প্রধান মেনু খুলুন

অপ্রকাশিত রচনাবলী সবিনয়ে কহিল, আজ্ঞে, তার সমস্তই জানেন, তবে কি-না ওতে দেশের দুঃখ-েৈস্তর কথা আছে, তাই ওটা আবৃত্তি করা যায় না-ওটা "সিডিশন’ । কহিলাম—-কে বলিল ? ছেলেটি জবাব দিল—আমাদের কর্তৃপক্ষর । যাক,—বাচা গেল। কর্তৃপক্ষ এদিকেও আছেন । অৰ্ব্বাচীন শিশুগুলার মঙ্গল চিন্তা করিতে এ-পক্ষেও পাকা মাথার অভাব ঘটে নাই। প্রশ্ন করিলাম—আচ্ছা তোমরা এই কবিতাংশগুলি সভায় আবৃত্তি করিতে পার না ? সে কহিল, পারি, কিন্তু তারা বলেন, পারা উচিত নয়, ফ্যাসাদ বাধিতে পারে। আর প্রশ্ন করিতে প্রবৃত্তি হইল না । দেশের যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ কবি, যিনি নিষ্পাপ, নিৰ্ম্মল—স্বদেশের হিতার্থে যে কবিতা তাহার অন্তর হইতে উখিত হইয়াছে, প্রকাষ্ঠ সভায় তাহার আবৃত্তি সিডিশন’—তাহ অপরাধের । এবং এই সত্য দেশের ছেলের আজ কর্তৃপক্ষের কাছে শিক্ষা করিতে বাধ্য হইতেছে। এবং কর্তৃপক্ষের অকাট্য যুক্তি এই যে,-ফ্যাসাদ বাধিতে পারে। ৱস-(সবায়েত শ্ৰীযুক্ত আত্মশক্তি’-সম্পাদক মহাশয় সমীপেযু৮– আপনার ৩০শে ভান্দ্রের ‘আত্মশক্তি’ কাগজে মুসাফির-লিথিত ‘সাহিত্যের মামলা’ পড়িলাম। একদিন বাঙলা-সাহিত্যে সুনীতি-দুর্নীতির আলোচনায় কাগজে কাগজে অনেক কঠিন কথার স্বষ্টি হইয়াছে, আর অকস্মাৎ আজি সাহিত্যের রিসে’র আলোচনায় তিক্ত রসটাই প্রবল হইয়া উঠিতেছে। এমনিই হয়। দেবতার মন্দিরে সেবকের পরিবর্তে সেবায়েতের সংখ্যা বাড়িতে থাকিলে দেবীর ভোগের বরাদ্দ বাড়ে না, কমিয়াই যায়, এবং মামলা ত থাকেই। আধুনিক সাহিত্যসেবীদের বিরুদ্ধে সম্প্রতি বহু কুবাক্য বর্ধিত রইয়াছে। বর্ষণ করার পুণ্য-কৰ্ম্মে যাহারা নিযুক্ত, আমিও তাঁহাদের একজন। শনিবারের চিঠি’র পাতায় তাহার প্রমাণ আছে । 8 రివె শরৎ-সাহিত্য-সংগ্ৰহ মুসাফির-রচিত এই “সাহিত্যের মামলা’র অধিকাংশ মস্তব্যের সহিতই আমি একমত, শুধু তাহার একটি কথায় যৎকিঞ্চিৎ মতভেদ আছে। রবীন্দ্রনাথের ব্যাপার রবীন্দ্রনাথ জানেন, কিন্তু আমার নিজের কথা যতটা জানি তাহাতে শরৎচন্দ্র “কল্লোল’, ‘কালি-কলম’ বা বাঙলার কোন কাগজই পড়েন না বা পড়িবার সময় পান না, মুসাফিরের এ অনুমানটি নিভুল নয়। তবে এ-কথা মানি যে, সব কথা পড়িয়াও বুঝি না, কিন্তু না-পড়িয়াও সব বুঝি, এ দাবী আমি করি না। এ ত গেল আমার নিজের কথা । কিন্তু যা লইয়া বিবাদ বাধিয়াছে সে জিনিসটি যে কি, এবং যুদ্ধ করিয়া যে কিরূপে তাহার মীমাংসা হইবে সে আমার বুদ্ধির অতীত। রবীন্দ্রনাথ দিলেন সাহিত্যের ধৰ্ম্ম নিরূপণ করিয়া, এবং নরেশ দিলেন সেই ধৰ্ম্মের সীমানা নির্দেশ করিয়া। যেমন পাণ্ডিত্য তেমনিই যুক্তি, পড়িয়া মুগ্ধ হইয়া গেলাম। ভাবিলাম, ব্যস, ইহার পরে আর কথা চলিবে না। কিন্তু অনেক কথাই চলিল। তখন কে জানিত কাহার সীমানায় কে পা বাড়াইয়াছে, এবং সেই সীমানার চৌহদ্দি লইয়া এত লাঠি-ঠ্যাঙ্গ উদ্যত হইয়া উঠিবে ! আশ্বিনের ‘বিচিত্রা’য় শ্ৰীযুক্ত দ্বিজেন্দ্রনারায়ণ বাগচী মহাশয় ‘সীমানা বিচারে’র রায় প্রকাশ করিয়াছেন। ঠাসবুনানি বিশ পৃষ্ঠা-ব্যাপী ব্যাপার। কত কথা, কত ভাব । যেমন গভীরতা, তেমনি বিস্তৃতি, তেমনি পাণ্ডিত্য। বেদ, বেদান্ত, দ্যায়, গীতা, বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, কালিদাসের ছড়া, উজ্জলনীলমণি, মায় ব্যাকরণের অধিকরণ কারক পর্য্যন্ত । বাপরে বাপ । মামুযে এত পড়েই বা কখন, এবং মনে রাখেই বা কি করিয়া ! ইহার পার্শ্বে ‘লাল শালু-মণ্ডিত বংশখণ্ড-নির্মিত ক্রীড়া-গাওঁীব-ধারী নরেশচন্দ্র একেবারে চ্যাপটাইয়া গিয়াছেন। আজ ছেলেবেলার একটা ঘটনা মনে পড়িতেছে। আমাদের অবৈতনিক নব-নাট্যসমাজের বড় অ্যাক্টর ছিলেন নরসিংহবাবু। রাম বল, রাবণ বল, হরিশ্চন্দ্র বল, র্তাহারই ছিল একচেটে । হঠাৎ আর একজন আসিয়া উপস্থিত হইলেন, তার নাম রাম-নরসিংবাবু। আরও বড় অ্যাক্টর । যেমন দরাজ গলার হুঙ্কার, তেমনি হস্ত-পদ সঞ্চালনের অপ্রতিহত পরাক্রম। যেন মত্ত হস্তী। এই নবাগত রাম-নরসিংবাবুর দাপটে আমাদের শুধু নরসিংবাবু একেবারে তৃতীয়ার শশিকলার স্থায় পাণ্ডুর হইয়া গেলেন। নরেশবাবুকে দেখি নাই, কিন্তু কল্পনায় র্তাহার মুখের চেহারা দেখিয়া বোধ হইতেছে, যেন তিনি যুক্ত-হস্তে চতুরাননকে গিয়া বলিতেছেন, প্ৰভু ! ইহার চেয়ে যে আমার বনে বাস করা ভাল। দ্বিজেন্দ্রবাবুর তর্ক করিবার রীতিও যেমন জোরালো, দৃষ্টিও তেমনি ক্ষুরধার। রায়ের মুসাবিদায় কোথাও একটি অক্ষরও যেন ফাক না পড়ে এমনি সতর্কত। যেন 8S e অপ্রকাশিত রচনাবলী বেড়াজালে ঘেরিয়া রুই-কাতল হইতে শামুক-গুগলি পৰ্য্যন্ত ছাকিয়া তুলিতে বদ্ধপরিকর। হায় রে বিচার ! হায় রে সাহিত্যের রস ! মথিয়া মথিয়া আর তৃপ্তি নাই । ডাইনে ও বামে রবীন্দ্রনাথ ও নরেশচন্দ্রকে লইয়া অক্লান্তকৰ্ম্মী দ্বিজেন্দ্রনাথ নিরপেক্ষ সমান-তালে যেন তুলাধুনা করিয়াছেন। কিন্তু ততঃ কিম ? এই কিম্‌টুকুই কিন্তু ঢের বেশী চিন্তার কথা । নরেশচন্দ্র অথবা দ্বিজেন্দ্রনাথ ইহারা সাহিত্যিক মানুষ। ইহাদের ভাব-বিনিময় ও প্রতি-সম্ভাষণ বুঝা যায়। কিন্তু এইসকল আদর-আপ্যায়নের স্বত্র ধরিয়া যখন বাহিরের লোকে আসিয়া উৎসবে যোগ দেয়, তখন তাহদের তাওব-নৃত্য থামাইবে কে ? i. একটা উদাহরণ দিই। এই আশ্বিনের প্রবাসী’ পত্রিকায় শ্ৰব্ৰজদুল্লভ হাজরা বলিয়া এক ব্যক্তি রস ও রুচির আলোচনা করিয়াছেন । ইহার আক্রমণের লক্ষ্য হইতেছে তরুণের দল। এবং নিজের রুচির পরিচয় দিতে গিয়া বলিতেছেন, “এখন যেরূপ রাজনীতির চর্চায় শিশু ও তরুণ, ছাত্র ও বেকার ব্যক্তি সতত নিরত", সেইরূপ অর্থে পার্জনের জন্যই এই বেকার সাহিত্যিকের দল গ্রন্থরচনায় নিযুক্ত। এবং তাঁহার ফল হইয়াছে এই যে, “হাড়ি চড়াইয়৷ কলম ধরিলে যাহা হইবার তাহাই হইয়াছে।” এই ব্যক্তি ডেপুটিগিরি করিয়া অর্থ সঞ্চয় করিয়াছে, এবং আজীবন গোলামির পুরষ্কার মোট পেন্সনও ইহার ভাগ্যে জুটিয়াছে। তাই সাহিত্যসেবীর নিরতিশয় দারিদ্র্যের প্রতি উপহাস করিতে ইহার সঙ্কোচের বাধা নাই। লোকটি জানেও না যে, দরিদ্র্য অপরাধ নয়, এবং সৰ্ব্বদেশে ও সৰ্ব্বকালে ইহারা অনশনে প্রাণ দিয়াছে বলিয়াই সাহিত্যের আজ এত বড় গৌরব । ব্ৰজদুল্ল ভবাবু না জানিতে পারেন, কিন্তু “প্রবাসী’র প্রবীণ ও সহৃদয় সম্পাদকের ত এ-কথা অজানা নয় যে, সাহিত্যের ভালো-মন্দর আলোচনা ও দরিদ্র সাহিত্যিকের হাড়ি-চড়া না-চড়ার আলোচনা ঠিক এক বস্তু নয়। আমার বিশ্বাস, র্তাহার অজ্ঞাতসারেই এতবড় কটুক্তি র্তাহার কাগজে ছাপা হইয় গেছে। এবং এজন্ত তিনি ব্যথাই অনুভব করিবেন। এবং হয়ত, র্তাহার লেখকটিকে ডাকিয় কানে কানে বলিয়া দিবেন, বাপু, মানুষের দৈন্তকে খোটা দেওয়ার মধ্যে যে রুচি প্রকাশ পায় সেটা ভজ-সমাজের নয় এবং ঘাট-চুরির বিচারে পরিপক্কতা অর্জন করিলেই সাহিত্যের *রসে’র বিচারে অধিকার জন্মায় না । এ দুটোর প্রভেদ আছে,–কিন্তু সে তুমি বুঝিবে না। ইতি ৫ই আশ্বিন, ১৩৩৪ । 8} > RT-t