প্রধান মেনু খুলুন

অপ্রকাশিত রচনাবলী শেষকালে একদিন রাজপুত্তর দেখা দিলেন। সেদিন কি ঘুমেই ন পেয়েছিল আমাকে । কত কথা তিনি বলেছিলেন ; তার মানে তখন বুঝিনি। এখনই কি ছাই বুঝতে পেরেছি ! তিনি বললেন, আবার দেখা হবে ; কবে তা বলেননি। বলেছেন, তিনি আমাকে ছেড়ে কোথাও থাকতে পারবেন না। তিনি মান করেছেন—আমাকে সিথির সিদুর মুছতে—আমার হাতের চুড়ি খুলে ফেলতে। তাই এই সিদুর—তাই আজও এই পোড়া হাত-দুটোতে সোনার চুড়ি ঝকৃঝক্‌ করে। এখন তোমরা কি কেউ দয়া করে আমাকে বলতে পার, কবে তিনি আসছেন ? ও কি ! তোমরাও যে অবাক হয়ে চেয়ে রইলে ! চোখের অমন উদাস চাউনি যে আমি সইতে পারিনে ! ওগো, তোমরা কি সব ছবি ? কথা কও না ? হায় হায়—এ কোন দেশে তুমি আমায় রেখে গেছ, কুমার ? ও মা ! চোখের কোণে তোমাদের ও কি গা ? জল নয় ত? সে কি, তোমরাও কথা কইবে না ? তবে কে আশায় বলে দেবে— কবে তুমি আসবে কুমার ? ৱসচক্র রাজশাহী শহরের ক্রোশ-কয়েক দূরে বিরজাপুর গ্রাম। গ্রামটি বড়,—বহু ঘর ব্রাহ্মণ বৈষ্ঠ কায়ন্থের বাস। কিন্তু মৈত্র-বংশের সততা, সাধুতা এবং স্বধৰ্ম্মনিষ্ঠার খ্যাতি গ্রাম উপচাইয়া শহর পর্য্যস্ত ছড়াইয়া পড়িয়াছিল। ইহাদের বিষয়-সম্পত্তি যাহা ছিল, তাহাতে মোট ভাত-কাপড়টাই কোনমতে চলিতে পারিত, কিন্তু তাহার অধিক নয়। অথচ ক্রিয়া-কলাপ কোনটাই বাদ পড়িবার যে ছিল না। অনেকখানি স্থান ব্যাপিয়া ভদ্রাসন, অনেকগুলি মেটে খোড়ে ঘর, মন্তবড় চণ্ডীমণ্ডপ ;–ইহার সকলগুলিই সকল সময়েই পরিপূর্ণ। কিন্তু এ-সব হইত কি করিয়া ? হইত, উপস্থিত তিন ভাই-ই উপার্জন করিতেন বলিয়। বড় শিবরতন গ্রামেই জমিদারী-রাজসরকারে ভাল চাকরি করিতেন ; সেজ শস্তৃরতন সেয়ারের গাড়ীতে জেলা আদালতে পেস্কার করিতে যাইতেন, 836. শরৎ-সাহিত্য-সংগ্রহ . কেবল ন’ বিভূতিরতন ধনী খণ্ডরের কৃপায় কলিকাতায় থাকিয় কোন একটা বড় সওদাগরী অফিসে বড় কাজ পাইয়াছিলেন । মেজ এবং ছোট ভাই শিশুকালেই মারা পড়িয়াছিল, তালিকায় ওই দুটা শূন্তস্থান ব্যতীত আর তাঁহাদের কিছুই फाव*िठे हिल नीं । দিন-দুই হইল দুর্গাপূজা শেষ হইয়া গেছে ; প্রতিমার কাঠামোটা উঠানের একধারে আড়াল করিয়া রাখা হইয়াছে,—সহসা চোখ না পড়ে ; কেবল র্তাহার মঙ্গলঘটটী অজিও বেদীর পাশ্বে তেমনি বসানো আছে। তাহার অস্ত্রিপল্লব আজিও তেমনি স্নিগ্ধ, তেমনি সজীব রহিয়াছে,—এখনও একবিন্দু মলিনতা কোথাও ম্পর্শ করে নাই । সকালে ইহারই অদূরে একটা বড় সতরঞ্চের উপর বসিয়া তিন ভাইয়ের মধ্যে বোধ হয় খরচপত্রের আলোচনাটাই এইমাত্র শেষ হইয়া একটু বিরাম পড়িয়াছিল, বিভূতিরতন একটু ইতস্তত: করিয়া একটু সঙ্কোচের সহিত মুখখান হাসির মত করিয়া কহিল, সেদিন শাশুড়ী-ঠাকরুণ আশ্চৰ্য্য হয়ে বলছিলেন, তোমার মাইনের সমস্ত টাকাটা এক-দফা বাড়িতে দাদার কাছে পাঠিয়ে দিতে হয়। তিনি আবার দরকার-মত কিছু নিয়ে বাকীটা ফিরে পাঠিয়ে-দেন, এতে মাসে মাসে অনেকগুলো টাকা পোষ্ট্রাফিসকে দিতে হয়। সংসার-খরচের খাতাখানা তখনও শিবরতনের সম্মুখে খোলা ছিল,—এবং চক্ষুও তাহার তাহাতেই আবদ্ধ ছিল, অনেকটা অন্যমনস্কের মত বলিলেন, পোষ্ট্রাফিস মনিঅর্ডারের টাকা ছাড়বে কেন হে ? এতে আশ্চৰ্য্য হবার কি আছে ? বিভূতির ধনী শ্বশ্ৰঠাকুরাণীর যে কিছুদিন হইতেই কন্যা-জামাতার সাংসারিক উন্নতির প্রতি দৃষ্টি পড়িয়ছে, এ সংশয় শিবরতনের জন্মিয়াছিল। কিন্তু কণ্ঠস্বরে কিছুই প্রকাশ পাইল না । বিভূতি মনে করিল, দাদা ঠিকমত কথাটাতে কান দেন নাই, তাই আরও একটু স্পষ্ট করিয়া কহিল, আজ্ঞে হা, তা ত বটেই। তাই তিনি বলেন, আপনার অবিশুক-মত টাকাটাই যদি শুধু— শিবরতন চোখ তুলিয়া চাহিলেন ; বলিলেন, আমার আবশ্বক তোমরা জানবে কি করে ? র্তাহার মুখের উপর তেমনি সহজ ও শান্ত ভাব দেখিয়া বিভূতির সাহস বাড়িল, সে প্রফুল্প হইয়া কহিল, আজ্ঞে হুঁ, তাই তিনি বলছিলেন, আপনার চিঠিপত্রের মধ্যে তার একটুখানি আভাস থাকলেও এই বাজে-খরচটা আর হতে পারত না। 8>や শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ বিভূতি কহিল, যে আজ্ঞে, তাই যাবো । শিবরতন আবার কিছুক্ষণ নিঃশব্দে ধূমপান করিয়া একটু হাসিয়া কহিলেন, ন’বৌমার কাছে বড় অপ্রতিভ হয়ে আছি। গত বৎসর তাকে একপ্রকার কথাই দিয়েছিলাম যে, এ-বৎসর তার ছুটি,—এ-বৎসর বাপের বাড়িতে তিনি পূজে দেখবেন । কিন্তু দিন যত ঘনিয়ে আসতে লাগল ততই ভয় হতে লাগল, তিনি না থাকলে ক্রিয়া-কৰ্ম্ম যেন সমস্ত বিশৃঙ্খল, সমস্ত পণ্ড হয়ে যাবে। আদর-অভ্যর্থন করতে, সকল দিকে দৃষ্টি রাখতে র্তার ত আর জোড়া নেই কি না ! এত কাজ, এত গণ্ডগোল, এত হাঙ্গাম,কিন্তু কখনো মাকে বলতে শুনলাম না—এটা দেখিনি, কিংবা এটা ভুলে গেছি। অন্য সময়ে সংসার চলে,—বড়বোঁ ও সেজবেীমাই দেখতে পারেন, কিন্তু বৃহৎ কাজকর্মের মধ্যে আমার ন’বেীমা নেই মনে করলেই ভয়ে যেন আমার হাত-পা গুটিয়ে আসে,-কিছুতে সাহস পাইনে। এই বলিয়া স্নেহে, শ্রদ্ধায় মুখখানি দীপ্ত করিয়া তিনি পুনরায় নীরবে ধূমপান করিতে লাগিলেন। বড়কর্তার ন’বৌমার প্রতি বিশেষ একটু পক্ষপাতিত্ব আছে, ইহা লইয়া বাটীর মধ্যে আলোচনা ত হইতই, এমন কি একটা ঈর্ষার ভাবও ছিল। বড়-বধু রাগ করিয়া মাঝে মাঝে ত স্পষ্ট করিয়াই স্বামীকে শুনাইয়া দিতেন ; এবং সেজ-বধু আড়ালে অসাক্ষাতে এরূপ কথাও প্রচার করিতে বিরত হইতেন না যে, ন'বে শুধু বড়লোকের মেয়ে বলিয়াই এই খোসামোদ করা । নইলে আমরা দু’জায়ে এগারো মাসই যদি গৃহস্থালীর ভার টানতে পারি ত পূজার মাসটা আর পারি না ! বড়মামুষের মেয়ে না এলেই কি মায়ের পূজে আটকে যাবে ? এই-সকল প্রচ্ছন্ন শব্দভেদী বাণ যথাকালে যথাস্থানে আসিয়াই পোছিত, কিন্তু শিবরতন না হইতেন বিচলিত, না করিতেন প্রতিবাদ । হয়ত-বা কেবল একটুখানি মুচকিয়া হাসিতেন মাত্র। বিভূতি অধিক উপার্জন করে, তাহাকে বারোমাস বাসা করিয়া কলিকাতাতেই থাকিতে হয়, সুতরাং ন’বধুমাতার তথায় না থাকিলে নয়। এ-কথা তিনি বেশ বুঝিতেন, কিন্তু অবুঝের দল কোনমতেই স্বীকার করিতে চাহিত না । তাহদের একজনকে সংসারের মামুলি এবং মোট কাজগুলা সারা বৎসর ধরিয়াই করিতে হয় না। কেবল মহামায়ার পূজা-উপলক্ষে হঠাৎ একসময়ে আসিয়া সমস্ত দায়িত্ব, সকল কর্তৃত্ব নিজের হাতে লইয়া তাহা নির্বিবন্ধে শেষ করিয়া দিয়া, ঘরের এবং পরের সমস্ত মুখ্যাতি আহরণ করিয়া লইয়া চলিয়া যায়,-সে না থাকিলে এ-সব যেন কিছু হইতে পারিত না, সমস্তই যেন এলোমেলো হইয়া উঠিত, লোকের মুখের ও চোখের এইসকল ইঙ্গিতে মেয়েদের চিত্ত একেবারে 8չե՝ অপ্রকাশিত রচনাবলী শিবরতন তাহার হিসাবের খাতার প্রতি পুনরায় দৃষ্টি আনত করিয়া জবাব দিলেন, র্তাকে ব’লো, দাদা একে বাজে খরচ বলেও মনে করেন না, চিঠিপত্রে আভাস দেওয়াও দরকার ভাবেন না । যোগীন, তামাক দিয়ে যা । বিভূতি পাংশু-মুখে স্তন্ধ হইয়া বসিয়া রহিল এবং শস্তু দাদার আনত মুখের প্রতি কটাক্ষে চাহিয়া হাতের খবরের কাগজে মনোনিবেশ করিল। কিছুক্ষণ পৰ্য্যন্ত কাহারে মুখেই কথা রহিল না,—একটা অবাঞ্ছিত নীরবতায় ঘর ভরিয়া রহিল। কিন্তু ইহার অর্থ বুঝিতে হইলে এই মৈত্রেয়-বংশের ইতিবৃত্তটাকে আরও একটু পরিস্ফুট করা প্রয়োজন। এই বিরাজপুরে ইহাদের সাত-আট পুরুষেরও অধিককাল বাস হইয়া গেছে, অনেক ঘর-দ্বার ভাঙ্গাগড়া হইয়াছে, অনেক ঘর-দ্বার আবশ্বক-মত বাড়ানো কমানো হইয়াছে। কিন্তু সাবেক-দিনের সেই রন্ধনশালাটি আজও তেমনি একমাত্র ও অদ্বিতীয় হইয়াই রহিয়াছে। কখনো তাহীকে বিভক্ত করা হয় নাই, কখনো তাহাতে আর একটা সংযুক্ত করিবার কল্পনা পৰ্য্যন্ত হয় নাই। এই পরিবার চিরদিন একান্নবৰ্ত্তী, চিরদিনই যিনি বড়, তিনি বড় থাকিয়াই জীবনপাত করিয়া গেছেন,— পরে জন্সিয়া অগ্রজের সর্বময় কর্তৃত্বকে কেহ কোনদিন প্রশ্ন করিবার অবকাশ পৰ্যন্ত পায় নাই । সেই বংশের আজ যিনি বড়, সেই শিবরতন যখন ছোট ভাইয়ের অত্যন্ত দুরূহ সমস্তার শুধু কেবল একটা ‘প্রয়োজন নাই বলিয়াই নিম্পত্তি করিয়া দিলেন, তখন বড়মানুষ শ্বশুর-শাশুড়ীর নিরতিশয় ক্রুদ্ধ মুখ মনে করিয়াও বিভূতির এমন সাহস হুইল না যে, এই বিতর্কের একটুকুও জের টানিয়া চলে। চাকর তামাক দিয়া গেল, শিবরতন খাতা বন্ধ করিয়া তাহা হাত-বাক্সে বন্ধ করিয়া অত্যন্ত ধীরে-সুস্থে ধূমপান করিতে করিতে বলিলেন, তোমার ছুটি আর ক'দিন রইল বিভূতি ? আজ্ঞে ছ’দিন । শিবরতন মনে মনে হিসাব করিয়া বলিলেন, তা হলে শুক্রবারেই তোমাকে রওনা হতে হবে দেখছি । 嗜 বিভূতি যুদ্ধকষ্ঠে বলিল, আজ্ঞে দ্বা। কিন্তু এই সময়টায় বড় বেশী কাজকৰ্ম্ম, তাই— শিবরতন কছিলেন, তা বেশ । না হয়, দু’দিন পূৰ্ব্বেই যাও। দেবীপক্ষ-দিনক্ষণ দেখার আর আবশ্বক নেই-সবই স্থদিন। তা হলে পরও বুধবারেই রওনা হয়ে পড়, কি বল ? 8ՖԳ শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ বছরের জন্তে আমাকে নিশ্চিন্ত করে যেতে পারতেন, কেন না, এ-সকল কাজ আর কোন বৌয়ের দ্বারাই অমন শৃঙ্খলায় হয় না,–কিন্তু কি আর করা যাবে । নিয়ে গিয়ে দু’দশদিন তার মায়ের কাছে দিয়ে, তবু বোনদের সঙ্গে দিন-কতক আনন্দে কাটাতে পারবেন। বিভূতি, তোমার বাসায় ত বিশেষ কোন অসুবিধা হবে না ? বিভূতি কহিল, আজ্ঞে না, অসুবিধা কিছুই হবে না। শিবরতন বলিলেন, বেশ তাই ক’রে । ন’বৌমা বাড়ি ছেড়ে যাবেন মনে হলেও আমার বিজয়ার দুঃখ যেন বেশী করে উথলে ওঠে,–কিন্তু কি আর করা যাবে। সবই মহামায়ার ইচ্ছা। সারা বছর সবাইকে নিয়ে সংসার করা—বলিয়া তিনি একটা দীর্ঘ-নিঃশ্বাস চাপিয়া ফেলিয়া বোধ করি আরও কি একটু বলিতে যাইতেছিলেন, কিন্তু অকস্মাৎ উপস্থিত সকলেই একেবারে চমকিত হইয়া উঠিলেন। বৃদ্ধ জননী কঁাদিতে কঁাদিতে একেবারে প্রাঙ্গণের মাঝখানে আসিয়া দাড়াইয়াছিলেন। শিবরতন শশব্যস্তে হ’ক রাখিয়া উঠিয়া দাড়াইলেন, শস্তু এবং বিভূতি তাহারাও অগ্রজের সঙ্গে দাড়াইয়া উঠিল ; মা কঁদিতে কঁাদিতে ধলিলেন,— শিবু, আমার গুরুর দিব্বি রইল, তোদের বাড়িতে আর আমি জল গ্রহণ করব না, যদি ন এর বিচার করিস। ন'বোঁ বড়লোকের বেটী, আজ আমাকে জুতো ছুড়ে মেরেছে ! সম্মুখে বজাঘাত হইলেও বোধ করি ভাইয়ের অধিক চমকিত হইতেন না । বিভূতি ভয়ে পাংগু হইয়া উঠিল, শিবরতন বিশ্বয়ে হতবুদ্ধি হইয়া বলিয়া উঠিলেন, ন’বেীমা ! একি কখনো হতে পারে মা ? মা তেমনি রোদন-বিকৃত-কণ্ঠে কহিলেন, হয়েও কাজ নেই বাবা, ও যে নবোঁ । বড়লোকের মেয়ে ! তা যাই হোক, যখন গুরুর নাম নিয়ে দিব্বি করেচি, তখন বাড়িতে রেখে বুড়ে মাকে আর মেরো না বাবা, আজই কাণী পাঠিয়ে দাও। যাই তাদের চরণেই আশ্রয় নিই গে । 幡 দেখিতে দেখিতে ছেলে-মেয়ে দাসী-চাকরে প্রায় ভীড় হইয়া উঠিয়াছিল, শিবরতন র্তার ছোট মেয়ে গিরিবালার প্রতি চাহিয়া কহিলেন, কি হয়েচে রে, গিরি, তুই জানিস? গিরিবালা মাথা নাড়িয়া বলিল, জানি বাবা —এই বলিয়া সে সাণ্ডেলদের সরীয় সন্দেশ কম হইবার বিবরণ সবিস্তারে বিবৃত করিয়া কহিল, ঠাকুরমা ন’খুড়ীমাকে বজ9 গলাগলি দিচ্ছিলেন, বাবা ! 8는 অপ্রকাশিত রচনাবলী দগ্ধ হইয়। যাইত। কাজকৰ্ম্ম অন্তে এই লইয়া প্রতি বৎসরেই কিছু-না-কিছু কলহবিবাদ হইতই । বিশেষ করিয়া মা আজও জীবিত আছেন এবং আজও তিনি গৃহিণী। কিন্তু বয়স অত্যন্ত বেশী হইয় পড়ায় অপরের দোষ-ত্রুটি দেখাইয়া তিরস্কার ও গালি-গালাজ করার কাজটুকু মাত্র হাতে রাখিয়া গৃহিণীপনার বাকী সমস্ত দায়িত্বই তিনি স্বেচ্ছায় বড় ও সেজ-বধুমাতার হাতে অর্পণ করিয়া নিশ্চিন্ত হইয়াছেন। তিনি ন'বোঁকে একেবারে দেখিতে পারিতেন না । সে সুন্দরী, সে বড়লোকের মেয়ে, তাহার কাপড়-গহনা প্রয়োজনের অতিরিক্ত, তাহাকে সংসার করিতে হয় না, সে চিঠি লিখিতে পারে, অহঙ্কারে তাহার মাটিতে পা পড়ে না, ইত্যাদি নালিশ এগারে মাস-কাল নিয়ত শুনিতে শুনিতে এই বধুটির বিরুদ্ধে মন র্তাহার তিক্ততায় পরিপূর্ণ হইয়া থাকিত ; এবং এই দীর্ঘকাল পরে সে যখন গৃহে প্রবেশ করিত, তখন তাহ অনধিকার-প্রবেশের মতই তাহার ঠেকিত । কাল হইতে একটা কথা উঠিয়াছে যে, ধরণী সাণ্ডেলদের বাড়ির মেয়েদের সরায় সন্দেশ দুটো করিয়া কম পড়িয়াছে, এবং কম পড়িয়াছিল কেবল তাহারা গরীব বলিয়াই। এই দুর্নাম শুধু গ্রামে নয়, তাহা শহর ছাড়াইয়া না-কি বিলাত পৰ্য্যন্ত পেছিবার উপক্রম করিয়াছে,--এই দুঃসংবাদ গৃহিণীর কানে গেল যখন তিনি আহিকে বসিতেছিলেন। তখন হইতে ছত্রিশ ঘণ্টা কাটিয়া গেছে,—মালাআহিকের যথেষ্ট বিঘ্ন ঘটিয়াছে, কিন্তু আলোচনার শেষ হইতে পায় নাই। দোষ শুধু ন’বৌমার এ-বিষয়েও যেমন কাহারও সংশয় ছিল না, এবং নিজে সে বড়লোকের মেয়ে বলিয়াই ইচ্ছা করিয়া দরিদ্র-পরিবারের অপমান করিয়াছে, ইহাতেও তেমনি কাহারও সন্দেহ ছিল না । ন’বেী যে সকল কথাই নীরবে সহ করিয়া যাইত তাহা নয়,—মাঝে মাঝে সেও উত্তর দিত, কিন্তু তাহার কোন উত্তরটাই সোজা শাশুড়ীর কানে পৌছিত না, পোছিত প্রতিধ্বনিত হইয়া । তাই তাহার বক্তব্যটা লোকের মুখে মুখে যা খাইয়া কেবল বিকৃতই হইত না, তাহার রেশটাও সহজে মিলাইতে চাহিত না । সকালে আজ বাটীর মধ্যে যখন এই অবস্থা—সাল্প্যাল-পরিবারের মিষ্টাল্পের নূ্যনতা লইয়া ন’বধূর সম্বন্ধে আলোচনা যখন তুমুল হইয়া উঠিয়াছে, বাহিরে তখন শিবরতন সেই ন’বধুমাতারই প্রশংসায়-মুক্তকণ্ঠ হইয়া উঠিয়াছিলেন। শিবরতন কহিলেন, বুধবারে ন'বোর্মাকেও সঙ্গে নিয়ে যাও । মা আমার আরও কিছুদিন এখানে থেকে যেতে পারলে যেখানের যা-সমস্ত গুছিয়ে-গাছিয়ে সারা 8ᎼᎽ సిā-&sరి অপ্রকাশিত রচনাবলী শিবরতন কহিলেন, তার পরে ? মেয়ে বলিল, ন’খুড়ীমা মুখ বুজে ঋণট দিচ্ছিলেন, স্বমুখে ন’কাকার জুতাজোড়াটা ছিল, তাই পা দিয়ে শুধু ফেলে দিয়েছিলেন। শিবরতন প্রশ্ন করিলেন, তার পরে ? গিরি কহিল, এক পাটি জুতো ছিটকে এসে ঠাকুরমার পায়ের কাছে পড়েছিল। শিবরতন শুধু কহিলেন, হ!—মায়ের প্রতি চাহিয়৷ বলিলেন, ভেতরে যাও মা ! এর বিচার যদি না হয় ত তখন কাণীতেই চলে যেয়ো । একে একে ধীরে ধীরে সবাই প্রস্থান করিল, শুধু কেবল তিন ভাই সেইখানে স্তন্ধ হইয়া বসিয়া রহিলেন। ভূত্য তামাক দিয়া গেল, কিন্তু সে শুধু পুড়িতেই লাগিল, শিবরতন স্পর্শ করিলেন না। প্রায় আধ ঘণ্টাকাল এইভাবে নিঃশব্দে বসিয়া থাকিয অবশেষে মুখ তুলিয়া বলিলেন, বিভূতি ? বিভূতি সসন্ত্রমে কহিল, আজ্ঞে ? শিবরতন বলিলেন, তোমার স্ত্রীর শাস্তি তুমি ছাড়া আর কারও দেবার অধিকার নেই। বিভূতি আশঙ্কায় পরিপূর্ণ হইয়া ক্ষীণ-কণ্ঠে বলিল, আজ্ঞ করুন। শিবরতন বলিলেন, ঐ জুতো তোমার স্ত্রীর মাথায় তুমি তুলে দেবে। উঠানের মাঝখানে তিনি মাথায় নিয়ে সমস্ত বেলা দাড়িয়ে থাকবেন । তোমার উপর এই আমার আদেশ । আদেশ শুনিয়া বিভূতির মাথার মধ্য দিয়া বিদ্যুৎ বহিয়া গেল। তাহার শ্বশুর-শাশুড়ীর মুখ, শালী-শালাজদের মুখ, চাকরীর মুখ, স্ত্রীর মুখ, সমস্ত একই সঙ্গে মনে পড়িয়া মুখখান ভযে ভাবনায় বিবর্ণ হইয়া উঠিল ; সে জড়িত-কণ্ঠে কহিতে চাহিল,—কিন্তু দাদা, দোষের বিচার না করেই— শিবরতন শাস্ত-স্বরে কহিলেন, ম৷ অত্যন্ত অপমানিত বোধ করেচেন, এ তোমরাও দেখলে। তার কি দোয, কতখানি দোষ, এ বিচারের ভার আমার ওপর নেই। যাদের বিচার করতে পারি তাদের প্রতি আমার এই আদেশ রইল। এখন কি করবে সে তুমি জানে । বিভূতি কহিল, আপনার হুকুম চিরদিন মাথায় বয়ে এসেচি দাদা, কোনদিন কোন স্বাধীনতা পাইনি। আজও তাই হবে, কিন্তু—— এই কিন্তুটা সেও শেষ করিতে পারিল না, শিবরতনও নীরবে অধোমুখে বসিয়া রছিলেন 8&> শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ বিভূতি ক্ষণকাল চুপ করিয়া থাকিয়া বোধ করি বা দাদার কাছে কিছু প্রত্যাশা করিল। কিন্তু কিছুই না পাইয়া সে উঠিয় দাড়াইয়া বলিল, দাদা, আমি চললুম— এই বলিয়া সে ধীরে ধীরে অন্তঃপুরের অভিমুখে প্রস্থান করিল। শিবরতন কোন কথা কহিলেন না, তেমনি অধোমুখে স্থির হইয়া বসিয়া রহিলেন । পূজার বাড়ি, আজও আত্মীয়, অনাত্মীয়, কুটুম্ব, প্রতিবেশী ছেলেমেয়ে চাকরদাসীতে পরিপূর্ণ । এই-সকলের মাঝখানে যে নবউমা তাহার প্রাণাধিক স্নেহের পাত্রী, তাহারই এতবড় অপমান, এতবড় শাস্তি যে কি করিয়া অনুষ্ঠিত হইবে তাহা তিনি নিজেও ভাবিয়া পাইলেন না । তাছার নত নেত্র হইতে বড় বড় তপ্ত অশ্রুর ফোটা টপ টপ করিয়া মেঝের উপর ঝরিয়া পড়িতে লাগিল,—কিন্তু বিভূতি’ বলিয়া একবার ফিরিয়া ডাকিতে পারিলেন না । কেবল মনে মনে প্রাণপণ-বলে বলিতে লাগিলেন–কিন্তু, কিন্তু মা যে ! মা যে ! তার যে অপমান হয়েচে ! * ‘সধবাৱ একাদশী’ এই সুপরিচিত গ্রন্থখানির ভূমিকা লিখিতে যাওয়াই বোধ করি একটা বাড়াবাড়ি। অথচ এই কাজের জন্যই আমি অমুরুদ্ধ হইয়াছি। খুব সম্ভব, আমাকেই ইহার যোগ্য ব্যক্তি কল্পনা করিয়া লইয়াছেন। যে-বইয়ের দোষ-গুণ আজ অৰ্দ্ধ-শতাব্দীকাল ধরিয়া যাচাই হইতেছে,—বিশেষত:, যে মারাত্মক উৎপাত কাটাইয়া সম্প্রতি ইহা খাড়া হইয়া উঠিল, তাহাতে মূল্য লইয় ইহার আর দরদপ্তর করা সাজে না । বাঙলা-সাহিত্যের ভাণ্ডারে এ একখানি জাতীয় সম্পত্তি—এ সত্য মানিয়া লওয়াই ভাল । অতএব, গ্রন্থ-সম্বন্ধে নয়, আমি ইহার সংস্করণ-সম্বন্ধেই দুই-একটা কথা বলিব ।

  • "য়লচক্ৰ" নামে বারোয়ারী উপস্তাসের সুচন-স্বরূপ শরৎচন্দ্র-রচিত অংশ।

8૨૨ অপ্রকাশিত রচনাবলী অত্যন্ত দুর্দিনে দেশের অনেক বহুমূল্য বস্তুই বটতলার সংস্করণ সঞ্জীবিত রাখিয়াছে, —তাই আজ তাহাদের অনেকেরই ভদ্র সাজ-সজ্জা সম্ভবপর হইতে পারিয়াছে, এবং বাঙালীর সম্পত্তি বলিয়াও গণ্য হইয়াছে । জানি না, ইহারও কোনদিন বটতলার ছায়ায় মাথা বাচাইবার প্রয়োজন ঘটিয়াছে কি না, কিন্তু আমার বক্তব্য শুধু এই যে, যে-কোন সংস্করণই এতদিন যাবৎ ইহার প্রাণ বঁাচাইয়া আসিয়াছে, তাহার যত দোষ যত ক্রটিই থাকৃ, সে কেবল আমাদের কৃতজ্ঞতা নয়, ভক্তিরও পাত্র । অথচ শুনিতেছি, বাঙলা-সাহিত্যের সে দুঃসময় আর নাই । তাই, দুঃখ যদি আজ সত্যই ঘুচিয়া থাকে ত, যে-সকল গ্রন্থ আমাদের ঐশ্বৰ্য্য, আমাদের গৌরব, তাহাদের মলিন জীর্ণ বাস ঘুচাইবারও প্রয়োজন হইয়াছে। প্রকাশক বলিতেছেন, সেই উদ্দেশ্বেই এই নিভুল সুন্দর সংস্করণ, এবং একথানি মাত্র বই-ই তাহীদের প্রথম ও শেষ উদ্যম নয়। উদ্দেশু সাধু, এবং প্রার্থনা করি, ইহা জয়যুক্ত হউক ; কিন্তু ইহাও জানি, প্রকাশক কেবল সঙ্কল্প করিতেই পারেন, কিন্তু ইহার স্থায়িত্ব ও সিদ্ধি যাহাঁদের হাতে, সেই দেশের পাঠক-পাঠিক যদি না চোখ মেলিয়া চান ত, কিছুতেই কিছু হইবে না। কিন্তু এতবড় কলঙ্কের কথাও আমার ভাবিতে ইচ্ছা করে না । fzTR5 ergf5 asptzi Oxford Press World's Classics zijn ftal একটির পরে একটি যে-সকল অমূল্য গ্রন্থরাজি প্রকাশ করিতেছেন, তাহারই সহিত এই নব-স"স্করণের একটা তুলনা করিবার কথা উঠিয়াছিল, কিন্তু আমি বলি– আজি নয় । হয়ত অনতিকাল মধ্যেই একদিন তাহার সময় আসিবে, কিন্তু তখন বাঙলা দেশকে সে শুভ-সংবাদ নিবেদন করিতে যোগ্যতর ব্যক্তিরও অভাব হইবে না । * শিবপুর, ৬ই ফাল্গুন, ১৩২৬ ।

  • দীনবন্ধুক্ষিত্র লিখিত সধবার একাদশী গ্রন্থের ভূমিকা ।

৪২৩ গ্রন্থ-পরিচয় শেষ প্রশ্ন প্রথম প্রকাশ–“ভারতবর্ষ মাসিক পত্রে ধারাবাহিকভাবে :–১৩৩৪ বঙ্গাব্দ, শ্রাবণ—কাৰ্ত্তিক, মাঘ—চৈত্র ; ১৩৩৫ বঙ্গাবা, জ্যৈষ্ঠ—শ্রাবণ, কাৰ্ত্তিক, পৌষ ও ফান্ধন ; ১৩৩৬ বঙ্গাবা, বৈশাখ, শ্রাবণ, কাৰ্ত্তিক, পৌষ, ফান্ধন ও চৈত্র ; ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ, বৈশাখ। পুস্তকাকারে প্রকাশ–বৈশাখ, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দ (২রা মে, ১৯৩১ ) । গ্রন্থকারকর্তৃক পরিমার্জিত ও বিশেষভাবে প্রথমাংশে পরিবর্তিত হইয়া প্রকাশিত । স্বামী প্রথম প্রবণশ–১৩২৪ বঙ্গাব্দ, শ্রাবণ ও ভাদ্র সংখ্যা “নারায়ণ’ মাসিক পত্রে । পুস্তকাকারে প্রকাশ–ফাঙ্কন, ১৩২৪ বঙ্গাব্দ ( ১৮ই ফেব্রুয়ারী, ১৯১৮) । ‘একাদশী বৈরাগী’ নামক গল্পটীও ইহার সহিত সন্নিবেশিত হয়। একাদশী বৈরাগী প্রথম প্রকাশ–১৩২৪ বঙ্গাব্দ, কাৰ্ত্তিক সংখ্যা ‘ভারতবর্ষ’ মাসিক পত্রে । পুস্তকাকারে প্রকাশ–ফাল্গুন, ১৩২৪ বঙ্গাব, ‘স্বামী’ গল্পের সহিত একত্র প্রকাশিত হয় । मांज्ञौज्ञ शूला প্রথম প্রকাশ—১৩২০ বঙ্গাব্দ, বৈশাখ-আষাঢ় ও ভাদ্র–আশ্বিন সংখ্য যমুনা” মাসিক পত্রিকায় । এই ধারাবাহিক অংশগুলি ‘শ্ৰীমতী আনিলা দেবী’ ছদ্মনামে প্রকাশিত । পুস্তকাকালে প্রকাশ–চৈত্র, ১৩৩০ বঙ্গাব্দ ( ১৮ই মার্চ ১৯২৪)। 8 R&