"নটরাজ ঋতুরঙ্গশালা" পাতাটির দুইটি সংশোধিত সংস্করণের মধ্যে পার্থক্য

+
(Jayantanth ব্যবহারকারী নটরাজ পাতাটিকে নটরাজ ঋতুরঙ্গশালা শিরোনামে কোনো পুনর্নির্দেশনা ছাড়াই স্...)
(+)
 
|প্রবেশদ্বার =
}}
<div style="padding-left:2em;">
<poem>
নটরাজ
ঋতুরঙ্গশালা
 
<pages index="নটরাজ ঋতুরঙ্গশালা - রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর.pdf" from=1 to=76/>
নৃত্য গীত ও আবৃত্তিযোগে "নটরাজ" দোলপূর্ণিমার রাত্রে শান্তিনিকেতনে অভিনীত হইয়াছিল।নটরাজের তান্ডবে তাঁহার এক পদক্ষেপের আঘাতে বহিরাকাশে রূপলোক আবর্ত্তিত হইয়া প্রকাশ পায়,তাঁহার অন্য পদক্ষেপের আঘাতে অন্তরাকাশের রসলোক উল্লখিত হইতে থাকে। অন্তরে বাহিরে মহাকালের এই বিরাট নৃত্যছন্দে যোগ দিতে পারিলে জগতে ও জীবনে অখন্ড লীলারস উপলব্ধির আনন্দে মন বন্ধনমুক্ত হয়। "নটরাজ" পালাগানের এই মর্ম্ম।
 
শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
মুক্তিতত্ত্ব
মুক্তিতত্ত্ব শুনতে ফিরিস
তত্ত্বশিরোমণির পিছে?
হায় রে মিছে, হায় রে মিছে।
 
 
মুক্ত যিনি দেখ্‌-না তাঁরে
আয় চলে তাঁর আপন দ্বারে,
তাঁর বাণী কি শুকনো পাতায়
হলদে রঙে লেখেন তিনি।
 
 
মরা ডালের ঝরা ফুলের
সাধন কি তাঁর মুক্তি-কূলের।
মুক্তি কি পণ্ডিতের হাটে
উক্তিরাশির বিকিকিনি।
এই নেমেছে চাঁদের হাসি
এইখানে আয় মিলবি আসি,
বীণার তারে তারণ-মন্ত্র
শিখে নে তোর কবির কাছে।
 
 
আমি নটরাজের চেলা
চিত্তাকাশে দেখছি খেলা,
বাঁধন খোলার শিখছি সাধন
মহাকালের বিপুল নাচে।
 
 
দেখছি, ও যার অসীম বিত্ত
সুন্দর তার ত্যাগের নৃত্য,
আপনাকে তার হারিয়ে প্রকাশ
আপনাতে যার আপনি আছে।
 
 
যে-নটরাজ নাচের খেলায়
ভিতরকে তার বাইরে ফেলায়,
কবির বাণী অবাক মানি'
তারি নাচের প্রসাদ যাচে।
 
 
শুনবি রে আয়, কবির আছে
তরুর মুক্তি ফুলের নাচে,
নদীর মুক্তি আত্মহারা
নৃত্যধারার তালে তালে।
রবির মুক্তি দেখ্‌-না চেয়ে
আলোক-জাগার নাচন গেয়ে,
তারার নৃত্যে শূন্য গগন
মুক্তি যে পায় কালে কালে।
 
 
প্রাণের মুক্তি মৃত্যুরথে
নূতন প্রাণের যাত্রাপথে,
জ্ঞানের মুক্তি সত্য-সুতার
নিত্য-বোনা চিন্তাজালে।
 
 
আয় তবে আয় কবির সাথে
মুক্তি-দোলের শুক্লরাতে,
জ্বলল আলো, বাজল মৃদঙ্‌
নটরাজের নাট্যশালে।
 
 
উদ্বোধন
মন্দিরার মন্দ্র তব বক্ষে আজি বাজে, নটরাজ,
নৃত্যমদে মত্ত করে, ভাঙে চিন্তা, ভাঙে শঙ্কা লাজ,
তুচ্ছ করে সম্মানের অভিমান, চিত্ত টেনে আনে
বিশ্বের প্রাঙ্গণতলে তব নৃত্যচ্ছন্দের সন্ধানে।
মুক্তির প্রয়াসী আমি, শাস্ত্রের জটিল তর্কজালে
যৌবন হয়েছে বন্দী বাক্যের দুর্গের অন্তরালে;
স্বচ্ছ আলোকের পথ রুদ্ধ করি ক্ষুব্ধ শুষ্ক ধূলি
আবর্তিয়া উঠে প্রাণে অন্ধতার জয়ধ্বজা তুলি
চতুর্দিকে। নটরাজ, তুমি আজ করো গো উদ্ধার
দুঃসাহসী যৌবনেরে, পদে পদে পড়ুক তোমার
চঞ্চল চরণভঙ্গি, রঙ্গেশ্বর, সকল বন্ধনে
উত্তাল নৃত্যের বেগে, --যে নৃত্যের অশান্ত স্পন্দনে
ধূলিবন্দিশালা হতে মুক্তি পায় নবশষ্পদল;
পুলকে কম্পিত হয় প্রাণের দুরন্ত কৌতূহল,
আপনারে সন্ধানিতে ছুটে যায় দূর কালপানে,
দুর্গম দেশের পথে, জন্মমরণের তালে তানে,
সৃষ্টির রহস্যদ্বারে নৃত্যের আঘাত নিত্য হানে,
যে-নৃত্যের আন্দোলনে মরুর পঞ্জরে কম্প আনে,
ক্ষুব্ধ হয় শুষ্কতার সজ্জাহীন লজ্জাহীন সাদা,
উচ্ছিন্ন করিতে চায় জড়ত্বের রুদ্ধবাক্‌ বাধা,
বন্ধ্যতার অন্ধ দুঃশাসন; শ্যামলের সাধনাতে
দীক্ষা ভিক্ষা করে মরু তব পায়ে; যে নৃত্য আঘাতে
বাহ্নিবাষ্প-সরোবরে ঊর্মি জাগে প্রচণ্ড চঞ্চল,
অতল আবর্তবক্ষে গ্রহনক্ষত্রের শতদল
প্রষ্ফুটিয়া স্ফুরে নিত্যকাল; ধুমকেতু অকস্মাৎ
উড়ায় উত্তরী হাস্যবেগে, করে ক্ষিপ্র পদপাত
তোমার ডম্বরুতালে, পূজা-নৃত্য করি দেয় সারা
সূর্যের মন্দির-সিংহদ্বারে, চলে যায় লক্ষ্যহারা
গৃহশূন্য পান্থ উদাসীন।
 
 
নটরাজ, আমি তব
কবিশিষ্য, নাটের অঙ্গনে তব মুক্তিমন্ত্র লব।
তোমার তাণ্ডবতালে কর্মের বন্ধনগ্রন্থিগুলি
ছন্দবেগে স্পন্দমান পাকে পাকে সদ্য যাবে খুলি;
সর্ব অমঙ্গল-সর্প হীনদর্প অবনম্র ফণা
আন্দোলিবে শান্ত লয়ে।
 
 
প্রভু, এই আমার বন্দনা
নৃত্যগানে অর্পিব চরণতলে,তুমি মোর গুরু,
আজিকে আনন্দে ভয়ে বক্ষ মোর করে দুরু দুরু।
পূর্ণচন্দ্রে লিপি তব, হে পূর্ণ, পাঠালে নিমন্ত্রণে
বসন্তদোলের নৃত্যে, দক্ষিণবায়ুর আলিঙ্গনে,
মল্লিকার গন্ধোল্লাসে, কিংশুকের দীপ্ত রক্তাংশুকে,
বকুলের মত্ততায়, আশোকের দোদুল কৌতুকে,
বেণুবনবীথিকার নিরন্তর মর্মরে কম্পনে
ইঙ্গিতে ভঙ্গিতে, আম্রমঞ্জরীর সর্বত্যাগপণে,
পলাশের পরিমায়। অবসাদে যেন অন্যমনে
তাল ভঙ্গ নাহি করি, তব নামে আমার আহ্বান
জড়ের স্তব্ধতা ভেদি উৎসারিত করে দিক গান।
আমার আহ্বান যেন অভ্রভেদী তব জটা হতে
উত্তারি আনিতে পারে নির্ঝরিত রসসুধাস্রোতে
ধরিত্রীর তপ্ত বক্ষে নৃত্যচ্ছন্দ মন্দাকিনীধারা,
ভস্ম যেন অগ্নি হয়, প্রাণ যেন পায় প্রাণহারা।
 
 
নৃত্য
নৃত্যের তালে তালে, নটরাজ,
ঘুচাও সকল বন্ধ হে।
সুপ্তি ভাঙাও, চিত্তে জাগাও
মুক্ত সুরের ছন্দ হে।
তোমার-চরণ-পবন-পরশে
সরস্বতীর মানস সরসে
যুগে যুগে কালে কালে,
সুরে সুরে তালে তালে,
ঢেউ তুলে দাও মাতিয়ে জাগাও
অমল কমল গন্ধ হে।
নামো নামো নামো--
তোমার নৃত্য অমিত বিত্ত
ভরুক চিত্ত মম।
নৃত্যে তোমার মুক্তির রূপ,
নৃত্যে তোমার মায়া
বিশ্বতনুতে অণুতে অণুতে
কাঁপে নৃত্যের ছায়া।
তোমার বিশ্ব-নাচের দোলায়
বাঁধন পরায়, বাঁধন খোলায়,
যুগে যুগে কালে কালে,
সুরে সুরে তালে তালে;
অন্ত কে তার সন্ধান পায়
ভাবিতে লাগায় ধন্দ হে।
নমো নমো নমো--
তোমার নৃত্য অমিত বিত্ত
ভরুক চিত্ত মম।
নৃত্যের বশে সুন্দর হল
বিদ্রোহী পরমাণু;
পদযুগ ঘিরে জ্যোতি-মঞ্জীরে
বাজিল চন্দ্রভানু।
তব নৃত্যের প্রাণবেদনায়
বিবশ বিশ্ব জাগে চেতনায়,
যুগে যুগে কালে কালে
সুরে সুরে তালে তালে,
সুখে দুখে হয় তরঙ্গময়
তোমার পরমানন্দ হে।
নমো নমো নমো--
তোমার নৃত্য অমিত বিত্ত
ভরুক চিত্ত মম।
মোর সংসারে তাণ্ডব তব,
কম্পিত জটাজালে।
লোকে লোকে ঘুরে এসেছি তোমার
নাচের ঘূর্ণিতালে।
ওগো সন্ন্যাসী, ওগো সুন্দর,
ওগো শঙ্কর, হে ভয়ংকর,
যুগে যুগে কালে কালে
সুরে সুরে তালে তালে,
জীবন-মরণ নাচের ডমরু
বাজাও জলদমন্দ্র হে।
নমো নমো নমো--
তোমার নৃত্য অমিত বিত্ত
ভরুক চিত্ত মম।
 
 
বৈশাখ
ধ্যান-নিমগ্ন নীরব নগ্ন
নিশ্চল তব চিত্ত;
নিঃস্ব গগনে বিশ্ব ভূবনে
নিঃশেষ সব বিত্ত।
রসহীন তরু, নির্জীব মরু,
পবনে গর্জে রুদ্র ডমরু,
ঐ চারিধার করে হাহাকার
ধরাভাণ্ডার রিক্ত।
তব তপ-তাপে হেরো সবে কাঁপে,
দেবলোক হল ক্লান্ত।
ইন্দ্রের মেঘ, নাহি তার বেগ,
বরুণ করুণ শান্ত।
দুর্দিনে আনে নির্দয় বায়ু,
সংহার করে কাননের আয়ু,
ভয় হয় দেখি, নিখিল হবে কি
জড়দানবের ভৃত্য।
জাগো ফুলে ফলে নব তৃণদলে
তাপস, লোচন মেলো হে।
জাগো মানবের আশায় ভাষায়,
নাচের চরণ ফেলো হে।
জাগো ধনে ধানে, জাগো গানে গানে,
জাগো সংগ্রামে, জাগো সন্ধানে,
আশ্বাসহারা উদাস পরানে
জাগাও উদার নৃত্য।
ভুলেছে ছন্দ, ভালোয় মন্দ
একাকার তাই হায় রে।
কদর্য তাই করিছে বড়াই,
ধরণী লজ্জা পায় রে।
পিনাকে তোমার দাও টংকার,
ভীষণে মধুরে দিক ঝংকার,
ধুলায় মিশাক যা কিছু ধুলার,
জয়ী হোক যাহা নিত্য।
 
 
বৈশাখ-আবাহন
এস, এস, এস, হে বৈশাখ।
তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।
যাক পুরাতন স্মৃতি যাক ভুলে যাওয়া গীতি,
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক।
মুছে যাক সব গ্লানি, ঘুচে যাক জরা,
অগ্নিস্নানে দেহে প্রাণে শুচি হোক ধরা।
রসের আবেশরাশি শুষ্ক করি দাও আসি,
আনো, আনো, আনো তব প্রলয়ে শাঁখ
মায়ার কুজ্‌ঝটি-জাল যাক দূরে যাক।
 
 
বৈশাখের প্রবেশ
নমো, নমো, হে বৈরাগী
তপোবাহ্নির শিখা জ্বালো জ্বালো,
নির্বাণহীন নির্মল আলো
অন্তরে থাক্‌ জাগি।
নমো নমো হে বৈরাগী।
 
 
সম্বোধন
ধূসরবসন, হে বৈশাখ
রক্তলোচন, হে নির্বাক,
শুষ্কপথের দানব দস্যু,
শুষে নিতে চাও হাসি ও অশ্রু
ইঙ্গিতে দাও দারুণ ডাক।
স্তম্ভিত হল সে ডাকে পৃথ#,
ভাণ্ডারে তার কাঁপিল ভিত্তি,
শঙ্কায় তার শুকায় তালু,
অট্ট হাসিল মরুর বালু।
হুংকার সেই তপ্ত হাওয়ায়
প্রান্তর হতে প্রান্তরে ধায়,
দিগ্বধূদের নীরবে কাঁদায়,
শূন্যে শূন্যে উড়ায় ধূলি,
বিজয়পতাকা আকাশে তুলি।
দুহিয়া লয়েছ গগন-ধেনুরে,
ঝরায়ে দিয়েছ শিরীষরেণুরে
উদাস করেছ রাখাল-বেণুরে
তৃষ্ণাকরুণ সারঙ্‌-তানে।
শীর্ণ নদীর গেল সঞ্চয়,
ঝিরিঝিরি জল ধীরি ধীরি বয়,
আকুলিয়া উঠে কাননের ভয়
ভীরু কপোতের কাকলি গানে
ধূসরবসন, হে বৈশাখ,
রক্তলোচন হে নির্বাক,
শুষ্ক পথের দানব দস্যু
শুষে নিতে চাও হাসি ও অশ্রু
ইঙ্গিতে দাও দারুণ ডাক।
 
 
হৃদয় আমার, ঐ বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে,
বেড়া ভাঙার মাতন নামে উদ্ধাম উল্লাসে।
মোহন এল ভীষণ বেশে
আকাশ ঢাকা জটিল কেশে,
এল তোমার সাধন-ধন চরম সর্বনাশে।
বাতাসে তোর সুর ছিল না, ছিল তাপে ভরা।
পিপাসাতে বুক-ফাটা তোর শুষ্ক কঠিন ধরা।
জাগ্‌ রে হতাশ, আয় রে ছুটে
অবসাদের বাঁধন টুটে,
এল তোমার পথের সাথী বিপুল অট্টহাসে।
 
 
কালবৈশাখী
ডাকো বৈশাখ, কালবৈশাখী,
করো তারে লীলাসঙ্গিনী--
কেন সন্ন্যাসী রয়েছ একাকী
আসুক প্রলয়রঙ্গিণী।
হৃত-ন্বিঃশ্বাস অম্বর তলে
রুদ্ধ বাতাস তাপ-শৃঙ্খলে,
ঘন ঝঞ্ঝার দিক্‌ ঝংকার
অন্তর তব চঞ্চলি,
মন্থি আনুক মর্ত্যস্বর্গ
তোমার অর্ঘ্য-অঞ্জলি।
বাজায় ডমরু তব তাণ্ডবে
গুরু গুর মেঘ মন্দ্রিয়া,--
দিগ্বধূ যত হাহাকার রবে
দুর্দাম উঠে ক্রন্দিয়া।
গৈরিক তব জয় পতাকায়
সন্ধ্যা-রবির রঙ সে মাখায়,
কুঞ্জে বাজায় শাখায় শাখায়
তাল-তমালের খঞ্জনি।
সপ্ততারার লুপ্তির পরে
নাচে সে সুপ্তি ভঞ্জনী॥
তপোভঙ্গের দিবে মন্ত্রণা
তব শান্তিরে তর্জিয়া,
তন্ত্র পরাবে রুদ্রবীণায়
রেখেছিলে যারে বর্জিয়া।
দিগন্তরের সঞ্চয় টুটি
অঞ্চলে মেঘ আনিবে সে লুটি--
বাজিয়া উঠিবে কল-কল্লোল
বন পল্লবে পল্লবে,--
শ্যাম উত্তরী নির্মল করি'
সাজাবে আপন বল্লভে।
 
 
মাধুরীর ধ্যান
মধ্যদিনে যবে গান
বন্ধ করে পাখি,
হে রাখাল, বেণু তব
বাজাও একাকী।
শান্ত প্রান্তরের কোণে
রুদ্র বসি তাই শোনে,
মধুরের ধ্যানাবেশে
স্বপ্নমগ্ন আঁখি;
হে রাখাল, বণু যবে
বাজাও একাকী।
সহসা উচ্ছ্বসি উঠে
ভরিয়া আকাশ
তৃষাতপ্ত বিরহের
নিরুদ্ধ নিঃশ্বাস।
অম্বরপ্রান্তের দূরে
ডম্বরু গম্ভীর সুরে
জাগায় বিদ্যুৎ-ছন্দে
আসন্ন বৈশাখী।
হে রাখাল, বেণু তব
বাজাও একাকী।
পরানে কার ধেয়ান আছে জাগি,
জানি হে জানি, কঠোর বৈরাগী।
সুদূর পথে চরণ দুটি বাজে
পুরব কূলে বকুলবীথিমাঝে,
লুটায়ে-পড়া অমল-নীল সাজে
নবকেতকী-কেশর আছে লাগি।
তাহারি ধ্যান পরানে তব জাগি।
 
 
রাখাল বেণু বাজায় তরুতলে
রাগিণী তার তাহারি কথা বলে।
ভূতলে খসি পড়িছে পাতাগুলি
চলিতে পাছে চরণে লাগে ধূলি,--
কৃষ্ণচূড়া রয়েছে খেলা ভুলি
পথে তাহারে ছায়া দিবারি লাগি।
তাহারি ধ্যান পরানে আছে জাগি।
 
 
কাঁকন-ধ্বনি তপোবনের পারে
চপল বায়ে আসিছে বারে বারে,
কপোত দুটি তাহারি সাড়া পেয়ে
চাঁপার ডালে উঠিছে গেয়ে গেয়ে,
মরমে তব মৌনী আছে চেয়ে
আপন-মাঝে তাহারি বাণী মাগি।
তাহারি ধ্যান পরানে আছে জাগি।
কঠোর, তুমি মাধুরী-সাধনাতে
মগন হয়ে রয়েছ দিনে রাতে।
নীরস কাঠে আগুন তুমি জ্বালো,
আঁধার যাহা করিবে তারে আলো,
অশুচি যাহা, যা-কিছু আছে কালো
দহিবে তারে, সুদূরে যাবে ভাগি,--
মাধুরী-ধ্যান পরানে তব জাগি।
 
 
ব্যঞ্জনা
শুনিতে কি পাস
এই যে শ্বসিছে রুদ্র শূন্যে শূন্যে সন্তপ্ত নিশ্বাস
এরি মাঝে দূরে বাজে চঞ্চলের চকিত খঞ্জনি,
মাধুরীর মঞ্জীরের মৃদুমন্দ গুঞ্জরিত ধ্বনি?
রৌদ্রদগ্ধ তপস্যার মৌনস্তব্ধ অলক্ষ্য আড়ালে
স্বপ্নে-রচা অর্চনার থালে
অর্ঘ্যমাল্য সাঙ্গ হয় সংগোপনে সুন্দরের লাগি।
মগ্না যেথা ধেয়ানের সর্বশূন্য গহনে বৈরাগী,
সেথা কে বুভুক্ষু আসে ভিক্ষা-অন্বেষণে;
জীর্ণ পর্ণশয্যা 'পরে একা রহে জাগি
কঠিনের শুষ্ক প্রাণে কোমলের পদস্পর্শ মাগি।
তাপিত আকাশে
হঠাৎ নীরবে চলে আসে
একটি করুণ ক্ষীণ স্নিগ্ধ বায়ুধারা,
কে অভিসারিণী যেন পথে এসে পায় না কিনারা।
অকস্মাৎ কোমলের কমলমালার স্পর্শ লেগে
শান্তের চিত্তের প্রান্ত অহেতু উদ্বেগে
ভ্রূকুটিয়া ওঠে কালো মেঘে;
বিদ্যুৎ বিচ্ছুরি উঠে দিগন্তের ভালে,
রোমাঞ্চ-কম্পন লাগে অশ্বত্থের ত্রস্ত ডালে ডালে;
মুহূর্তে অম্বরবক্ষে উলঙ্গিনী শ্যামা
বাজায় বৈশাখী-সন্ধ্যা ঝঞ্ঝার দামামা,
দিগ্বিদিকে নৃত্য করে দুর্বার ক্রন্দন,
ছিন্ন ছিন্ন হয়ে যায় ঔদাসীন্য কঠোর বন্ধন।
 
 
বর্ষার প্রবেশ
নমো, নমো করুণাঘন নম হে।
নয়ন স্নিগ্ধ অমৃতাঞ্জন পরশে,
জীবন পূর্ণ সুধারস বরষে,
তব দর্শন-ধন-সাথর্ক মন হে,
অকৃপণবর্ষণ করুণাঘন হে।
 
 
প্রত্যাশা
তপের তাপের বাঁধন কাটুক
রসের বর্ষণে,
হৃদয় আমার শ্যামল-বঁধুর
করুণ স্পর্শ নে॥
 
 
ঐ কি এলে আকাশ-পারে
দিক্‌-ললনার প্রিয়,
চিত্তে আমার লাগল তোমার
ছায়ার উত্তরীয়।
 
 
অঝোর-ঝরন শ্রাবণজলে,
তিমির-মেদুর বনাঞ্চলে
ফুটুক সোনার কদম্বফুল
নিবিড় হর্ষণে।
 
 
মেঘের মাঝে মৃদঙ্‌ তোমার
বাজিয়ে দিলে কি ও
ঐ তালেতেই মাতিয়ে আমার
নাচিয়ে দিয়ো দিয়ো।
 
 
ভরুক গগন, ভরুক কানন
ভরুক নিখিল ধরা,
দেখুক ভুবন মিলন-স্বপন
মধুর বেদন ভরা।
পরান-ভরানো ঘন ছায়াজাল
বাহির-আকাশ করুক আড়াল,
নয়ন ভুলুক বিজুলি ঝলুক
পরম দর্শনে।
 
 
আষাঢ়
কোন্‌ বারতার করিল প্রচার
দূর আকাশের ইঙ্গিতে
ঐরাবতের বৃংহিতে।
নিষ্ঠুর তপে আছে নিমগ্ন
ধরণী তপস্বিনী,
রুক্ষ অঙ্গ পাংশু-ধূসর,
ধ্যান-অঙ্গন শুষ্ক ঊষর,
নাহি সখী সঙ্গিনী;--
বুঝি আসন্ন হল তার বর,
শুনি গর্জন রথ-ঘর্ঘর,
বুঝি আসে কাঙক্ষিত,
তাই চিত্ত যে হল চঞ্চল,
আঁখিপল্লব বাষ্পসজল,
তাই সে রোমাঞ্চিত।
 
 
ওগো বিরহিণী, গেল দুর্দিন
দুঃখ ঘুচিবে নিঃশেষে,
মনোমাঝে যারে রুদ্ধ নয়নে
পূজিলে ধ্যানের পুষ্প চয়নে,
দেখা দিবে আজি বিশ্বে সে।
ঐ বুঝি আসে আকাশে আকাশে
সমারোহ তার বিস্তারি,
বিজয়ী সে বীর, ওরে ভয়ভীতা
যাবে তোর ভয়, ওরে পিপাসিতা
তৃষা হতে দিবে নিস্তারি।
ললাটে নিপুণ পত্রলেখাটি
আঁকো কুঙ্কুম চন্দনে।
দুলাও চামেলি অলকে তোমার
কবরী রচিয়া এলো কেশভার
বেঁধে তোলো বণীবন্ধনে।
 
 
উঠ ধূলি হতে ওগো দুঃখিনী
ছাড়ো গৈরিক উত্তরী।
নীলবসনের অঞ্চলখানি
কম্পিত বুখে লহ লহ টানি'
হাসিমুখে চাহো সুন্দরী।
বীর-মঙ্গল ঘোষুক মন্দ্র
মুখে তুলে তোর শঙ্খ নে।
কৌতুকসুখ চক্ষে ফুটুক,
বিদ্যুৎ-শিখা কম্পি উঠুক
তব চঞ্চল কঙ্কণে।
কুঞ্জকানন জাগ্রত হোক
আজি বন্দনাসংগীতে--
শিহর লাগুক শাখায় শাখায়,
মাতন লাগুক শিখীর পাখায়
তব নৃত্যের ভঙ্গিতে।
শ্যামবন্ধুরে শ্যামল তৃণের
আসনে বসাবি অঙ্গনে।
রাখিবি দুয়ারে আল্‌পনা আঁকি,'
চরণের তলে ধুলা দিবি ঢাকি,
টগর করবী রঙ্গনে।
গাও জয় জয়, গাও জয়গান
ঢেউ তোলো স্বরসপ্তকে,
বনপথে আসে মনোরঞ্জন,
নয়নে পরাবে প্রেম অঞ্জন,
সুধা দিবে চিরতপ্তকে।
 
 
লীলা
গগনে গগনে আপনার মনে
কী খেলা তব।
তুমি কত বেশে নিমেষে নিমেষে
নিতুই নব।
জটার গভীরে লুকালে রবিরে
ছায়াপটে আঁক এ কোন্‌ ছবি রে।
মেঘমল্লারে কী বল আমারে
কেমনে কব।
বৈশাখী ঝড়ে সেদিনের সেই
অট্টহাসি
গুরু গুরু সুরে কোন্‌ দূরে দূরে
যায় যে ভাসি।
সে সোনার আলো শ্যামলে মিশাল,
শ্বেত-উত্তরী আজ কেন কালো?
লুকালে ছায়ায় মেঘের মায়ায়
কী বৈভব।
 
 
বর্ষামঙ্গল
ওগো সন্ন্যাসী, কী গান ঘনাল মনে।
গুরু গুরু গুরু নাচের ডমরু
বাজিল ক্ষণে ক্ষণে।
তোমার ললাটে জটিল জটার ভার
নেমে নেমে আজি পড়িছে বারম্বার,
বাদল আঁধার মাতাল তোমার হিয়া,
বাঁকা বিদ্যুৎ চোখে উঠে চমকিয়া।
চিরজনমের শ্যমলী তোমার প্রিয়া
আজি এ বিরহ-দীপন-দীপিকা
পাঠাল তোমারে এ কোন্‌ লিপিকা,
লিখিল নিখিল-আঁখির কাজল দিয়া,
চিরজনমের শ্যামলী তোমার প্রিয়া।
 
 
মনে পড়িল কি ঘন কালো এলোচুলে
অগুরু ধূপের গন্ধ?
শিখি-পুচ্ছের পাখা সাথে দুলে দুলে
কাঁকন-দোলন ছন্দ?
মনে পড়িল কি নীল নদীজলে,
ঘন শ্রাবণের ছায়া ছলছলে
মিলি মিলি সেই জল-কলকলে
কলালাপ মৃদুমন্দ;
স্থকিত-পায়ের চলা দ্বিধাহত,
ভীরু নয়নের পল্লব নত,
না-বলা কথার আভাসের মতো
নীলাম্বরের প্রান্ত?
মনে পড়িছে কি কাঁখে তুলে ঝারি
তরুতলে-তলে ঢেলে চলে বারি,
সেচন-শিথিল বাহু দুটি তারি
ব্যথায় আলসে ক্লান্ত?
 
 
ওগো সন্ন্যাসী, পথ যায় ভাসি'
ঝরঝর ধারাজলে--
তমালবনের শ্যামল তিমিরতলে।
দ্যুলোক ভূলোকে দূরে দূরে বলাবলি
চিরবিরহের কথা,
বিরহিণী তার নত আঁখি ছলছলি'
নীপ-অঞ্জলি রচে বসি' গৃহকোণে
ঢেলে ঢেলে দেয় তোমারে স্মরিয়া মনে,
ঢেলে দেয় ব্যাকুলতা।
 
 
কভু বাতায়নে অকারণে বেলা বাহি'
আতুর নয়নে দু-হাতে আঁচল ঝাঁপে।
তুমি চিত্তের অন্তরে অবগাহি'
খুঁজিয়া দেখিছ ধৈরজ নাহি নাহি,
মল্লাররাগে গর্জিয়া ওঠ গাহি',
বক্ষে তোমার অক্ষের মালা কাঁপে।
যাক যাক তব মন গলে গলে যাক,
গান ভেসে গিয়ে দূরে চলে চলে যাক,
বেদনার ধারা দুর্দাম দিশাহারা
দুখ-দুর্দিনে দুই কূল তার ছাপে।
কদম্ববন চঞ্চল ওঠে দুলি,
সেইমতো তব কম্পিত বাহু তুলি
টলমল নাচে নাচো সংসার ভুলি,
আজ সন্ন্যাসী, কাজ নাই জপে জাপে।
 
 
শ্রাবণ-বিদায়
শ্রাবণ তুমি বাতাসে কার
আভাস পেলে?
পথে তারি সকল বারি
দিলে ঢেলে।
কেয়া কাঁদে, যায় যায় যায়।
কদম ঝরে, হায় হায় হায়।
পুব হাওয়া কয়, ওর তো সময় নাই বাকি আর।
শরৎ বলে, যাক-না সময় ভয় কিবা তার, --
কাটবে বেলা আকাশমাঝে বিনা কাজে
অসময়ের খেলা খেলে।
 
 
কালো মেঘের আর কি আছে দিন
ও যে হল সাথীহীন।
পুব হাওয়া কয়, কালোর এবার যাওয়াই ভালো,
শরৎ বলে, গেঁথে দেব কালোয় আলো।
সাজবে বাদল আকাশ-মাঝে
সোনার সাজে
কালিমা ওর মুছে ফেলে।
যার রে শ্রাবণকবি রসবর্ষা ক্ষান্ত করি তার,
কদম্বের রেণুপুঞ্জে পদে পদে কুঞ্জবীথিকার
ছায়াঞ্চল ভরি দিল। জানি, রেখে গেল তার দান
বনের মর্মের মাঝে; দিয়ে গেল অভিষেকস্নান
সুপ্রসন্ন আলোকেরে; মহেন্দ্রের অদৃশ্য বেদীতে
ভরি গেল অর্ঘ্যপাত্র বেদনার উৎসর্গ অমৃতে;
সলিল গণ্ডূষ দিতে তটিনী সাগরতীর্থে চলে,
অঞ্জলি ভরিল তারি; ধরার নিগূঢ় বক্ষতলে
রেখে গেল তৃষ্ণার সম্বল; অগ্নিতীক্ষ্ণ বজ্রবাণ
দিগন্তের তূণ ভরি একান্তে করিয়া গেল দান
কালবৈশাখীর তরে; নিজ হস্তে সর্ব ম্লানতার
চিহ্ন মুছে দিয়ে গেল। আজ শুধু রহিল তাহার
রিক্তবৃষ্টি জ্যোতিঃশুভ্র মেঘে মেঘে মুক্তির লিখন,
আপন পূর্ণতাখানি নিখিলে করিল সমর্পণ।
 
 
শেষ মিনতি
কেন পান্থ এ চঞ্চলতা?
কোন্‌ শূন্য হতে এল কার বারতা।
 
 
যাত্রাবেলায় রুদ্ররবে
বন্ধন-ডোর ছিন্ন হবে,
ছিন্ন হবে, ছিন্ন হবে।
নয়ন কিসের প্রতীক্ষা-রত
বিদায়বিষাদে উদাসমতো,
ঘন-কুন্তলভার ললাটে নত
ক্লান্ত তড়িৎবধূ তন্দ্রাগতা।
 
 
মুক্ত আমি, রুদ্ধ দ্বারে
বন্দী করে কে আমারে।
যাই চলে যাই অন্ধকারে
ঘণ্টা বাজায় সন্ধ্যা যবে।
 
 
কেশরকীর্ণ কদম্ববনে
মর্মর মুখরিল মৃদু পবনে,
বর্ষণহর্ষভরা ধরণীর
বিরহবিশঙ্কিত করুণ কথা।
ধৈর্য মানো ওগো ধৈর্য মানো,
বরমাল্য গলে তব হয়নি ম্লান,
আজো হয়নি ম্লান,
ফুল-গন্ধ-নিবেদন-বেদন-সুন্দর
মালতী তব চরণে প্রণতা।
 
 
শ্রাবণ সে যায় চলে পান্থ,
কৃশতনু ক্লান্ত,
উড়ে উড়ে উত্তরী-প্রান্ত
উত্তর-পবনে।
যূথীগুলি সকরুণ গন্ধে
আজি তারে বন্দে,
নীপবন মর্মর ছন্দে
জাগে তার স্তবনে।
শ্যামঘন তমালের কুঞ্জে
পল্লবপুঞ্জে।
আজি শেষ মল্লারে গুঞ্জে
বিচ্ছেদগীতিকা,
আজি মেঘ বর্ষণরিক্ত
নিঃশেষবিত্ত,
দিল করি শেষ অভিষিক্ত
কিংশুকবীথিকা।
 
 
শরৎ
ধ্বনিল গগনে আকাশ-বাণীর বীন,
শিশির-বাতাসে দূরে দূরে ডাক দিল কে?
আয় সুলগনে, আজ পথিকের দিন,
এঁকে নে ললাট জয়যাত্রার তিলকে।
গেল খুলি গেল মেঘের ছায়ার দ্বার,
দিকে দিকে ঘোচে কালো আবরণভার,
তরুণ আলোক মুকুট পরেছে তার,
বিজয়শঙ্খ বেজে ওঠে তাই ত্রিলোকে।
শরৎ এনেছে অপরূপ রূপকথা
নিত্যকালের বালকবীরের মানসে।
নবীন রক্তে জাগায় চঞ্চলতা,
বলে,--চলো চলো, অশ্ব তোমার আনো'সে
ধেয়ে যেতে হবে দুস্তর প্রান্তরে,
বন্দিনী কোন্‌ রাজকন্যার তরে,
মায়াজাল ভেদি চলো সে রুদ্ধ ঘরে,
লও কার্মুক , দানবের বুক হানো'সে।
ওরে, শারদার জয়মন্ত্রের, গুণে
বীর-গৌরবে পার হতে হবে সাগরে।
ইন্দ্রের শর ভরি নিতে হবে তূণে
রাক্ষসপুরী জিনে নিতে হবে, জাগো রে।
"দেবী শারদার যে প্রসাদ শিরে লয়ি'
দেব সেনাপতি কুমার দৈত্যজয়ী,
সে প্রসাদখানি দাও গো অমৃতময়ী'
এই মহা বর চরণে তাঁহার মাগো রে।
আজি আশ্বিনে স্বচ্ছ বিমল প্রাতে
শুভ্রের পায়ে অম্লান মনে নমো রে।
স্বর্গের রাখি বাঁধো দক্ষিণ হাতে
আঁধারের সাথে আলোকের মহাসমরে।
মেঘবিমুক্ত শরতের নীলাকাশ
ভুবনে ভুবনে ঘোষিল এ আশ্বাস--
"হবে বিলুপ্ত মলিনের নাগপাশ,
জয়ী হবে রবি, মরিবে মরিবে তম রে।'
 
 
শান্তি
পাগল আজি আগল খোলে
বিদায়রজনীতে,
চরণে ওর বাঁধিবি ডোর,
কী আশা তোর চিতে।
গগনে তার মেঘ-দুয়ার ঝেঁপে,
বুকেরি ধন বুকেতে ছিল চেপে,
হিম হাওয়ায় গেল সে দ্বার কেঁপে,
এসেছে ডাক ভোরের রাগিণীতে।
শীতল হোক বিমল হোক প্রাণ,
হৃদয়ে শোক রাখুক তার দান।
যা ছিল ঘিরে শূন্যে সে মিলাল,
সে ফাঁক দিয়ে আসুক তবে আলো,
বিজনে বসি পূজাঞ্জলি ঢালো
শিশিরে ভরা শিউলি-ঝরা গীতে।
 
 
শরতের প্রবেশ
নির্মল কান্ত, নমো হে নমঃ।
স্নিগ্ধ সুশান্ত নমো হে নমঃ
বন-অঙ্গনময় রবিকর-রেখা
লেপিল আলিম্পনলিপি লেখা,
আঁকিব তাহে প্রণতি মম।
নমো হে নমঃ।
শরৎ ডাকে ঘর-ছাড়ানো ডাকা
কাজ-ভোলানো সুরে,--
চপল করে হাঁসের দুটি পাখা
ওড়ায় তারে দূরে।
শিউলিকুঁড়ি যেমনি ফোটে শাখে
অমনি তারে হঠাৎ ফিরে ডাকে,
পথের বাণী পাগল করে তাকে,
ধুলায় পড়ে ঝুরে।
শরৎ ডাকে ঘর-ছাড়ানো ডাকা
কাজ-খোওয়ানো সুরে।
 
 
শরৎ আজি বাজায় এ কী ছলে
পথ-ভোলানো বাঁশি।
অলস মেঘ যায়-যে দলে দলে
গগনতলে ভাসি।
নদীর ধারা অধীর হয়ে চলে
কী নেশা আজি লাগল তার জলে,
ধানের বনে বাতাস কী যে বলে
বেড়ায় ঘুরে ঘুরে।
শরৎ ডাকে ঘর-ছাড়ানো ডাকা,
কাজ-খোওয়ানো সুরে।
 
 
শরৎ আজি শুভ্র আলোকেতে
মন্ত্র দিল পড়ি,
ভুবন তাই শুনিল কান পেতে
বাজে ছুটির ঘড়ি।
কাশের বনে হাসির লহরীতে
বাজিল ছুটি মর্মরিত গীতে,--
ছুটির ধ্বনি আনিল মোর চিতে
পথিক বন্ধুরে।
শরৎ ডাকে ঘর-ছাড়ানো ডাকা
কাজ-খোওয়ানো সুরে।
 
 
শরতের ধ্যান
আলোর অমল কমলখানি
কে ফুটালে,
নীল আকাশের ঘুম ছুটালে।
 
 
সেই তো তোমার পথের বঁধু
সেই তো।
দূর কুসুমের গন্ধ এনে খোঁজায় মধু--
এই তো।
 
 
আমার মনের ভাবনাগুলি
বাহির হল পাখা তুলি,
ঐ কমলের পথে তাদের
সেই জুটালে।
 
 
সেই তো তোমার পথের বঁধু
সেই তো।
এই আলো তার এই তো আঁধার
এই আছে এই নেই তো।
 
 
শরৎবাণীর বীণা বাজে
কমলদলে।
ললিত রাগের সুর ঝরে তাই
শিউলিতলে।
তাই তো বাতাস বেড়ায় মেতে
কচি ধানের সবুজ খেতে,
বনের প্রাণে মরমরানির
ঢেউ উঠালে।
 
 
শরতের বিদায়
কেন গো যাবার বেলা
গোপনে চরণ ফেলা,
যাওয়ার ছায়াটি পড়ে যে হৃদয়-মাঝে,
অজানা ব্যথার তপ্ত আভাস রক্ত আকাশে বাজে।
সুদূর বিরহতাপে
বাতাসে কী যেন কাঁপে,
পাখির কণ্ঠ করুণ ক্লান্তি-ভরা,
হারাই হারাই মনে করে তাই সংশয়-ম্লান ধরা।
জানিনে গহন বনে
শিউলি কী ধ্বনি শোনে,
আনমনে তার ভূষণ খসায়ে ফেলে।
মালতী আপন সব ঢেলে দেয়, শেষ খেলা তার খেলে।
না হতে প্রহর শেষ
হবে কি নিরুদ্দেশ,
তোমার নয়নে এখনো রয়েছে হাসি,
বাজায়ে সোহিনী এখনো মোহিনী বাঁশি ওঠে উচ্ছ্বাসি।
এই তব আসা-যাওয়া
একি খেয়ালের হাওয়া,
মিলনপুলক তাতেও কি অবহেলা,
আজি এ বিরহ-ব্যথার বিষাদ এও কেবলি খেলা?
 
 
শিউলি ফুল, শিউলি ফুল,
কেমন ভুল, এমন ভুল?
রাতের বায় কোন্‌ মায়ায়
আনিল হায় বনছায়ায়,
ভোরবেলায় বারে বারেই
ফিরিবারেই হলি ব্যাকুল।
কেন রে তুই উন্মনা,
নয়নে তোর হিমকণা?
কোন্‌ ভাষায় চাস বিদায়,
গন্ধ তোর কী জানায়,
সঙ্গে হায় পলে পলেই
দলে দলেই যায় বকুল।
 
 
বিলাপ
চরণরেখা তব যে-পথে দিলে লেখি
চিহ্ন আজি তারি আপনি ঘুচালে কি?
ছিল তো শেফালিকা
তোমারি লিপি-লিখা
তারে যে তৃণতলে আজিকে লীন দেখি?
কাশের শিখা যত কাঁপিছে থরথরি,
মলিন মালতী যে পড়িছে ঝরি ঝরি।
তোমার যে-আলোকে
অমৃত দিত চোখে,
স্মরণ তারো কি গো মরণে যাবে ঠেকি?
 
 
হেমন্তের প্রবেশ
নম, নম, নম।
তুমি ক্ষুধার্তজন-শরণ্য,
অমৃত-অন্ন-ভোগধন্য
করো অন্তর মম।
হেমন্তেরে বিভল করে কিসে,
চলিতে পথে হারাল কেন দিশে।
যেন রে ওর আলোর স্মৃতিখানি
বিস্মৃতির বাষ্পে নিল টানি,--
কণ্ঠ তাই হারাল তার বাণী,
অশ্রু কাঁপে নয়ন-অনিমিষে।
হেমন্তেরে বিভল করে কিসে।
 
 
ক্ষণেক তরে লও-না ঘরে ডাকি,
যাত্রা ওর অনেক আছে বাকি।
শিশিরকণা লাগিবে পায়ে পায়ে,
রুক্ষ কেশ কাঁপিবে হিমবায়ে,
আঁধার-করা ঘনবনের ছায়ে
শুষ্ক পাতা রয়েছে পথ ঢাকি।
ক্ষণেক তরে লও-না ঘরে ডাকি।
 
 
বাসা যে ওর সুদূর হিমাচলে,
শেওলা-ঝোলা তিমির গুহাতলে।
যে পথ বাহি বলাকা যায় ফিরে
সৈকতিনী নদীর তীরে তীরে,
সে পথ দিয়ে ধানের খেত ঘিরে
হিমের ভারে চলিবে পলে পলে। যেতে যে হবে সুদূর হিমাচলে।
 
 
চলিতে পথে এল আঁধার রাতি,
নিবিয়া গেল ছিল যে ওর বাতি।
অসুরদলে গগনে রচে কারা,
তাই তো শশী হয়েছে জ্যোতিহারা,
আকাশ ঘেরি ধরিবে যত তারা
কে যেন জেলে কুহেলি-জাল পাতি।
নিবিয়া গেল ছিল যে ওর বাতি।
বধূরা যবে সাঁজের জ্যোতি জ্বাল
একটি দীপ উহারে দেওয়া ভালো।
দেবতা যারে বিঘ্ন দিয়ে হানে
তোমারা তারে বাঁচায়ো দয়া দানে
কল্যাণী গো, তোদেরি কল্যাণে
ছুটিয়া যাক্‌ কুস্বপন কালো,--
একটি দীপ উহারে দেওয়া ভালো।
 
 
শিউলি-ফোটা ফুরাল যেই শীতের বনে,
এলে যে সেই শূন্যখনে।
তাই গোপনে সাজিয়ে ডালা
দুখের সুরে বরণমালা
গাঁথি মনে মনে
শূন্য খনে।
দিনের কোলাহলে
ঢাকা সে যে রইবে হৃদয়তলে।
রাতের তারা উঠবে যবে
সুরের মালা বদল হবে
তখন তোমার সনে
মনে মনে।
হায় হেমন্তলক্ষ্মী, তোমার নয়ন কেন ঢাকা--
হিমের ঘন ঘোমটাখানি ধূমল রঙে আঁকা।
সন্ধ্যাপ্রদীপ তোমার হাতে
মলিন হেরি কুয়াশাতে,
কণ্ঠে তোমার বাণী যেন করুণ বাষ্পে মাখা।
ধরার আঁচল ভরে দিলে প্রচুর সোনার ধানে।
দিগঙ্গনার অঙ্গন আজ পূর্ণ তোমার দানে।
আপন দানের আড়ালেতে
রইলে কেন আসন পেতে,
আপনাকে এই কেমন তোমার গোপন করে রাখা।
 
 
হেমন্ত
হে হেমন্তলক্ষ্মী, তব চক্ষু কেন রুক্ষ চুলে ঢাকা,
ললাটের চন্দ্রলেখা অযত্নে এমন কেন ম্লান?
হাতে তব সন্ধ্যাদীপ কেন গো আড়াল করে আন
কুয়াশায়? কণ্ঠে বাণী কেন হেন অশ্রুবাষ্পে মাখা
গোধূলিতে আলোতে আঁধারে? দূর হিমশৃঙ্গ ছাড়ি
ওই হেরো রাজহংসশ্রেণী, আকাশে দিয়েছে পাড়ি
উজায়ে উত্তরবায়ুস্রোত, শীতে ক্লিষ্ট ক্লান্ত পাখা
মাগিছে আতিথ্য তব জাহ্নবীর জনশূন্য তটে
প্রচ্ছন্ন কাশের বনে। প্রান্তরসীমায় ছায়াবটে
মৌনব্রত বউ-কথা-কও। গ্রামপথ আঁকাবাঁকা
বেণুতলে পান্থহীন অবলীন অকারণ ত্রাসে,
ক্বচিৎ চকিত-ধূলি অকস্মাৎ পবন উচ্ছ্বাসে।
 
 
কেন বলো হৈমন্তিকা, নিজেরে কুণ্ঠিত করে রাখা,
মুখের গুণ্ঠন কেন হিমের ধূমলবর্ণে আঁকা ।
 
 
ভরেছ, হেমন্তলক্ষ্মী, ধারার অঞ্জলি পক্ক ধানে।
দিগঙ্গনে দিগঙ্গনা এসেছিল ভিক্ষার সন্ধানে
শীতরিক্ত অরণ্যের শূন্যপথে। বলেছিল ডাকি,
"কোথায় গো, অন্নপূর্ণা, ক্ষুধার্তেরে অন্ন দিবে না কি?
শান্ত করো প্রাণের ক্রন্দন, চাও প্রসন্ন নয়ানে
ধরার ভাণ্ডার পানে।" শুনিয়া লুকায়ে হাস্যখানি,
লুকায়ে দক্ষিণ হস্ত দক্ষিণা দিয়েছ তুমি আনি,
ভূমিগর্ভে আপনার দাক্ষিণ্য ঢাকিলে সাবধানে।
স্বর্গলোক ম্লান করি প্রকাশিলে ধরার বৈভব
কোন্‌ মায়ামন্ত্রগুণে, দরিদ্রের বাড়ালে গৌরব।
অমরার স্বর্ণ নামে ধরণীর সোনার অঘ্রানে।
তোমার অমৃত-নৃত্য, তোমার অমৃতস্নিগ্ধ হাসি
কখন ধূলির ঘরে সঞ্চিত করিলে রাশি রাশি,
আপনার দৈন্যচ্ছলে পূর্ণ হলে আপনার দানে।
 
 
দীপালি
হিমের রাতে ঐ গগনের
দীপগুলিরে
হেমন্তিকা করল গোপন
আঁচল ঘিরে।
ঘরে ঘরে ডাক পাঠাল--
"দীপালিকায় জ্বালাও আলো,
জ্বালাও আলো, আপন আলো,
সাজাও আলোয় ধরিত্রীরে।"
শূন্য এখন ফুলের বাগান,
দোয়েল কোকিল গাহে না গান,
কাশ ঝরে যায় নদীর তীরে।
যাক্‌ অবসাদ বিষাদ কালো
দীপালিকায় জ্বালাও আলো,
জ্বালাও আলো, আপন আলো,
শুনাও আলোর জয়বাণীরে।
দেবতারা আজ আছে চেয়ে
জাগো ধরার ছেলে মেয়ে
আলোয় জাগাও যামিনীরে।
এল আঁধার, দিন ফুরাল,
দীপালিকায়, জ্বালাও আলো,
জ্বালাও আলো, আপন আলো,
জয় করো এই তামসীরে।
 
 
শীতের উদ্বোধন
ডেকেছ আজি, এসেছি সাজি, হে মোর লীলাগুরু,
শীতের রাতে তোমার সাথে কী খেলা হবে শুরু।
ভাবিয়াছিনু খেলার দিন
গোধূলি-ছায়ে হল বিলীন,
পরান মন হিমে মলিন
আড়াল তারে ঘেরি,'--
এমন ক্ষণে কেন গগনে বাজিল তব ভেরী?
উতর-বায় কারে জাগায়, কে বুঝে তার বাণী?
অন্ধকারে কুঞ্জদ্বারে বেড়ায় কর হানি।
কাঁদিয়া কয় কানন-ভূমি--
"কী আছে মোর, কী চাহ তুমি?
শুষ্ক শাখা যাও যে চুমি'
কাঁপাও থরথর,
জীর্ণপাতা বিদায়গাথা গাহিছে মরমর।"
 
 
বুঝেছি তব এ অভিনব ছলনাভরা খেলা,
তুলিছ ধ্বনি কী আগমনী আজি যাবার বেলা।
যৌবনেরে তুষার-ডোরে
রাখিয়াছিলে অসাড় ক'রে;
বাহির হতে বাঁধিলে ওরে
কুয়াশা-ঘন জালে--
ভিতরে ওর ভাঙালে ঘোর নাচের তালে তালে।
 
 
নৃত্যলীলা জড়ের শিলা করুক খান্‌খান্‌,
মৃত্যু হতে অবাধ স্রোতে বহিয়া যাক প্রাণ।
নৃত্য তব ছন্দে তারি
নিত্য ঢালে অমৃতবারি,
শঙ্খ কহে হুহুংকারি
বাঁধন সে তো মায়া,
যা-কিছু ভয়, যা-কিছু ক্ষয়, সে তো ছায়ার ছায়া।
 
 
এসেছে শীত গাহিতে গীত বসন্তেরি জয়,--
যুগের পরে যুগান্তরে মরণ করে লয়।
তাণ্ডবের ঘূর্ণিঝড়ে
শীর্ণ যাহা ঝরিয়া পড়ে,
প্রাণের জয়-তোরণ গড়ে
আনন্দের তানে,
বসন্তের যাত্রা চলে অনন্তের পানে।
 
 
বাঁধন যারে বাঁধিতে নারে, বন্দী করি তারে
তোমার হাসি সমুচ্ছ্বাসি উঠিছে বারে বারে।
অমর আলো হারাবে না যে
ঢাকিয়া তারে আঁধার-মাঝে,
নিশীথ-নাচে ডমরু বাজে
অরুণদ্বার খোলে--
জাগে মুরতি, পুরানো জ্যোতি নব উষার কোলে।
 
 
জাগুক মন, কাঁপুক বন, উড়ুক ঝরা পাতা,
উঠুক জয়, তোমরি জয়, তোমারি জয়গাথা।
ঋতুর দল নাচিয়া চলে
ভরিয়া ডালি ফুলে ও ফলে,
নৃত্য-লোল চরণতলে
মুক্তি পায় ধরা,--
ছন্দে মেতে যৌবনেতে রাঙিয়ে ওঠে জরা।
 
 
আসন্ন শীত
শীতের বনে কোন্‌ সে কঠিন
আসবে বলে
শিউলিগুলি ভয়ে মলিন
বনের কোলে।
আমলকী-ডাল সাজল কাঙাল,
খসিয়ে দিল পল্লবজাল,
কাশের হাসি হাওয়ায় ভাসি
যায় যে চলে।
সাইবে না সে পাতায় ঘাসে
চঞ্চলতা,
তাই তো আপন রঙ ঘুচাল
ঝুমকো লতা।
উত্তরবায় জানায় শাসন,
পাতল তাপের শুষ্ক আসন,
সাজ খাসাবার এই লীলা কার
অট্টরোলে।
 
 
শীত
ওগো শীত, ওগো শুভ্র, হে তীব্র নির্মম,
তোমার উত্তরবায়ু দুরন্ত দুর্দম
অরণ্যের বক্ষ হানে। বনস্পতি যত
থর থর কম্পমান, শীর্ষ করি নত
আদেশ-নির্ঘোষ তব মানে। "জীর্ণতার
মোহবন্ধ ছিন্ন করো' এ বাক্য তোমার
ফিরিছে প্রচার করি জয়ডঙ্কা তব
দিকে দিকে। কুঞ্জে কুঞ্জে মৃত্যুর বিপ্লব
করিছে বিকীর্ণ শীর্ণ পর্ণ রাশি রাশি
শূন্য নগ্ন করি শাখা, নিঃশেষে বিনাশি
অকাল-পুষ্পের দুঃসাহস।
হে নির্মল,
সংশয়-উদ্বিগ্ন চিত্তে পূর্ণ করো বল।
মৃত্যু-অঞ্জলিতে ভরো অমৃতের ধারা,
ভীষণের স্পর্শঘাতে করো শঙ্কাহারা,
শূন্য করি দাও মন; সর্বস্বান্ত ক্ষতি
অন্তরে ধরুক শান্ত উদাত্ত মুরতি,
হে বৈরাগী। অতীতের আবর্জনাভার,
সঞ্চিত লাঞ্ছনা গ্লানি শ্রান্তি ভ্রান্তি তার
সম্মার্জন করি দাও। বসন্তের কবি
শূন্যতার শুভ্র পত্রে পূর্ণতার ছবি
লেখে আসি', সে-শূন্য তোমারি আয়োজন,
সেইমতো মোর চিত্তে পূর্ণের আসন
মুক্ত করো রুদ্র-হস্তে; কুজ্‌ঝটিকারাশি
রাখুক পুঞ্জিত করি প্রসন্নের হাসি।
বাজুক তোমার শঙ্খ মোর বক্ষতলে
নিঃশঙ্ক দুর্জয়। কঠোর উদগ্রবলে
দুর্বলেরে করো তিরস্কার; অট্টহাসে
নিষ্ঠুর ভাগ্যেরে পরিহাসো; হিমশ্বাসে
আরাম করুক ধূলিসাৎ। হে নির্মম,
গর্বহরা, সর্বনাশা, নমো নমো নমঃ।
 
 
নৃত্য
শীতের হাওয়ার লাগল নাচন
আমলকীর এই ডালে ডালে।
পাতাগুলি শির্‌শিরিয়ে
ঝরিয়ে দিল তালে তালে।
উড়িয়ে দেবার মাতন এসে
কাঙাল তারে করল শেষে,
তখন তাহার ফলের বাহার
রইল না আর অন্তরালে।
শূন্য করে ভরে-দেওয়া
যাহার খেলা
তারি লাগি রইনু বসে
সারা বেলা।
শীতের পরশ থেকে থেকে
যায় বুঝি ঐ ডেকে ডেকে,
সব খোওয়াবার সময় আমার
হবে কখন কোন্‌ সকালে।
 
 
 
শীতের প্রবেশ
নম, নম, নম নম।
নির্দয় অতি করুণা তোমার
বন্ধু তুমি হে নির্মম,
যা-কিছু জীর্ণ করিবে দীর্ণ
দণ্ড তোমার দুর্দম।
সর্বনাশার নিঃশ্বাস বায়
লাগল ভালে।
নাচল চরণ শীতের হাওয়ায়
মরণতালে।
করব বরণ, আসুক কঠোর,
ঘুচুক অলস সুপ্তির ঘোর,
যাক ছিঁড়ে মোর বন্ধনডোর
যাবার কালে।
ভয় যেন মোর হয় খান্‌খান্‌
ভয়েরি ঘায়ে,
ভরে যেন প্রাণ ভেসে এসে দান
ক্ষতির বায়ে।
সংশয়ে মন না যেন দুলাই,
মিছে শুচিতায় তারে না ভুলাই,
নির্মল হব পথের ধুলাই
লাগিলে পায়ে।
 
 
শীত, যদি তুমি মোরে দাও ডাক
দাঁড়ায়ে দ্বারে--
সেই নিমেষেই যাব নির্বাক্‌
অজানা পারে।
নাই দিল আলো নিবে-যাওয়া বাতি,--
শুকনো গোলাপ ঝরা যূথী জাতী,
নির্জন পথ হোক মোর সাথী
অন্ধকারে।
 
 
জানি জানি শীত, আমার যে-গীত
বীণায় নাচে
তারে হরিবার কভু কি তোমার
সাধ্য আছে।
দক্ষিণবায়ে করে যাব দান
রবিরশ্মিতে কাঁপিবে সে তান,
কসুমে কুসুমে ফুটিবে সে গান
লতায় গাছে।
 
 
যাহা-কিছু মোর তুমি, ওগো চোর,
হরিয়া লবে,
জেনো বারেবারে ফিরে ফিরে তারে
ফিরাতে হবে।
যা-কিছু ধুলায় চাহিবে চুকাতে
ধুলা সে কিছুতে নারিবে লুকাতে,
নবীন করিয়া নবীনের হাতে
সঁপিবে কবে।
 
 
স্তব
হে সন্ন্যাসী,
হিমগিরি ফেলে নীচে নেমে এলে
কিসের জন্য?
কুন্দমালতী করিছে মিনতি
হও প্রসন্ন।
যাহা-কিছু ম্লান বিরস জীর্ণ
দিকে দিকে দিলে করি বিকীর্ণ,
বিচ্ছেদভারে বনচ্ছায়ারে
করে বিষণ্ন;
হও প্রসন্ন।
 
 
 
সাজাবে কি ডালা গাঁথিবে কি মালা
মরণসত্রে?
তাই উত্তরী নিলে ভরি ভরি
শুকানো পত্রে?
ধরণী যে তব তাণ্ডবে সাথী,
প্রলয়বেদনা নিল বুকে পাতি,
রুদ্র এবারে বরবেশে তারে
করো গো ধন্য;
হও প্রসন্ন।
 
 
শীতের বিদায়
তুঙ্গ তোমার ধবলশৃঙ্গশিরে
উদাসীন শীত, যেতে চাও বুঝি ফিরে?
চিন্তা কি নাই সঁপিতে রাজ্যভার
নবীনের হাতে, চপল চিত্ত যার।
হেলায় যে-জন ফেলায় সকল তার
অমিত দানের বেগে?
 
 
দণ্ড তোমার তার হাতে বেণু হবে,
প্রতাপের দাপ মিলাবে গানের রবে,
শাসন ভুলিয়া মিলনের উৎসবে
জাগাবে, রহিবে জেগে।
 
 
সে যে মুছে দিবে তোমার আঘাতচিহ্ন,
কঠোর বাঁধন করিবে ছিন্ন ছিন্ন।
এতদিন তুমি বনের মজ্জামাঝে
বন্দী রেখেছ যৌবনে কোন্‌ কাজে,
ছাড়া পেয়ে আজ কত অপরূপ সাজে
বাহিরিবে ফুলে দলে।
 
 
তব আসনের সম্মুখে যার বাণী
আবদ্ধ ছিল বহুকাল ভয় মানি'
কণ্ঠ তাহার বাতাসেরে দিবে হানি'
বিচিত্র কোলাহলে।
তোমার নিয়মে বিবর্ণ ছিল সজ্জা,
নগ্ন তরুর শাখা পেত তাই লজ্জা।
তাহার আদেশে আজি নিখিলের বেশে
নীল পীত রাঙা নানা রঙ ফিরে এসে,
আকাশের আঁখি ডুবাইবে রসাবেশে
জাগাইবে মত্ততা।
সম্পদ তুমি যার যত নিলে হরি'
তার বহুগুণ ও যে দিতে চায় ভরি,
পল্লবে যার ক্ষতি ঘটেছিল ঝরি,
ফুল পাবে সেই লতা।
 
 
ক্ষয়ের দুঃখে দীক্ষা যাহারে দিলে,
সব দিকে যার বাহুল্য ঘুচাইলে,
প্রাচুর্যে তারি হল আজি অধিকার।
দক্ষিণবায়ু এই বলে বার বার,
বাঁধন-সিদ্ধ যে-জন তাহারি দ্বার
খুলিবে সকলখানে।
 
 
কঠিন করিয়া রচিলে পত্রখানি
রসভারে তাই হবে না তাহার হানি,
লুঠি লও ধন, মনে মনে এই জানি,
দৈন্য পুরিবে দানে।
 
 
বসন্তের প্রবেশ
নম নম নম নম
তুমি সুন্দরতম।
দূর হইল দৈন্যদ্বন্দ্ব,
ছিন্ন হইল দুঃখবন্ধ
উৎসবপতি মহানন্দ
তুমি সুন্দরতম।
লুকানো রহে না বিপুল মহিমা
বিঘ্ন হয়েছে চূর্ণ,
আপনি রচিলে আপনার সীমা
আপনি করিলে পূর্ণ।
ভরেছে পূজার সাজি,
গান উঠিয়াছে বাজি'
নাগকেশরের গন্ধরেণুতে
উড়ে চন্দনচূর্ণ।
এ কী লীলা, হে বসন্ত,
ম্লান আবরণ আড়ালে দেখালে
সব দৈন্যের অন্ত।
 
 
অমানিত মাটি, দিবে তারে মান
এসেছ তাহারি জন্য;
পথে পথে দিলে পরশের দান
ধূলিরে করিলে ধন্য।
যেথা আস তুমি বীর,
জাগে তব মন্দির,
বর্ণছটায় মাতে মহাকাশ
স্তব করে মহারণ্য।
এ কী লীলা, হে বসন্ত,
অনেক ভুলায়ে নিমেষে সহসা
দেখালে আপন পন্থ।
 
 
ছিনু পথ চেয়ে বহু দুখ সয়ে,
আজ দেখি এ কী দৃশ্য,
শক্তি তোমার সুন্দর হয়ে
জিনিল কঠিন বিশ্ব।
তব পুষ্পিত তরু
জয় করি নিল মরু,
মুক চিত্তের জাগাইলে গান,
কবি হল তব শিষ্য।
এ কী লীলা, হে বসন্ত,
যা ছিল শ্রীহীন দীপ্তি-বিহীন
করিলে প্রজ্বলন্ত।
 
 
আবাহন
তোমার আসন পাতব কোথায়
হে অতিথি।
ছেয়ে গেছে শুকনো পাতায়
কাননবীথি।
ছিল ফুটে মালতী ফুল, কুন্দকলি,
উত্তরবায় লুঠ করে তায় গেল চলি,
হিমে বিবশ বনস্থলী
বিরলগীতি,
হে অতিথি।
 
 
সুর-ভোলা ঐ ধরার বাঁশি
লুটায় ভুঁয়ে,
মর্মে তাহার তোমার হাসি
দাও-না ছুঁয়ে।
মাতবে আকাশ নবীন রঙের তানে তানে,
পলাশ বকুল ব্যাকুল হবে আত্মদানে,
জাগবে বনের মুগ্ধ মনে
মধুর স্মৃতি,
হে অতিথি।
 
 
বসন্ত
হে বসন্ত, হে সুন্দর, ধরণীর ধ্যান-ভরা ধন,
বৎসরের শেষে
শুধু একবার মর্ত্যে মূর্তি ধর ভুবনমোহন
নব বরবেশে।
তারি লাগি তপস্বিনী কী তপস্যা করে অনুক্ষণ,
আপনারে তপ্ত করে, ধৌত করে, ছাড়ে আভরণ,
ত্যাগের সর্বস্ব দিয়ে ফল-অর্ঘ্য করে আহরণ
তোমার উদ্দেশে।
 
 
সূর্য প্রদক্ষিণ করি' ফিরে সে পূজার নৃত্যতালে
ভক্ত উপাসিকা।
নম্র ভালে আঁকে তার প্রতিদিন উদয়াস্তকালে
রক্তরশ্মিটিকা।
সমুদ্রতরঙ্গে সদা মন্দ্রস্বরে মন্ত্র পাঠ করে,
উচ্চারে নামের শ্লোক অরণ্যের উচ্ছ্বাসে মর্মরে
বিচ্ছেদের মরুশূন্যে স্বপ্নচ্ছবি দিকে দিগন্তরে
রচে মরীচিকা।
আবর্তিয়া ঋতুমাল্য করে জপ, করে আরাধন
দিন গুনে গুনে।
সার্থক হল যে তার বিরহের বিচিত্র সাধন
মধুর ফাল্গুনে।
হেরিনু উত্তরী তব, হে তরুণ, অরুণ আকাশে,
শুনিনু চরণধ্বনি দক্ষিণের বাতাসে বাতাসে,
মিলনমাঙ্গল্য-হোম প্রজ্বলিত পলাশে পলাশে,
রক্তিম আগুনে।
 
 
তাই আজি ধরিত্রীর যত কর্ম, যত প্রয়োজন
হল অবসান।
বৃক্ষশাখা রিক্তভার, ফলে তার নিরাসক্ত মন,
খেতে নাই ধান।
বকুলে বকুলে শুধু মধুকর উঠিছে গুঞ্জরি,
অকারণ আন্দোলনে চঞ্চলিছে অশোকমঞ্জরী,
কিশলয়ে কিশলয়ে নৃত্য উঠে দিবসশর্বরী
বনে জাগে গান।
হে বসন্ত, হে সুন্দর, হায় হায়, তোমার করুণা
ক্ষণকাল তরে।
মিলাইবে এ উৎসব, এই হাসি, এই দেখাশুনা
শূন্য নীলাম্বরে।
নিকুঞ্জের বর্ণচ্ছটা একদিন বিচ্ছেদবেলায়
ভেসে যাবে বৎসরান্তে রক্তসন্ধ্যাস্বপ্নের ভেলায়,
বনের মঞ্জীরধ্বনি অবসন্ন হবে নিরালায়
শ্রান্তিক্লান্তিভরে।
 
 
তোমারে করিবে বন্দী নিত্যকাল মৃত্তিকাশৃঙ্খলে
শক্তি আছে কার?
ইচ্ছায় বন্ধন লও, সে বন্ধন ইন্দ্রজালবলে
কর অলংকার।
সে বন্ধন দোলরজ্জু, স্বর্গে মর্ত্যে দোলে ছন্দভরে,
সে বন্ধন শ্বেতপদ্ম, বাণীর মানসসরোবরে,
সে বন্ধন বীণাতন্ত্র, সুরে সুরে সংগীতনির্ঝরে
বর্ষিছে ঝংকার।
 
 
নন্দনে আনন্দ তুমি, এই মর্ত্যে, হে মর্ত্যের প্রিয়
নিত্য নাই হলে।
সুদূর মাধুর্য-পানে তব স্পর্শ, অনির্বচনীয়,
দ্বার যদি খোলে,
ক্ষণে ক্ষণে সেথা আসি নিস্তব্ধ দাঁড়াবে বসুন্ধরা,
লাগিবে মন্দাররেণু শিরে তার ঊর্ধ্ব হতে ঝরা,
মাটির বিচ্ছেদপাত্র স্বর্গের উচ্ছ্বাসরসে ভরা
রবে তার কোলে।
 
 
রাগরঙ্গ
রঙ লাগালে বনে বনে,
ঢেউ জাগালে সমীরণে।
আজ ভুবনের দুয়ার খোলা,
দোল দিয়েছে বনের দোলা,
কোন্‌ ভোলা সে ভাবে-ভোলা
খেলায় প্রাঙ্গণে।
আন্‌ বাঁশি তোর আন্‌ রে,
লাগল সুরের বান রে,
বাতাসে আজ দে ছড়িয়ে
শেষ বেলাকার গান রে।
সন্ধাকাশের বুকফাটা সুর
বিদায়রাতি করবে মধুর,
মাতল আজি অস্তসাগর
সুরের প্লাবনে।
 
 
বসন্তের বিদায়
মুখখানি কর মলিন বিধুর
যাবার বেলা,
জানি আমি জানি সে তব মধুর
ছলের খেলা।
জানি গো বন্ধু, ফিরে আসিবার পথে
গোপন চিহ্ন এঁকে যাবে তব রথে,
জানি তুমি তারে ভুলিবে না কোনোমতে,
যার সাথে তব হল একদিন
মিলন-মেলা।
জানি আমি, যবে আঁখিজল ভরে
রসের স্নানে
মিলনের বীজ অঙ্কুর ধরে
নবীন প্রাণে।
খনে খনে এই চিরবিরহের ভান,
খনে খনে এই ভয়রোমাঞ্চ দান,
তোমার প্রণয়ে সত্য সোহাগে
মিথ্যা হেলা।
 
 
প্রার্থনা
জানি তুমি ফিরে আসিবে আবার, জানি,
তবু মনে মনে প্রবোধ নাহি যে মানি।
বিদায়লগনে ধরিয়া দুয়ার
তবু যে তোমায় বলি বারবার
"ফিরে এসো, এসো, বন্ধু আমার"
বাষ্পবিভল বাণী।
 
 
 
যাবার বেলায় কিছু মোরে দিয়ো দিয়ো
গানের সুরেতে তব আশ্বাস, প্রিয়।
বনপথে যবে যাবে সে-ক্ষণের
হয়তো বা কিছু রবে স্মরণের,
তুলি লব সেই তব চরণের
দলিত কুসুমখানি।
 
 
 
অহৈতুক
মনে রবে কি না রবে আমারে
সে আমার মনে নাই গো।
ক্ষণে ক্ষণে আসি তব দুয়ারে,
অকারণে গান গাই গো।
চলে যায় দিন, যতখন আছি
পথে যেতে যদি আসি কাছাকাছি
তোমার মুখের চকিত সুখের
হাসি দেখিতে যে চাই গো,
তাই অকারণে গান গাই গো।
ফাগুনের ফুল যায় ঝরিয়া
ফাগুনের অবসানে।
ক্ষণিকের মুঠি দেয় ভরিয়া,
আর কিছু নাহি জানে।
ফুরাইবে দিন, আলো হবে ক্ষীণ,
গান সারা হবে, থেমে যাবে বীন;
যতখন থাকি ভরে দিবে না কি
এ খেলারি ভেলাটাই গো।
তাই অকারণে গান গাই গো।
 
 
মনের মানুষ
কত-না দিনের দেখা
কত-না রূপের মাঝে,
সে কার বিহনে একা
মন লাগে নাই কাজে।
কার নয়নের চাওয়া
পালে দিয়েছিল হাওয়া,
কার অধরের হাসি
আমার বীণায় বাজে।
কত ফাগুনের দিনে
চলেছিনু পথ চিনে,
কত শ্রাবণের রাতে
লাগে স্বপনের ছোঁওয়া।
চাওয়া-পাওয়া নিয়ে খেলা,
কেটেছিল কত বেলা,
কখনো বা পাই পাশে
কখনো বা যায় খোওয়া।
শরতে এসেছে ভোরে
ফুলসাজি হাতে ক'রে,
শীতে গোধূলির বেলা
জ্বালায়েছে দীপশিখা।
কখনো করুণ সুরে
গান গেয়ে গেছে দূরে,
যেন কাননের পথে
রাগিণীর মরীচিকা।
সেই-সব হাসি কাঁদা,
বাঁধন খোলা ও বাঁধা,
অনেক দিনের মধু,
অনেক দিনের মায়া--
আজ এক হয়ে তারা
মোরে করে মাতোয়ারা,
এক বীণারূপ ধরি
এক গানে ফেলে ছায়া।
নানা ঠাঁই ছিল নানা,
আজ তারে হল জানা,
বাহিরে সে দেখা দিত
মনের মানুষ মম--
আজ নাই আধাআধি
ভিতর বাহির বাঁধি
এক দোলাতেই দোলে
মোর অন্তরতম।
 
 
চঞ্চল
ওরে প্রজাপতি, মায়া দিয়ে কে যে
পরশ করিল তোরে।
অস্তরবির তুলিখানি চুরি ক'রে।
বাতাসের বুকে সে-চঞ্চলের বাসা
বনে বনে তুই বহিস তাহারি ভাষা,
অপ্সরীদের দোল-খেলা ফুলরেণু
পাঠায় কে তোর দুখানি পাখায় ভ'রে।
 
 
যে-গুণী তাহার কীর্তিনাশার নেশায়
চিকন রেখার লিখন শূন্যে মেশায়,
সুর বাঁধে আর সুর যে হারায় ভুলে,
গান গায়ে চলে ভোলা রাগিণীর কূলে,
তার হারা সুর নাচের হাওয়ার বেগে
ডানাতে তোমার কখন পড়েছে ঝরে।
 
 
 
উৎসব
সন্ন্যাসী যে জাগিল ঐ, জাগিল ঐ, জাগিল।
হাস্যভরা দখিনবায়ে
অঙ্গ হতে দিল উড়ায়ে
শ্মশানচিতাভস্মরাশি, ভাগিল কোথা, ভাগিল। মানাসলোকে শুভ্র আলো
চূর্ণ হয়ে রঙ জাগাল,
মদির রাগ লাগিল তারে,
হৃদয়ে তার লাগিল।
আয় রে তোরা, আয় রে তোরা, আয় রে।
রঙের ধারা ঐ যে বহে যায় রে।
 
 
 
রঙের ঝড় উচ্ছ্বসিল গগনে,
রঙের ঢেউ রসের স্রোতে মাতিয়া ওঠে সঘনে;--
ডাকিল বান আজি সে কোন্‌ কোটালে।
নাকাড়া বাজে, কানাড়া বাজে বাঁশিতে,
কান্নাধারা মিলিয়া গেছে হাসিতে,
প্রাণের মাঝে ফোয়ারা তার ছোটালে।
এসেছে হাওয়া বাণীতে দোল-দোলানো,
এসেছে পথ-ভোলানো,
এসেছে ডাক ঘরের দ্বার-খোলানো।
আয় রে তোরা, আয় রে তোরা, আয় রে।
রঙের ধারা ঐ যে বহে যায় রে।
 
 
 
উদয়রবি যে রাঙা রঙ রাঙায়ে
পূর্বাচলে দিয়েছে ঘুম ভাঙায়ে--
অস্তরবি সে রাঙা রসে রসিল,
চিরপ্রাণের বিজয়বাণী ঘোষিল;
অরুণবীণা যে-সুর দিল রনিয়া
সন্ধ্যাকাশে সে সুর উঠে ঘনিয়া,
নীরব নিশীথিনীর বুকে নিখিল ধ্বনি ধ্বনিয়া।
আয় রে তোরা, আয় রে তোরা, আয় রে।
বাঁধনহারা রঙের ধারা ঐ যে বহে যায় রে।
 
 
শেষের রঙ
রাঙিয়ে দিয়ে যাও গো এবার
যাবার আগে,--
আপন রাগে,
গোপন রাগে,
তরুণ হাসির অরুণ রাগে
অশ্রুজলের করুণ রাগে।
রঙ যেন মোর মর্মে লাগে,
আমার সকল কর্মে লাগে,
সন্ধ্যাদীপের আগায় লাগে,
গভীর রাতের জাগায় লাগে।
যাবার আগে যাও গো আমায়
জাগিয়ে দিয়ে
রক্তে তোমার চরণদোলা
লাগিয়ে দিয়ে।
আঁধার নিশার বক্ষে যেমন তারা জাগে,
পাষাণগুহার কক্ষে নিঝরধারা জাগে,
মেঘের বুকে যেমন মেঘের মন্দ্র জাগে,
বিশ্বনাচের কেন্দ্রে যেমন ছন্দ জাগে,
তেমনি আমায় দোল দিয়ে যাও
যাবার পথে আগিয়ে দিয়ে,
কাঁদন বাঁধন ভাগিয়ে দিয়ে।
 
 
দোল
আলোকরসে মাতাল রাতে
বাজিল কার বেণু।
দোলের হাওয়া সহসা মাতে,
ছড়ায় ফুলরেণু।
অমলরুচি মেঘের দলে
আনিল ডাকি গগনতলে,
উদাস হয়ে ওরা যে চলে
শূন্যে-চরা ধেনু।
 
 
দোলের নাচে সে বুঝি আছে
অমরাবতীপুরে?
বাজায় বেণু বুকের কাছে,
বাজায় বেণু দূরে।
শরম ভয় সকলি ত্যেজে
মাধবী তাই আসিল সেজে,
শুধায় শুধু "বাজায় কে যে
মধুর মধু সুরে'।
 
 
গগনে শুনি এ কী এ কথা,
কাননে কী যে দেখি--
এ কি মিলনচঞ্চলতা।
বিরহব্যথা এ কি।
আঁচল কাঁপে ধরার বুকে,
কী জানি তাহা সুখে না দুখে।
ধরিতে যারে না পারে তারে
স্বপনে দেখিছে কি।
 
 
লাগিল দোল জলে স্থলে,
জাগিল দোল বনে,
সোহাগিনীর হৃদয়তলে,
বিরহিণীর মনে।
মধুর মোরে বিধুর করে
সুদূর তার বেণুর স্বরে,
নিখিলহিয়া কিসের তরে
দুলিছে অকারণে।
আনো গো আনো ভরিয়া ডালি
করবীমালা লয়ে,
আনো গো আনো সাজায়ে থালি
কোমল কিশলয়ে।
এস গো পীত বসনে সাজি,
কোলেতে বীণা উঠুক বাজি,
ধ্যানেতে আর গানেতে আজি
যামিনী যাক বয়ে।
 
 
এস গো এস দোলবিলাসী,
বাণীতে মোর দোলো।
ছন্দে মোর চকিতে আসি
মাতিয়ে তারে তোলো।
অনেক দিন বুকের কাছে
রসের স্রোত থমকি আছে,
নাচিবে আজি তোমার নাচে
সময় তারি হল।
 
 
কিশোর, আজি তোমার দ্বারে
পরান মম জাগে।
নবীন কবে করিবে তারে
রঙিন তব রাগে।
ভাবনাগুলি বাঁধনখোলা
রচিয়া দিবে তোমার দোলা,
দাঁড়িয়ো আসি হে ভাবে-ভোলা,
আমার আঁখি আগে।
 
</poem>
</div>
 
[[বিষয়শ্রেণী:রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা]]