রাজযোগ/প্রথম অধ্যায়


 

রাজযোগ

Rajyogepage1part2image.png

প্রথম অধ্যায়

Rajyogepage1part1image.png

অবতরণিকা

 আমাদের সকল জ্ঞানই স্বানুভূতির উপব নির্ভর করে। আনুমানিক জ্ঞানের (সামান্য হইতে সামান্যতর বা সামান্য হইতে বিশেষ জ্ঞান, উভয়ের) ভিত্তি—স্বানুভূতি। সেগুলিকে নিশ্চিতবিজ্ঞান[১] বলে, তাহাদের সত্যতা লোকে সহজেই বুঝিতে পাবে, কারণ, উহারা প্রত্যেক লোককেই নিজে সেই বিষয় সত্য কিনা দেখিয়া তবে বিশ্বাস করিতে বলে। বিজ্ঞানবিৎ তোমাকে কোন বিষয় বিশ্বাস করিতে বলিবেন না। তিনি নিজে কতকগুলি বিষয় প্রত্যক্ষ অনুভব করিয়াছেন ও সেইগুলির উপর বিচার করিয়া কতকগুলি সিদ্ধান্তে উপনীত হইয়াছেন। যখন তিনি তাঁহার সেই সিদ্ধান্তগুলিতে আমাদিগকে বিশ্বাস করিতে বলেন, তখন তিনি মানবসাধারণের অনুভূতির উপর উহাদের সত্যাসত্য নির্ণয়ের ভার প্রক্ষেপ করিয়া থাকেন। প্রত্যেক নিশ্চিতবিজ্ঞানেরই (Exact Science) একটি সাধারণ ভিত্তিভূমি আছে, উহা হইতে যে সিদ্ধান্তসমূহ লব্ধ হয়, সকলেই ইচ্ছা করিলে উহাদের সত্যাসত্য তৎক্ষণাৎ বুঝিতে পাবেন। এক্ষণে প্রশ্ন এই, ধৰ্ম্মেব এরূপ সাধারণ ভিত্তিভূমি কিছু আছে কিনা? ইহার উত্তর আমাকে দিতে হইলে, ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ এই উভয়ই বলিতে হইবে। জগতে ধৰ্ম্মসম্বন্ধে সচরাচর এইরূপ শিক্ষা পাওয়া যায় যে, ধৰ্ম্ম কেবল শ্রদ্ধা ও বিশ্বাসের উপর স্থাপিত, অধিকাংশস্থলেই উহা ভিন্ন ভিন্ন মতসমষ্টি মাত্র। এই কারণেই ধৰ্ম্মে ধৰ্ম্মে কেবল বিবাদ বিসম্বাদ দেখিতে পাওয়া যায়। এই মতগুলি আবার বিশ্বাসের উপর স্থাপিত; কেহ কেহ বলেন, মেঘপটলারূঢ় এক মহা্‌ন্‌ পুরুষ আছেন, তিনিই সমুদয় জগৎ শাসন করিতেছেন; বক্তা আমাকে কেবল তাঁহার কথার উপব নির্ভর কবিয়াই উহা বিশ্বাস করিতে বলেন। এইরূপ আমারও অনেক ভাব থাকিতে পারে, আমি অপরকে তাহা বিশ্বাস করিতে বলিতেছি। যদি তাঁহারা কোন যুক্তি চান, এই বিশ্বাসের কারণ জিজ্ঞাসা করেন, আমি তাঁহাদিগকে কোনরূপ যুক্তি দেখাইতে অসমর্থ হই। এই জন্যই আজকাল ধৰ্ম্ম ও দর্শনশাস্ত্রের দুর্নাম শুনা যায়। প্রত্যেক শিক্ষিত ব্যক্তিরই যেন মনের ভাব এই যে, “দুর ছাই, ধৰ্ম্মগুলো ত দেখ্‌ছি কতকগুলো রকমারি মত মাত্র, উহাদের সত্যাসত্য বিচারের ত একটা মানদণ্ড নেই, যাঁর যা খুসি, তিনি তাই প্রচার করতে ব্যস্ত।” কিন্তু তাঁহারা যাহাই ভাবুন না কেন, প্রকৃতপক্ষে ধৰ্ম্মবিশ্বাসের এক সাৰ্ব্বভৌমিক মূলভিত্তি আছে—উহাই বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মতবাদ ও সৰ্ব্ববিধ বিভিন্ন ধারণাসমূহের নিয়ামক। ঐগুলির মূলদেশে যাইলে আমরা দেখিতে পাই যে, উহারাও সাৰ্ব্বজনীন অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির উপর প্রতিষ্ঠিত।

প্রথমতঃ, আমি অনুরোধ করি যে, আপনার/ পৃথিবীর ভিন্ন ভিন্ন ধৰ্ম্মসকল একটু বিশ্লেষণ করিয়া দেখুন। অল্প অনুসন্ধানেই দেখিতে পাইবেন যে, উহারা দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। কতকগুলির শাস্ত্র-ভিত্তি আছে; কতকগুলির শাস্ত্র-ভিত্তি নাই। যে গুলি শাস্ত্রভিত্তিব উপর স্থাপিত, তাহারা সুদৃঢ়; তদ্ধৰ্ম্মাবলম্বি-লোকসংখ্যাও অধিক। শাস্ত্র-ভিত্তিহীন ধৰ্ম্মসকল প্রায়ই লুপ্ত। কতকগুলি নূতন হইয়াছে বটে, কিন্তু অল্পসংখ্যক লোকেই তদনুগত। তথাপি উক্ত সকল সম্প্রদায়েই এই মতৈক্য দেখা যায় যে, তাঁহাদের শিক্ষা বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির প্রত্যক্ষ অনুভব মাত্র। খ্ৰীষ্টিয়ান তোমাকে তাঁহার ধৰ্ম্মে, মীশুখীষ্টকে ঈশ্বরের অবতার বলিয়া, ঈশ্বর ও আত্মার অস্তিত্বে এবং ঐ আত্মার ভবিষ্যৎ উন্নতির সম্ভাবনীয়তায় বিশ্বাস করিতে বলিবেন। যদি আমি তাঁহাকে এই বিশ্বাসের কারণ জিজ্ঞাসা করি, তিনি আমাকে বলিবেন—“ইহা আমার বিশ্বাস।” কিন্তু যদি তুমি খ্ৰীষ্ট-ধৰ্ম্মের মুলদেশে গমন করিয়া দেখ, তাহা হইলে দেখিতে পাইবে যে, উহাও প্রত্যক্ষানুভূতির উপর স্থাপিত। যীশুখ্ৰীষ্ট বলিয়াছেন, “আমি ঈশ্বর দর্শন করিয়াছি।” তাঁহার শিষ্যেরাও বলিয়া, ছিলেন, “আমরা ঈশ্বরকে অনুভব করিয়াছি।” এইরূপ আরও অনেক প্রত্যক্ষানুভূতি শুনা যায় ।

বৌদ্ধধৰ্ম্মেও এইরূপ। বুদ্ধদেবের প্রত্যক্ষানুভূতির উপরে এই ধৰ্ম্ম স্থাপিত। তিনি কতকগুলি সত্য অনুভব করিয়াছিলেন। তিনি সেইগুলি দর্শন করিয়াছিলেন, সেই সকল সত্যের সংস্পর্শে আসিয়াছিলেন এবং তাহাই জগতে প্রচার করিয়াছিলেন। হিন্দুদের সম্বন্ধেও এইরূপ; তাঁহাদের শাস্ত্রে ঋষি-নামধেয় গ্রন্থকৰ্ত্তাগণ বলিয়া গিয়াছেন, “আমবা কতকগুলি সত্য অনুভব করিয়াছি।" এবং তাঁহারা তাহাই জগতে প্রচার করিয়া গিয়াছেন। অতএব স্পষ্ট বুঝা গেল যে, জগতে সমুদয় ধৰ্ম্মই, জ্ঞানের সাৰ্ব্বভৌমিক ও সুদৃঢ় ভিত্তি যে-প্রত্যক্ষানুভব—তাহারই উপর স্থাপিত। সকল ধৰ্ম্মাচাৰ্য্যগণই ঈশ্বরকে দর্শন করিয়াছিলেন। তাঁহারা সকলেই আত্মদর্শন করিয়াছিলেন; সকলেই আপনাদের অনন্ত স্বরূপ অবগত হইয়াছিলেন, আপনাদের ভবিষ্যৎ অবস্থা দেখিয়াছিলেন, আর যাহা তাঁহারা দেখিয়াছিলেন, তাহাই প্রচার করিয়া গিয়াছেন। তবে প্রভেদ এইটুকু যে, প্রায় সকল ধৰ্ম্মেই, বিশেষতঃ ইদানীন্তন, একটি অদ্ভুত দাবি আমাদের সম্মুখে উপস্থিত হয়, সেটি এই যে— 'এক্ষণে এই সকল অনুভূতি অসম্ভব। যাঁহারা ধৰ্ম্মের প্রথম স্থাপনকৰ্ত্তা, পরে যাঁহাদের নামে সেই সেই ধৰ্ম্ম প্রচলিত হয়, এইরূপ স্বল্প ব্যক্তিতেই কেবল, প্রত্যক্ষানুভব সম্ভব ছিল। এখন আর এরূপ অনুভব হইবার উপায় নাই; সুতরাং এক্ষণে ধৰ্ম্ম, বিশ্বাস করিয়া লইতে হইবে'—আমি এ কথা সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করি। যদি জগতে কোন প্রকার বিজ্ঞানের কোন বিষয়ে কেহ কখন প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করিয়া থাকেন, তাহা হইলে তাহা হইতে আমরা এই সাৰ্ব্বভৌমিক সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারি যে, পূৰ্ব্বেও উহা কোটী কোটী বার উপলব্ধির সম্ভাবনা ছিল, পরেও অনন্তকাল ধরিয়া উহার উপলব্ধির সম্ভাবনা থাকিবে। সমবৰ্ত্তনই প্রকৃতির বলবৎ নিয়ম; যাহা একবার ঘটিয়াছে, তাহা পুনরায় ঘটিতে পারে।

যোগ-বিদ্যার আচাৰ্য্যগণ সেই নিমিত্ত বলেন, ‘ধৰ্ম্ম যে কেবল পূৰ্ব্বকালীন অনুভূতির উপর স্থাপিত, তাহা নহে;-পরন্তু স্বয়ং এই সকল অনুভূতিসম্পন্ন না হইলে কেহ ধাৰ্ম্মিক হইতে পারে না। যে বিদ্যার দ্বারা এই সকল অনুভূতি হয়, তাহার নাম যোগ।' ধৰ্ম্মের সত্যসকল যতদিন না কেহ অনুভব করিতেছেন, ততদিন ধৰ্ম্মের কথা কহাই বৃথা। ভগবানের নামে গণ্ডগোল, যুদ্ধ, বাদানুবাদ কেন? ভগবানের নামে যত রক্তপাত হইয়াছে, অন্য কোন বিষয়ের জন্য এত রক্তপাত হয় নাই; তাহার কারণ এই, কোন লোকই মূলে গমন করে নাই। সকলেই পূর্বপুরুষগণের কতকগুলি আচারেব অনুমোদন করিয়াই সস্তুষ্ট ছিলেন। তাঁহারা চাহিতেন, অপরেও তাহাই করুক। যাঁহার আত্মার অনুভূতি অথবা ঈশ্বব সাক্ষাৎকার না হইয়াছে, তাঁহার আত্মা বা ঈশ্বর আছেন বলিবার অধিকার কি? যদি ঈশ্বর থাকেন, তাঁহাকে দর্শন করিতে হইবে; যদি আত্মা বলিয়া কোন পদার্থ থাকে, তাহাকে উপলব্ধি করিতে হইবে। তাহা না হইলে বিশ্বাস না করাই ভাল। ভণ্ড অপেক্ষা স্পষ্টবাদী নাস্তিক ভাল। একদিকে, আজকালকার বিধান বলিয়া পরিচিত লোকসকলের মনের ভাব এই যে, ধৰ্ম্ম, দর্শন ও পরম পুরুষের অনুসন্ধান সমুদয় নিষ্ফল । অপর দিকে, যাহার অৰ্দ্ধশিক্ষিত, তাঁহাদের মনের ভাব এইরূপ বোধ হয় ষে—ধৰ্ম্ম-দৰ্শনাদির বাস্তবিক কোন ভিত্তি নাই; তবে উহাদের এই মাত্র উপযোগিতা যে, উহার কেবল জগতের মঙ্গলসাধনের বলবতী প্ররোচিকা শক্তি –যদি লোকের ঈশ্বরসত্তায় বিশ্বাস থাকে, তাহা হইলে সে সৎ, নীতিপরায়ণ ও সৌজন্যশালী সামাজিক হইয়া থাকে। যাহাদের এইরূপ ভাব, তাহাদিগকে ইহার জন্য দোষ দেওয়া যায় না; কারণ, তাহার ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে যা কিছু শিক্ষা তাহা কতকগুলি অন্তঃসারশূন্য উন্মত্ত-প্রলাপ তুল্য অনন্ত শব্দসমষ্টিতে বিশ্বাস মাত্র। তাহাদিগকে শব্দের উপরে বিশ্বাস করিয়া থাকিতে বলা হয়; তাহা কি কেহ কথন পারে? যদি লোকে তাহা পারিত, তাহা হইলে আমার মানবপ্রকৃতির প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা থাকিত না। মানুষ সত্য চায়, স্বয়ং সত্য অনুভব করিতে চায়, সত্যকে ধাবণ করিতে চায়, সত্যকে সাক্ষাৎকার করিতে চায়, অন্তরের অন্তরে অনুভব করিতে চায়। বেদ বলেন, “কেবল তখনি সকল সন্দেহ চলিয়া যায়, সব তমোজাল ছিন্ন ভিন্ন হইয়া যায়, সকল বক্রতা সরল হইয়া যায়”—

“ভিদ্যতে হৃদয়গ্রন্থিশ্ছিদ্যন্তে সৰ্ব্বসংশয়াঃ

ক্ষীয়ন্তে চাস্য কৰ্ম্মাণি তস্মিন্‌ দৃষ্টে পরাবরে।” মুণ্ডঃ উঃ, ২|২|৮

“শৃণ্বন্তি বিশ্বে অমৃতস্য পুত্রা

আ যে ধামানি দিব্যানি তণুঃ ॥" শ্বেঃ উঃ, ২|৫

“বেদাহমেতং পুরুষং মহান্যং

আদিত্যবর্ণং তমস: পরস্তাৎ।

তমেব বিদিত্বাতিমৃত্যুমেতি।
নান্যঃ পন্থা বিদ্যতেহয়নায় ॥” শ্বেঃ উঃ ৩|৮

হে অমৃতের পুত্ৰগণ ! হে দিব্যধামনিবাসিগণ । শ্রবণ কর— আমি এই অজ্ঞানান্ধকার হইতে আলোকে যাইবার পথ পাইয়াছি, যিনি সমস্ত তমের অতীত, তাহাকে জানিতে পারিলেই তথায় যাওয়া যায়—মুক্তির আর কোন উপায় নাই। রাজযোগ-বিদ্যা এই সত্য লাভ করিবার, প্রকৃত কাৰ্য্যকরী ও সাধনোপযোগী বৈজ্ঞানিক প্রণালী মানবসমক্ষে স্থাপন করিবার প্রস্তাব করেন। প্রথমতঃ, প্রত্যেক বিস্তারই বা সাধন প্রণালী স্বতন্ত্র স্বতন্ত্র। তুমি যদি জ্যোতিৰ্ব্বেত্ত হইতে ইচ্ছা কর, আর বসিয়া বসিয়া কেবল জ্যোতিষ জ্যোতিষ বলিয়া চীৎকার কর জ্যোতিষশাস্ত্রে তুমি কখনই অধিকারী হইবে না। রসায়ন শাস্ত্র সম্বন্ধেও ঐরূপ, উহাতেও একটি নির্দিষ্ট প্রণালীর অনুসরণ করিতে হইবে ; পরীক্ষাগারে ( Laboratory ) গমন করিয়া বিভিন্ন দ্রব্যাদি লইতে হইবে, উহাদিগকে একত্রিত করিতে হইবে, মাত্রা বিভাগে মিশাইতে হইবে, পরে তাহাদিগকে লইয় পরীক্ষা করিতে হইবে, তবে তুমি রসায়নবিৎ হইতে পারিবে । যদি তুমি জ্যোতিৰ্ব্বিত হইতে চাও, তাহা হইলে তোমাকে মানমন্দিরে গমন করিয়া দূরবীক্ষণ যন্ত্র সাহায্যে তারা ও গ্রহ গুলি পৰ্যবেক্ষণ করিয়া তদ্বিয়ে আলোচনা করিতে হইবে, তবেই তুমি জ্যোতিৰ্ব্বিৎ হইতে,পারিবে। প্রত্যেক বিস্কারই এক একটি নির্দিষ্ট প্রণালী আছে । আমি তোমাদিগকে শত সহস্র উপদেশ দিতে পারি, কিন্তু তোমরা যদি সাধনা না কর, ভোমরা q রাজযোগ কখনই ধাৰ্ম্মিক হইতে পারিবে না ; সমুদার যুগেই, সমুদায় দেশেই, নিষ্কাম শুদ্ধ-স্বভাব সাধুগণ এই সত্য প্রচার করিয়া গিয়াছেন। তাহদের, জগতের হিত ব্যতীত আর কোন কামন! ছিল না। তাহারা সকলেই বলিয়াছেন যে—ইন্দ্রিয়গণ আমাদিগকে যতদূর সত্য অনুভব করাইতে পারে, আমরা তাহা অপেক্ষী উচ্চতর সত্য লাভ করিয়াছি এবং তাহ পরীক্ষা করিতে আহবান করেন। তাহারা বলেন, তোমরা নির্দিষ্ট সাধন প্রণালী লইয়া সরলভাবে সাধন করিতে থাক। যদি এই উচ্চতর সত্য লাভ না কর, তাহা হইলে o পাব বটে যে, এই উচ্চতব সত্য সম্বন্ধে যাহা বলা হয়, তাহা যথার্থ নহে। কিন্তু তাহার পূৰ্ব্বে এই সকল উক্তির সত্যতা একেবাবে অস্বীকার করা কোন মতেই যুক্তিযুক্ত নহে } অতএব আমাদেব নির্দিষ্ট সাধন প্রণালী লইয়া যথাযথ ভাবে সাধন করা আবশ্যক, নিশ্চয়ই আলোক আসিবে। কোন জ্ঞান লাভ করিতে হইলে আমরা সামাঙ্গীকরণের ' সাহায্য লইয়া থাকি ; ইহার জন্য আবার ঘটনাসমূহ পর্যবেক্ষণ আবগুক। আমবা প্রথমে ঘটনাবলী পৰ্যবেক্ষণ করি, পরে সেই গুলিকে সামাষ্ঠীকৃত,এবং তাহা হইতে আমাদের সিদ্ধান্ত বা মতামত সমূহ উদ্ভাবন করি। আমরা যতক্ষণ পৰ্য্যন্ত না মনের ভিতর কি হইতেছে না হইতেছে প্রত্যক্ষ করিতে পারি, ততক্ষণ আমরা আমাদের মন সম্বন্ধে, মানুষের আভ্যন্তরিক প্রকৃতি সম্বন্ধে, মামুষের চিন্তা সম্বন্ধে কিছুই জানিতে পারি না। বাহজগতের ব্যাপার পর্য্যবেক্ষণ করা অতি সহজ । প্রকৃতির প্রতি অংশ পৰ্য্যবেক্ষণ করিবার জন্ত সহস্ৰ সহস্ৰ যন্ত্র নিৰ্ম্মিত হইয়াছে, কিন্তু - ゲ i অবতরণিকা অন্তর্জগতের ব্যাপার জানিবার জন্ত সাহায্য করে, এমন কোনও যন্ত্র নাই। কিন্তু তথাপি আমরা ইহা নিশ্চয় জানি যে, কোন বিষয়ের প্রকৃত বিজ্ঞান লাভ করিতে হইলে পৰ্যবেক্ষণ আবশুক । বিশ্লেষণ ব্যতীত বিজ্ঞান নিরর্থক ও নিষ্ফল হইয় ভিত্তিহীন অনুমানমাত্রে পর্য্যবসিত হইয়া পড়ে। এই কারণেই যে অল্প কয়েক জন মনস্তত্ত্বান্বেষী পৰ্য্যবেক্ষণ কবিবার উপায় জানিয়াছেন, তাহারা ব্যতীত আর সকলেই চিরকাল কেবল বাদামুবাদ করিতেছেন মাত্র । রাজযোগ-বিদ্যা প্রথমত: মানুষকে তাহার_নিজের আভ্যন্তরীণ অবস্থাসমূহ পৰ্য্যবেক্ষণ করিবার উপায় (Fಿಕ್ಕಿಗ দেয় । মনই ঐ পৰ্য্যবেক্ষণের যন্ত্র। আমাদের বিষয় বিশেষে অবহিত হইবার শক্তিকে ঠিক ঠিক নিয়মিত করিয়া যখন অন্তর্জগতের দিকে পরিচালিত করা হয়, তখনই উহা মনের প্রত্যেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিশ্লেষণ করিয়া ফেলিবে এবং তাহার আলোকে আমাদের মনের মধ্যে কি ঘটনা ঘটিতেছে, তাহা ঠিক ঠিক বুঝিতে পারিব। মনের শক্তিসমূহ ইতস্ততোবিক্ষিপ্ত আলোকরশ্মি সদৃশ। উহার কেন্দ্রীভূত হইগেই সমস্ত আলোকিত করে, ইছাই আমাদের সমুদয় জ্ঞানের একমাত্র উপায় । কি বাহজগতে কি অস্তজগতে সকলেই এই শক্তির পরিচালনা করিতেছেন ; তবে বৈজ্ঞানিক বহিজগতে যে স্বল্প পৰ্য্যবেক্ষণশক্তি প্রয়োগ করেন, মনস্তত্ত্বান্বেষীকে তাহাই মনের উপর প্রয়োগ করিতে হইবে। ইহাতে অনেক অভ্যাসের আবশুক করে।, বাল্যকাল হইতে আমরা কেবল বাহিরের বস্তুতেই মনোনিবেশ করিতে শিক্ষিত হইয়াছি, অস্তুজগতে মনোনিবেশ করিতে শিক্ষা পাই নাই। আর এই কারণে রাজযোগ আমাদের মধ্যে অনেকেই অন্তর্যন্ত্রের পর্য্যবেক্ষণ-শক্তি হারাইয়া ফেলিয়াছেন। মনকে অস্তমুখী করা, উহার বহিমুখী গতি নিবারণ করা, যাহাতে মন নিজের স্বভাব জানিতে পারে, নিজেকে বিশ্লেষণ করিয়া দেখিতে পারে, তজ্জন্ত উহার সমুদয় শক্তিগুলিকে কেন্দ্রীভূত করিয়া নিজের উপবেষ্ট প্রয়োগ করা অতি কঠিন কাৰ্য্য। কিন্তু এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক প্রথায় অগ্রসর হইতে হইলে ইহাই একমাত্র উপায় । এইরূপ জ্ঞানের উপকারিতা কি ? প্রথমতঃ জ্ঞানই জ্ঞানের সৰ্ব্বোচ্চ পুরস্কার। দ্বিতীয়তঃ ইহার উপকারিতাও আছে-ইহা সমস্ত দুঃখ হরণ করিবে । যখন মানুষ আপনার মন বিশ্লেষণ করিতে করিতে এমন এক বস্তুকে সাক্ষাৎ দর্শন করে, যাহার কোন কালে নাশ নাই—যাহা স্বরূপত: নিত্যপূর্ণ ও নিত্যশুদ্ধ, তখন তাহার দুঃখ থাকে না, নিরাননা থাকে না। ভয় ও অপূর্ণ বাসনা সমুদয় দুঃখের মূল। পূৰ্ব্বোক্ত অবস্থা প্রাপ্ত হইলে মানুষ বুঝিতে পারিবে, তাহার মৃত্যু নাই, সুতরাং তখন আর মৃত্যু ভয় থাকিবে না। নিজেকে পূর্ণ বলিয়া জানিতে পারিলে অসার বাসনা আর থাকে না। পূৰ্ব্বোক্ত কারণদ্বয়ের অভাব হইলেই আর কোন দুঃখ থাকিবে না। তৎপরিবর্তে এই দেহেই পরমাননা লাভ হইবে। জ্ঞানলাভের একমাত্র উপায় একাগ্রতা। রসায়নতত্ত্বান্বেষী নিজের পরীক্ষাগারে গিয়া, নিজের মূনর সমুদয় শক্তি কেন্দ্রীভূত করিয়া, তিনি যে সকল বস্তু বিশ্লেষণ করিতেছেন, তাহাদের উপর প্রয়োগ করেন এবং এইরূপে তাহদের বৃহন্ত অবগত হল। У о অবতরণিকা জোতিৰ্ব্বিং নিজের মনের সমুদয় শক্তিগুলি একত্রিত করিয়া তাহাকে দূরবীক্ষণ যন্ত্রের মধ্য দিয়া আকাশে প্ৰক্ষেপ করেন, আর অমনি তারা, সূৰ্য্য, চন্দ্র ইহার| সকলেই আপন আপন রহস্য র্তাহার নিকট ব্যক্ত করে । আমি যে বিষয়ে কথা কহিতেছি, সে বিষয়ে আমি যতই মনোনিবেশ করিতে পারিব ততই সেই বিষয়ের গুঢ় তত্ত্ব তোমাদের নিকট প্রকাশ করিতে পারিব । তোমরা আমার কথা শুনিতেছ ; তোমরাও যতই এ বিষয়ে মনোনিবেশ করিবে, ততই আমার কথা স্পষ্টভাবে ধারণা করিতে পারিবে । মনের একাগ্রতা-শক্তি ব্যতিরেকে আর কীরূপে জগতে এই সকল জ্ঞান লব্ধ হইয়াছে ? প্রকৃতিৰ দ্বারদেশে আঘাত প্রদান করিতে জানিলে,—তথায় যেরূপ ধাক্কা দেওয়া প্রয়োজন, তাহা দিতে জানিলে—প্রকৃতি তাহার রহস্ত উদঘাটিত করিয়া দেন এবং সেই আঘাতের শক্তি ও তেজঃ, একাগ্রত হইতেই আইসে। মনুষ্যমনের শক্তির কোন সীমা নাই ; উহা যতই একাগ্র হয়, ততই উহার শক্তি এক লক্ষ্যের উপর আইসে এবং ইহাই রহস্ত । মনকে বহিবিষয়ে স্থির করা অপেক্ষাকৃত সহজ । মন স্বভাবতঃই বহিমুখী ; কিন্তু ধৰ্ম্ম, মনোবিজ্ঞান, কিংবা দর্শন বিষয়ে জ্ঞাত ও জ্ঞেয় ( বা বিষয়ী ও বিষয় ) এক। এখানে প্রমের একটি আভ্যন্তরীণ বস্তু, মনই এখানে প্রমেয় । মনস্তত্ত্ব अक्बन করাই এখানে প্রয়োজন, আর মনই মনস্তত্ব পর্য্যবেক্ষণ করিবার কর্তা। আমরা জানি যে, মনের এমন একটি ক্ষমতা আছে, ৰদ্বারা উহা নিজের ভিতরে যাহা হইতেছে, তাহা দেখিতে পারে— উহাকে অন্তঃপৰ্য্যবেক্ষণ শক্তি বলা যাইতে পারে । আমি তোমাদের 3 S রাজযোগ সহিত কথা কহিতেছি ; আবার ঐ সময়েই আমি যেন আর একজন লোক বাহিরে দাড়াইয়া রহিয়াছি এবং ঘাহা করিতেছি তাহ। জানিতেছি ও শুনিতেছি। তুমি এক সময়ে কার্ধ্য ও চিন্তা উভয়ই করিতেছ, কিন্তু তোমার মনের আর এক অংশ যেন বাহিরে দাড়াইয়া, তুমি যাহা চিন্তা করিতেছ, তাহ দেখিতেছে। মনের সমুদয় শক্তি একত্রিত করিয়া মনের উপরেই প্রয়োগ করিতে হইবে। যেমন স্বর্ঘ্যের তীয় রশ্মির নিকট অতি অন্ধকারমঞ্চ স্থানসকলও তাহাদের গুপ্ত তথ্য প্রকাশ করিয়া দেয়, তদ্রুপ এই একাগ্র মন নিজের অতি অন্তরতম রহস্য সকল প্রকাশ করিয়া দিবে। তখন আমরা বিশ্বাসের প্রকৃত ভিত্তিতে উপনীত হইব । তখনই আমাদের প্রকৃত ধৰ্ম্মলাভ হইবে । তখনই আত্মা আছেন কি না, জীবন কেবল এই সামান্ত জীবিত কালেই পধ্যাপ্ত বা অনন্তব্যাপী ও জগতে ঈশ্বর কেহ আছেন কি না, আমরা স্বয়ং দেখিতে পাইব । সমুদয়ই আমাদের জ্ঞান-চক্ষের সমক্ষে উদ্ভাসিত হইবে। রাজযোগ ইহাই আমাদিগকে শিক্ষা দিতে অগ্রসর । ইহাতে যত উপদেশ আছে, তৎসমুদয়ের উদ্দেশু— প্রথমতঃ মনের একাগ্রতা-সাধন, তৎপরে উহার গভীরতম প্রদেশে কত প্রকার ভিন্ন ভিন্ন কাৰ্য্য হইতেছে, তাহার জ্ঞানলাভ, তৎপরে ঐগুলি হইতে সাধারণ সত্যসকল নিষ্কাশন করিয়া তাহা, হইতে নিজের একটা সিন্ধান্তে উপনীত হওয়া । এই জঙ্কই রাজযোগ শিক্ষা করিতে হইলে, ড়োমার ধৰ্ম্ম যাহাই श्डेकতুমি আস্তিক হও, নাস্তিক হও, মাহদি হও, বৌদ্ধ হও, অথবা খ্ৰীষ্টানই হও—তাহাতে কিছুই আসিয়া যায় না। তুমি অবতরণিকা মানুষ—তাহাই যথেষ্ট। প্রত্যেক মন্থন্যেরই ধৰ্ম্মতত্ত্ব অনুসন্ধান করিবার শক্তি আছে, অধিকারও আছে। প্রত্যেক ব্যক্তিরই যে কোন বিষয়ে হউক না কেন, তাহার কারণ জিজ্ঞাসা করিবার অধিকার আছে, আর তাহার এমন ক্ষমতাও আছে যে, সে নিজের ভিতর হইতেই সে প্রশ্নের উত্তর পাইতে পারে। তবে অবশু ইছার জন্য একটু কষ্ট স্বীকার করা আবশুক । এতক্ষণ দেখিলাম, এই রাজযোগ-সাধনে কোন প্রকার বিশ্বাসের) T আবগুক করে না। যতক্ষণ না নিজে প্রত্যক্ষ করিতে পার, ততক্ষণ কিছুই বিশ্বাস করিও না, রাজযোগ ইহাই শিক্ষা দেন। সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করিবার জন্য অন্ত কোন সহায়তার আবশ্যক করে না। তোমবা কি বলিতে চাও যে জাগ্রত অবস্থাৰ সত্যতা প্রমাণ করিতে স্বপ্ন অথবা কল্পনার সহায়তার আবশু্যক হয় ? কখনই নহে। এই রাজযোগ সাধনে দীর্ঘকাল ও নিরস্তুর অভ্যাসের প্রয়োজন হয়। এই অভ্যাসের কিয়দংশ শরীর-সংযমবিষয়ক । কিন্তু ইহার অধিকাংশষ্ট মনঃসংযমাত্মক। আমরা ক্রমশঃ বুঝিতে পারিব, মন শরীরের সহিত কিরূপ সম্বন্ধে সম্বন্ধ। যদি আমরা বিশ্বাস করি যে, মন কেবল শবীরেব সূক্ষ্ম অবস্থাবিশেষ মাত্র, আর মন শরীরের উপর কার্য্য করে, এ সত্যে যদি আমাদের বিশ্বাস থাকে, তাহা হইলে ইহাও স্বীকার করিতে হইলে যে, শরীরও মনের উপর কার্য্য করে। শরীর অসুস্থ হইলে মন অসুস্থ হয়, শরীর সুস্থ থাকিলে মনও মুম্ব ও সতেজ থাকে। যখন কোন ব্যক্তি ক্রোধাম্বিত হয়, তখন তাহার মন অস্থির হয়। মনের অস্থিরতা হেতু শরীরও সম্পূর্ণ অস্থির হইয়া পড়ে। অধিকাংশ >S) রাজযোগ লোকেরই মন শরীরের সম্পূর্ণ অধীন। বাস্তবিক ধরিতে গেলে তাহাদের মনঃশক্তি অতি অল্পপরিমাণেই প্রস্ফুটিত । তোমরা যদি কিছু মনে না কর, তবে বলি, অধিকাংশ মনুষ্কই পশু হইতে অতি অল্পই উন্নত। কারণ, অনেক স্থলে সামান্ত পশুপক্ষী অপেক্ষা তাহাদের সংযমের শক্তি বড় অধিক নহে। আমাদের মনকে নিগ্ৰহ করিবার শক্তি অতি অল্পই আছে। মনের উপর এই ক্ষমতা লাভের জন্ত, শরীর ও মনের উপর ক্ষমতা বিস্তার করিবার জন্ত আমাদের কতকগুলি বহিরঙ্গ সাধনের—দৈহিক সাধনের—প্রয়োজন । শরীর যখন সম্পূর্ণরূপে আয়ত্ত হইবে, তখন মনকে লইয়া নাড়াচাড়া করিবার সময় আসিবে। এইরূপে মন যখন আমাদের অনেকটা বসে আসিবে, তখন আমরা ইচ্ছামত উহাকে কাজ করাইতে ও ইচ্ছামত উহার বৃৰ্ত্তিসমূহকে একমুখী হইতে বাধ্য করিতে পারিব। রাজযোগীর মতে এই সমুদয় বহির্জগৎ, অন্তর্জগৎ বা স্বল্পজগতের স্থল বিকাশ মাত্র । সৰ্ব্বস্থলেই স্বক্ষকে কারণ ও স্থলকে কাৰ্য্য বুঝিতে হইবে । এই নিয়মে বহির্জগৎ কাৰ্য্য ও অন্তর্জগৎ কারণ। এই হিসাবেই স্থল জগতে পরিদৃপ্তমান শক্তিগুলি আভ্যন্তরিক স্বল্পতর শক্তির স্থলভাগ মাত্র । যিনি এই আভ্যন্তরিক শক্তিগুলিকে আবিষ্কার করিয়া উহাদিগকে ইচ্ছামত পরিচালিত করিতে শিখিয়াছেন, • তিনি সমুদয় প্রকৃতিকে বশীভূত করিতে পারেন। যোগী, সমুদয় জগৎকে বশীভূত করা ও সমুদয় প্রকৃতির উপর ক্ষমতা বিস্তার করারূপ স্ববৃহৎ কার্যকে আপন কৰ্ত্তব্য বলিয়া গ্রহণ করেন। তিনি এমন এক অবস্থায় ধাইতে চাহেন, যথায় আমরা যাহাদিগকে “প্রকৃতির নিয়মাবলি" বলি, তাহারা তাহার 38 অবতরণিকা উপর কোন প্রভাব বিস্তার করিতে পরিবে না, যে অবস্থায় তিনি ঐ সমুদয় অতিক্রম করিতে পারিবেন। তখন তিনি, আভ্যন্তরিক" ও বাহ সমুদয় প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব লাভ করেন। মনুষ্যজাতির উন্নতি ও সভ্যতা, এই প্রকৃতিকে বশীভূত করার শক্তির উপর নির্ভর করে। এই প্রকৃতিকে বশীভূত করিবার জন্ত ভিন্ন ভিন্ন জাতি ভিন্ন ভিন্ন প্রণালী অবলম্বন করিয়া থাকে। যেমন একই সমাজের মধ্যে কতকগুলি ব্যক্তি বাহপ্রকৃতি, কতকগুলি আবার অন্তঃপ্রকৃতি বশীভূত করিতে চেষ্টা পায়, সেইরূপ ভিন্ন ভিন্ন জাতির মধ্যে কোন কোন জাতি বাহ ও কোন কোন জাতি অন্তঃপ্রকৃতি বশীভূত করিতে চেষ্টা করে। কাহারও মর্তে, অন্তঃপ্রকৃতি বশীভূত 7 করিলেই সমুদয় বশীভূত হইতে পারে ; কাহারও মতে বা বাহ প্রকৃতি বশীভূত করিলেই সমুদয় বশীভূত হইতে পারে। এই দুইটি সিদ্ধান্তের চরমভাব লক্ষ্য করিলে ইহা প্রতীয়মান হয় যে, এই উভয় সিদ্ধান্তই সত্য ; কারণ প্রকৃতপক্ষে বাহ অভ্যস্তর বলিয়া কোন ভেদ নাই । ইহা একটি কাল্পনিক বিভাগ মাত্র। এইরূপ বিভাগের অস্তিত্বই নাই, কখনও ছিল না। বহিৰ্ব্বাদী বা অন্তৰ্ব্বাদী উভয়ে যখন স্বস্ব জ্ঞানের চরম সীমা লাভ করিবেন, তখন একস্থানে উপনীত হইবেনই হইবেন । যেমন বহির্বিজ্ঞানবাণী নিজ জ্ঞানকে চরম সীমায় লইয়া যাইলে শেষকালে তাহাকে দার্শনিক হইতে হয়ু সেইরূপ দার্শনিকও দেখিবেন, তিনি মন ও ভূত বলিয়া যে দুইটি ভেদ করেন, তাহা বাস্তবিক কাল্পনিক মার, তাহা একদিন একেবারেই চলিয়া যাইবে । 3 (t রাজযোগ যাহা হইতে এই বহু উৎপন্ন হইয়াছে, যে এক পদার্থ বহুরূপে প্রকাশিত হইয়াছে, সেই এক পদার্থকে নির্ণয় করাই সমুদয় বিজ্ঞানের মুখ্য উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য । রাজযোগীরা বলেন, “আমরা প্রথমে অন্তর্জগতের জ্ঞান লাভ করিব, পরে উহার দ্বারাই বাহ ও অন্তর উভয় প্রকৃতিই বশীভূত করিব।” প্রাচীন কাল হইতেই লোকে এই বিষয়ে চেষ্টা করিয়া আসিতেছেন। ভাবতবর্ষেই ইহার বিশেষ চেষ্ট হয় ; তবে অন্তান্ত জাতিরাও এই বিষয়ে কিঞ্চিৎ চেষ্টা করিয়াছিল। পাশ্চাত্য প্রদেশে লোকে ইহাকে রহস্য বা গুপ্তবিদ্যা ভাবিত, যাহারা ইহা অভ্যাস করিতে যাইতেন, তাহাদিগকে ডাইন, ঐশ্রজালিক ইত্যাদি অপবাদ দিয়া পোড়াইয়া অথবা অন্তরূপে মারিয়া ফেলা হইত। ভারতবর্ষে নানা কারণে ইহা এমন লোকসমূহের হস্তে পড়ে, যাহার এই বিষ্ঠায় শতকরা নব্বই অংশ নষ্ট করিয়া অবশিষ্টটুকু অতি গোপনে রাখিতে চেষ্টা করিয়াছিল। আজকাল আবার ভারতবর্ষের গুরুগণ অপেক্ষা নিকৃষ্ট গুরুনামধারী কতকগুলি ব্যক্তিকে দেখা যাইতেছে ; ভারতবর্ষের গুরুগণ তবু কিছু জানিতেন, এই আধুনিক গুরুগণ কিছুই জানেন না। এই সমস্ত যোগ-প্রণালীতে গুহ বা অদ্ভূত যাহা কিছু আছে, সমুদয় ত্যাগ করিতে হইবে। যাহা কিছু বল প্রদান করে, তাহাই অনুসরণীয়। অন্তান্ত বিষয়েও যেমন, ধৰ্ম্মেও তদ্রুপ। যাহা তোমাকে দুৰ্ব্বল করে, তাহা একেবারেই ত্যজ্য। রহস্যম্পৃহাই মানবমস্তিক্ষকে দুর্বল করিয়া ফেলে। এই সমস্ত গুহ রাখাতেই যোগশাস্ত্র প্রায় একেধারে নষ্ট হইয়া গিয়াছে বলিলেই হয়। কিন্তু وی (ه অবতরণিকা বাস্তবিক ইহা একটি মহাবিজ্ঞান। চতুঃসহস্ৰাধিক বর্ষ পূৰ্ব্বে ইহা আবিষ্কৃত হয়, সেই সময় হইতে ভারতবর্ষে ইহা প্রণালীবদ্ধ হইয়া বর্ণিত ও প্রচারিত ইইতেছে। একটি আশ্চৰ্য্য এই ষে ব্যাখ্যাকার যত আধুনিক, তাহার ভ্রমও সেই পরিমাণে অধিক। লেখক যতই প্রাচীন, তিনি ততই অধিক স্বায়সঙ্গত কথা বলিয়াছেন। আধুনিক লেখকের মধ্যে অনেকেই নানাপ্রকার রহস্তের বা আজগুবী কথা কহিয়া থাকেন। এইরূপে যাহাদের হস্তে ইহ পড়িল, তাহারা সমস্ত ক্ষমতা নিজকরতলস্থ রাখিবার ইচ্ছায় ইহাকে মহ গোপনীয় বা আজগুবী করিয়া তুলিল এবং যুক্তিরূপ প্রভাকরের পূর্ণালোক আর ইহাতে পড়িতে দিল না। আমি প্রথমেই বলিতে চাই, আমি যাহা প্রচার করিতেছি, তাহার ভিতর গুহ কিছুই নাই । যাহা যৎকিঞ্চিৎ আমি জানি, তাহা তোমাদিগকে বলিব। ইহা যতদূৰ যুক্তি দ্বারা বুঝান যাইতে পারে, ততদুর বুঝাইবার চেষ্টা করিব। কিন্তু আমি যাহা বুঝিতে পারি না, তৎসম্বন্ধে বলিব, “শাস্ত্র এই কথা বলেন” । অবিশ্বাস করা অন্যায় ; নিজের বিচারশক্তি ও যুক্তি থাটাইতে হইবে ; কাৰ্য্যে করিয়া দেখিতে হইবে যে, শাস্ত্রে যাহা লিখিত আছে, তাহা সভ্য কি-না। জড়বিজ্ঞান শিখিতে হইলে যে ভাবে শিক্ষা কর, ঠিক সেই প্রণালীতেই এই ধৰ্ম্ম-বিজ্ঞান শিক্ষা করিতে হইবে । ইহাতে গোপন করিবার কোন কথা নাই, কোন বিপদের আশঙ্কাও নাই, ইহার মধ্যে যতদুব সত্য আছে,°তাহা সকলের সমক্ষে রাজপথে প্রকাগুভাবে প্রচার করা উচিত। কোনরূপে, এ সকল গোপন করিবার চেষ্টা করিলে অনেক বিপদের উৎপত্তি হয়। - 3 * রাজযোগ আর অধিক বলিবার পূৰ্ব্বে আমি সাংখ্যদর্শন সম্বন্ধে কিছু . বলিব। এই সাংখ্যদর্শনের উপর রাজযোগ-বিহু সংস্থাপিত। সাংখ্যদর্শনের মতে বিষয়-জ্ঞানের প্রণালী এইরূপ,—প্রথমতঃ বিষয়ের সহিত চক্ষুরাদি যন্ত্রের সংযোগ হয়। চক্ষুরাদি ইঞ্জিয়গণের নিকট উহ! প্রেরণ করে ; ইপ্রিয়গণ মনের ও মন নিশ্চয়াত্মিক বুদ্ধির নিকট লইয়া যার ; তখন পুরুষ বা আত্মা উহ। গ্রহণ করেন ; পুরুষ আবার, যে সকল সোপান পরম্পরায় উহ! আসিয়াছিল, তাহাদের মধ্য দিয়া যেন উহাকে ফিরিয়া যাইতে আদেশ করেন। এইরূপে বিষয় গৃহীত হইয়া থাকে । পুরুষ ব্যতীত আর সকলগুলি গুড়। তবে মন চক্ষুবাদি বাহ যন্ত্র অপেক্ষ স্বক্ষতর ভূতে নিৰ্ম্মিত। মন যে উপাদানে নিৰ্ম্মিত তাহী ক্রমশঃ স্থলতর হইলে তন্মাত্রার’ উৎপত্তি হয়। উহা আবও স্থল হইলে পরিদৃগুমান ভূতের উৎপত্তি হয়। সাংখ্যের মনোবিজ্ঞান এই। মুতরাং, বুদ্ধি ও স্থল ভূতের মধ্যে প্রভেদ কেবল মাত্রার তারতম্যে। একমাত্র পুরুষই চেতন । মন যেন আত্মার হস্তে যন্ত্রবিশেষ ! উহা দ্বারা আত্মা বাহ বিষয় গ্রহণ করিয়া থাকেন। মন সদা পরিবর্তনশীল, -একদিক্ হইতে অন্ত দিকে দৌড়ায়, কখন সমুদয় ইন্দ্রিয়গুলিতে সংলগ্ন, কথন বা একটিতে সংলগ্ন থাকে, আবার কখনও বা কোন ইঞ্জিয়েই সংলগ্ন থাকে । न । भtन कङ्ग श्रांभि ७क;ि शक्लिव्र *क भटनांtषां★ा कब्रिब्रां শুনিতেছি ; এরূপ অবস্থায় আমার চক্ষু উল্মীলিত থাকিলেও কিছুই দেখিতে পাইব না ; ইহাতে স্পষ্ট" জানা যাইতেছে যে, মন যদিও প্রবণেন্ত্রিয়ে সংলগ্ন ছিল, কিন্তু দর্শনেঞ্জিয়ে ছিল না। এইরূপ मून गभूषा ইঞ্জিয়েও এক সময়ে সংলগ্ন থাকিতে পারে। মনের Dto অবতরণিকা আবার অন্তর্দৃষ্টি শক্তি আছে, এই শক্তিবলে, মানুষ নিজ অন্তরের গভীরতম প্রদেশে দৃষ্টি করিতে পারে। অন্তর্দৃষ্টিশক্তির বিকাশসাধন করাই যোগীর উদ্বেগু ; মনের সমুদয় শক্তিকে একত্র করিয়া ও ভিতরের দিকে ফিরাইয়া, ভিতরে কি হইতেছে, তাহাই তিনি জানিতে চাহেন। ইহাতে বিশ্বাসের কোন কথা নাই ইহা কতকগুলি দার্শনিকের মনস্তত্ত্ববিশ্লেষণের ফলমাত্র। আধুনিক শীরতত্ত্ববিৎ পণ্ডিতেরা বলেন, চক্ষু প্রকৃতপক্ষে দর্শনের করণ নহে, ঐ করুণ মস্তিষ্কের অন্তর্গত স্নায়ু-কেন্দ্রে অবস্থিত। সমুদয় ইন্দ্রিয়সম্বন্ধেই এইরূপ বুঝিতে হইবে। তাহারা আরও বলেন-মস্তিষ্ক যে পদার্থে নিৰ্ম্মিত, এই কেন্দ্রগুলিও ঠিক সেই পদার্থে নিৰ্ম্মিত। সাংখ্যেরাও এইরূপ বলিয়া থাকেন ; তবে প্রভেদ এই যে— সাংখ্যের সিদ্ধান্ত আধ্যাত্মিক দিক্ দিয়া ও বৈজ্ঞানিকের ভৌতিক দিক্ দিয়া । তাহা হইলেও, উভয়ই এক কথা। আমাদিগকে ইহার অতীত রাজ্যের অন্বেষণ করিতে হইবে। - যোগীর চেষ্টা, নিজেকে এমন স্বল্পাকুন্ডুতিসম্পন্ন করা যে, যাহাতে তিনি বিভিন্ন মানসিক অবস্থাগুলিকে প্রত্যক্ষ করিতে পারেন। মানসিক প্রক্রিয়া সমুদয়ের_পৃথক পৃথক ভাবে মানস' প্রত্যক্ষ আবগুৰু বিসমূহ, গোলকদিকে আঘাত করিবামাত্র তত্ত্বৎপন্ন বেদন কিরূপে তত্ত্বৎ করণসহায়ে স্নায়ুমার্গে ভ্রমণ করে, মন কিরূপে উহাদিগকে গ্রহণ করে, কি করিয়া উহারা আবার নিশ্চয়াত্মিক বুদ্ধিতে গমন করে, পরিশেষে, কি করিরাই বা পুরুষের নিকট যায়– এই সমুদয় ব্যাপারগুলিকে পৃথক পৃথক্ ভাবে প্রত্যক্ষ করিতে হইবে। সকল বিষয় শিক্ষারই কতকগুলি নির্দিষ্ট প্রণালী >> রাজযোগ আছে । যে কোন বিজ্ঞান শিক্ষা কর না কেন, প্রথমে আপনাকে উহার জন্ত প্রস্তুত হইতে হয়, পরে এক নির্দিষ্ট প্রণালীর অমুসরণ করিতে হয়। তাহা না করিলে উক্ত বিজ্ঞানের সিদ্ধাস্তুসমূহ বুঝিবার আর দ্বিতীয় উপায় নাই । রাজযোগ সম্বন্ধেও তদ্রুপ । আহার সম্বন্ধে কতকগুলি নিয়ম আবশ্বক। যাহাতে মন খুব পবিত্র থাকে, এরূপ আহার করিতে হইবে। যদি কোন পশুশালায় - গমন করা যায়, তাহা হইলে আহারের সহিত জীবের কি সম্বন্ধ, তাহা স্পষ্টই বুঝিতে পারা যায়। হস্তী অতি বৃহৎকায় জন্তু কিন্তু তাহার প্রকৃতি অতি শান্ত ; আর যদি তুমি সিংহ বা ব্যান্ত্রেব পিঞ্জরার দিকে গমন কর, দেখিতে পাইবে— তাহারা ছট্‌ফট্‌ করিতেছে। ইহাতে বুঝা যায় যে, আহারের তারতম্যে কি ভয়ানক পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে । আমাদের শরীরে যতগুলি শক্তি ক্রীড়া করিতেছে, তাহার সমুদয়গুলিই আহার হইতে উৎপন্ন, আমরা ইহা প্রতিদিনই দেখিতে পাই। যদি তুমি উপবাস করিতে আরম্ভ কর, তোমার শরীর দুৰ্ব্বল হইয়া যাইবে, দৈহিক শক্তিগুলির হ্রাস হইবে, কয়েক দিন পরে মানসিক শক্তিগুলিরও হ্রাস হইতে থাকিবে। প্রথমতঃ স্মৃতিশক্তি চলিয়া যাইবে, পরে এমন এক সময় আসিবে, যপন তুমি চিন্তা করিতেও সমর্থ হইবে না-বিচার করা ত দূরের কথা। সেই জন্ত সাধনের প্রথমাবস্থায় ভোজনের বিষয়ে বিশেষ লক্ষ্য রাখিতে হইবে, ' পরে সাধনে বিশেষ অগ্রসর হইলে ঐ বিষয়ে ততদূর সাবধান ন হইলেও চলে । যতক্ষণ গাছ ছোট থাকে ততক্ষণ উহাকে বুেড়া দিয়া বানিতে হয়, তাল না হইলে পশুর छेह थाहेब्रां 는

  1. Exact Science-নিশ্চিত-বিজ্ঞান অর্থাৎ যে সকল বিজ্ঞানের তত্ত্ব এতদূর সঠিক ভাবে নির্ণীত হইয়াছে যে, গণনা-বলে তাহার দ্বারা ভবিষ্যৎ নিশ্চয় করিয়া বলিয়া দিতে পারা যায়। যথা—গণিত, গণিত-জ্যোতিষ ইত্যাদি।