের হৃদয় জয় করিয়া বিবাদ করিবার রীতি নাই, বরঞ্চ তাহা নিন্দার সামগ্ৰী, যে-দেশের নর-নারী আশা করিবার ३***) শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ সৌভাগ্য, মাকাখা করিবার ভয়ঙ্কর আনন্দ হইতে চিরদিনের জন্ত বঞ্চিত, যাহাদের জয়ের গর্ব, পরাজয়ের ব্যথা, কোনটাই জীবনে একটিবারও বহন করিতে হয় না, যাহাদের ভুল করিবার দুঃখ, আর ভুল না করিবার আত্মপ্রসাদ, কিছুরই বাগাই নাই, যাহাদের প্রাচীন এবং বহুদশী বিজ্ঞ সমাজ সৰ্ব্বপ্রকারের হাঙ্গামা হইতে অত্যন্ত সাবধানে দেশের লোককে তফাং করিয়া, মাঞ্জীবন কেবল ভালটি হইয়া থাকিবারই ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছেন, তাই বিবাহ-ব্যাপারটা যাহাদের শুধু নিছক contract, তা সে যতই কেন না বৈদিক মন্ত্ৰ দিয়া document পাকা করা হোক, সে-.দশের লোকের সাধ্যই নাই, মৃত্যুঞ্জয়ের অন্ন-পাপের কারণ বোঝে। বিলাসীকে যাহারা পরিহাস করিয়াছিলেন, তাহারা সাধু গৃহস্থ এবং সাধৰী গৃহিণী—অক্ষয় সতীলোক র্তাহারা সবাই পাইবেন, তাও আমি জানি । কিন্তু সেই সাপুড়ের মেয়েটি যখন একটি পীড়িত শয্যাগত লোককে তিল তিল করিয়া জয় করিতেছিল, তাহার তখনকার সে গৌরবের কণামাত্রও হয়ত আজিও ইহাদের কেহ চোখে দেখেন নাই। মৃত্যুঞ্জয় হয়ত নিতান্তই একটা তুচ্ছ মানুষ ছিল, কিন্তু তাহার হৃদয় জয় করিয়া দখল করার জানন্দটাও তুচ্ছ নয়, সে সম্পদও অকিঞ্চিৎকর নহে। এই বস্তুটাই এ-দেশের লোকের পক্ষে বুঝিয়া ওঠা কঠিন । আমি ভূদেববাবুর “পারিবারিক প্রবন্ধে’রও দোষ দিব না এবং শাস্ত্রীয় তথা সামাজিক বিধি-ব্যবস্থার ও নিন্দ করিব না। করিলেও, মুখের উপর কড়া জবাব দিয়া যাহারা বলিবেন, এই হিন্দু-সমাজ তাহার নিতুল বিধি-ব্যবস্থার জোরেই অত শতাব্দীর অতগুলো বিপ্লবের মধ্যে যাচিয়া আছে, আমি তাহাদেরও অতিশয় ভক্তি করি, প্রত্যুত্তরে আমি কখনই বলিব না, টি-কিয়া থাকা চরম সার্থকতা নয়—এবং অতিকায় হস্তী লোপ পাইয়াছে, কিন্তু তেলাপোকা টিকিয়া আছে। আমি শুধু এই বলিব যে, বড়লোকের নন্দগোপালটির মত দিবারাত্র চোখে-cচাখে এবং কোলে-কালে রাখিলে যে সে বেশটি থাকিবে তাহাতে কোনই সন্দেহ নাই, কিন্তু একেবারে তেলাপোকাটির মত বাচাইয়া রাখার চেয়ে এক-আধবার কোল হইতে নামাইয়া আরও পাচজন মামুষের মত দু-এক পা হাটিত্তে দিলেও প্রায়শ্চিত্ত করার মত পাপ হয় না ।