রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ/একাদশ পরিচ্ছেদ

 

একাদশ পরিচ্ছেদ।


 লাহিড়ী মহাশয় যখন রসাপাগলা হইতে বরিশাল ও বরিশাল হইতে কৃষ্ণনগরে বদলী হইয়া শারীরিক অসুস্থতা বশতঃ শিক্ষকতা কাৰ্য্য হইতে অবসর গ্রহণের জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিলেন, সেই কালের মধ্যে বঙ্গসমাজে পাঁচটা প্রবল শক্তি দেখা দিল। ইহার আভাস পূৰ্ব্ব পরিচ্ছেদে কিঞ্চিৎ দিয়াছি। প্রথম শক্তি কেশবচন্দ্র সেনের অভ্যুদয়, দ্বিতীয় শক্তি দীনবন্ধু মিত্রের নাট্যকাব্যের অভ্যুদয়; তৃতীয় শক্তি বঙ্গসাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্রের আবির্ভাব; চতুর্থ শক্তি সোমপ্রকাশের অভ্যুদয়; পঞ্চম শক্তি চিকিৎসা-জগতে ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের অভ্যুদয়। পাঁচটা মানুষ, কেশবচন্দ্র সেন, দীনবন্ধু মিত্র, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ ও মহেন্দ্রলাল সরকার এই কালের মধ্যে বঙ্গবাসীর চিত্তকে বিশেষরূপে অধিকার করিয়াছিলেন। এই পরিচ্ছেদে ইহাদের সংক্ষিপ্ত জীবন-চরিত দেওয়া যাইতেছে;—

কেশবচন্দ্র সেন।

 কেশবচন্দ্র সেন হুগলী জেলাস্থ গঙ্গাতীরবর্ত্তী গৌরীভা-নিবাসী ও কলিকাতার কলুটোলা-প্রবাসী স্বপ্রসিদ্ধ রামকমল সেন মহাশয়ের পৌত্র ও তাঁহার দ্বিতীয় পুত্র প্যারীমোহন সেনের দ্বিতীয় পুত্র। ১৮৩৮ সালের ৫ই অগ্রহায়ণ দিবসে কলুটোলাস্থ ভবনে ইঁহার জন্ম হয়। যাঁহারা প্যারীমোহন সেনকে দেখিয়াছেন, তাঁহারা বলেন যে তিনি দেখতে অতি সুপুরুষ ও পরম ভক্ত বৈষ্ণব ছিলেন। সৰ্ব্বাঙ্গে হরিনামের ছাপ, শান্ত, শিষ্ট, প্রসন্নমূৰ্ত্তি। কেশবচন্দ্র পিতার ভক্তিরভাব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। ইঁহার জননীদেবীও সদাশয়তা ও ধৰ্ম্মপরায়ণতার জন্য স্বপ্রসিদ্ধ ছিলেন। কেশবচন্দ্র এই পিতা মাতার ক্রোড়ে জন্মগ্রহণ করিয়া বাল্যাবধি শান্ত, শিষ্ট, সাধুতানুরাগী, হ্রীমান বালক ছিলেন। ইঁহার বয়ঃক্রম যখন অনুমান ছয় বৎসর তখন ইহার পিতামহের মৃত্যু হয়। ইহার পাঁচ বৎসরের মধ্যে পিতা প্যারীমোহন সেনও এলোক হইতে অবসৃত হন। কেশবচন্দ্রের বয়স তখন একাদশ বৎসর মাত্র ছিল। পিতৃবিয়োগের পর, জ্যেষ্ঠতাত হরিমোহন সেন ইঁহাদের অভিভাবক হন। তাঁহারই তত্ত্বাবধানের অধীনে-কেশবচন্দ্র বৰ্দ্ধিত হন। 

Keshab Chandra Sen.jpg

স্বর্গীয় কেশবচন্দ্র সেন।

 ১৮৪৫ সালে সাত বৎসর বয়সে কেশবচন্দ্র হিন্দুকলেজে ভৰ্ত্তি হন। পূৰ্ব্বেই বলিয়াছি ১৮৫২ সালে হিন্দুকলেজে বিবাদ উপস্থিত হয়, যে বিবাদের ফলস্বরূপ খ্যাতনামা রাজেন্দ্র দত্ত মহাশয় ১৮৫৩ সালে মেট্ৰপলিটান কলেজ স্থাপন করেন। কেশবচন্দ্রের জ্যেষ্ঠভাত হরিমোহন সেন মহাশয় এই বিবাদে “রাজা বাবুর” পৃষ্ঠপোষক ছিলেন; সুতরাং তিনি কেশবচন্দ্রকে হিন্দুকলেজ হইতে তুলিয়া লইয়া উক্ত কলেজে দিলেন। ১৮৫৪ সালে মেট্ৰপলিটান কলেজ উঠিয়া গেলে কেশবচন্দ্র আবার হিন্দুকলেজে আসিলেন।

 ইহাঁর কিছুকাল পরে একবার বার্ষিক পরীক্ষার সময় কোনও অপরাধে লিপ্ত হওয়াতে তাঁহাকে শাস্তি ভোগ করিতে হয়। শান্ত, সুধীর, সৰ্ব্বজনপ্রিয় কেশবচন্দ্রের মনে ইহাতে গুরুতর আঘাত লাগে। চিরদিন তাহার আত্মমৰ্য্যাদা-জ্ঞান অতিশয় প্রবল ছিল। সুতরাং এই অপমান তাহার প্রাণে শেল-সম বাজিল; তিনি সমবয়স্কদিগের সঙ্গ পরিত্যাগ করিলেন; ঘোর বিষাদের মধ্যে পতিত হইলেন; এবং অমৃতপ্ত হৃদয়ে আত্মোন্নতিয় জন্ত ঈশ্বর-চরণে প্রার্থনা করিতে আরম্ভ করিলেন। অনুমান করি ইহাই তাহার জীবন পরিবর্তনের প্রধান কারণ হইয়াছিল।

 এই সময়ে অর্থাৎ অনুমান ১৮৫৬ সালে তিনি আমেরিকান ইউনিটেরিয়ান মিশনারি ড্যাল সাহেব ও সুবিখ্যাত পাদরী লং সাহেবের সহিত সম্মিলিত হইয়া ব্রিটিশ ইণ্ডির সোসাইট নামে এক সভা স্থাপন করেন। ঐ সভার অপরাপর কার্কের মধ্যে কেশবচন্দ্রেয় কলুটোলাস্থ বাস ভবনে বালকদিগের বিদ্যাশিক্ষার সাহায্যাৰ্থ একটা সায়ংকালীন বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। কেশবচন্দ্র, কতিপয় বয়স্তের সহিত সেখানে প্রতিদিন “বালকদিগকে পড়াইতেন। আমার সমবয়স্ক ও সহাধ্যায়ী কেহ কেহ এই ১৮৫৬ সালে, ঐ স্কুলে সন্ধ্যার সময় পড়া করিতে যাইত। আমি তাহাদের মুখে তখনি কেশবচন্দ্রের প্রশংসা শুনিতাম।

 ১৮৫৬ সালে বাণীগ্রামের কুলীন বৈদ্ধপরিবারস্থ চন্দ্রকুমার মজুমদারের জ্যেষ্ঠ কন্যার হিত তাহার বিবাহ হয়।.

 ১৮৫৭ সাল হইতে কেশবচন্দ্রেয় ধৰ্ম্মভাব ও কৰ্ম্মোৎসাহ বিশেষরূপে প্রকাশ পাইতে লাগিল। ঐ সালে তিনি পুৰ্ব্বোক্ত বেন-স্বহৃদগণের সহিত সম্মিলিত হইয় আপনার ভবনে Good Will Fraternity নামে এক সভা স্থাপন করিলেন। ঐ সভাতে তিনি প্রসিদ্ধ পাশ্চাত্য ধৰ্ম্মাচাৰ্য্যদিগের গ্রন্থ হইতে অংশ সকল উদ্ধৃত করিয়া পাঠ করিতেন; এবং নিজেও প্রবন্ধ লিখিয়া পড়িতেন বা মৌখিক বক্তৃতা দিতেন। এই সভাতে র্তাহার ভাবী বাগিতার স্বত্রপাত হইল; এবং এখন হইতেই একদল যুবক তাহার পদাঙ্ক অনুসরণ করিতে লাগিলেন। এই সভার সম্বন্ধ স্থত্রে ব্রাহ্মসমাজের তদানীন্তন নেতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের সহিত র্তাহার পরিচয় হয়। দেবেন্দ্রনাথের মধ্যম পুত্ৰ সত্যেন্দ্রনাথ কেশবচন্দ্রের সমাধ্যায়ী ও বন্ধু ছিলেন। সত্যেন্দ্র বাবুর দ্বারা অনুরুদ্ধ হইয়া দেবেন্দ্রনাথ একবার উক্ত সভার অধিবেশনে সভাপতির কাজ করেন; এবং যুবক কেশবের ধৰ্ম্মানুরাগ ও ভাবী অসাধারণ বাগ্মিতার প্রমাণ প্রাপ্ত হন।

 ইহার পর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় কিছুদিন একান্তে ধ্যানধারণাতে যাপন করিবার উদ্দেশে সিমলা পাহাড়ে গমন করেন। র্তাহার অনুপস্থিতিকালে কেশবচন্দ্র ব্রাহ্মসমাজের প্রতিজ্ঞাপত্র স্বাক্ষর কম্বিয়া ব্রাহ্মসমাজের সভ্যশ্রেণীভূক্ত হন। দেবেন্দ্রনাথ ১৮৫৮ সালে সহরে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া এই সংবাদে পুলকিত হইলেন; এবং তাহার যৌবন-সুহৃদ প্যারীমোহন সেনের পুত্রকে সাদরে স্বীয় শিস্যদলের মধ্যে গ্রহণ করিলেন।

 একদিকে কেশবচন্দ্রের ব্রাহ্মসমাজে প্রবেশ, অপরদিকে দেবেন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক জীবনের নব উদ্দীপনা—এই উভয়ে ব্রাহ্মসমাজ মধ্যে এক নব শক্তির সঞ্চার করিল; এবং ইহার পল্প হইতে ব্রাহ্মসমাজ নব নব কাৰ্য্যক্ষেত্রে প্রবেশ করিতে লাগিলেন। কেশবচন্দ্র ঐ সকল কাৰ্য্যের উদ্ভাবনকৰ্ত্তা ও দেবেন্দ্রনাথ পৃষ্ঠপোষক হইতে লাগিলেন। ১৮৫৯ সালে “ব্রহ্মবিদ্যালয়” নামে একটা বিদ্যালয় স্থাপিত হইল। তাহাতে দেবেন্দ্রনাথ ও কেশবচন্দ্র কালেজের ছাত্রদিগকে বাঙ্গালা ও ইংরাজীতে উপদেশ দিতে লাগিলেন। তদ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সন্মানিত ছাত্র ব্রাহ্মসমাজের দিকে আকৃষ্ট হইলেন।

 এই সময়ে মহাসমারোহে সিন্দুরীয় পটার গোপাল মল্লিকের বাটতে উমেশচন্দ্র মিত্র প্রণীত “বিধবা বিবাহ” নাটকের অভিনয় হয়। কেশবচন্দ্র তাহার প্রধান উদ্যোগী ও কার্যনিৰ্বাহক ছিলেন। এই অভিনয়ের বাতিকটা র্তার বাল্যকাল হইতেই ছিল। তিনি বাল্যকালে বয়স্তদিগকে লইয়া নানা বিষয়ে অভিনয় করিতেন।

 অনুমান ১৮৫৯ সালে সঙ্গতসভা নামে ধৰ্ম্মালোচনা সভা স্থাপিত হয়।  কেশবচন্দ্র ও র্তাহার বয়স্তগণ এই সভাতে সপ্তাহে একবার সমবেত হইয়া নিজ নিজ ধৰ্ম্মজীবনের অবস্থা ও তাহার উন্নতির উপায় সম্বন্ধে বিশ্রস্তালাপে কিয়ৎক্ষণ যাপন করিতেন। তাহার নিজের ভবনে এই সভার অধিবেশন হইত।

 ১৮৫৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেবেন্দ্রনাথ কেশবচন্দ্র ও সত্যেন্ত্রনাথকে সঙ্গে করিয়া সিংহল যাত্রা করেন; এবং নানাস্থান পরিদর্শনে কয়েক মাস যাপন করিয়৷ আসেন। এই বিদেশযাত্রা ও একত্র বাস দুই নেতাকে মুদৃঢ় প্রীতি-সুত্রে বদ্ধ করিয়া দিল।

 কেশবচন্দ্র দেশে ফিরিলে তাহার অভিভাবকগণ র্তাহাকে বেঙ্গল ব্যাঙ্কে একটা ৩০ টাকার চাকুরী লইয়া কৰ্ম্ম কাজে বসিতে বাধ্য করিলেন। কিন্তু তখন তাহাকে বিষয় কৰ্ম্মে রত করিবার চেষ্টা করা বৃথা। তখন তাহার প্রাণে অগ্নি জলিয়াছে, তাহার জীবনের কাজ তাহার সম্মুখে আসিয়াছে ! কেশবচন্দ্র বিষয় কৰ্ম্মে বসিলেন বটে, কিন্তু অবসর কাল ব্রাহ্মধৰ্ম্ম প্রচারোদেশে facilio office oilfiscan Young Bengal, this is for you, Atwo তাহার সুপ্রসিদ্ধ পুস্তিক। সকল ইহার পর বৎসরেই প্রকাশ পাইতে লাগিল।

 ইহার পর বৎসর তিনি স্বাস্থ্যের জন্ত কৃষ্ণনগরে গিয়া উৎসাহের সহিত ব্রাহ্মধৰ্ম্ম প্রচার করিয়া আসিলেন। তৎপরে ক্রমে of Indian Mirror নামে পাক্ষিক পত্রিক প্রকাশিত হইল; এবং “কলিকাতা কলেজ” নামে একটা বিদ্যালর স্থাপিত হইল। সেই স্কুলগৃহ এই যুবকমণ্ডলীর একটা প্রধান আড্ডা হইয়া দাড়াইল।

 ১৮৬১ সালে কেশবচন্দ্র বিষর কৰ্ম্ম ত্যাগ করিয়া ব্ৰাহ্মধৰ্ম্ম প্রচারে আত্মসমর্পণ করিলেন। ঐ সালেই ব্রাহ্মধৰ্ম্মের পদ্ধতি অনুসারে প্রথম বিবাহু অনুষ্ঠিত হইল। ঐ সালের শ্রাবণ মাসে দেবেন্দ্রনাথের কন্যা সুকুমারীর নবপ্রণীত ব্রাহ্মপদ্ধতি অনুসারে বিবাহ হয়। বোধ হয় ইহার কিছুকাল পরে দেবেন্দ্র নাথের পিতা স্বৰ্গীয় দ্বারকানাথ ঠাকুর মহাশয়ের বার্ষিক শ্ৰাদ্ধও ব্রাহ্মপদ্ধতি অনুসারে সম্পন্ন হয়। এই সকল ব্রাহ্ম অনুষ্ঠান যুবকদলের মধ্যে এক নূতন দ্বার খুলিয়া দিল। কলিকাতার বাহিরে ও অনেক স্থানে ব্রাহ্মপদ্ধতি অনুসারে শ্রাদ্ধাদি ও उद्गिरेकन যুধকদূিগের প্রতি নির্যাতন ও উৎপীড়ন আরম্ভ হইল।

 ত্বরায় সঙ্গত-সভার সভ্যদিগের মধ্যে এক নব ভাবের আবির্ভাব হইল। তাহার ব্রাহ্মধৰ্ম্মের উদার সত্যসকলকে মুখে রাখিয়া সন্তুষ্ট না হইয়া কার্য্যে পরিণত করিবার জন্ত বদ্ধপরিকর হইলেন। ঠাহীদের মধ্যে যাহারা ব্রাহ্মণ ছিলেন, তাহাদের অনেকে উপবীত পরিত্যাগ করিলেন; এবং তন্নিবন্ধন গৃহতাড়িত হইয়া নানা অসুবিধা ভোগ করিতে লাগিলেন। ঘরে ঘরে ব্রাহ্মযুবকগণ পৌত্তলিকতার সংশ্রব ত্যাগ করিবার জন্ত কৃতসংকল্প হওয়াতে আত্মীয় স্বজনের সহিত বিরোধ উপস্থিত হইতে লাগিল।

 ১৮৬২ সালের ১লা বৈশাখ দিবসে কেশবচন্দ্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কর্তৃক কলিকাতা ঘুমাজের আচার্য্যের পদে বৃত হন; এবং ব্রহ্মানন্দ উপাধি প্রাপ্ত হন। “উক্ত দিবস তিনি স্বীয় পত্নীকে ঠাকুরবাড়ীতে লইয়া যান। তাহার অভিভাবকগণ এ কাৰ্য্যের বিরোধী ছিলেন। কিন্তু তিনি নিজে যে আলোক প্রাপ্ত হইয়াছিলেন, তাহা পত্নীকে দিবার জন্য এতই ব্যগ্র হইয়াছিলেন যে অপরের অনুরাগ বিরাগের প্রতি দৃষ্টিপাত করিবার সমর হইল না। তিনি আপনার অভীষ্ট সাধন করিলেন বটে, কিন্তু কিছুদিনের জন্ত গৃহ হইতে তাড়িত হইতে হইল। * এই অবস্থাতে র্তাহাকে ও তাহার পত্নীকে অনেক দিন দেবেন্দ্রনাথের ভবনে তাহার পুত্র ও পুত্রবধূদিগের মধ্যে বাস করিতে হইল। তাহাতে উভয়ের প্রতিবন্ধন আরও দৃঢ় হইল। তৎপরে স্বীর অভিভাবকদিগের হস্ত হইতে আপনার প্রাপ্য সম্পত্তি উদ্ধার করিতে ও পৈতৃকভব্লনে পুনঃপ্রবেশাধিকার লাভ করিতে কয়েক মাস গেল।

 নিজভবনে প্রবেশাধিকার লাভের পরেই তাঁহার পরিবারে প্রথম ব্রাহ্ম অনুষ্ঠানের অবসর উপস্থিত হইল। র্তাহার প্রথম পুত্র করুণাচন্দ্রের নামকরণ নবপ্রণীত ব্ৰাহ্মপদ্ধতি অনুসারে সম্পন্ন হইল।

 ইহার পরে তিনি উৎসাহ সহকারে ব্রাহ্মধৰ্ম্মপ্রচারে প্রবৃত্ত হইলেন। খ্ৰীষ্টীয় মিশনারিগণের সঙ্গে তুমুল সংগ্রাম বাধিয়া গেল, কয়েক বৎসর পূর্বে কৃষ্ণনগরে গিয়া তিনি যে বক্তৃতাদি করেন, তাহাতেই তত্রতা পাদরী ডাইসন সাহেবের সহিত বিবাদ বাধিয়াছিল, “ যে বিবাদ আর মেটে নাই। খ্ৰীষ্টীয় সংবাদপত্র ও সভাসমিতিতে ব্ৰাহ্মদিগে প্রতি গালাগালি চলিতেছিল। ১৭৬৩ সালের প্রারম্ভে প্রসিদ্ধ খ্ৰীষ্টীয় প্রচারক লালবিহারী দে কর্তৃক সম্পাদিত এক পত্রিকাতে ব্রাহ্মদিগের প্রতি অনেক উপহাস বিদ্রুপ প্রকাশ পায়। তদুত্তরে corbă Brahmo Samaj Vindicated (“stonio পক্ষসমর্থন”) বলিরা এক বক্তৃতা প্রদান করেন। সেই বক্তৃতাতে তাঙ্কার যে বাগিতা প্রকাশ পাইয়াছিল, তাহা দেখিয় শ্রোতৃবৃন্দ চমৎকৃত হইয়া যান। স্বপ্রসিদ্ধ পাদরী ডফ সাহেব উক্ত বস্তু তাতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি পরে বলেন ব্রাহ্মসমাজ  বে শক্তি লইয়া উঠিতেছে তাহ৷ সামাৰ শক্তি নহে। বলিতে গেলে এই বস্তৃতা হইতেই কেশবচন্দ্রের প্রতিষ্ঠা বঙ্গসমাজে স্থাপিত হইয়া যায়।,

 এই বৎসরে তিনি ‘ব্রহ্মবন্ধু সভা” নামে একটী সভা স্থাপন ’করেন। অস্তঃপুরে স্ত্রীশিক্ষা বিস্তার তাঁহার অতিম উদেষ্ঠ ছিল। এই সভার সভ্যগণ। উৎসাহের সহিত নানা হিতকর বিষয়ের আলোচনাতে প্রবৃত্ত হন। ১৮৬৪ সালে কেশবচন্দ্র একজন বয়স্তা সহ মাদ্রাজ ও বোৱাই প্রদেশে প্রচারার্থ গমন করেন। তদবধি সে সকল প্রদেশে ব্রাহ্মধর্মের বীজ উপ্ত• হইয়া বৃক্ষে পরিণত হইয়াছে।

 বোম্বাই হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া কেশবচন্দ্র দেবেন্দ্রনাথকে একটী প্রধান সংস্কার কাৰ্য্যে প্ৰবৃত্ত করিলেন। তৎপূর্বে উপবীতধারী উপাচার্যগণ ’ব্রা সমাজের বেদীতে আসীন হইয়া উপাসনাদি কাৰ্য্য নিপন্ন করিতেন। কেশব চত্রের প্ররোচনায় মহর্ষি তাহাদিগকে কষুচুত করিয়া দুইজন উপবীতত্যাগী উপাচার্যকে সেই পদে নিয়োগ করিলেন। এতদ্দার সমাজের প্রাচীন সভ্যগণের মনে বির’গ জন্মিল। গৃহারা মহর্ষির নিকট মনের হুঃখ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। ওদিকে যুবকাল আর একটী অসমসাহসিক কাৰ্য্যে অগ্রসর হইলেন। তাহার৷ অসমবর্ণের দুই ব্যক্তিকে বিবাহ সম্বন্ধে আবদ্ধ করিলেন। দেবেন্দ্রনাথ কেশবচন্দ্রের প্রতি হাজার অমুর ক্ত হইলেওনিজে তৎপূৰ্বে উপবীত পরিত্যাগ করিলেও, এবং খুব কদলকে বিধিমতে উৎসাহদানে ইছুক থাকিলেও, এরূপ সমাজবিপ্লবধূচক কার্যের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তথন ‘তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা যুবকদলের হস্তে ছিল। তাহাতে এই বিবাহের সংবাদ প্রকাশিত। হইলে তিনি বিপ্লবের সূচনা দেখিয়া ভীত হইলেন; এবং যুবকদলকে সমাজ-সম্বন্ধীয় সৰ্ববিধ কর্তৃত্ব হইতে অস্তরিত করিবার জন্য প্রতিজারূঢ় হইলেন। কেশবচন্দ্র দেখিলেন ঘোর ঝটিকা আসিতেছে, তিনি তাহার জন্য প্রস্তুত হইতে লাগিলেন। কলিকাতা লমাজের কর্তৃত্বভার তাহার হন্তের বাহিরে যায় দেথিয়, তিনি ব্রাহ্মধর্ম প্রচার বিভাগকে স্বতন্ত্ৰ করিয়া নিজ হস্তে রাখিবার জ্য “ব্রাহ্মপ্রতিনিধি সভ” নামে এক সভা গঠন করিতে। প্রবৃত্ত হইলেন; ব্রাহ্মধর্ম প্রচারার্থ “স্বৰ্ষতৰ’ নামক এক মাসিক পত্রিকা। বাহির করিপেন; এবং তাহার দৃষ্টস্তের অনুসরণ করিা যে কতিপয় যুবা বিষয় কৰ্ম্ম ত্যাগ পূৰ্বক ব্রাহ্মধর্ম প্রচারে আত্মসমৰ্পণ করিয়াছিলেন, তাই দিগকে লইয়া মহোৎসাহে প্রচার বিভাগ গঠনে প্রবৃত্ত হইলেন।  এই গোলমালের মধ্যে আর এক ঘটনা ঘটিল। ১৮৬৪ সালের স্বপ্রসিদ্ধ ঝড়ে কলিকাতা ব্রাহ্মসমাজের বাড়ী ভাঙ্গিয়া যাওয়াতে তাহার জীর্ণ সংস্কারের প্রয়োজন হইল। তখন কিছুদিনের জন্ত সমাজের উপাসনা দেবেন্দ্রনাথের গৃহে উঠিয়া গেল। সেখানে যে দিন প্রথম উপাসনা আরম্ভ হইল, সে দিন উপবীত-ত্যাগী উপাচাৰ্য্যদ্বয় গিয়া দেখেন যে তাহাদের উপস্থিত হইবার পূৰ্ব্বেই পূৰ্ব্বকার উপবীতধারী উপাচাৰ্য্যগণ উপাসনা কাৰ্য আরম্ভ করিয়াছেন। ইহা -যুবক ব্রাহ্মদলের পক্ষে অসহনীয় বোধ হইল। র্তাহীদের অনেকে সেই মুহূৰ্ত্তেই সে স্থান ত্যাগ করিয়া অন্ত স্থানে গিয়া উপাসনা করিলেন। বলিতে গেলে এই সময় হইতেই প্রকাগু গৃহবিচ্ছেদ আরম্ভ হইল। ইহার পর কেশবচন্দ্র অনেক দিন কোনও প্রকারে সম্মিলিত ভাবে থাকিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু চরমে শান্তি স্থাপিত হওয়া অসম্ভাবিত হইল।

 বরায় তিনি কলিকাতা সমাজের সম্পাদকের পদ ত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। সেই পদে দেবেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর নিযুক্ত হইলেন। কেশবচন্দ্র কলিকাতা সমাজের অধ্যক্ষত হইতে বিচুত হইয়া প্রতিনিধিসভাকে প্রধান যন্ত্ররূপে আশ্রয় করিলেন। তাহার সাহায্যে একটা ব্রাহ্মমণ্ডলী গঠন ও ব্রাহ্মধৰ্ম্ম প্রচার করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। দেবেন্দ্রনাথ এ বিষয়ে প্রথমে তাহার সাহায্য করিয়াছিলেন, কিন্তু পরে যুবকদলেয় অভিসন্ধির প্রতি সন্দিহান হইয়া পশ্চাৎপদ হইলেন। কিন্তু সৰ্ব্ববিধ উন্নতিকর প্রস্তাবে সহায়তা করিতে বিরত হইলেন না। যুবকদল আত্মোস্নতির নিমিত্ত কোনও প্রস্তাব করিলেই তিনি তাহাতে যোগ দিতেন ও বিধিমতে সাহায্য করিতেন। এমন কি যুবকদলের প্রতিষ্ঠিত ব্রাহ্মবন্ধু সভাতে একবার তিনি “ব্ৰাহ্মসমাজের পঞ্চবিংশতি বৎসরের পরীক্ষিত বৃত্তান্ত” বিষয়ে বক্তৃতা করিয়াছিলেন।

 ১৮৬৫ সালের আষাঢ় মাসে যুবকদলের অগ্রণীগণ কলিকতা সমাজের অধ্যক্ষদিগের নিকট এই প্রার্থনা জানাইলেন যে সমাজের বেদীতে উপবীতধারী উপাচাৰ্য্যগণকে বসিতে না দেওয়া হয়; এবং যদি এ প্রার্থনা অগ্রাহ হয়, তাহা হইলে তাহাদিগকে স্বতন্ত্র দিনে সমাজগৃহে উপাসনা করিতে দেওয়া হয়। উত্তরে দেবেন্দ্রনাথ বলিলেন যে যাহারা বহুকাল সমাজের সহিত যোগ দিয়া অনুরাগের সহিত কাজ করিয়া আসিতেছেন, র্তাহাদিগকে এক্ষণে স্বাধিকারচ্যুত করা তিনি পক্ষপাতের কার্য্য বলিয়া মনে করেন। তৎপরে সমাজের একটা সাধারণ উপাসনার দিন থাকিতে, প্রতিবাদকারী কয়েকজনকে আর এক দিন সমাজগৃহ দেওয়া ভাল মনে করিলেন না। বস্তুতঃ দেবেন্দ্রনাথ এ সময়ে যাহা কিছু করিয়াছিলেন, কৰ্ত্তব্য বোধে এবং তাহার অবলম্বিত আদর্শ রক্ষার জন্ত। ব্রাহ্মধৰ্ম্মকে হিন্দুভাবে হিন্দুসমাজের মধ্যে প্রচার করা তাঁহার চিরদিনের আদর্শ। তিনি মনে করিতেন রামমোহন রায় তাহাকে সেই ভার দিয়া গিয়াছিলেন। তাহার ব্যাঘাতের আশঙ্কাতেই তিনি কেশবচন্দ্রের দলের হস্ত হইতে কাৰ্য্যভার লইলেন। তাঁহাদিগকে ভালবাসিতে ও সাহায্য করিতে বিরত হইলেন না। সকল ভাল বিষয়ে তাহাদের উৎসাহদাতা রহিলেন।

 ১৮৬৫ সালের কাৰ্ত্তিক মাসে কেশবচন্দ্র, অঘোরনাথ গুপ্ত ও বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী এই দুই প্রচারক সঙ্গে পূৰ্ব্ববঙ্গে ব্রাহ্মধৰ্ম্ম-প্রচারে বহির্গত হন। তদুপলক্ষে ফরিদপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ প্রভৃতি স্থান পরিদর্শন করেন।

 কলিকাতায় ফিরিয়া কেশবচন্দ্র যুবকদলের নেতা হইয়া সমাজ-সংস্কারে আপনাকে নিয়োগ করিলেন। বোধ হয় ১৮৬৪ সালেই স্বীয় বয়স্তগণের পত্নীদিগের আধাত্মিক উন্নতি সাধনের জন্ত “ব্রান্ধিক-সমাজ” নামে এক নারী সমাজ স্থাপন করিয়াছিলেন। সেখানে তিনি উপদেশ দিতেন। ব্রাহ্মগণ স্বীর স্বীয় পরিবারস্থ নারীগণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য প্রাণপণে চেষ্টা করিতে লাগিলেন।

 ১৮৬৬ সালের জানুয়ারির শেষে যে মাঘোৎসব হইল, তাহাতে কেশবের ব্রান্ধিকা-সমাজের মহিলাসভ্যগণ উপস্থিত থাকিবায় ইচ্ছা প্রকাশ করিলেন। তদনুসারে তিনি দেবেন্দ্রনাথকে অনুরোধ করিয়া কলিকাতা সমাজে বেণীর পুৰ্ব্বপাশ্বে পরদার আড়ালে মহিলাদিগেয় বসিবার আসন করিলেন। ব্রাহ্মসমাজের ইতিহাসে সৰ্ব্বপ্রথমে নারীগণ এই প্রকাণ্ডু উপাসন-মন্দিরে পুরুষদিগের সহিত বসিলেন। মহিলাদিগের উৎসাহ আজও বাড়িয়া গেল। পরবত্তী ফেব্রুয়ারী মাসে কেশবচন্দ্র মহিলাদিগকে লইর ডাক্তার রবসন নামক খ্ৰীষ্টীয় পাদরীর ভবনে প্রকাশু সান্ধা-সমিতিতে গেলেন। সহরে খুব আলোচনা উঠিল।

 ইহার পরে কলিকাতা সুমাজের সহিত বিচ্ছেদ দিন দিন বাড়িতে লাগিল। ঐ সালের এপ্রিল বা মে মাসে কেশবচন্দ্র Jesus Christ, Asia and Europe নামে স্বপ্রসিদ্ধ বক্তৃতা করিলেন। এই বক্তৃতাতে যেমন একদিকে অসাধারণ বাগিতা, অপরদিকে তেমনি আশ্চৰ্য্য ধৰ্ম্মভাবের উদারতা প্রকাশ পাইল। র্তাহার নাম সুবক্তা ও বঙ্গসমাজের নেতাদিগের শীর্ষস্থানে উঠিয়া গেল। কিন্তু ইহাতে ধীশুখ্রষ্টের প্রতি যে প্রগাঢ় ভক্তি প্রদর্শন করিয়াছিলেন, তাহাতে দুইদিকে দুই প্রকার চর্চা উঠিল। গবর্ণর জেনারেল লর্ড লরেন্স হইতে আরম্ভ করিয়া সামান্ত কেটেকিষ্ট পৰ্য্যস্ত খ্ৰীষ্টানগণ কেশবচন্দ্র ত্বরায় খ্ৰীষ্টীয় ধৰ্ম্ম অবলম্বন করিবেন বলিয়া বগল বাজাইতে লাগিলেন। অপরদিকে দেশীয় স্বধৰ্ম্মামুরাগিগণ কেশবচন্দ্রকে ও নবোদিত ব্ৰাহ্মদলকে খ্ৰীষ্টীয়ান বলিয়া এগালি দিতে লাগিলেন। কলিকাতা ব্রাহ্মসমাজের সভ্যগণ এই আন্দোলনে যোগ দিলেন। এত অতিরিক্ত খ্ৰীষ্টভক্তি তাঁহীদের চক্ষে ব্রাহ্মধৰ্ম্মের বিকার ৰলিয়া প্রতীতি হইল। ব্রাহ্মদিগের সেই যে খ্ৰীষ্টীয়ান অপবাদ উঠিয়াছে, তাহা আজও যায় নাই। যদিও তৎপরবর্তী সেপ্টেম্বর মাসে কেশবচন্দ্র Great Men নামক আর একটা বক্তৃতা করিরা নিজের খ্ৰীষ্টীয়ান অপবাদ কতকটা দূর করিবার প্রয়াস পাইলেন বটে, তথাপি সে অপবাদ সম্পূর্ণ গেল না। এ অপবাদের আর একটু কারণ আছে। এই ১৮৬৬ সাল হইতে, চৈতন্তের প্রভাবের আবির্ভাব পর্যন্ত, কয়েক বৎসর কেশবচন্দ্রের দলভুক্ত ব্রাহ্মগণ যিশুখ্ৰীষ্টকে লইয়া কিছু বাড়াবাড়ি করিয়াছিলেন। বড়দিনের দিন যিশুর ধ্যানে দিনযাপন করা, যিশুর নামে সঙ্গীত রচনা করা, উঠিতে বসিতে যিশু কীৰ্ত্তন করা, অন্তান্ত ধৰ্ম্মশাস্ত্র অপেক্ষা গ্ৰীষ্টীয় শাস্ত্র অধিক অনুশীলন করা প্রভৃতি চলিয়াছিল। সুতরাং লোকের ও প্রকার সংস্কার স্বাভাবিক। এদিকে যুবক ব্রাহ্মদলের কার্য্যক্ষেত্র দিন দিন বিস্তৃত হইলে লাগিল। তাঁহাদের প্রচারকগণ তখন উৎসাহের সহিত মফঃস্বলের নানা স্থানে ভ্রমণ করিয়া নব নব সমাজ প্রতিষ্ঠিত করিতে লাগিলেন। ক্রমে এই সকল সমাজকে একতাস্থত্রে আবদ্ধ করা প্রয়োজন হইতে লাগিল। চারিদিক হইতে অনেক ব্রাহ্ম ও ব্রাক্ষিক একটা স্বতন্ত্র সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য অনুরোধ করিতে লাগিলেন। অবশেষে এই সালের ১১ই নবেম্বর দিবসে উন্নতিশীল ব্রাহ্মদলের এক সভাতে “ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ” নামক এক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হইল।

 উন্নতিশীল ব্রাহ্মদল মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথকে আপনাদের ভক্তি ও কৃতজ্ঞতাস্বচক এক অভিনন্দন পত্র দিয়া এবং তঁহার আশীৰ্ব্বাদ গ্রহণ করিয়া, নবপ্রতিষ্ঠিত সমাজের কার্য্যক্ষেত্রে প্রবেশ করিলেন। এই সময় হইতে কলিকাতা ব্রাহ্মসমাজের নাম পরিবর্তিত করিয়া আদি ব্রাহ্মসমাজ রাখা হইল।

 ১৮৬৭ সাল হইতে যুবকলের প্রচারোৎসাহ আগুনের ন্যায় জলিয়া উঠিল। অনেকে কল্যকার চিন্তা পরিত্যাগ. করিয়া প্রচার ব্রত গ্রহণ করিলেন; এবং অৰ্দ্ধাশনে ও অনশনে দিন কাটাইতে ও পাছকাবহীন পদে কলিকাতৃ সহরে ভ্রমণ করিতে লাগিলেন। এই প্রচারোৎসাহের ফলস্বরূপ দেশের রানাস্থানে ব্রাহ্মসমাজ স্থাপিত হইতে লাগিল; এবং ব্রাহ্মবিবাহের সংখ্যা বাড়িতে লাগিল।

 এই সাল হইতে কেশবচন্দ্রের নিজের ভবনে তাহার বয়স্তদিগকে লইয়া দৈনিক উপাসনা আরম্ভ হইল। এই দৈনিক উপাসনা হইতে নবব্যাকুলত৷ ও নবভক্তির সঞ্চার হইল। তাছার ফলস্বরূপ ইছারা মহাত্মা চৈতন্তের ভক্তিতত্ত্ব • আলোচনা করিতে লাগিলেন; এবং আপনাদের মধ্যে খোল করতাল সহ সংকীৰ্ত্তনের প্রথা প্ৰবৰ্ত্তিত করিলেন। আমনি সংবাদ পত্রে ব্রাহ্মেরা নেড়ানেড়ীর দল হইল বলিয়া চর্চা উঠিল।

 ১৮৬৮ সালের প্রারম্ভে ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের উপাসনা-মন্দির নিৰ্ম্মাণের জন্ত একখণ্ড ভূমি ক্রয় করিয়া উক্ত মন্দিরের ভিত্তি স্থাপন করা হইল। তদুপলক্ষে কেশবচন্দ্র সদলে নগরকীৰ্ত্তন করিয়া ভিত্তিস্থাপন করিতে গেলেন। এই ব্রাহ্মদিগের প্রথম নগর-কীৰ্ত্তন। সেই কীৰ্ত্তনের মধ্যে উন্নতিশীল ব্রাহ্মগণ জগতের নিকট এই ঘোষণা করিলেন;—

“নর নারী সাধারণের সমান অধিকার,
যার আছে ভক্তি, পাবে মুক্তি, নাহি জাত বিচার ”

 ইহাই অস্কাপি উন্নতিশীল ব্রাহ্মদলের মূলমন্ত্রস্বরূপ রহিয়াছে।

 এই ১৮৬৮ সালে ব্রাহ্মসমাজ মধ্যে এক মহ আন্দোলন উপস্থিত হয়। নবভক্তির আবির্ভাবে ব্রাহ্মদিগের অস্তরে আশ্চৰ্য্য বিনয়ের আবির্ভাব হয়। তাহার ফলস্বরূপ তাহাদের অনেকে পরম্পরের এবং বিশেষতঃ কেশবচন্দ্রের পদে ধরিয়া, পদধূলিগ্রহণ, পাদপ্রক্ষার্লন, সবিনয়ে ক্ৰন্দন প্রভৃতি আরম্ভ করেন। তাছা ভক্তি প্রকাশের আতিশয্য মাত্র। এই সময়ে কিছুদিনের জন্ত কেশৱচন্দ্র সপরিবারে মুঙ্গের সহরে বাস করিতেছিলেন। সেখানেই ঐ ভক্তির উচ্ছাস প্রধানরূপে প্রকাশ পায়। ইহাতে তাহার দলের দুইজন প্রচারক ব্রাহ্মসমাজ মধ্যে নরপূজার আবির্ভাব বলিরা প্রকাগু পত্রে আন্দোলন করিতে প্রবৃত্ত হন। এই আন্দোলনে অনেক ব্রাহ্ম ব্রাহ্মসমাজ পরিত্যাগ করেন।

 অল্পদিনের মধ্যে এই আন্দোলন নিরন্ত হইলে, ১৮৬৯ সালে কেশবচন্দ্র ভারতবর্ষীয় ব্রহ্মমন্দিরে উপাসনা প্রতিষ্ঠা করিতে সমর্থ হন।

 ১৮৭৭ সালে তিনি ইংলণ্ডে গমন করেন; এবং প্রান্ধ ছয় সাত মাল কাল সেখানে বাস করিয়া নানা স্থানে ব্ৰাহ্মধৰ্ম্ম প্রচার করেন। ভারতেশ্বরী মহারাণী ভিক্টোরিয়া হইতে সামান্ত ধৰ্ম্মাচাৰ্য্য পৰ্য্যস্ত সকলে তাহার প্রতি সন্মান প্রদর্শন করিতে ক্ৰটি করেন নাই।

 স্বদেশে ফিরিয়াই তিনি দেশের সর্ববিধ সংস্কার-কার্য্যে নিযুক্ত হন; এবং “ভারত সংস্কার সভা” নামে, একটি সভা স্থাপন করিয়া, তাহার অধীনে সুলতসাহিত্য, নৈশবিদ্যালয়, স্ত্রীশিক্ষা, শিক্ষাবিস্তার, সুরাপান নিবারণ প্রভৃতি ৰহুবিধ দেশহিতকয় কার্য্যের স্বত্রপাত করেন। কয়েক বৎসরের মধ্যে এই সভা, ও ইহার অনুষ্ঠিত সমুদর কার্য্য উঠিয়া গিয়াছে। এখন এলবার্ট কলেজ ভিন্ন অন্ত কোনও স্মৃতি-চিকু নাই।

 ১৮৭১ সালে ব্রাহ্মবিবাহ বিধিবদ্ধ করিবার আন্দোলন প্রবলরাপে উপস্থিত হয়। ব্ৰাহ্মদিগের নামে বিবাহ সম্বন্ধীয় কোনও স্লাজবিধি প্রণীত হয়, আদিসমাজ ইহার বিরোধী হওয়াতে, ব্ৰাহ্মবিবাহবিধি এই নাম ত্যাগ করিয়া, ১৮৭২ সালেয় তিন আইন নাম দিয়া একটা সিভিল বিবাহ বিধি প্রচারিত হয়। তদবধি তদনুসারেই উন্নতিশীল ব্ৰাহ্মদিগের বিবাহদি হইয়া আসিতেছে।

 এই সময়েই কেশবচন্দ্র কতকগুলি ব্ৰাহ্মপরিবারকে একসঙ্গে রাখিয়া, দৈনিক উপাসনা, পাঠ, সৎ প্রসঙ্গ, সময়ে আহার, সময়ে বিশ্রাম প্রভৃতির নিয়ম শিক্ষা দিয়া, ব্রান্ধপরিবারের আদর্শ প্রদর্শনেয় উদ্দেশে “ভারতাশ্রম” নামে একটা আশ্রম প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রচারকদিগের অনেকে এবং অপর ব্রাহ্মদিগের ৪ কেহ কেহ সপরিবারে সেই আশ্রমে বাস করিতেন। কেশবচন্দ্র প্রতিদিন উপাসনাকাৰ্য্য সম্পাদন করিতেন; এবং সকলে নিজ নিজ ব্যয় দিয়া, একত্র আহারাদি করিয়া, এক পরিবারভুক্ত হইয়া থাকিতেন। আশ্রম ভবনেই বয়স্থ মহিলাদের জন্ত একটা বিদ্যালয় ছিল। সেখানে আমরা কয়েকজন শিক্ষকতা করিতাম; এবং আশ্রমবাসীদের ও বাহিরের ব্রাহ্মদিগের পত্নী, ভগিনী ও কস্তাগণ পাঠ করিতেন।

 ১৮৭২ সালে উন্নতিশীল ব্ৰাহ্মদলে স্ত্রীস্বাধীনতায় আন্দোলন উপস্থিত হইল। এ আন্দোলন কালে থামিল বটে, কিন্তু ত্বরার আর এক প্রতিবাদের রোল উঠিল। আশ্রমের অধক্ষের সহিত আঁশ্রমবাসীকোনও ব্রান্ধের বিবাদ উপস্থিত হইয়া, সেই বিবাদের প্রতিধ্বনি বাহিরের সংবাদ পত্রে বাহির হইয়া, তাহ হইত হাইকোর্টে এক মোকদম উঠিল। কেশবচন্দ্র, স্বয়ং বাদী হইয়া ঐ মোকদম উপস্থিত করিলেন। প্রতিবাদিগণ ক্ষমা প্রার্থনা করাতে মোকদম উঠিয়া গেল বটে, কিন্তু ইহা হইতে পরোক্ষভাবে ব্ৰহ্মমন্দিরের উপাসকমণ্ডলীর সভ্যগণের মধ্যে আর এক আন্দোলন উঠিল। উপাসকমণ্ডলীর কার্য্যে উপসকগণের অধিকার স্থাপনের চেষ্ট আরম্ভ হইল এবং কেশবচন্দ্রের অবলম্বিত কতকগুলি মত লইয়া বিশেষ আলোচনা চলিল। এই বিরোধিদল “সমদৰ্শী” নামে এক মাসিকপত্র বাহির করিলেন; এবং প্রকাগু বক্তৃতাদি করিতে প্রবৃত্ত হইলেন।

 ওদিকে কেশবচন্দ্র ৰ্তাহার অনুগত সাধকদলকে যোগী, ভক্ত প্রভৃতি। কয়েক শ্রেণীতে বিভক্ত করিয়া বিশেষ উপদেশ দিতে প্রবৃত্ত হইলেন; এবং কলিকাতার অনতিদূরে একটা উদ্যান-বাটিকা ক্রয় করিয়া, তাহার “সাধনকানন’ নাম রাথিয়া, মধ্যে মধ্যে সেখানে গিয়া প্রচারকদলের সহিউ বাস করিতে লাগিলেন। এই সময়ে তিনি বিশেষভাবে বৈরাগ্যের উপদেশ দিতে প্রবৃত্ত হন; এবং তাহার নিদর্শন স্বরূপ নিজে স্বপাকে আহার করিতে আরম্ভ করেন। তাহার অনুকরণে তাহার প্রচারকগণের অনেকেও স্বপাকে আহার করিতে থাকেন। ইহা লইয়াও ব্রাহ্মদিগের মধ্যে মতভেদ ও বাদানুবাদ আরম্ভ হর।

 ১৮৭৭ সালের প্রারম্ভে সমাজের কার্য্যে নিয়মত্তস্ত্র প্রণালী স্থাপনের উদ্দেশে “সমদৰ্শী দল একটা ব্ৰহ্মপ্রতিনিধি সভা গঠনের জন্ত ব্যগ্র হন। কেশবচন্দ্র, তাহাদের চেষ্টাতে বাধা দেন নাই; বরং সাহায্য করিতে সন্মত হইরাছিলেন। কিন্তু এই চেষ্টা সম্পূর্ণ কার্য্যে পরিণত হইতে না হইতে কুচবিহারের বিবাহ আসিয়া পড়িল; এবং ঐ বিবাহে ব্ৰাহ্মদের অবলম্বিত কতকগুলি নিয়ম লঙ্ঘন হওয়াতে উন্নতিশীল ব্রাহ্মদল তাঙ্গিয়া দুই ভাগ হইয়া যায়। g বিবাহন্থে কেশববাবুকে আচার্যের পদ হইতে ও ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদকের পদ হইতে অবস্থত করিবার জন্য চেঃ আরম্ভ হইল। কেশববাবু তাহা হইতে দিলেন না; স্বতরাং ব্রাহ্মদিগের অধিকাংশ তাহাকে পরিত্যাগ করিয়া “সাধারণ ব্ৰাহ্মসমাজ” নামে একটা স্বতন্ত্র সমাজ স্থাপন করিলেন।

 ইহার কিছুদিন পরে কেশবচন্দ্র, তাহাব নিজের বিভাগীর সমাজের “নববিধান” নাম দিয়া, তাহার নূতন বিধি, নুতন সাধন, নূতন লক্ষণ, নুতন প্রণালী প্রভৃতি স্বষ্টি করিত্বে প্রবৃত্ত হইলেন; মহম্মদের অমুকরণে বিরোধিগণকে কাফের শ্রেণী গণ্য করিয়া তাহাদের প্রতি কটুক্তি বর্ষণ করিতে লাগিলেন; এবং আপনার দলের শ্রেষ্ঠতা প্রতিপাদনের জন্ত বিধিমতে প্রশ্বাসী হইলেন।  ফলতঃ, এই বিৰাদের পর ১৮৭৮ সাল হইতে ১৮৮৪ সাল পর্য্যস্ত এই পাঁচ বৎসরে তিনি ভগ্নগৃহের পুনর্গঠনের জন্ত ষেরূপ গুরুতর শ্রম করিয়াছিলেন তৎপূৰ্ব্বে বিশ বৎসরে তাহা করিয়াছিলেন কি না সন্দেহ। সেই শ্রমে র্তাহার শরীর ভয় হইয়া গেল। ১৮৮৩ হইত্তেই দারুণ বহুমূত্র রোগ ধরা পড়িল; এবং ১৮৮৪ সালের ৮ই জানুয়ারি দিবসের প্রাতে প্রাণবায়ু তাহার শ্রান্ত ক্লাস্ত দেহকে পরিত্যাগ করিয়া গেল।


দীনবন্ধু মিত্র।

 মাইকেল মধুসূদন দত্ত যে কেবল মাত্র গুপ্ত কবি কর্তৃক দৃঢ়ীকৃত মিত্রাক্ষর নিগড় হইতে বঙ্গ-কবিতাকে উদ্ধার করিবার প্রয়াস পাইয়াছিলেন তাহা নহে; “নাটুকে” রামনারারণের অবলম্বিত নাট্যকাব্যের রীতি হইতেও বঙ্গীর নাট্যকাব্যকে উদ্ধার করিবার প্রয়াস পাইয়াছিলেন। ইহা অগ্ৰেই প্রদর্শন করিয়াছি। তাহার প্রণীত শৰ্ম্মিষ্ঠা ও কৃষ্ণকুমারী নাট্যকাব্যের নুতন পথ প্রদর্শন করিয়া যার। এই নুতন পথে অগ্রসর হইয় অনেকে নাটক রচনা করিবার জন্ত প্রয়ঃসী হন। তন্মধ্যে দীনবন্ধু মিত্রই সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন। ইহার প্রণীত নাটক সকল সে সমরে বঙ্গীয় পাঠক সমাজে প্রচুর সমাদর পাইয়াছিল। আমাদের সাহিত্য জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্রদিগের মধ্যে ইনিও একজন। যে সমরে কেশবচন্দ্র সেন বাঙ্গালি জাতির নব শক্তি ও নব আকাঙ্ক্ষার উন্মেষের মুখপাত্র স্বরূপ হইয়া দাড়াইয়াছিলেন, যে দমরে বঙ্কিমচন্দ্র ও “বঙ্গদর্শন আমাদের চিন্তার এতটা স্থান অধিকার করিয়াছিলেন, সেই সময়ে দীনবন্ধু আর এক দিক দিয়া সেই উন্মেষে সহায়তা করিয়াছিলেন তাহাতে সন্দেহ নাই। সেইজন্ত এ কালের প্রধান পুরুষদিগের মধ্যে র্তাহারও জীবনের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত দিভে অগ্রসর হইতেছি।

 দীনবন্ধু বাঙ্গাল ১২৩৬ বা ইংরাজী ১৮২৯ সালে কলিকাতার অদূরবর্তী চৌবেড়িয়া নামক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাহার পিতার নাম কালাচাঁদ মিত্র। কালাচাদ মিত্ৰ সামান্ত বিষয় কৰ্ম্ম করিয়৷ অক্তি কষ্টে সংসার যাত্রা নিৰ্ব্বাহ করিতেন। র্তাহার এরূপ সামর্থ্য ছিল না যে নিজ পুত্রের উচ্চ শিক্ষার ব্যয় নিৰ্ব্বাহ করেন; সুতরাং তিনি বালে দীনবন্ধুকে গ্রাম্য পাঠশালাভে সামান্তরূপ জমিদারি হিসাব শিখাইস্থা অল্প বয়সেই তাহাকে বিধৱ কৰ্ম্মে নিযুক্ত

Dinabandhu Mitra (1830-1873).jpg

Signature of Dinabandhu Mitra.jpg

করিয়া দেন। ঐ কৰ্ম্মের আয় অতি অল্প ছিল, কিন্তু তাহাতেই তিনি নিজ আয়ের অনেক সাহায্য হইত বলিয়া মনে করিতেন। কিন্তু এই কাজ করিয়া দীনবন্ধু চিত্তে সন্তোষ লাভ করিতেন না। তাহার মন অধিক জ্ঞান লাভের জন্ত, বিশেষতঃ ইংরাজী শিক্ষা করিবার জন্ত, পিঞ্জরাবদ্ধ বিহঙ্গের হ্যায় সৰ্ব্বদা আপনাকে অমুখী বোধ,করিত।

 অবশেষে একদিন দীনবন্ধু কৰ্ম্ম ছাড়িয়া খ্ৰীয় পিতাকে কিছু ন বলিয়া গোপনে কলিকাতায় পলাইয়া আসিলেন; এবং একজন আত্মীয়ের আশ্রয়ে, থাকিয়া ইংরাজী শিক্ষা আরম্ভ করিলেন। এই সময়ে তাহাকে বিদ্যা শিক্ষার জন্ত নানা প্রকার ক্লেশ সহ করিতে হইয়াছিল। স্বয়ং রন্ধন করিয়া খাওয়াইয়া অপরের বাসাতে থাকিতে হইত। কিন্তু কোনও ক্লেশেই র্তাহাকে স্বীয় অভীষ্ট পথ হইতে বিরত করিতে পারিত না।

 দীনবন্ধুর কলিকাতার আসা ও বিদ্যাশিক্ষা আয়ম্ভ করা বিষয়ে একটী কৌতুকজনক ঘটনা আছে। শৈশবে র্তাহার পিতা তাহার নাম রাখিয়াছিলেন “গন্ধৰ্ব্ব নারায়ণ”; লোকের মুখে এই নাম দাড়াইল “গন্ধ", সময় বয়স্ক বালুকদিগের মুখে হইয়া পড়িল “খু খু গন্ধ, গন্ধ"! এই রূপে পিতৃদত্ত নামটা বালকের অশাস্তির একটা কারণ হইয়া উঠিয়াছিল। যদিও তাঁহার জননী বিদ্রপকারী বালকদিগকে তিরস্কার করিয়। বলিতেন “তোরা একদিন দেখবি ওর গন্ধে দেশ আমোদিত হবে” তথাপি সমবয়স্কদিগের বিদ্রুপে শিশু গন্ধৰ্ব্ব নারায়ণ নিশ্চয় উত্যক্ত হইতেন। বোধ হয় এই কারণেই তিনি কলিকাতাতে আসিয়া নিজে দীনবন্ধু নাম লইলেন এবং সেই নামেই স্কুলে ভর্তি হইলেন। যাহার দুঃখ-সন্তপ্ত হৃদয় হইতে ‘নীলদর্পণ’ বাহির হইরাছিল, তিনি যে নিজে দীনবন্ধু নাম পছন্দ করিয়া লইয়াছিলেন এট, একটা বিশেষ স্মরণীর ঘটনা বলিতে হুইবে। যাহা হউক তিনি স্কুলে ভর্তি হইয়া এরূপ আগ্রহের সহিত আত্মোন্নতি সাধনে নিযুক্ত হইলেন যে, সকল শ্রেণীতে প্রশংসা ও নির্দিষ্ট প্লারিতোষিক লাভ করিতে লাগিলেন। দীনবন্ধু শিক্ষা বিষয়ে একটু অগ্রসর হইয়াই গুপ্ত কবির প্রভাবের মধ্যে পড়িয়া গেলেন; প্রভাকরে লিখিতে আরম্ভ করিলেন। এই সময়ে তিনি “মানবচরিত্র” নামে একখানি পদ্যগ্রন্থ রচনা করেন। তাছাতে উহার “কৰিত্ব খ্যাতি তদানীন্তন সমাজে ব্যাপ্ত হয়। প্রভাকরে লিখিত কবিতাগুলির মধ্যে কতকগুলি কবিতা লোকের দৃষ্টিকে বিশেষরূপে আকৃষ্ট করিরাছিল। কিন্তু তিনিও চরমে বঙ্কিমের স্থায় পদ্ধ রচনা পরিত্যাগ করিয়া নাটক রচনাকে আপনার প্রতিভা বিকাশের উপায়রূপে অবলম্বন করেন।

 ১৮৫৬ সালে দীনবন্ধু কলেজ ইইতে বাহির হক্টর গবর্ণনেটের অধীনে ডাক বিভাগে কষ্ম করিতে প্রত্নত্ত হন। এভং হুত্রে তিনি উড়িষ্যা, নদীয়া, ঢাকা, কুমিল্লা, লুশাই পাহাড়, প্রভৃতি নানাস্থানে ভ্রমণ করেন। তিনি রাজকাৰ্য্য বিষয়ে যেরূপ দক্ষতা প্রদর্শন করিয়াছিলেন, তাহার জন্তই •প্রধান প্রধান কাজের ভার তাহার উপরে ন্যস্ত হইত। ১৮৭১ সালে লুশাই যুদ্ধ বাধিলে, ডাকের বন্দোবস্ত করিবার ভার তাহার উপরেই অৰ্পিত হইয়াছিল। এই সকল কাৰ্য্য সমুচিত রূপে নিৰ্ব্বাহ করিয়া তিনি গবর্ণমেণ্টের নিকট হইতে ‘রায় বাহাদুর’ উপাধি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।

 গবর্ণমেণ্টের কার্য্যোপলক্ষে যে তিনি নানা স্থানে ভ্রমণ ও নানা শ্রেণীর লোকের সহিত পরিচয় ও আত্মীয়তা করিতে পারিয়াছিলেন, তাহাই তাহার নাটক রচনার পক্ষে বিশেষ সাহায্য করিয়াছিল। এরূপ অভিজ্ঞতা, এরূপ মানব-চরিত্র দর্শন, ও এরূপ বিবিধ-সামাজিক অবস্থার জ্ঞান আর কাহারও হয় নাই। তাঙ্গার রচিত নাটক সকলে আমরা এই সকলের যথেষ্ট পরিচয় প্রাপ্ত হই।

 ১৮৫৯ সালে যখন নদীয়া ও যশোহর প্রভৃতি জেলার প্রজাগণের সহিত নীলকরদিগের ঘোর বিবাদ উপস্থিত হইয়া প্রজাদিগের ধর্মঘট চলিতেছিল, তখন দীনবন্ধু ঢাকাতে ছিলেন। তিনি তৎপূৰ্ব্বে নিজে অনেক নীল-প্ৰপীড়িত স্থানে ভ্রমণ করিয়া প্রজাদের দুঃখ স্বচক্ষে দর্শন করিয়াছিলেন। সে সময়ে হিন্দুপেটিয়টের পৃষ্ঠায় হরিশ্চন্দ্র তাহার ওজস্বিনী ভাষাতে প্রজাদের দুঃখের যে সকল চিত্র অঙ্কিত করিতেছিলেন, সে সকল চিত্রের অধিকাংশ দীনবন্ধুর নিজের পরীক্ষিত ছিল। সুতরাং প্রজাদের দুঃখ স্মরণ করিয়া দেশহিতৈষী মাত্রেরই হৃদয় যে আগুন তখন জলিয়াছিল, তাহ তাহার ও হৃদয়ে জলতেছিল। হৃদয়ের সেই অগ্নি লইয়াই তিনি “নীল-দৰ্পণ” লিখিবার জন্য লেখনী ধারণ করিয়াছিলেন। অগ্ৰেই বলিয়াছি, ১৮৬০ সালের শেষভাগে ঢাকা হইতে নীলদর্পণ প্রকাশিত হয়। বঙ্গদেশীয় গবর্ণমেণ্টের প্রধান কৰ্ম্মচারীদের অনুমতিক্রমে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ইহা ইংরাজীতে অনুবাদ করেন, এবং রেভারেও ঙ্কেনস লং সাহেব তাহ নিজের নামে মুদ্রিত করেন। তাহ লইয়া যে মোকদ্দমা উপস্থিত হয়, এবং সদাশয় লং সাহেবের যে এক হাজার টাকা জরিমান ও একমাস কারাদও হয় সে সকল বিবরণ অগ্ৰেই দিয়াছি। মহাভারতের অনুবাদক স্বপ্রসিদ্ধ কালীপ্রসন্ন সিংহ মহোদয় ঐ এক হাজার টাকা জরিমান নিজে প্রদান করেন।

 প্রতিহিংসোদ্যত নীলকরগণ তখন “দীনবন্ধুকে ধরিতে না পারিয়া লংকে কারাগারে দিয়া এবং হিন্দু পেটি স্বটের সম্পাদক হরিশকে ধনে প্রাণে সার করিয়া নিবৃত্ত হইল। এদিকে দীনবন্ধু স্বীয় নির্দিষ্ট পথে অবাধে অগ্রসর হইলেন। “নবীন তপস্বিনী,” “বিয়ে পাগল বুড়ে,” “সধবার একাদশী,” “লীলাবতী,” “জামাইবারিক” প্রভৃতি অদ্ভুত হান্ত-রসাত্মক নাটক সকল পরে পরে প্রকাশ পাইতে লাগিল।

 শেষদশায় তিনি “সুরধুনী-কাব্য” ও “দ্বাদশ কবিতা” নামে দুইখানি পদ্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। ইহার পরে তিনি দুরারোগ্য বহুমূত্র রোগে আক্রান্ত হন এবং তাহার চরম ফল দারুণ বিস্ফোটকে তাঁহাকে শয্যাস্থ করে। সেই রোগেই ১৮৭৩ সালের নবেম্বর মাসে গতাস্থ হন। তিনি যখন মৃত্যুশয্যাতে শয়ান, তখন তাহার শেষ গ্রন্থ, “কমলে কামিনী” নাটক যন্ত্রস্থ। এই তার শেষ লাহিত্য রচনা। তিনি সৰ্ব্বজন-প্রিয় ছিলেন। তাঁহার চিরদিনের ৰন্ধু বঙ্কিমচন্দ্র, বলিয়াছেন—“র্তাহার স্বভাব তাদৃশ তেজী ছিলু না বটুে, বন্ধুর অনুরোধে বা সংসর্গ দোষে নিন্দনীয় কাৰ্য্যের সংস্পর্শ তিনি সব সময়ে এড়াইতে পারিতেন না; কিন্তু যাহা অসৎ, যাহাতে পরের অনিষ্ট আছে, যাহা পাপের কাৰ্য্য, এমন কাৰ্য্য দীনবন্ধু কখনও করেন নাই।”

 বিষয় কৰ্ম্মোপন্থক্ষে তিনি যত স্থানে গিয়াছিলেন, তন্মধ্যে কৃষ্ণনগরে অনেক কাল বাস করেন। এখানে তিনি স্থায়ীরূপে থাকিবার মানসে একটা বাসভবন নিৰ্ম্মাণ করিয়াছিলেন। সেই কৃষ্ণনগরে বাস কালেই লাহিড়ী মহাশয়েয় সহিত তাহার আলাপ পরিচয় ও আত্মীয়তা জন্মে। লালুচী মহাশয়কে তিনি কি ভাবে দেখিতেন, তাহা তাহার প্রণীত “মুরধুনী কাব্য”হুইতে উদ্ধৃত নিম্নলিখিত কয়েক পংক্তি হইতে বিশেষরূপে বুঝিতে পারা যাইবে।

“পরম ধাৰ্ম্মিকবর এক মহাশয়,
‘সত্য-বিমণ্ডিতু তার কোমল-হৃদয়।
সারলের পুত্তলিক, পরহিতে রত,
সুখ দুঃখ সম জ্ঞান ঋষিদের মত।
জিতেন্দিয়, বিজ্ঞতম, বিশুদ্ধ বিশ্লেষ,

রুসনায়ু বিরাজিত ধৰ্ম্ম উপদেশ।
একদিন তার কাছে করিলে যাপন,
দশদিন থাকে ভাল দুৰ্ব্বিণীত মন।
বিদ্যা বিতরণে তিনি সদা হরষিত,
র্তার নাম রামতনু সকল বিদিত।

 “একদিন তার কাছে করিলে যাপন, দশদিন থাকে ভাল দুৰ্ব্বিণীত মন।” এই বাক্যগুলি লাহিড়ী মহাশয়ের কি অকৃত্রিম সাধুতারই পরিচয় দিতেছে! সাধুতার কত প্রকার লক্ষণ শুনিয়াছি তন্মধ্যে একটা প্রধান এই যে “তিনিই সাধু যার সঙ্গে বসলে হৃদয়ের অসাধু ভাব সকল লজ্জা পায়, ও সাধুভাব সকল জাগিয়া উঠে”। প্রকৃত সাধুর নিকটে বসিয়া উঠিয়া আসিবার সময় অনুভব করিতে হয়, যেরূপ মানুষটা গিয়াছিলাম, তাহা অপেক্ষ উৎকৃষ্ট মানুষ হইয়া ফিরিতেছি। দীনবন্ধু সাক্ষ্য দিতেছেন যে লাহিড়ী মহাশয়ের এরূপ সাধুতা ছিল, যে তাহার সহবাসে একদিন যাপন করিয়া আসিলে দশদিন হৃদয় মনের উন্নত অবস্থা থাকিত। এটা স্মরণ করিয়া রাখিবার মত কথা।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।

 ১৮৩৮ খ্ৰীষ্টাব্দে নৈহাটর সন্নিহিত কাঠালপাড়া নামক গ্রামে বঙ্কিমচন্দ্রেয় জন্ম হয়। র্তাহার পিতা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বহুদিন ইংরাজ গবর্ণমেণ্টের অধীনে ডেপুটী কালেক্টরের কাজ করিতেন।

 বাল্যকালে বঙ্কিমচন্দ্র হুগলী-কালেজে পাঠ করেন। সেখানে পাঠ করিবার সময়েই র্তাহার বঙ্গ-সাহিত্যের প্রতি দৃষ্টি পড়ে। সে সময়ে কবিবর ঈশ্বর চন্দ্র গুপ্তের প্রাদুর্ভাবের ফাল। তখন প্রতিভাশালী ব্যক্তি মাত্রেই সাহিত্যজগতে কিছু করিতে ইচ্ছুক হইলে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের শিষ্যত্ব স্বীকার করিতেন। গুপ্ত কবিও তথন প্রতিভার উৎসাহদাতা ছিলেন। অগ্ৰেই বলিয়াছি, তিনি অক্ষয় কুমার দত্তের উৎসাহদাতাদিগের মধ্যে একজন ছিলেন। কিন্তু কাব্যজগতে র্তাহার শিষ্যবর্গের মধ্যে, মঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, মনেীমোহন বন, দ্বায় কানাথ অধিকারী, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যার, দীনবন্ধু মিত্র প্রভৃতি সমধিক প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছেন। তৎকালপ্রচলিত রীতি অনুসারে বঙ্কিম প্রথমে “প্রভাকরে”

Bankim Chattapadhyay.jpg

রায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বাহাদুর

লিখিয়া কাব্যরচনার অভ্যাস আরম্ভ করেন। তখন প্রভাকরে উত্তর প্রত্যুত্তরে কবিতা লেখা যুবক লেখকদিগের একটা মহা উৎসাহের ব্যাপার ছিল। এই সকল বাকৃযুদ্ধ “কালেজীয় কবিতাযুদ্ধ” নামে প্রথিত হইয়াছে * এরূপ শোনা যায় বঙ্কিমচন্দ্র যৌবনের প্রারম্ভে “ললিতা-মানস” নামে একখানি পদ্যগ্রন্থ প্রচার করিয়াছিলেন।

 তিনি হুগলী-কালেজ হইতে কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে গমন করেন; এবং সেখান হইতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রদত্ত বি, এ, উপাধি সৰ্ব্বপ্রথমে প্রাপ্তহইয়া ডেপুটী মাজিষ্ট্রেট কৰ্ম্ম প্রাপ্ত হন।

 ১৮৬৪ সালে তাহার প্রণীত “দুর্গেশনন্দিনী” নামক উপন্যাস মুদ্রিত ও প্রচারিত হয়। আমরা সে দিনের কথা ভুলিব না। দুর্গেশ-নন্দিনী বঙ্গসমাজে পদার্পণ করিবামাত্র সকলের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করিল। এ জাতীয় উপন্যাস বাঙ্গালাতে কেহ অগ্রে দেখে নাই। আমরা তৎপূৰ্ব্বে “বিজয় বসন্ত” “কামিনী কুমার” প্রভৃতি কতিপয় সেকেলে কাদম্বরী ধরণের উপন্যাস, গার্হস্থ্য পুস্তক প্রচার সভার প্রকাশিত, “হ’সরূপী রাজপুত্র”, “চকুমকির বাক্স” প্রভৃতি কয়েকটা ছোট গল্প, এবং “আরব উপদ্যাস” প্রভৃতি কয়েকখানি উপকথা গ্রন্থ আগ্রহের সহিত পড়িয়া আসিতেছিলাম। “আলালের ঘরের দুলাল” তাহার মধ্যে একটু নুতন ভাব আনিয়াছিল। কিন্তু দুর্গেশনন্দিনীতে আমরা যাহা দেখিলাম তাহা অগ্রে কখনও দেখি নাই। এরূপ অদ্ভূত চিত্রণ শক্তি বাঙ্গালাতে কেহ অগ্রে দেখে নাই। দেখিয় সকলে চমকিয়া উঠিল। কি বর্ণনার রীতি, কি ভাষার নবীনত, সকল বিষয়ে বোধ হইল, যেন বঙ্কিমবাবু দেশের লোকের রুচি ও প্রবৃত্তির স্রোত পরিবর্তিত করিবার জন্ত প্রতিজ্ঞাঢ়ি হইয়া লেখনী ধারণ করিয়াছেন।

 অল্পদিন পরে “কপালকুণ্ডলা” দেখা দিল। যে তুলিকা দুর্গেশনন্দিনীয় নয়নানন্দকন্তু কমনীয়তা চিত্রিত করিয়াছিল, তাঃ কপালকুণ্ডলার গাম্ভীৰ্য্যরস-পূর্ণ ভাব স্বষ্টি করিল! লোকে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া যাইতে লাগিল।

 ক্রমে মৃণালিনী, চন্দ্রশেখর, বিষবৃক্ষ, কৃষ্ণকান্তের উইল, আনন্দমঠ, দেবীচৌধুরাণী, কমলাকান্তের দপ্তর, সীতারাম, রাজসিংহ প্রভৃতি আরও অনেকগুলি উপন্যান্স প্রকাশিত হইয়া বঙ্কিমচন্দ্রকে বঙ্গীয় ঔপন্যাসিকদিগের শীর্ষস্থানে স্থাপন করিল।

 বঙ্কিমবাবু স্বপ্রণীত গ্রন্থ সকলে এক নুতন বাঙ্গালা গদ্য লিখিার পদ্ধতি অবলম্বন করিলেন। তাহা একদিকে বিদ্যাসাগরী বা অক্ষয়ী ভাষা ও অপরদিকে মালালী ভাষার মধ্যগ। ইহাতে অসন্তুষ্ট হইরা আমার পূজ্যপাদ মাতুল দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ মহাশয় তাহার সম্পাদিত সোমপ্রকাশে বঙ্কিমবাবু ও তাহার অনুকরণকারীদিগের নাম “শধ-পোড়া মড়াদাহের দল” রাখিলেন। অভিপ্রায় এই, যাহারা “শব” বলে তাহারা “দাহ” বলে, যাহারা “মড়া” বলে তাহারা তৎসঙ্গে “পোড়া” বলে, কেহই “শবপোড়া” বা “মড়াদাহ” বলে না। তাহার মতে বঙ্কিমী দল ঐরূপ ভাষা ব্যবহার দোষে দোষী। আমরা, সংস্কৃত কলেজের ছাত্রদল, সোমপ্রকাশের পক্ষাবলম্বন করিলাম এবং বঙ্কিমী দলকে “শব পোড়া মড়াদাহের দল বলিয়া বিদ্রুপ করিতে আরম্ভ করিলাম। বঙ্কিমের দল ছড়িবেন কেন? তাহার সোমপ্রকাশের ভাষাকে “ভট্টাচার্য্যের চানা” নাম দিয়া বিদ্রুপ করিতে লাগিলেন।

 ১৮৭২ সালে “বঙ্গদর্শন” প্রকাশিত হইল। বঙ্কিমের প্রতিভা আর এক আকারে দেখা দিল। প্রতিভা এমনি জিনিস, ইহা যাহা কিছু স্পর্শ করে তাহাকেই সজীব করে। বঙ্কিমের প্রতিভা সেইরূপ ছিল। তিনি মাসিক পত্রিকার সম্পাদক হইতে গিয়া এরূপ মাসিক পত্রিক স্বষ্টি করিলেন, যাহা প্রকাশ মাত্র বাঙ্গালির ঘরে ঘরে স্থান পাইল। তাহার সকলি যেন চিত্তকর্ষক, সকলি যেন মিষ্ট। বঙ্গদর্শন দেখিতে দেখিতে উদীয়মান স্বর্য্যের ন্যায় লোক চক্ষের সমক্ষে উঠিয়া গেল। বঙ্কিমচন্দ্র যখন বঙ্গদর্শনের সম্পাদক তখন তিনি রুসোর সাম্যভাবের পক্ষ, উদার নৈতিকের অগ্রগণ্য, এবং বেস্থাম ও মিলের হিতবাদের পক্ষপাতী। তিনি তাঁহার অমৃতময়ী ভাষাতে সাম্য নীতি এরূপ করিয়া ব্যাখ্যা করিতেন যে দেখিয়া যুবকদলের মন মুগ্ধ হইয়া যাইত। কিন্তু দুঃখের বিষয় বঙ্গদর্শন আহুদিন থাকিল না। বঙ্কিমবাবু বিষয়াস্তরে ব্যাপৃত হওয়াতে তাহা হস্তান্তরে গেল, ও সেই সঙ্গে তাহার আকর্ষণও গেল এবং ক্রমে তিরোভাব হইল।

 আমাদের দেশের প্রতিভাশালী ব্যক্তিদিগের সাধারণ নিয়মানুসারে বঙ্কিমের প্রতিভার শক্তি পন্থতাল্লিশ বৎসরের পর মন্দীভূত হইয়া আসিল। তৎপরে তিনি যে কয়েক খানি গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন, তাহার ভাষা ও চিত্রণশক্তির সেই পূৰ্ব্বকার উন্মাদিনী শক্তি নাই, সে সজীবতা নাই। তাহার দৃষ্টি ও সুখ হইতে পশ্চাৎদিকে পড়িতে লাগিল।

 শেষ কয় বৎসর তিনি ধৰ্ম্মতত্ত্বের ব্যাখ্যাতে আপনাকে অর্পণ করিয়াছিলেন। শুনিতে পাওয়া যায়, এই অবস্থাতে তিনি আপনার প্রকাশিত “সাম্য” নামক গ্রন্থের প্রচার বন্ধ করিতে ইচ্ছুক হইয়াছিলেন। যাহা হউক, তালুর শেষ প্রচারিত এই নবধৰ্ম্মের প্রধান লক্ষণ ছিল বৃত্তি-নিচয়ের সামঞ্জস্ত এবং“শ্ৰীকৃষ্ণই র্তাহার আদর্শ পুরুষ। এই নবভাব ব্যক্ত করিবার জন্য তিনি কৃষ্ণচরিত ও ধৰ্ম্মতত্ত্ব বিষরে গ্রন্থ রচনা করেন।

 এদিকে তিনি গবর্ণমেণ্টের ডেপুটী ম্যাজিষ্ট্রেট দলের মধ্যে সৰ্ব্ব-প্রথম শ্রেণীতে উঠিয়া, রাজ-প্রসাদের চিহ্ন স্বরূপ “রায় বাহাদুর” ও সি, আই, ই, উপাধি প্রাপ্ত হন। বঙ্কিম বাৰু চরিত্রাংশে কেশবচন্দ্র সেন বা মহেন্দ্রলাল সরকার বা দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের সমকক্ষ লোক ছিলেন না; কিন্তু প্রতিভার জ্যোতিতে দেশ উজ্জল করিয়া গিয়াছেন।  ঘরে পরে এইরূপে সন্মানিত হইয়৷ ১৮৯৪ সালের ৮ই এপ্রেল দিবসে ভবধাম পরিত্যাগ করেন।


দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ।

 এইকালের মধ্যে উপন্যাস ও নাটক রচনা দ্বারা বঙ্গসমাজে যে পরিবর্তন ঘটিয়াছিল, তাহা কথঞ্চিৎ প্রদর্শন করিয়া আর এক সুমহৎ বিপ্লবের বিষয় উল্লেখ করিতে যাইতেছি, তাহা বঙ্গীয় সাহিত্য জগতে “সোমপ্রকাশের” অভু্যদয়।

 কলিকাতার দক্ষিণ পূৰ্ব্ব পাঁচ ক্রোশ ব্যবধানে, চাঙ্গড়িপোতা গ্রামে, দাক্ষিণাত্য বৈদিক ব্রাহ্মণ কুলে দ্বারকানাথের জন্ম হয়। তাহার জন্মকাল, বৈশাখ মাস, ১৮২০ সাল। তাহার পিতার নাম হরচন্দ্র দ্যায়রত্ন। দ্যায় রত্ন মহাশয় কলিকাতা হাতিবাগানের সুপ্রসিদ্ধ কাশীনাথ তর্কালঙ্কারের ছাত্র। তিনি সংস্কৃত বিদ্যাতে পারদর্শী হইয়া কলিকাতাতেই টােল চতুম্পাঠী করিয়া অধ্যাপনা কার্য্যে নিযুক্ত হন। “ এতদ্ভিন্ন তাহার অতিরিক্ত ছাত্রও থাকিত। অতিরিক্ত ছাত্রের মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত ও রামতনু লাহিড়ী মহাশয়ের নাম উল্লেখ যোগ্য। ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের অনুরোধেই ন্যায়রত্ন মহাশর প্রভাকর পত্রিকার সম্পাদন বিষয়ে তাহার সহায়তা করিতেন।

 দ্বারকানাথ তদানীন্তন প্রথানুসারে গুরুমহাশয়ের পাঠশালে কিছুজি পাঠ করিরাই স্বগ্রামস্থ একজন আত্মীয়ের চতুষ্পাঠীতে সংস্কৃত পড়িতে আরম্ভ করেন। ১৮৩২ সালের প্রারম্ভে তাহার পিতা তাহাকে টোল চতুষ্পাঠী হইতে লইয়া কলিকাতা সংস্কৃত কলেজে ভৰ্ত্তি করিয়া দেন। ১৮৩২ সাল হইতে ১৮৪৫ সাল পর্য্যন্ত তিনি প্রশংসিত ও পুরস্কৃত হইয়া সংস্কৃত কলেজে যাপন করেন। কালেজ হইতে উত্তীর্ণ হইয়া ঐ কালেজের লাইব্রেরিয়ানের পদ প্রাপ্ত হন। তৎপরে ১৮৪৫ সালে ব্যাকরণের অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত হন। ক্রমে ক্রমে পদোন্নতি ও বেতনের vউন্নতি হইয়। ১৮৭৩ সালের জুলাই মাসে কৰ্ম্ম হইতে অবস্থত হন। ইহার পর তিনি ১৮৮৭ সাল পর্য্যন্ত জীবিত ছিলেন। কিন্তু ১৮৭৩ সাল হইতেই র্তাহার স্বাস্থ্য ভগ্ন হয়। দারুণ বহুমূত্র রোগে ধরে। শ্রম কর। তাছার অভ্যাস ছিল; নিষ্কৰ্ম্ম বসিয়া থাকিতে পারিতেন না; বসিয়া থাকাকে ঘৃণা করিতেন; সুতরাং থাটিতে থাটিতে শরীর একবারে ভাঙ্গিয় পড়িল। তদবস্থাতে ১৮৮৬ সালে স্বাস্থ্যলাভের আশায় মধ্য প্রদেশের রেওয়া রাজ্যের অন্তর্গত সাতনা নামক স্থানে গিয়া বাস করিলেন। সেই খানেই ঐ সালের ২২ আগষ্ট র্তাহার দেহান্ত হইল।

 সোমপ্রকাশই ই হার প্রধান কীৰ্ত্তি; সোমপ্রকাশই ইহাকে বঙ্গ সাহিত্যে চিরস্মরণীয় করিয়া য়াখিবে; সুতরাং সোমপ্রকাশের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত দিতেছি।

 ১৮৫৬ সালে হরচন্দ্র দ্যায়রত্ন মহাশয় স্বীয় পুত্র দ্বারকানাথকে সহায় করিয়া একটা মুদ্রা যন্ত্রের প্রতিষ্ঠা করেন। করিয়াই তিনি পীড়িত হইয়া পড়েন; এবং অল্প কালের মধ্যেই গতাস্থ হন। ঐ যন্ত্র হইতে দ্বারকানাথের লিখিত রোম ও গ্রীসের ইতিহাস নামক দুই বাঙ্গালা গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। উৎকৃষ্ট বাঙ্গালা ভাষাতে লিখিত বৃহৎ ইতিহাস গ্রন্থ উহাই বোধ নহয় প্রথম। যাহা হউক এই দুই ইতিহাস প্রকাশিত হইলে তাহা তদানীন্তন বঙ্গীয় পাঠকগণের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করে; এবং দ্বারকানাথের নাম বাঙ্গালা লেখকদিগের মধ্যে পরিচিত হয়। তৎপরে তাহার রচিত বালক-পাঠ্য “নীতিসার,” প্রভৃতি প্রকাশিত হইয়াছে, কিন্তু সোমপ্রকাশের প্রভা সে সমুদয়কে ঢাকিয়া ফেলিয়াছে। শুনিয়াছি সোমপ্রকাশ প্রকাশের প্রস্তাব প্রথমে ঈশ্বরচন্দ্র বিস্তাসাগর মহাশয় বিদ্যাভূষণের নিকট উপস্থিত করেন। সারদা প্রসাদ নামে র্তাহাদের প্রিয় একজন বধির পণ্ডিতকে কাজ যোগান, র্তাহার সুততর উদ্দেশু ছিল। ১৮৫৮ সালে সোমপ্রকাশ প্রথম প্রকাশিত হইল। দ্বারকানাথ সম্পাদকতা ভার ও তাহার যন্ত্র মুদ্রাঙ্কণের ব্যয়ভার গ্রহণ করিলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রভৃতি কতিপয় বন্ধু লেখক-শ্রেণীগণ্য হইলেন। কার্য্যকালে সারদা প্রসাদ আসিলেন না; অপরাপর লেখকগণও অদর্শন হইলেন; সোমপ্রকাশ সম্পূর্ণ রূপে দ্বারক নাথ বিদ্যাভূষণের উপরেই পড়িয়া গেল। তিনি অধ্যাপকতা বাদে যে কিছু অবসর কাল পাইতেন, তাহ সমুদয় সোমপ্রকাশ সম্পাদনে নিয়োগ করিতে লাগিলেন। তাহার হ্যায় কর্তবী-পরায়ণ মানুষ আমরা অল্পই দেখিয়াছি। তিনি যখন সংস্কৃত কলেজের পুস্তকালয়ে পাঠে নিমগ্ন থাকিতেন, তখন দেখিলে বোধ হইত না যে অধ্যাপকতা কার্য্যe সুচারুরূপে নিম্পন্ন করা ভিন্ন তাহার পুথিবীতে আর কোন ও কাজ আছে। অবরিখখন গৃহে সোমপ্রকাশের জন্ত রাশীকৃত দেশী ও বিলাতী সংবাদ-পত্র, গবর্ণমেণ্টের রিপোর্ট ও গ্রন্থ।fদ পাঠে মগ্ন থাকিতেন, তখন কোথা দিয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাইত তাহার জ্ঞান থাকিত না। রাত্রি ১১ টার সমর শয়ন করিতে যাইবার পূৰ্ব্বে দেখিয়াছি তিনি কার্য্যে মগ্ন আছেন, রাত্রি ও টার সময়ে উঠিয়া দেখিয়াছি তিনি কার্য্যে মগ্ন আছেন। আমার বয়সের মধ্যে প্রত্যুষে উঠিয়া তাহাকে কখনও ঘুমাইতে দেখিয়াছি এরূপ মনে হয় না।

 দেখিতে দেখিতে সোমপ্রকাশের প্রভাব চারিদিকে বিস্তৃত হইয়া পড়িল। প্রভাকর ও ভাস্কর প্রভৃতি বঙ্গসমাজের নৈতিক বাকে দুষিত করিয়া দিয়া ছিল, সোমপ্রকাশের প্রভাবে তাহ দিন দিন বিশুদ্ধ হইতে লাগিল। 'সোমবার আসিলেই লোকে সোমপ্রকাশ দেখিবার জন্ত উৎসুক হইয়া থাকিত। যেমন ভাষার বিশুদ্ধতা ও লালিতা, তেমনি মতের উদারতা ও যুক্তি-যুক্ত el, তেমনি নীতির উৎকর্ষ। চিত্তের একাগ্রতাটাই সোম প্রকাশের প্রভাবের মূলে ছিল৭ তত্ত্ববোধিনী সম্পাদন বিষয়ে অক্ষয় বাবুর চিত্তের অদ্ভুত একাগ্রতার অনেক গল্প শুনিয়াছি; আর সোমপ্রকাশ সম্পাদন বিষয়ে' বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের চিত্তের একাগ্রতা দেখিয়াছি; তাছার অহরূপ সমগ্র হৃদয় মনের একীভাব আর কখনও দেখি নাই ৯ তিনি সোমপ্রকাশে যাহা লিখিতেন তাহার এক পক্তি কাঙ্গায়ও তুষ্টি সাধনের প্রতি দৃষ্টি রাথিয়া লিখিতেন না। লোক সমাজে আদৃত হুইবার লোভে লোকের রুচি বা ংস্কারের অনুরূপ করিয়া কিছু বলিতেন না। যাহা নিজে সমগ্র হৃদয়ের সহিত বিশ্বাস করিতেন, তাং হৃদয়নিঃস্থত অকপট-ভাষাতে ব্যক্ত করিতেন। তাহাই ছিল সোমপ্রকাশের সর্বপ্রধান আকর্ষণ। এই আকর্ষণ এতদূর প্রবল ছিল যে বিদ্যাভূষণ মহাশয় নিজ কাগজের বার্ষিক মূল করিয়াছিলেন ১০ দশ টাক, এবং তাহাও অগ্রিম দেয়। বাস্তবিক দশট টাকা অগ্ৰে প্রেরণ না করিলে কাহাকেও একখানি কাগজ দেওয়া হইত না। ইহাতেও সোমপ্রকাশের গ্রাহক সে সময়ের পক্ষে বহুসংখ্যক ছিল।

 সোমপ্রকাশ যদিও ১৮৬৩ সালের পূৰ্ব্বেই প্রকাশিত হইয়াছিল, তথাপি ১৮৬০ হইতে ১৮৭০ পর্য্যন্ত এই কালের মধ্যেই ইহার প্রভাব সৰ্ব্বত্র ব্যাপ্ত হয়; ইহ এক দিকে গবর্ণমেণ্টের, অপর দিকে দেশবাসিগণের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করে। প্রথম কয়েক বৎসর হই। কলিকাতায় চাপাতলার এক গলি হইতে বাহির হইত। তখন সেই ভবনে ঈশ্বল্পচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় সৰ্ব্বদা পদার্পণ করিতেন; এবং পরামর্শাদি দ্বারা সোমপ্রকাশ সম্পাদন বিষয়ে বিদ্যাভূষণ মহাশষ্ট্রের বিশেষ সহায়তা করিতেন।

 পরে ১৮৬১ কি ১৮৬২ সালে মাতলার রেলওয়ে খোলে। মাতলা বা পোষ্ট ক্যানিং একটা প্রধান বন্দর হুইবে গবর্ণমেণ্টের মনে এই আশা ছিল। গঙ্গার মুখে চড়া পড়িয়া বড় বড় জাহাজ কলিকাতাতে আসা দুঃসাধ্য হওয়াতে, মাতলাতে একটা বন্দর করিবার কথা চলিতেছিল, এবং পোর্ট ক্যানিং কোম্পানি নামে এক কোম্পানি করিয়া টাকা তোলা হইয়াছিল। শেষে মাতলাকে অস্বাস্থ্যকর দেখিয়া সে সংকল্প ত্যাগ করা হইল। গবর্ণমেণ্টের রেলওয়ে খোলাই সার হইল।

 মাতলা রেলওয়ে খুলিলেই বিদ্যাভূষণ মহাশয় সোমপ্রকাশ যন্ত্র তাহার বাসগ্রাম চাঙ্গড়িপোতাতে লইয়া যান, এবং সেখান হইতে উহা প্রকাশ করিতে থাকেন। সোমপ্রকাশ সে বিভাগের একটা প্রবল শক্তি হইয়া দাড়ায়। ইহার সাহায্যে অনেক সদনুষ্ঠানের স্বত্রপাত হইয়াছে, অনেক অত্যাচার নিবারিত হইয়াছে। কেবল তাই নহে, দেশে গিয়াই রিদ্যাভূষণ মহাশয় নিজ বাসগ্রামের নানা প্রকার কল্যাণ সাধনে নিযুক্ত হইলেন। তন্মধ্যে একটী উচ্চশ্রেণীর ইংরাজী স্কুল স্থাপন। ঐ স্কুলট তিনি নিজের ব্যয়ে ও নিজের চেষ্টাতে রক্ষা করিতে লাগিলেন। তাহাতে কয়েক বৎসরে তাহার প্রচুর অর্থ ব্যয় হইয়া গেল। আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধর এই ব্যয়সাধ্য ব্যাপার হইতে নিরস্ত হইবার জন্ত তাহাকে কতই পরামর্শ দিয়াছিলেন, কিন্তু তিনি তাহার প্রতি কৰ্ণপাত করেন নাই। অনেক সময় দেখিয়াছি সংস্কৃত কালেজ হইতে বেতনটী পাইয়া ৰাষ্ট্রীতে ফিরিবার সময় পথে স্কুলগৃহে প্রবেশ করিয়া সে বেতনের অধিকাংশ তথাকার ব্যয় নিৰ্ব্বাহের জন্ত দিয়া সামান্ত অর্থ লইয়া গৃহে ফিরিয়াছেন। পাপের প্রতি র্তাহার এমনি ঘৃণা ছিল যে গ্রামের পাপাচারী লোকেরা র্তাহাকে দেখিয়া কাঁপিত। একবার একজন দুশ্চরিত্র পুরুষ একটা গোপ জাতীয়া বিধবাকে বিপথে লইয়া গেল; এবং কিছুদিন পরে তাহাকে অন্তসত্ত্বা অবস্থাতে তাড়াইয়া দিল। বিদ্যাভূষণ মহাশয় ইহা জানিবামাত্র নিজের ব্যয়ে সেই রমণীর দ্বারা আদালতে নালিস উপস্থিত করাইয়া সেই দুশ্চরিত্র পুরুষের নিকট হইতে ঐ নারীয় মাসিক বৃত্তির ব্যবস্থা করিয়া দিলেন।

 আর একবার একজন শিক্ষিতনামধারা ভদ্রলোক নিজ ধনগমে দৃপ্ত হইয়াপ্রতিবেশবাসিনী কোনও বিধবার কিছু জমি আত্মসাৎ করিবার জন্য তাহার প্রতি বিবিধ প্রকারে অত্যাচার আরম্ভ করেন। একদিন বিদ্যাভূষণ মহাশয় সোমপ্রকাশ লিখিতেছেন এমন সময়ে সংবাদ আসিল যে ঐ ধনী লোকটী সদলে সেই বিধবার বাটীতে প্রবেশ করিয়া তাহাকে প্রস্থার করিতে যাইতেছে। তিনি তৎক্ষণাৎ কলম রাথিয় স্বীয় সহোদর ভ্রাতাকে লইয়া বিধবার গৃহাভিমুখে ধাবিত হইলেন। তিনি তাহার ভবনে প্রবেশ করিয়া স্বহস্তে সেই ধনীর গ্রীবা ধরিয়া বাড়ী হইতে বাহির করিয়া দিলেন। তাহার প্রতি সংক্রম বশতঃ তাহাকে কেহ কিছু বলিতে পারিল না। এইরূপে গ্রামে তিনি দুৰ্ব্বলের রক্ষক ও সৰ্ব্বপ্রকার সদনুষ্ঠানের উৎসাহ দাতা রূপে বাস করিতে লাগিলেন।

 বাৰ্দ্ধক্যে একটা বিষয়ের জন্য তাহাকে বড় উদ্বিগ্ন দেখা যাইত। ইংরাজী শিক্ষার প্রভাবে হিন্দুসমাজে ধৰ্ম্মের শাসন ও ধৰ্ম্মের উপদেশ রহিত হইতেছে বলিয়া দুঃখ করিতেন। তাহার একটা পুত্র এই সময়ে জপ, তপ, পূজা প্রভৃতিতে কিছু অধিক মাত্রায় মাতিয়া গেল। এমন কি সেজন্য তার জ্ঞান চর্চা, সংসারের কাজ কৰ্ম্ম প্রভৃতিতে মনোযোগ রহিল না। কেহ সে বিষয়ের উল্লেখ করিয়া দুঃখপ্রকাশ করিলে বিদ্যাভূষণ মহাশয় বলিতেন—'ও শিশু নহে বয়ঃপ্রাপ্ত, ও যাহা আত্মার কল্যাণকর ভাবিয়াছে তাহ করুক, দেশকাল ফুেরূপ দেখিতেছি তাহাতে ও যে অন্যদিকে মতি না দিয়া ধৰ্ম্মসাধনে মাতিয়া আছে তাহ তাল।' সাধারণ মানুষের ধৰ্ম্মোপদেশের সুবিধার জন্ত তিনি নিজভবনে হরিসভা করিতে দিয়া কৃথকতা, পাঠ, শাস্ত্রব্যাখ্যা প্রভৃতির ব্যবস্থা করিয়াছিলেন।

 শেষ দশায় শারীরিক অশ্বাস্থ্যনিবন্ধন তিনি সোমপ্রকাশ সম্পাদনে ততটা সময় দিতে পারিতেন না। এই সময়ে কিছুদিন স্বাস্থ্যলাভের উদ্দেখে,কাশীতে গিয়া বাস করেন। তীর্থস্থানের দুরবস্থা পূৰ্ব্বে কখনও দেখেন নাই।

৩৭ কাশীতে গিয়া কাশীবাসী অনেকের বিশেষতঃ পাণ্ডীগণের মধ্যে ধৰ্ম্ম ও নীতির দুরবস্থা দেখিয় তাহার প্রাণে বড় আঘাত লাগে। তিনি হৃদয়ের সেই ভাব ব্যক্ত করিয়া “ৰিশ্বেশ্বর-বিলাপ’ নামে একখানি কাব্যপুস্তক রচনা করেন। তৎপরে দেশে ফিরিয়া আর পূৰ্ব্বের ন্তায় সোমপ্রকাশের কার্য্য করিতে পারিতেন না।

 ইহার উপরে ভানেকিউলার প্রেস श्रांद्प्ले (Vernacular Press Act) নামক আইন বিধিবদ্ধ হইলে, অমৃত বাজার পত্রিকা যখন ইংরাজী কাগজে পরিণত হইল, তখন তিনি কিছুদিনের জন্ত সোমপ্রকাশ তুলিয়া দিলেন, তথাপি নব প্রণীত অপমানকর আইনের অধীন হইতে পারিলেন না। এই সময়ে বঙ্গের লেপ্টনাণ্ট গবর্ণর সার রিচার্ড টেম্পল তাহাকে নিজ ভবনে ডাকাইয়া, সোম প্রকাশ তুলিয়া না দিবার জন্য অনেক অনুরোধ করিয়াছিলেন। পরে ঐ গৰ্হিত আইন উঠিয়া গেলে সোমপ্রকাশ আবার বাহির হইল বটে কিন্তু পূৰ্ব্বপ্রভাব আর রহিল না। তাহাও ক্রমে হস্তান্তরে গেল। ইহার পরে তিনি “কল্পদ্রুম” নামে এক মাসিক পত্রিকা কিছুদিন বাহির করিয়াছিলেন; তাহাও তাহার অসুস্থত বশতঃ অধিক কাল রহিল না। চরমে তিনি পীড়িত হইয়া রে গুরা রাজ্যের অন্তর্গত সাতনা নামক স্থানে গিয়া বাস করেন। সেখানে গুরুতর পৃষ্ঠত্রণ রোগে ১৮৮৬ সালের ২২শে আগষ্ট দিবসে গতাস্থ হন।

 লাহিড়ী মহাশয় কিছুদিন বাড়ীতে বসিয়া বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের পিতা হরচন্দ্র দ্যায়রত্ন মহাশরের নিকট পড়িয়াছিলেন। তাহা অল্পদিনের জন্ত; কিন্তু লাহিড়ী মহাশয়ের প্রকৃতিতে গুরুভক্তি ও সাধুভক্তি এমনি প্রবল ছিল যে সেই অল্পদিনের সম্বন্ধ তিনি কখনও ভুলিতে পারেন নাই। চিরদিন হ্যায়রত্ন মহাশয়ের নাম স্মৃতিতে ধারণ করিয়া আসিয়াছেন। দ্যায়রত্ন মহাশয়ের স্বসম্পৰ্কীয় লোফদিগের প্রতি, বিশেষত বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের প্রতি, শ্রদ্ধা প্রচুর পরিমাণে ছিল। সেই কারণেই বোধ হয় আমাকে দেখিবামাত্র দ্যায়রত্ন মহাশয়ের দৌহিত্র বলিয়া প্রেমালিঙ্গনের মধ্যে লইয়াছিলেন।

ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার।

 বঙ্গদেশকে যত লোক লোকচক্ষে উচু করিয়া তুলিয়াছেন এবং শিক্ষিত বাঙ্গালিগণের মনে মনুষ্যত্বের আকাঙ্ক্ষা উদ্দীপ্ত করিরাছেন, তাহাদের মধ্যে 

Mahendralal Sarkar.jpg

স্বগীয় ডাক্তার সঙ্গে দুলাল সরকার, সি, আহ, ই

ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকার একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তি। এরূপ বিমল সত্যাকুরাগ অতি অল্প লোকের মনে দেখিতে পাওয়া যায়; এরূপ সাহস ও দৃঢ়চিত্ততা অতি অল্প বাঙ্গালীই দেখাইতে পারিয়াছেন; এরূপ জ্ঞানাচুরাগ এই বঙ্গদেশে ফুলভ। র্তাহার সংশ্রবে আসিয়া এ জীবনে বিশেষ উপকৃত হইয়াছি। তাহার নাম নব্যবঙ্গের শিক্ষাগুরুদিগের মধ্যে গণনীয়; সুতরাং আনন্দের সহিত র্তাহার জীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই গ্রন্থে সন্নিবিষ্ট করিতেছি।

 কলিকাতার অদূরবর্তী হাবড়া বিভাগের পাইকপাড়া নামক গ্রামে, ১৮৩৩ সালের ২রা নবেম্বর দিবসে মহেন্দ্রলাল জন্মগ্রহণ করেন। পাঁচ বৎসর বয়সের সময় ইহার জননী ছর মাস বয়স্ক আর একটী পুত্র কোলে ইহাকে লইয়া কলিকাতা নেবুতলাতে ইহার মাতামহালয়ে আগমন করেন। ইহার অল্পকাল পরেই ৩২ বৎসর বয়সে পাইকপাড়া গ্রামে ইহার পিতার মৃত্যু হয়। তখন ইহার মাতুলদ্বর, ঈশ্বরচন্দ্র ঘোষ ও মহেশচন্দ্র ঘোষের উপরে ইহার রক্ষা ও প্রতিপালনের ভার পড়ে। এই পারিবারিক দুর্ঘটনার চারি বৎসর পরেই র্তাহার জননীর মৃত্যু হয়। তখন পিতৃমাতৃহীন হইয়া তিনি উক্ত মাতুলদ্বয়ের স্নেহ যত্নে প্রতিপালিত হইতে থাকেন।

 তাহার মাতুলের প্রথমে বাঙ্গালী শিখিবার ਵੇ। তাহাকে গুরুমহাশয়ের পাঠশালে ভৰ্ত্তি করিয়া দেন; এবং কিছুদিন পরে ইংরাজী শিখাইযার জন্ত ঠাকুর দাস দে নামক একজন ভদ্রলোককে নিযুক্ত করেন। উত্তর কালে এই ঠাকুর দাস দে যতদিন জীবিত ছিলেন ডাক্তার সরকার তাহাকে গুরুর দ্যায় ভক্তি শ্রদ্ধা করিয়া আসিয়াছেন; এবং নিজ কার্য্যের সহায়রূপে রাখিয়াছেন।

 সরকার মহাশয়ের মাইলদিগের অবস্থা ভাল ছিল না। ইহার জ্যেষ্ঠ, মাতুল ট্রাভলিং প্ৰিণ্টারের কাজ করিতেন; তাহাঁর কনিষ্ঠ মাতুলের অবস্থাও যে খুব ভাল ছিল এরূপ মনে হয় না।

 ঠাকুর-দাস দে মহাশয়ের নিকট সামান্তরূপ ইংরাজী শিক্ষা করার পর, তাহার কনিষ্ঠ মাতুল র্তাহাকে ফ্রী বালকরূপে হেয়ারের স্কুলে ভৰ্ত্তি করিয়া দিলেন। মহামতি হেয়ার তখনও জীবিত ছিলেন। তাহার দেড় বৎসর পরে ১৮৪২ সালে ইংলোক পরিত্যাগ করেন!' মহেন্দ্রলাল ১৮৪৯ পৰ্য্যন্ত হেয়ারের স্কুলে ছিলেন। ঐ সালে তিনি “জুনিয়ার স্কলার্সিপ পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হইয়া হিন্দু কলেজে গমন করেন। হিন্দু কলেজে তিনি ১৮৫৪ সাল পর্যন্ত পাঠ করেন। ইতিমধ্যে র্তাহার জ্ঞানপিপাসা অতিমাত্র বৰ্দ্ধিত হইল, তিনি নানা জ্ঞানের বিষয়ে দৃষ্টিনিক্ষেপ করিতে আরম্ভ করেন। কালেরেন্থ পাঠ্য বিষয় ও গ্রন্থ সকলে তার পরিতৃপ্তি হইত না। বিজ্ঞান পাঠের জন্ত তাহার মন বাঞ্জ। হইত। তখন হিন্দু কালেজে বিজ্ঞান পাঠনার রীতি ছিল না; তদনুরূপ আয়োজনও ছিল না॥ অবশেষে তিনি কলিকাতা মেডিকেল কালেজে ভৰ্ত্তি। হইবার করিলেন; এবং তাঁহার হিন্দু কালেজের অধ্যাপকদিগের অমতে উক্ত কালেজে প্রবিষ্ট হইলেন।

 ১৮৫৫ সালের বৈশাখ মাসে তিনি পরিণীত হইলেন; এবং ১৮৬০ সালে তাহার একমাত্র পুত্র অমৃতলাল সরকার জন্মগ্রহণ করিলেন।

 ডাক্তার সরকার মেডিকেল কলেজে ছয় বংসর পাঠ করিয়া ১৮৫৯। ৬০ সালে এল, এড়, এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া চিকিৎসকরূপে বাহির হন। মেডিকেল কালেজে অধ্যয়নকালে, তিনি তাহার অধ্যাপক ও সহাধায়িগণের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করিয়াছিলেন; এবং সে সময়ে পরীক্ষোত্তীর্ণ ছাত্ৰগণের জন্ত বতগুলি পারিতোষিক ছিল প্রায় সকলগুলিই অৰ্জন করিয়াছিলেন; সুতরাং তিনি কালেজ। হইতে বাহির হইলেই খ্যাতি প্রতিপত্তি তাহার সঙ্গে সঙ্গেই আসিল; এবং তাহার বহুদৰ্শিতা ও প্রতিভার গুণে তিনি অচিরকালের মধ্যে সহরের একজন খ্যাতনামা চিকিৎসক হইয়া উঠিলেন।

 ১৮৬৩ সালে তিনি কলেজের সৰ্ব্বোচ্চ এম, ডি পরীক্ষাতে উত্তীৰ্ণ হইলেন। তথন তাহার মান সম্রম চারিদিকে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। তৎপূর্বে ডাক্তার চন্দ্রকুমার দে মাত্র উ = উপাধি পাইয়া ছিলেন। সুতরাং দ্বিতীয় এম, ডি বলিয়া তাহার নাম সকলের মুথে উঠিল্লা গেল।

 এই ১৮৬৩ সালে ডাক্তার সূৰ্য্যকুমার চক্রবর্তীর উদ্যোগে সহরে একটী নূতন সভা স্থাপিত হয়। তাহা' ইংলণ্ডের ব্রিটিশ মেডিকেল এসোসিএশন নামক সভার বঙ্গীয় শাখা। কলকাতার বড় বড় ইংরাজ ও দেশীয় চিকিৎসকগণ মিলিয়া এই সভার প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার দিনে ডাক্তার সরকার একটা বক্ততা করেন, তাহাতে তাহার বাগিতা ও চিন্তাশীলতা দেখিল্লা সকলে মুগ্ধ হন। তিনি সভার প্রধান উদ্যোগী ও তৰ্মিযুক্ত সেক্রেটারীদিগের মধ্যে একজন ছিলেন। তিন বৎসর পরে তিনি উক্ত সভার একজন সহকারী সভাপতিরূপে বৃত হন।

 যে কারণে ঐ সভার প্রতিষ্ঠাকার্য্যের উল্লেখ করিতেছি তাহা এই ঐ দিনের বক্ততাতে ডাক্তার সরকার অপরাপর কথার মধ্যে হোমিওপেথিক চিকিৎসাপ্রণালীর দোষ কীৰ্ত্তন করেন। সেই বাক্যগুলি সুপ্রসিদ্ধ হোমিওপ্যাণ রাজেন্দ্র দত্ত মহাশয়ের চক্ষে পড়ে। ডাক্তার সরকারের সহিত তাহার, পূর্বেই পরিচয় ছিল। তৎপরে উভয়ে সাক্ষাৎ হইবামাত্রই রাজাবাবু ঐ উক্তিগুলি। অবলম্বন করিদ্মা ডাক্তার সরকারের' সহিত বিচার উপস্থিত করেন। এই বিচার বহুদিন চলিতে থাকে। ক্রমে আর এক ঘটনা আাসির উপস্থিত হয়। একজন বন্ধু (Morgan) মর্গান নামক একজন প্রসিদ্ধ চিকিৎসকের লিখিত Philosophy of Homeopathy নামক একখানি পুস্তকের সমালোচনা করিবার জন্য ডাক্তার সরকারকে অনুরোধ করেন। ঐ সমালোচনা ‘Indian Field নামক কিশোরীচাদ মিত্রের সম্পাদিত পত্রিকাতে বাহির করিবার কথা থাকে। কিন্তু পুস্তকধানি মনোযোগ পূৰক পাঠ করিতে গিয়া ডাক্তার সরকার তন্মধ্যে এমন কিছু কিছু কথা পাইলেন, যে বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনা মত প্রকাশ করা কঠিন বোধ হইতে লাগিল! তাহার মনে হইল যে কার্যতঃ হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ফলাফল কিছুদিন না দেখিয়া মত প্রকাশ করা প্তাহার পক্ষে কৰ্ত্তব্য নহে। সুতরাং তিনি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসার • ফলাফল দেখিবার জন্য রাজাবাবুর শরণাপন্ন হইলেন। রাজাবাবু আনন্দের সহিত তাহাকে সঙ্গে করিরা কতকগুলি কঠিন রোগের চিকিৎয়া দেথাইতে লইয়া গেলেন॥ ডাক্তার সরকার সেই সকল রোগীর অবস্থা ও চিকিৎস৷ বিধিমতে পরীক্ষা করির দেখিতে লাগিলেন এবং ভুল ভ্রান্তি যাহাতে না হয় এরূপ উপার সকল অবলম্বন করিলেন। এই রোগীগুলির চিকিৎসা কাৰ্য্য দেখিতে দেথিতে ডাক্তার সরকারের মত পরিবর্তিত হইয়া গেল। হানিমানের অবলম্বিত প্রণালী যে যুক্তি-সঙ্গত তাহ৷ প্ৰতীতি হইল। এই পরিবর্তন ঘটিতে ঘটিতে, তাহারা ১৮৬৬ সালে উপনীত হইলেন।

অন্য লোক হইলৈ মনের বিশ্বাস মনে রাখির।, আপনার অর্থোপার্জন ও সুথ সচ্ছদের উপার দেখিতেন, কিন্তু; মহেন্দ্রলাল সরকার সে ধাতুর লোক ছিলেন না৷। স্বাহা সত্য বলিয়া একবার প্রতীতি হইত তাহা তিনি। হৃদর মনের সহিত অবলম্বন করিতেন।; তাহ প্রকাশ বা প্রচার করিতে কুষ্টিত হইতেন ’ না৷; অথবা,সত্যাবলম্বন বিষয়ে ক্ষতি লাভ, বা লোকের অনুবাগ বিরাগের ভঃ করিতেন না। তাহার সেই প্রকৃতি অনুসারে, যখন। তাহার মত পরিবর্তন হইল। তখন তিনি তাহা তাহার চিকিৎসকবন্ধগণের নিকট ব্যক্ত করিবার জন্য ব্যগ্ৰ হইলেন। ১৮৬৭ সালের ১৬ই ফেব্রুঘারি দিবসে ব্রিটিশ মেডিকেল এসোসিএশনের ৰঙ্গদেশীয় শাখার চতুর্থ সাম্বৎসরিক অধিবেশন। হইল। সেই দিন ডাক্তার। সরকার “চিকিৎসা-প্রণালীর অনির্দিষ্টতা” বিষয়ে একটী বক্ত, তা পাঠ করিলেন। তাহাতে ভূমোদর্শন, চিস্তাশীলতা, সত্যপ্ৰিয়তানির্ভীকচিত্ততা সমুদ একাধারে উজ্জলরূপে প্ৰকাশ পাইয়াছিল॥ তাহাতে তিনি এলোপেথিক চিকিৎসা প্রণালীর সর্বজন-বিনিৰ্দিষ্ট কতকগুলি দোষ কৗত্তন করিয়া হানিমানের আবিষ্কৃত প্রণালীর যুক্তিযুকতা প্রদর্শন করিতে অগ্রসর হইলেন। ইহার ফল। যাহা দাড়াইল তাহ৷ বোধ হয় তিনি অগ্রে সম্ভব বলিয়া বিবেচনা করেন নাই।

তাহার বক্ত, তা শেষ হইলে, ইংরাজ ডাক্তারগণ মহা আপত্তি উত্থাপন করি লেনাঁ ডাক্তার ওয়ালার নামে একজন ইংরাজ ডাক্তার চটিয়া লাল হইয়া গেলেন। ডাক্তার সরকার কাহারও কাহারও আপত্তির উত্তর দিতে প্রবৃত্ত হইলে তিনি থামাইয়া দিবার চেষ্টা করিলেন; বলিলেন ‘ডাক্তার সরকার! ডাক্তার সরকার! আর একটা কথা যদি বল, তবে তোমাকে এখান হ’তে বাহির করে দেব। “ পরে তিনি এই মত প্রকাশ করিলেন, যে ডাক্তার সরকার উক্ত সভার সহকারী সভাপতি থাকা দূরে থাক, সভ্য থাকিলে তিনি তাহার সভ্য থাকিবেন না। ডাক্তার ই ওয়ার্চ, ডাক্তার চক্রবর্তী প্রভৃতি এরূপ মতে সায় দিলেন। সভামধ্যে আগ্নে্যুগিরির অগ্নIৎপাতের তায় সভ্যগণের ক্ৰোধ-বহুি প্রজ্জলিত হইল।

ডাক্তার সরকার সুদৃঢ় প্রতিজ্ঞা হৃদয়ে লইয়া ধীর গম্ভীর ভাবে গৃহে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। বাড়ীতে আসিয়া বলিলেন ‘আমি চাষার ছেলে, না হয়। সামা্য কাজ করে থাব তাতে আর কি? সত্য যা ত৷ বলতেই হবে ও করতেই হবে”। ওদিকে সংবাদ পত্রের স্তম্ভ সকল এই বাৰ্তাতে পূর্ণ হইতে লাগিল। মেডিকেল মিশনারি ডাক্তার রবসন তাহার বিরুদ্ধে এক বর্তৃতা করিলেন; ডাক্তার ইওয়াৰ্ট সংবাণ পত্রে অন্ত্র ধারণ করিলেন।; এবং চিকিৎসকগণ এক বাক্যে তাহাকে বর্জন করিলেন। সহর তোলপাড় হইয়া যাইতে লাগিল। ডাক্তার সরকারের পসার কিছু দিনের জন্য মাটী হইয়া গেল। ছয় মাসের মধ্যে তিনি একটীও রোগী পাইগেন না। কিন্তু তিনি নির্ভীক চিত্তে দণ্ডারমান। রহিলেন। যাহ৷ সত্য বলিয়া বুবিয়াছিলেন তাহ ঘোষণা করিতে বিরত হইলেন না॥ পর বৎসরেই তাহার Calcutta Journal of Medicine বাহির হইল। লোকে দেখিতে পাইল মানুঘটা দমে নাই; যাহাকে সত্য বলিয়া বুঝিয়াছে তাহাতে প্ৰাণ সমৰ্পণ করিয়াছে। এই ঘোর পরীক্ষার মধ্যে তিনি কি ভাবে স্থির ছিলেন, তাহা তিনি নিজেই এক স্থানে বাক্ত করিয়াছেন; -—“I was sustained by my faith in the ultimate triumph of truth—অর্থাৎ সত্য যাহা তাহ চরমে জয়যুক্ত হইবেই এই বিশ্বাসেই আমি সবল ছিলাম।” তাহার ভূতপূৰ্ব্ব প্রোফেসারদিগের অনেকে তাহার প্রতি খড়গহস্ত হইয়াছিলেন এবং তাহাকে অবাচ্য কুবাচ্য বলিয়াছিলেন; কিন্তু তিনি কি ভাবে সে সমুদয় কটুক্তি গ্রহণ করিয়াছিলেন, আহা ঐ ১৮৬৭ সালে মার্চ মাসে মুদ্রিত তাঁহার ঐ বক্তৃতার ভূমিকা হইতে উদ্ধৃত করিতেছি। তিনি। এক স্থানে বলিতেছেন;—

Whâtever may now have become the differences between my venerable Preceptors of the Medical College and myself, I shall always look back with ecstacy and gratitude on those days when I used to be charmed by their eloquence, pregnant with the words of Scienco. আবার ঐ ভূমিকার উপসংহারে তিনি লিখিতেছেন —

Persecution has already commenced. Professional combination is strong against me, and is likely to be stronger; every one's arm seems to be raised against me; but I cannot deprive myself of the satisfaction that mine has been, and shall be raised against none. It is...probable “my bread will be affected,” but I shall never forget the words of Jesus, who certainly speaks as man never spake, that as beings, instinet with-Reason, and made in the image of our Creator, “we must not live by bread alone, but by every word that proceedeth out of the mouth of God.”

• সকলে অনুভব করুন যখন তাহার বিরোধিগণ কোলাহল করিতেছিলেন এবং তাহার প্রতি” নানা প্রকার কটুক্তি বর্ষণ বুরিতেছিলেন, তখন এই মহামন ব্যক্তি কোন জগতে বাস করিতেছিলেন। ইহারই কিঞ্চিৎ পরে অর্থাৎ . ১৮৬৯ সালের প্রারম্ভে আমি তাহার অকৃত্ৰিষু সাধুতার এক পরিচয় পাই, তাহ চিরস্মরণীয় হইয়া ੋ। উচিত প্ৰলিয়া,লিখিয়া রাখিতেছি।

আমি তখন একুশ বাইশ বছরের ছেলে, সবে এল এ পরীক্ষা দিয়া উঠিয়াছি। সে সমরে আমি ভবানীপুরে আমার আশ্রয়দাতা ও প্রতিপালক। হাইকোর্টের প্রসিদ্ধ উকীল স্বৰ্গীয় মহেশচন্দ্র চৌধুরী মহাশয়ের ভবনে বাস করিতেছিলেন। আমি দরিদ্র ব্রাহ্মণের সগুন, আমার সহরে থাকিবার স্থান ছিল না। আমার পিতার সহিত বন্ধুতা স্বত্ৰে। চৌধুরী মহাশয় আমাকে। আানিয়া, দয়া করিয়া নিজ ভবনে স্থান দিয়াছিলেন। কেবল স্থান দিয়া ছিলেন তাহা নহে, ভ্রাতৃ-নির্বিশেষে পালন করিয়াছিলেন। ডাক্তার। সরকার সেই ভবনের স্থান্ধী-চিকিৎসক ছিলেন। এল, এ পরীক্ষা কালে। •গুরুতর শ্ৰম করাতে আমার এক প্রকার পীড় জমে। বাসার লোকেরা আমাকে বলপূর্বক ধরিদ্ধা ডাক্তার সরকারের নিকট উপস্থিত করেন। বলেন আমাদের বাসাতে এই একটা বামনের ছেলে আছে, এল এ পরীক্ষHর জন্য গুরুতর আম করে এর কি অমুথ হয়েছে দেখুন, আপনাকে দয়া করে এর চিকিৎসার ভার নিতে হবে। ডাক্তার সরকার দয়া করিয়া আমার চিকিৎসার ভার লইলেন। বলিলেন,—"তোমার পীড়ার আনুপূর্বিক বিবরণ লিথে আমার কাছে পাঠিও r কিন্তু সে দিন আর এক ঘটনা ঘঠিল যাহাতে আমার মনটা খারাপ হইল। মহেশচন্দ্র চোধুরী মহাশয়ের কনিষ্ঠ ভ্রাতা গিরিশচন্দ্র চৌধুরী একজন সাধুপুরুষ ছিলেন। আমরা যুবকদল তাহাকে গুরুতুল্য ভক্তিশ্রদ্ধা করিতাম। কিন্তু তাহাঁর একটা স্বভাব এই ছিল যে তিনি সকল বিষয়ে অতিরিক্ত মাত্রায় অনুসন্ধিৎসু হইতেন। সে দিন ডাক্তার সরকার যথন ব্যবস্থা পত্র লিথিতেছেন, তখন তিনি পার্থে দাড়াইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন “মশাই কি ঔষধ দিলেন?” ডাক্তার সরকার বিরক্ত হইয়া তাহার মুখের দিকে চাহিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনি কি মেডিকেল কালেজে পড়েছেন?'

গিরিশ বাবু না।

ডাক্তার সরকার—তবে এমন আহাম্কি করেন কেন? আমি কি ঔষধ দিচ্চি তাতে আপনার দরকার কি?

এই কণাগুলি এমন• রুক্ষভাবে বলিলেন যে আমাদের সালের প্রাণে। বড় আঘাত করিল। তারপর আমার রোগের আনুপূর্বিক বিবরণটা ইংরাজীতে লিথিয়া পাঠাইবার সময় তৎসঙ্গে বাঙ্গালাতে এক পত্র লিথিয়া পাঠাইলাম। তাহ৷ তাহার গিরিশবাবুর প্রতি পূীেক্ত ককশ। ব্যবহারের জন্য তিরস্কারে পূর্ণ ছিল। পাঠাইবার সমর মনে হইল না। যে নিজে ত গরীব ব্রাহ্মণের সস্তান, বাহার অনুগ্রহ প্রার্থী হইতে ঘাইতেছি, তাহাকেই তিরস্কার, এ কিরূপ ব্যবহায়। ঠিীখানি পাঠাইয়াই চিন্তা হইল। বুঝি বা চৌধুরী মহাপদ্মদিগের আশ্রয় হইতে বঞ্চিত হইতে হইল। ভয়ে ভয়ে ব'স করিতে লাগিলাম। তৎপরদিন বৈকালে ডাক্তার সরকারের আসিবার কথা। Iছল না। তথাপি তিনি আসিলেন। আসিয়াই। নীচের ঘরেজিজ্ঞাসা। করিলেন “শিবনাথ ভট্টাচার্য্য তোমাদৈর বাড়ীতে কে?” তাহারা হাসিয়া। বলিলেন ‘সেই যে মশাই পাগল ছেলেটা”। শুনিলাম ডাক্তার সরকার গম্ভীর ভাবে বলিলেন—“ঈশ্বর করুন এমনি পাগল ছেলে দেশে বেশী হয়। আমি তার সঙ্গে দেখা করতে চাই।”

আমি উপরে বসিয়৷ পড়িতেছিলাম, লোকে আসিয়া আমাকে টানিয়া লাইয়া গেল।; ‘ওরে আয় আয় ডাক্তার সরকার তোকে ডাকচেন। আমি কাপিতে কাপিতে গিয়া। উপস্থিত। আমি ঘরে প্রবেশ করিবামাত্র ডাক্তার সরকার টেবিলের অপর পার্থে উঠিয়া দাড়াইলেন এবং হস্ত প্রসারিত। করিয়া আমার হাত ধরিলেন। বলিলেন: —"তোমার ইংরাজী স্টেটমেন্ট দেখে খুসি হয়েছি; আর তোমার বাঙ্গালা পত্রের জন্য আমার মান্তরিক ধ্যবাদ গ্রহণ কর। আমি ত অবাক, তারপর তিনি আমাকে তার গাড়িতে তুলিয়া তার বাড়ী। পর্য্যন্ত আনিলেন। গিরিশবাবুর ওরূপ প্রশ্ন করা কেন উচিত হয়। নাই, এবং এ শ্রেণীর লোকের কিছু শিক্ষার প্রয়োজন, এই সকল আমাকে বুঝাইয়া৷। বলিলেন। তখন আমি কোথায় আর তিনি কোথায় ! আমি “ কলেজের একটা গরীবের ছেলে, তিনি সহরের একজন লব্ধপ্রতিষ্ঠ চিকিৎসক। আমায় তিরস্কারটা এই ভাবে গ্রহণ। করাতে কি সাধুতারই পরিচয় পাইলাম। সেই তাহার সহিত আমার আত্মীয়তা জন্মিয়া গেল॥ তদবধি আমার বা আমার পরিবারস্থ ‘কাহার ও পীড়ার সংবাদ দিবামাত্র বুক দিয়া আসিন্ধ পড়িাছেন; এবং বিনাভিজিটে দিনের পর দিন আসিয়া চিকিৎসা করিরাছেন। সে উপকারের স্বাণ আমায় অপরিশোধনীয় রহিরাছে।

এরূপ মানুষকে কে শ্রদ্ধাভক্তি না করিরা থাকিতে পারে? অচিরকালের মধ্যে তাহার পসার আবার ফিরিয়া আসিল। তাহার অভুখানের সঙ্গে সঙ্গে হোমিওপেথি ও লোকচক্ষে উঠিয়া পড়িল।

১৮৭০ সালে তিনি কলিকাতা বিশ্ববিস্তালয়ের ফেলো নিযুক্ত হইলেন। প্রথমে তাহাঁকে আর্টফ্যাকটর প্রতিনিধি করিয়া সিণ্ডিকেটে লওয়া হয়। তৎপরে ১৮৭৮ সালে সেনেটের সভ্যগণ তাহাকে ফাকটী অব মেডিসিনের প্রতিনিধিরূপে সিণ্ডিকেটে প্রেরণ করিবার প্রস্তাব করেন। ইহাতে ফ্যাকটী অব মেডিসিনের সভ্যগণের মধ্যে আপত্তি উপস্থিত হয়। উক্ত ফ্যাকলটার ডাক্তারগুণ তাহাকে গ্রহণ করিতে অস্বীকৃত হন। আবার সেই পুরাতন প্রশ্ন, সেই পুরাতন বিবাদ। ডাক্তার সরকারকে স্বীয় পক্ষ সমর্থন করিয়া দুইখানি পত্র লিখিতে হয়; তাহাতে সেনেটের সভ্যগণের মনের সকল সন্দেহ ভঞ্জন হয়; এবং তাহারা তাহাকে ফ্যাকল্টী অব মেডিসিনে বাহাল রাখেন।

১৮৭৬ সালে তাহার প্রধান উদ্যোগে ও তাহারি চেষ্টায় ‘সাএন্স এসোসিএ*ন’ প্রতিষ্ঠিত হয়; এবং অদ্যাপি বর্তমান আছে।

১৮৭৭ সালে তিনি কলিকাতার অন্ততম অনারারি মাজিষ্ট্রেটরূপে বৃত হন; এবং তাহার মৃত্যুর পূর্ববৎসর পর্যন্ত ঐ কাৰ্য্য দক্ষতার সহিত করিয়া আসেন।

১৮৮৩ সালে গবৰ্ণমেণ্ট তাহার মান সন্ত্রমেয় চিতুম্বরূপ র্তাহাকে সি, আই, ই, উপাধি প্রদান করেন।

১৮৮৭ সালে তিনি ছোটলাটের ব্যবস্থাপক সভার সভ্যরূপে মনোনীত হন। ১৮৯৩ সালে চতুর্থ বার মনোনীত হওয়ার পর তিনি ঐ পদ নিজে পরিত্যাগ করেন।

১৮৮৭ সালে তিনি কলিকাতার শেরিফের পদে বৃত হন। ১৮৯৩ হইতে ১৮৯৫ পর্য্যস্ত চারি বংসরের জন্য ফ্যাকলট অব আর্টের সভাপতির কার্য্য করেন।

বহুবৎসর এসিয়াটিক সোসাইটর সভ্যপদে অভিষিক্ত ছিলেন। ১৮৯৮ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালর তাহাকে অনারারি ডি, এল উপাধি প্রদান করেন।

এতদ্ভিন্ন তিনি স্বদেশ-বিদেশের অনেক বিজ্ঞান-সভার সভ্যপদে; মনোনীত হইয়াছিলেন।

সায়েন্স এসোসিএশন স্থাপন ব্যতীত তিনি আর একটী সদনুষ্ঠানের স্বত্রপাত করিয়াছিলেন। একবার স্বাস্থ্যলাভের উদ্দেশে তিনি বৈদ্যনাথে বাস করিতেছিলেন। তখন তথাকার কুষ্ঠরোগীদিগের দুর্দশা দেখিয়া তাহার পর-দুঃখকাতর হৃদর বড় ব্যথিত হয়। তিনি নিজে ৫০০০ হাজার টাকা ব্যয় করিয়া কুষ্ঠাদিগের জন্য একটী আশ্রয়-বাটিক নিৰ্ম্মাণ করেন; এবং তাহার পত্নী ‘লাজকুমারীর’ নামে তাহ উৎসর্গ করেন। ১৮৯২ সালে সার চালস ইলিয়ট তাঙ্গার ভিত্তি স্থাপন করেন। অবিশ্রাস্ত কার্য্যে ব্যস্ততার মধ্যে ডাক্তার সরকারের স্বাস্থ্য ভাল থাকিত না; মধ্যে মধ্যে ইপিকাশী প্রভৃতি রোগে ভগ্ন হইয়া পড়িতেন। তদুপরি চিকিৎসা-সুত্রে কোনও কোনও স্থানে যাওয়াতে ম্যালেরিয়া জরে ধরিজছিল t তাহাতে শেষ দশায় তিনি অতিশয় দুৰ্ব্বল হইয়া পড়িয়াছিলেন। অবশেষে ১৯০৩ সালের শেষভাগ হইতে এক কঠিন রোগে ধরিল। মূত্রাধারে একপ্রকার পীড়ার সঞ্চার হইয়া বড়ই ক্লেশ দিতে লাগিল। ঐ রোগে ১৯০৪ সালের ২৩এ ফেব্রুয়ারি দিবসের প্রাতঃকালে প্রাণবায়ু তাঙ্গর শ্রান্ত ক্লান্ত দেহকে পরিত্যাগকরিয়া গেল। বঙ্গের একটা উজ্জল তার চিরদিনের জঙ্গ অস্ত গেল।

আজারা তাহাতে যে কেবল সাহস ও সত্যপ্রিয়তাই দেখিয়াছিলাম তাহা নহে। এরূপ জ্ঞানাতুরাগী মাহুষ আমরা অল্পই দেখিয়াছি। চিকিৎসাবিদ্যা ও বিজ্ঞান তাহার নিজের স্বোপার্জিত বিশেষ বিদ্যা ছিল; কিন্তু তাহাতে তিনি তৃপ্ত হন নাই; তাহার জ্ঞানীন্তুরাগ সৰ্ব্বতোমুখীন ছিল। সর্বপ্রকার জ্ঞাতব্য বিষয়ে তাহার চিত্তের অভিনিবেশ দৃষ্ট হইত। সদ্‌গ্ৰন্থ সকল ক্রয় করা ও রক্ষা করা, তার একটা বাতিকের মত হইয়া দাড়াইয়াছিল। আমরা তাহার লাইব্রেরি দেখিবার জন্ত মধ্যে মধ্যে র্তাহীর ভবনে যাইতাম। তিনি তাহার জ্ঞানসম্পত্তি দেখাইতে আনন্দলাভ করিতেন। তাইার ভবনে জ্ঞানানুরাগী বন্ধুগণের একটা আড় ছিল। সেখানে বসিলেই অনেক জ্ঞানের কথা শোনা ষাইত। অনুমান করি তিনি যে লাইবেরি রাখিয়া গিয়াছেন তাহার মূলা লক্ষ টাকার অধিক হইবে। ধনী ব্যক্তিরা বিষয় সম্পত্তি রাখিয়া যায়, এই স্বাবলম্বনশীল, স্কুষ্মোন্নতিপরায়ণ দরিদ্রের সন্তান স্কোপার্জিত ধনের চিহ্ন স্বরূপ লক্ষ টাকারও অধিক মূল্যের জ্ঞানসম্পত্তি রাখিরা গিয়াছেন।

বহুদিন সাধুমুখে শুনিয়া আসিতেছি, যাহাদের হৃদয় পবিত্র তাহদের হৃদয়ে ঈশ্বর আবির্ভূত থাকেন। মহেন্দ্রলাল জীবনের সকল পথে, সকল সঙ্কটে, সকল সংগ্রামের মধ্যে, ঈশ্বরের সান্নিধ্য অনুভব করিতেন। যিনি মৃত্যুয় কিছুদিন পূৰ্ব্বে রোগযন্ত্রণার মধ্যে নিম্নলিখিত সংগীত রচনা করিতে পারিয়াছিলেন, তাহার স্বাভাবিক ধৰ্ম্মভাবের বিষয় আর কি বলিব।


পাহাড়ী-কাওয়ালি।

সয় না রোগের ষাতনা আর সয়ন,
কোথায়, নাথ, তোমার অসীম করুণা ৯

কৃপাদৃষ্টি থাকলে তোমার, থাকেন ত (কোন)

যাতনা।

দিয়ে এ বিশ্বাস, করো না নিরাশ, (একবার)

স্নেহ-নয়নে চাও না।

কোপদৃষ্টি ফিরাইয়ে লও, আর বাঁচিবনা, বাঁচিবনা।
সকলি খাদ, অধিক পোড়ালে কিছুই থাক্‌বে না।
জানি প্রভু, যা কর তুমি, তা সবে হয় মঙ্গল সাধনা,
তবু কাতর হয়ে আমি করিয়াছি যে প্রার্থনা;
তাতে তব কাছে, যদি হয়ে থাকি অপরাধী
নিজ গুণে দয়াময় করহে মাৰ্জ্জনা।
কারে দুঃখ জানাই, প্রভু, তোমা বিনা,
তুমি ছাড়া কে আছে, বুঝিতে মনের বেদনা,
কে আছে আর শান্তিদাতা দেখিতে পাই না;
তাই কেঁদে ডাকি তোমায় ঘুচাতে জ্বালা যন্ত্রণা।