রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ/চতুর্থ পরিচ্ছেদ

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

বঙ্গদেশে শিক্ষাবিস্তার, ইংরাজী শিক্ষার অভ্যুদয় ও হিন্দুকালেজের সংক্ষিপ্ত ইতিবৃত্ত।

১৮২৮ সালে লাহিড়ী মহাশয় স্কুল সোসাইটর স্কুল হইতে বৃত্তি প্রাপ্ত হইয়া হিন্দু কালেজে প্রবেশ করেন। কিন্তু তাহার হিন্দু কলেজের শিক্ষার বিবরণ দিবার অগ্ৰে বঙ্গদেশে শিক্ষাবিস্তার, ইংরাজী শিক্ষার অভু্যদয় ও হিন্দুকালেজের ইতিবৃত্ত সম্বন্ধে কিছু বলা আব্যশক।

দেওয়ানী কার্য্যের ভার কোম্পানির হাতে আসার পরেও অনেক দিন ফৌজদারী কাৰ্য্যভার মুসলমান কৰ্ম্মচারীদের উপরেই ছিল। তখন বিচারকার্য্যে ইংরাজ জজদিগকে সাহায্য করিবার জন্য এক এক জন মৌলবী সঙ্গে থাকিতেন। কিন্তু আইনজ্ঞ মৌলবী পাওয়া অনেক সময়ে কঠিন হইত। এই অভাব দূর করিবার জন্য, এবং মৈত্রী প্রদর্শন দ্বারা রাজ্যভ্রষ্ট মুসলমান সমাজকে প্রীত করিবার আশয়ে, প্রথম গবর্ণর জেনেরাল ওয়ারেণ হেষ্টিংস বাহাদুর কলিকাতাতে একটা মাদ্রাসা স্থাপন করিবার সঙ্কল্প করিলেন। অনেক সম্ভ্রান্ত মুসলমান এ বিষয়ে তাহার উৎসাহদাতা ও সহায় হইলেন। তাহাদের উদ্যোগে ১৭৮১ খ্ৰীষ্টাব্দে কলিকাতা নগরে উক্ত মাদ্রাসা স্থাপিত হইল। উহা অদ্যাপি বিদ্যমান আছে। এই কালেজ স্থাপন বিষয়ে গবর্ণর জেনেরাল এতই উৎসাহিত হইয়াছিলেন, যে বিলাতের প্রভুদের অনুমোদনের অপেক্ষা না করিয়াই, কালেজ গৃহ নিৰ্ম্মাণের জন্ত নিজ তহবিল হইতে ষাটি হাজার টাকা দিয়াছিলেন। শুনিতে পাওয়া যায় কোর্ট অব ডিরেক্টারসের সভ্যগণ নাকি পরে ঐ অর্থ তাহাকে প্রত্যপণ করিয়াছিলেন। এতদ্ভিন্ন হেষ্টিংস বাহাদুরের প্রযত্নে ঐ বিদ্যালয়ের ব্যয় নিৰ্ব্বাহের নিমিত্ত বাধিক ত্ৰিশ সহস্র টাকা আয়ের উপযুক্ত ভূসম্পত্তি দান করা হইয়াছিল। এই বিদ্যালয়ে প্রাচীন আরবী ও পারসী রীতি অনুসারে শিক্ষা দেওয়া হইত; এবং একজন প্রাচীন মৌলবী তাহার তত্ত্বাবধান করিতেন। ৭২ রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ ।

ইহার পর ১৭৯২ খ্ৰীষ্টাব্দে কাশীধামে তত্ৰত্য রেসিডেন্ট জোনাথান ডনকান বাহাদুরের প্রযত্নে একটী সংস্কৃত কালেজ স্থাপিত হয়। এই জোনাথান ডনকান তৎকালের প্রসিদ্ধ ভারত-হিতৈষী ইংরাজদিগের মধ্যে একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তি ছিলেন। এদেশীয়দিগের সহিত মিশিতে, বন্ধুতা করিতে, ও তাহাদের হিতচিন্তা করিতে তিনি ভালবাসিতেন । এজন্য তৎকালীন ভারতবাসী ইংরাজগণ তাহাকে আধা হিন্দু বলিয়া মনে করিতেন। সে সময়ে উত্তর পশ্চিমাঞ্চল, রাজপুতানা, ও পঞ্জাব প্রভৃতি অনেক প্রদেশে, বিশেষতঃ রাজপুতদিগের মধ্যে, সূতিকাগারে কন্যা-হত্যা করার প্রথা প্রচলিত ছিল। ডনকান কাশীতে অবস্থিতি কালে বহু-সংখ্যক রাজপুত পরিবারকে কন্যা-হত্যা হইতে বিরত হইবার জন্য শপথ-বদ্ধ করিয়াছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি অপর অয়েকজন কৰ্ম্মচারীর সহিত কন্যা-হত্যা নিবারণার্থ গুজরাট ও রাজপুতানাতে প্রেরিত হইয়াছিলেন! এই ভারত-হিতৈষী রাজপুরুষের চেষ্টাতে কাশীতে সংস্কৃত কালেজ স্থাপিত হয়। প্রথম বর্ষে তাহার ব্যয় নিৰ্ব্বাহাৰ্থ গবর্ণমেণ্ট চতুর্দ্দশ সহস্র মুদ্রা মঞ্জুর করেন। পরবর্ষে বার্ষিক ব্যয় ত্রিশ সহস্র মুদ্রা নিৰ্দ্ধারিত হয়।

কাশীর কালেজের নিয়মাবলীর মধ্যে নির্দ্দিষ্ট হয় যে, সেখানে বৈদ্যশাস্ত্রের অধ্যাপক ব্যতীত আর সমুদয় অধ্যাপক ব্রাহ্মণ-জাতীয় হইবেন; এবং মনুপ্রণীত ধৰ্ম্মশাস্ত্রের নির্দ্দিষ্ট প্রণালী অনুসারে ছাত্রদিগকে শিক্ষা দেওয়া হইবে।

পূৰ্ব্বোক্ত উভয় নিয়ম দ্বারাই প্রতিপন্ন হইতেছে, যে তদানীন্তন রাজপুরুষগণ হিন্দু ও মুসলমানগণের প্রাচীন রীতি নীতির প্রতি হস্তার্পণ করিতে অতীব কুষ্ঠিত ছিলেন; বরং সেই সকল রীতি নীতির প্রতি সমুচিত্ত শ্রদ্ধা প্রদর্শন করিবার চেষ্টা করিতেন। কেবল তাহা নহে, সে সময়ে তারতবর্ষীয় ইংরাজ গবর্ণমেণ্ট এদেশীয়দিগের প্রাচীন ধৰ্ম্মানুষ্ঠানে বিধিমতে সহায়তা করিতেন। বড় বড় হিন্দু পৰ্ব্ব ও মহোৎসবাদির দিনে ইংরাজদুর্গে তোপধ্বনি হইত; ইংরাজ সৈন্যগণ শান্তিরক্ষার ও সন্মান প্রদর্শনের জন্য মহোৎসব স্থলে উপস্থিত থাকিত; এবং অনেক স্থলে জেলার মাজিষ্ট্রেট স্বয়ং উপস্থিত থাকিয়া সম্মান প্রদর্শন করিতেন। তীর্থস্থানের বড় বড় মন্দিরের রক্ষকরূপে কোম্পানি তাহাদের আয়ের অংশী ছিলেন । এজন্য “পিলগ্রিমস ট্যাকস’ বা “যাত্রীর কর” নামে এক প্রকার শুল্ক আদায় করা হইত। ১৮৪০ সালে দেখা যায় এতদ্দ্বারা বঙ্গদেশে বর্ষে বর্ষে প্রায় তিন লক্ষ টাকা উঠিত। এ কথা এক্ষণে অনেকের নিকট চতুর্থ পরিচ্ছেদ । ৭৩

উপকথার মত লাগিতে পারে । কিন্তু বস্তুতঃ ১৮৪০ সাল পৰ্য্যন্ত এই সকল নিয়ম প্রচলিত ছিল । আরও শুনিলে সকলে আশ্চৰ্য্য বোধ করবেন যে, যুদ্ধাদিতে জয় লাভ হইলে গবৰ্ণমেণ্টের পক্ষ হইতে কালীঘাট প্রভূত তীর্থের বড় বড় মন্দিরে পূজারিদগের দ্বারা পূজা দেওয়া হইত। উক্ত সালে গবৰ্ণর জেনেরাল লর্ড অকল্যাণ্ড বাহাদুর রাজবধির দ্বারা ঐ সকল নিয়ম রহিত করেন। পুর্ব্বকার রাজনীতি কি প্রকার ছিল তাহ প্রদর্শন করিবার উদ্দেশেই এই সকলেয় উল্লেখ করা গেল।

যাহা হউক, যখন এদেশে রাজপুরুষদিগের অনেকে এদেশীয়দিগের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের জন্য ব্যগ্র হইতেছিলেন, তখন যে ইংলণ্ডের লোক একেবারে সে বিষয়ে উদাসীন ছিলেন এরূপ বলা যায় না। ১৭৯৩ খ্ৰীষ্টাব্দে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সনন্দ পত্র পুনর্গ্রহণের সময় উপস্থিত হয়। পার্লেমেন্ট মহাসভায় সেই প্রশ্ন সমুপস্থিত হইলে চার্লস গ্রান্ট (Charles Grant) নামক একজন ভারত-হিতৈষী পুরুষ এদেশীয়দিগের মধ্যে শিক্ষাবিস্তার ও ধৰ্ম্মপ্রচার এবং এদেশ প্রবাসী ইংরাজগণের ধৰ্ম্ম ও নীতির উন্নতি বিধান একান্ত কৰ্ত্তব্য বলিয়া এক প্রস্তাব উপস্থিত করেন। এতদৰ্থ তিনি একখানি ক্ষুদ্র পুস্তিকা রচনা করিয়া বোর্ড অব কন্‌ট্রোলের সভ্যগণের হস্তে অর্পণ করেন। এই পুস্তিকা পাঠ করিয়া ক্রীতদাস-প্রথা-নিবারণকারী সুবিখ্যাত উইলবারফেসি সাহেব চার্লস গ্রান্টএর সহায়তা করিতে প্রতিশ্রুত হন। বোর্ড অব কট্রোলের সভাপতি ডনডান বাহাদুর প্রথমে ইহাদিগের প্রস্তাবের সপক্ষতা করিবার আশা দেন; কিন্তু পরে কোর্ট অব ডিরেক্টারের সভ্যগণের প্ররোচনাতে সে পথ পরিত্যাগ করেন। সুতরাং গ্রান্টের প্রস্তাবে বিশেষ ফল ফলিল না।

এইরূপে যখন একদিকে স্বদেশ-বিদেশে ভারত-হিতৈষী ব্যক্তিগণ ক্ষীণ ও দুর্ব্বলভাবে এদেশীয়দিগের অজ্ঞান অন্ধকার হরণ করবার প্রয়াস পাইতেছিলেন, তখন অপরদিকে শিক্ষা সম্বন্ধে দেশের অবস্থা অতীব শোচনীয় ছিল। বিগত শতাব্দীর প্রারম্ভে গবর্ণমেন্ট, ডাক্তার ফ্র্যান্সিস্ বুকানান হামিল্টন নামক একজন কর্মচারীকে কোন কোনও বিষয়ে সংবাদ সংগ্ৰহ করিবার জন্য নিযুক্ত করেন। তন্মধ্যে দেশের শিক্ষাসম্বন্ধীয় অবস্থাও একটা জ্ঞাতব্য বিষয় ছিল। হামিণ্টন অনেক জিলা পরিদর্শন করিয়া এ বিষয়ে বহু তথ্য সংগ্রহ করেন। তদ্দ্বারা দেশের অবস্থা বিষয়ে অনেক কথা জানতে পারা যায়। তাহার সকল বিবরণ এখানে উল্লেখ করা নিষ্প্রয়োজন। এইমাত্র বললেই যথেষ্ট হইবে, যে ৭৪ রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ ।

১৮০০ খ্ৰীষ্টাব্দে বাখরগঞ্জ একটা স্বতন্ত্র জিলাতে পরিণত হয়। ১৮০১ খ্ৰীষ্টাব্দে ডাক্তার হামিল্টন ইহার প্রজা সংখ্যা ৯২৬৭২৩ বলিয়া গণনা করেন। কিন্তু ইহাদের মধ্যে একটীও পাঠশালা দেখিতে পান নাই । দেশের অপরাপর কোন কোনও স্থানে সংস্কৃতের চর্চা কিছু ছিল বটে, কিন্তু তাহাও কেবল ব্যাকরণ, স্মৃতি ও ন্যায়ের শিক্ষাতে পর্য্যবসিত হইত। যে জ্ঞানের দ্বারা হৃদয় মন সমুন্নত হয়, জগত ও মানবকে বুঝিবার সহায়তা হয়, এমন কোনও জ্ঞান দেশে বিদ্যমান ছিল না। এমন কি বেদ, বেদান্ত, গীত, পুরাণ, ইতিহাস প্রভৃতি জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থসকল পণ্ডিতগণেরও অজ্ঞাত ছিল।

শিক্ষা সম্বন্ধে যখন দেশের এই দুরবস্থা, তখন নানা কারণের সমাবেশ হইয় দেশের লোকের দৃষ্টি শিক্ষার প্রতি, বিশেষতঃ ইংরাজী শিক্ষার প্রতি, আকৃষ্ট হইতে লাগিল। বৎসরের পর বৎসর যতই ইংরাজ রাজ্য সুপ্রতিষ্টিত হইতে লাগিল, যতই ক্রমে শাসন কার্যের জন্য আইন আদালত প্রভৃতি স্থাপিত হইতে লাগিল, যতই ইংরাজ বণিকগণ দলে দলে আসিয়া কলিকাতা সহরে আপনাদের বাণিজ্যাগার স্থাপন করিতে লাগিলেন, ততই এদেশীয়দিগের, এবং বিশেষ ভাবে কলিকাতার মধ্যবিত্ত গৃহস্থদিগের, মধ্যে স্বীর স্বীয় সস্তানগণকে ইংরাজী শিক্ষা দিবার আকাঙ্ক্ষা বৰ্দ্ধিত হইতে লাগিল।

এই সময়ে কলিকাতার কয়েক ক্রোশ উত্তরবর্তী শ্রীরামপুর নগরে কেরী, মার্সম্যান ও ওয়ার্ড নামক তিনজন ইউরোপীয় খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম-প্রচারক বাস করিতেছিলেন। শ্রীরামপুর তখন দিনেমার জাতির অধীনে ছিল। সে সময়ে ইংরাজ গবর্ণমেণ্ট নবরাজ্য প্রাপ্ত হইয়া এমন ভয়ে ভয়ে বাস করিতেন যে নিজরাজ্য মধ্যে খ্ৰীষ্টধৰ্ম্ম-প্রচারকদিগকে স্বীর ধৰ্ম্ম-প্রচার করিবার অধিকার দিলে পাছে বিদ্রোহাগ্নি জলিয়া উঠে, এই ভয়ে পূৰ্ব্বোক্ত প্রচারকত্রয়কে কলিকাতাতে কার্জাক্ষেত্র বিস্তার করিবার অনুমতি দেন নাই। তদনুসারে তাহার ডেনমার্কের অধিপতির নিকট প্রচারের অনুমতি-পত্ৰ লইয়া শ্রীরামপুরে গিয়া বাস করিয়াছিলেন। ১৮০২ খ্ৰীষ্টাব্দে পীতাম্বর সিং নামক কায়স্থ-জাতীয় এক ব্যক্তিকে তাহারা সৰ্ব্ব প্রথমে খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মে দীক্ষিত করেন। তৎপরে বৎসরের পর বৎসর খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মাবলম্বিগণের সংখ্যা বৰ্দ্ধিত হইতে লাগিল। তাহার সঙ্গে সঙ্গে শ্রীরামপুরের মিশনারিগণের দুই দিকে মনোযোগ দেওয়া আবশ্যক হইতে লাগিল। প্রথম, খ্ৰীষ্টধৰ্ম্মাবলম্বীদিগের ইংরাজী শিক্ষার উপায় বিধান করা, দ্বিতীয়তঃ, দেশীয় ভাষাতে বাইবেল প্রভৃতি গ্ৰন্থ অনুবাদ করিবার জন্য বাঙ্গালা ভাষার চতুর্থ পরিচ্ছেদ । ৭৫

অনুশীলন করা। ইহাদের প্রযত্নে রামপুরে উক্ত উভয় বিষয়েই উন্নতি হইতে লাগিল এবং তাহার ফল সমগ্র দেশে ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল।

এই কালের অার একটী অনুষ্ঠান উল্লেখযোগ্য। সে সময়ে যে সকল সিবিলিয়ান পুরাতন হালিবরি কালেজ হইতে উত্তীর্ণ হইরা এদেশে আসিতেন, তাহাদিগকে আসিয়াই দেশের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে গমন করিতে হইত এবং শাসন সংক্রান্ত বিবিধ গুরুতর কার্যের ভার গ্রহণ করিতে হইত। তাহারা যখন এদেশে পদার্পণ করিতেন তখন সম্পূর্ণরূপে এদেশীয় ভাষা, এদেশীয় রীতি নীতি, এদেশীর লোকের স্বভাব চরিত্র, মনের ভাব, প্রভৃতি বিষয়ে অনভিজ্ঞ থাকিতেন! এজন্য তাঁহারা অনেক সময়ে আপনাদের কার্য্য সুচারুরূপে সম্পন্ন করিতে পারিতেন না; অনেক সময়ে অজ্ঞতা বশতঃ উৎকোচজীবী নিম্নতম কৰ্ম্মচারীদের আশ্রয় লইতেন; অনেক সময়ে বিচার কার্য্যে ভ্রম প্রমদ করিয়া ফেলতেন। গবর্ণর জেনেরাল লর্ড ওয়েলেসলি এই অভাবটী দূর করিবার চেষ্টা করেন। লর্ড ওয়েলেসলির ন্যায় প্রতিভাশালী ও মনস্বী গবর্ণর জেনেরাল অতি অল্পই দেখা গিয়াছে। তিনি সঙ্কল্প করিলেন, যে নবাগত সিবিলিয়ানদিগকে কিছুদিন কলিকাতাতে দেশীয় ভাষা শিক্ষা দিয়া পরে রাজকাৰ্য্যে প্রেরণ করবেন। তদনুসারে ১৮০০ সালে কলিকাতাতে ফোর্ট উইলিয়াম কালেজ নামে একটা কালেজ স্থাপন করিলেন । কালেজ স্থাপন করিলেই পাঠ্য পুস্তকের প্রয়োজন হইল। তখন বাঙ্গালী ভাষায় পাঠ্য পুস্তক ছিল না। লর্ড ওয়েলেসলি কিছুতেই পশ্চাৎপদ হইবার লোক ছিলেন না। তাঁহার প্ররোচনায় মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার নামক উড়িষ্যা-দেশীয় কলেজের একজন পণ্ডিত বাঙ্গালা গ্রন্থ রচনা করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। এই সময়ে মুহূঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার, উইলিয়াম কেরী, রামরাম বসু, হরপ্রসাদ রায় প্রভৃতি কয়েক ব্যক্তি কতকগুলি গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। তন্মধ্যে রাজীবলোচন প্রণীত "কৃষ্ণচন্দ্র চরিত’, কেরী প্রণীত "বাঙ্গালী ব্যাকরণ", রামরাম বসু প্রণীত “প্রতাপাদিত্য চরিত” ও “লিপিমালা”, মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার প্রণীত “বত্রিশসিংহাসন” ও “রাজাবলী,” চণ্ডীচরণ মুন্সী প্রণীত ‘তোতার ইতিহাস', হরপ্রসাদ রায় প্রণীত “পুরুষ পরীক্ষা” বিশেষ . উল্লেখযোগ্য। ১৮০০ খৃষ্টাব্দ হইতে ১৮১৮ খৃষ্টাব্দের মধ্যে ঐ সমস্ত গ্রন্থ রচিত হইয়াছিল। এই সকল গ্রন্থের অধিকাংশের ভাষা পারসী-বহুল ও দুর্বোধ। তখনকার বাঙ্গালা ও বর্তমান বাঙ্গালাতে এত প্রভেদ যে পাঠ করিলে বিস্ময়াবিষ্ট হইতে হয়। ৭৬ রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ ।

এই ফোর্ট উইলিয়াম কালেজ বহু বৎসর জীবিত ছিল। উইলিয়াম কেরী ইহার প্রথম শিক্ষকদগের মধ্যে একজন। আর এক কারণে এই কলেজ বঙ্গদেশে চিরস্মরণীয় হয়েছে। পণ্ডিতবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কিছুদিন ইহার শিক্ষকতা করিয়া ছলেন এবং সেই সময়েই তাহার সুপ্রসিদ্ধ “বেতালপঞ্চবিংশতি” নামক গ্রন্থ রচনার সংকল্প করেন। উহা ১৮৪৭ সালে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। বেতালপঞ্চবিংশতিকে বৰ্ত্তমান সুললিত বঙ্গভাষার উৎপত্তি-স্থান বলিয়া নির্দেশ করা যাইতে পারে।

একদিকে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সাহায্যে পরোক্ষভাবে দেশে বাঙ্গালা ভাষায় চর্চা চলিতে লাগিল এবং সেই সঙ্গে বাঙ্গালা শিক্ষার জন্য পাঠশালা প্রভৃতি স্থাপিত হইতে লাগিল, অপরদিকে কলিকাতা সহরের সন্ত্রান্ত গৃহস্থদিগেয় মধ্যে নিজ সন্তানদিগকে ইংরাজী শিক্ষা দিবার প্রবৃত্তি প্রবল হইতে লাগিল । সুবিধা বুঝিয়া কয়েকজন ফিরিঙ্গী কলিকাতার স্থানে স্থানে ইংরাজী স্কুল স্থাপন করলেন। সার্বরণ (Sherburne) নামক একজন ফিরিঙ্গী চিতপুর রোডে একটী স্কুল স্থাপন করিলেন। সুবিখ্যাত দ্বারকানাথ ঠাকুর এই স্কুলে প্রথম শিক্ষা লাভ করেন। মার্টন বাউল (Martin Bowle) নামক আর একজন ফিরিঙ্গী আমড়াতলায় এক স্কুল স্থাপন করেন ; স্বপ্রসিদ্ধ মতিলাল শীল সেই স্কুলে শিক্ষা লাভ করিয়াছিলেন। আরটুন পিট্রাস (Arratoon Petres) নামক আর একজন ফিরিঙ্গী আর একটা স্কুল স্থাপন করেন ; তাহার যাবতীয় ছাত্রের মধ্যে কলুটোলার কানানিতাই সেন ও খোঁড়া অদ্বৈত সেন প্রসিদ্ধ। ইঁহারা ভাঙ্গা ভাঙ্গা ব্যাকরণ-হীন ইংরাজী বলিতে পারিতেন এবং লিখিতে পারিতেন বলিয়া তৎকালীন কলিকাতা সমাজে ইঁহাদের খ্যাতি প্রতিপত্তির সীমা ছিল না। ইহারা যাত্রা মহোৎসবাদিতে আপনাদের পদগৌরবের চিহ্ন স্বরূপ কাবা চাপকান পরিয়া এবং জরীর জুতা পায়ে দিয়া আসিতেন। লোকে সন্ত্রমের সহিত ইঁহাদের দিকে তাকাইত।

সে সময়ে যে ইংরাজী শিক্ষা দেওয়া হইত, তাহার বিষয়ে কিছু বলা আবশ্যক। সে সময়ে বাক্য-রচনা-প্রণালী বা ব্যাকরণ প্রভৃতি শিক্ষা দিবার দিকে দৃষ্টি ছিল না। কেবল ইংরাজী শব্দ ও তাহার অর্থ শিখাইবার দিকে প্রধানতঃ মনোযোগ দেওয়া হইত। যে যত অধিক সংখ্যক ইংরাজী শব্দ ও তাহার অর্থ কণ্ঠস্থ করিত, ইংরাজী ভাবার স্বশিক্ষিত বলিয়া তাহার তত খ্যাতি প্রতিপত্তি হইত। এরূপ শোনা যায় শ্ৰীয়ামপুরের মিশনারিগণ সে সময়ে এই বলিয়া তাহদের আশ্রিত ব্যক্তি দগকে সার্টিফিকেট দিতেন যে এ ব্যক্তি দুইশত বা তিনশত ই রাজী শব্দ শিখয়াছে। এই কারণে সে সময়ে কোন কোনও বালক ইংরাজী অভিধান মুখস্থ করিত । অনেক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা সাঙ্গ করিয়া স্কুল ভাঙ্গিবার সময় নামতা ঘোষাইবার স্তীয় ইংরাজী শদ ঘোষান হইত। যথা

ফিলজফার—বিজ্ঞলোক, প্লেীম্যান—চাষী ।
পমকিন—লাউ কুমড়া, কুকুম্বার—শষ ॥

 অনেকে বিঘ্নিত হইয়া জিজ্ঞাস করিতে পারেন বাক্য-রচনাহীন ও ব্যাকরণহন ইংরাজী শব্দের দ্বাবা তৎকালীন ইংরাজীশিক্ষিত ব্যক্তিগণ কিরূপে ইংরাজগণের সহিত কথাবাৰ্ত্তা চালাইতেন। সে সম্বন্ধে কলিকাতা সহরে প্রাচীন লোকদগের মধ্যে অনেক কৌতুকজনক গল্প প্রচলিত আছে। তাহার অনেক গল্প পাঠকগণ পরলোকগত রজনারায়ণ বসু মহাশয়ের প্রীত “সে কাল ও একাল” নামক গ্রন্থে দেখিতে পাইবেন । দুই একটমাত্র এস্থলে উল্লেখ করা যাইতেছে ।

 একবার বড় ঝড় হইয়! একখানি জাহাজ গঙ্গার তীরে লাগিয়া আড় হইয়া পড়ে। পরদিন সেই জাহাজের সরকার বাবু ইংরাজ প্রভুকে আসিয়া বলতেছেন—“শার শার শিপ ইজ এইটি ওয়ান্‌” অর্থাৎ জাহাজ একাশি হইয় পড়িয়াছে ।

 কোন ইংরাজের অধীনস্থ একজন বাঙ্গালি কৰ্ম্মচারী প্রতিদিন পর বেলা সাহেবের ঘোড়ার দানা খাইয়া টিফিন করতেন । দুষ্ট সহিশগণ এই স্থবিধা পাইয়া ঘোড়ার দান। চুরি করিয়া বুেচিত। ক্রমে এবিষয় প্রভুর . কর্ণগোচর হইলে তিনি ভূতাদিগকে যখন তিরুস্কার করিতে লাগিলেন, তখন তাহারা বলিল—“হুজুর! আপনার বাবু রোজ রোজ ঘোড়ার দানাতে টিফিন করেন” । সাহেবের বড় আশ্চৰ্য্য বোধ হইল। তিনি বসুজ মহাশয়কে ডাকিয়। বলিলেন--“নবীন ! তুমি নাকি আমার ঘোড়ার দানাতে টিফন কর ?” নবীন বললেন -"ইয়েশ, শার মাই হাউস মানিং এও ইবনিং টুয়ো ন্ট লীভস্ . ফল, লিটল লিটল পে, হাউ- মনেজ ?—অর্থাৎ আমার বাটীতে প্রাতে ও সন্ধাতে কুড়ি খান পাত পড়ে এত কম বেতনে কিরূপে চলে.! শুনিতে পাওয়া যায় বম্বৰু মহাশয়ের এই উক্তিতে ইংরাজটা নাকি সদয় ईश्ब्र তাহার বেতন বৰ্দ্ধিত করিয়া দিরাছিলেন ।  এই ভাবে যতদূর কথাবার্জী চলা সম্ভব তাহাই চলিত। ইংরাজের ভাবে, আকারে ইঙ্গিতে, বুঝিয়া লইতেন; এবং সেই সকল কথা তাহাদের নিজেদের মধ্যে সায়াহ্নিক ভেজের সময়ে আমোদ প্রমোদের বিশেষ স্বহারতা করি ত।

 যখন এইরূপে ইংরাজী শিক্ষার জ্য দেশের লোকের ব্যগ্রতা দিন দিন বাড়িতে লাগিল তখন সে বিষয়ে গমণমেন্টের মনোযেfগ ছিল না। পাছে ইংরাজী শিক্ষা প্রচলিত করিতে গেলে দেশের লোক বিরক্ত হয় এই ভয়ে ভারতবর্ষীয় গবৰ্ণমেণ্ট সে বিষয়ে হাত দিতেন না॥ প্রসঙ্গক্রমে একটী ঘটনার উল্লেখ করিলেই তাহারা কিরূপ ভয়ে ভয়ে থাকিতেন তাহার প্রমাণ প্রাপ্ত হওরা যাইবে। ১৮০৭ সালে শ্রীরামপুর হইতে পারত ভাষায় লিখিত একখানি। পুস্তিকা প্রকাশিত হয়। উক্ত পুস্তিকাতে মহম্মদীয় ধর্মের উপরে গ্ৰীষ্টীয় ধর্মের শ্রেষ্ঠতা প্রতিপাদিত হইয়াছিল। ঐ পুস্তিকা প্রকাশিত হইলে কলিকাতাবাসী রাজপুরুষগণ ভরে অস্থির হইয়। উঠিলেন। উক্ত পুস্তিকা প্রচার বন্ধ করি যার জন্য ডেনমার্কের গবৰ্ণমেন্টের নিকট পত্র গেল। তদষুসারে শ্রীরাম পুরের ডেন রাজপুরুষগণ অবশিষ্ট ১৭০০ কি ১৮০০ পুস্তক কেরী প্রভৃতি প্রচারকদিগের নিকট হইতে কাঁড়ির লইয়া কলিকাতাতে গবৰ্ণর জেনেরালের মন্ত্ৰি সভার হস্তে অৰ্পণ করিলেন॥ এইরূপ ভরে ভরে র্যাহারা বাস করিতেন। তাহারা যে কেন হঠাৎ ইংরাজীশিক্ষা প্রদানে কৃতসংকল্প হন নাই তাহা আমরা অনুভব করতে পারি।

 এই ভাবে ১৮১১ খ্রীষ্টাব্দ পর্য্যন্ত গেল। ঐ বৎসর গবর্ণর জেনে রাল লর্ড মিন্টো বাহাদুর এক মন্তব্য লিপিবদ্ধ করিলেন। তাহাতে লিখিলেন।

 “It is a common romPurk thaot Science and Ibitiature auro in a progressive state of decay anong the Nativus of India. Fron every inquiry which I have been enabled to make on this interesting subject, that remark appears to me bn too Well-founded. The number of che learned is not only diminished, bn the circle of learning even amongst those who still devote themselves to it, appears to be considerably contracterl: 'I'he abstract sciences are abandoned, polite literature neglected, and no branch of lourming cultivated but what is connected with the peculiaur religious doctrines of the people. The immediate consequence of this state of things is the disse and even 'actual lossof many books; and it is to be approhended, that unless Government inter pos৬ with a fostering hand, the revival of letters may shortly come hopelesss fron_a want of books or •of persons cap able of explaining them  অর্থ-সকলের মুখেই শুনিতে পাওয়া যায়, ভারবর্ষের প্রজাবর্গের মধ্যে উত্তরোত্তর বিজ্ঞান ও সাহিত্যের অবনতি হইতেছে। আমি যতদূর অনুসন্ধান করিতে পারিয়াছি তাহাতে উক্ত প্রকার উক্তির যথেষ্ট কারণ আছে বলিয়া মনে হইতেছে। কেবল যে বিদ্বান ও পণ্ডিত জনের সংখ্যা হ্রাস হইতেছে তাছা নহে, যাহারা বিদ্যার চর্চা করিতেছেন, তাহাদের মধ্যে ও বিদ্যার ক্ষেত্র অতি সংকীর্ণ হইতেছে । মনোবিজ্ঞান, দর্শন প্রভৃতি আর অধীত হয় না ; বিদগ্ধজনোচিত স্বকুমার সাহিতের আদর নাই ; এবং প্রজাকুলের বিশেষ বিশেষ ধর্মবিশ্বাস সংক্রান্ত সাহিত্য ভিন্ন অন্ত বিদ্যার সমাদর দৃষ্ট হয় না। এই প্রকার অনাদরের ফল এই হইয়াছে, যে অনেক উৎকৃষ্ট গ্রন্থ আর অধীত হর না ; এমন কি অনেক ভাল ভাল গ্রন্থ বিলুপ্ত হইয়া যাইতেছে ; এবং এরূপ সম্ভব বোধ হইতেছে যে গবর্ণমেণ্ট যদি সাহায্যকারী হইয়া হস্তার্পণ না করেন, অচিরে পাঠ গ্রন্থের ও উপযুক্ত অধ্যাপকের অভাবে বিদ্যার পুনরুদার অসাধ্য হইয়া পড়িবে।

 এইরূপে দেশের প্রাচীন বিদ্যার বিলোপাশঙ্কার স্বচনা করিরা লর্ড মিণ্টো প্রস্তাব করিরiছলেন;–

 “l would accordingly recommend that in addition to the College at Benares ( to be subjected, of course, to the reform already noticed ) Colleges be established at Nuddea and at Bhour # * in the district of Tirhoot.

 অর্থ—অতএব আমি পরামর্শ দেই ষে কাণীর কালেজ ব্যতীত, (সে কালেজের কি রূপে সংস্কার করিতে হইবে তাহ পূৰ্ব্বেই বলিয়াছি ) নবদ্বীপে ও ত্রিহুতের অষ্টগত ভাউর নামক স্থানে আর দুইটি সংস্কৃত কলেজ স্থাপন করা হউক ।

 কেন লর্ড মিণ্ট বাহাদুর ব্রিটিশ গবর্ণমেণ্টের বহুবংসরের ঔদাসীন্ত-নিদ্রা হইতে উখিত হইয়া সংস্কৃত বিস্তার রক্ষার্থে এই প্রস্তাব করিলেন আহার কিঞ্চিৎ ইতিবৃত্ত আছে। সে ইতিবৃত্ত এই,—সার উইলিয়াম জোন্সের সমর হইতে ভারত-প্রবাসী ইংরাজদেগের মধ্যে সংস্কৃত বিদ্যার আলোচনা" করা একটা বাতিক স্বরূপ হইয়া উঠিয়ছিল। তখুন সংস্কৃতবিদ্যা বিষরে অভিজ্ঞ হওয়া উtহাদের মান সন্ত্রম লাভের &কটা প্রধান উপায়-স্বরূপ ছিল। এই কারণে অল্প বা অধিক পরিমাণে সংস্কৃত জনা সে সময়কার ভদ্র ইংরাজদ্বগের একটা F্যাসনের মত হইয় দাড় ইরা:ছল। এই ১৮১১ খ্ৰীষ্টাব্দে সুবিখ্যাত সংস্কৃতবস্তাবিং কোলব্রুক সাহেব গবর্ণমেণ্টের মন্ত্রিসভাতে অধিষ্ঠিত ছিলেন। সংস্কৃত বিঠাতে তাহার মাস্থ পণ্ডিত লোক বিদেণীর দিগের মধ্যে অল্পই দৃষ্ট হয়। কেবল তিনিই যে এ বিষয়ে গব র্ণর জেনেরালের পরামর্শদাতা ছিলেন এরূপ বোধ হয় না। ডাক্তার এইচ উইলসন, জেম্স ও টোবি পিন্সেপ ভ্রাতৃদ্বয়, ছে মেকনাটেন, মিষ্টর সদরল্যাণ্ডমিষ্টর সেক্সপীয়র প্রভৃতি যে সকল সংস্কৃতজ্ঞ ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে ইংরাজী শিক্ষার পক্ষপাতী ব্যক্তিদিগের সহিত ঘেরতর বার্গম্বুদ্ধ প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন, তাহাদেরও কেহ কেহ এ সময়ে কোলব্রুক মহোদয়ের পৃষ্ঠপোষক ও গবৰ্ণর জেনেরলের পরামর্শদাতা ছিলেন, ইহা সম্ভব বলিয়া মনে হয়। ইহাদের অনেকে সংস্কৃতে গভীর বিদ্যা লাভ করিতে গিয়া দেখিয়াfছ:লন, এ দেশীয় পণ্ডিতগণ সে বিষয়ে অনভিজ্ঞ; তাহারো৷ স:মাঠ্য বাকরণের সূত্র, সাম্য হই-চ রিখানি কাব্য, নব্য স্থতির ইই চারিটী ব্যবস্থাও ন্যায়ের দুই চারিটী ফাকি হইয়া কা নাতিপত করিতে ছেন; প্রকৃত বিষ্ঠা ও প্রাচীন গ্রন্থাবলী দেশ হইতে বিলুপ্ত হইরা যাইতেছে। সেই জন্ত তাহারা পশ্চাতে থাকিয়া। গবৰ্ণর জেনেরালকে উত্তেজিত করিয়া ৷ তুলিয়াছিলেন। লর্ড মিন্টে। বাহাদুরের এই লিপি ও তঞ্জনিত স্বদেশ বিদেশে যে আন্দোলন উপ স্থত হয়, তাহার ফল এই হইল যে ১৮১৩ খ্রীষ্টাব্দে ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সনন্দ পত্র পুনঃ হণের সময় পালেমেন্টের ত্বরা পাইয়া, কোর্ট অব ডিরেক্টারসের সভ্যগণ ভারতবর্ষীয় গবৰ্ণমেন্টের প্রতি নিম্নলিখিত অ্যাদেশ প্রচার করিলেন;--

 That a sum of not less than a lac of Rupees, in each year, shall be set apart, aud applied to the revival and improvement of literature, and the encouragencnt of the learned nativ•s of India und for the introduction and pro • notion of a knowledge of the sciences among' the British territores of India.”

 অর্থাৎ—প্রত্যেক বৎসরে। অনান এক লক্ষ টাক। স্বতন্ত্র রাখিতে হইবে। তাহাঁ ভারতীয় প্রজাকুলের মধ্যে বিদ্যার উন্নতি ও পণ্ডিতগণের উৎসাহদান, ও ভারতবর্ষীয় ব্রিটিশ অ ধকারের মধ্যে জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রবর্তন ও উন্নতির জষ্ঠ্য ব্যবহৃত হইবে।

 ১৮১৪ খ্রীস্টাব হইতে ১৮২৩ ফল পান্ত কিছুই করা হয় নাই বলিলে অাৈক্তি হ্রয় না। ঐ বৎসরে, ১৪ই জুলাই, কদিচী জব পবলিক ই প্লকশন ( Committee of Public Instruction) নামে একটী কমিটি গঠিত হয়॥ ঐ কমিটীয় সভ্যগণ সেই এক বক্ষ টাকা প্রচীন সংস্কৃত ও আরবী গ্রন্থের মুদ্রাহ্মণ, পণ্ডিতদিগের বৃত্তি, ও সংস্কৃতশিক্ষার্থীদিগের বৃত্তি প্রভৃতিতে ব্যয় করিতে আরম্ভ করেন। তাহার বিশেষ বিবরণ পরে প্রদত্ত হইবে।

 ১৮১৪ সাল আর এক কারণে চিরস্মরণীয়। ঐ সালে মহাত্মা রাজা। রামমোহন রার বিষয়কৰ্ম্ম ত্যাগ করিয়া গাহার পৈতৃক সম্পত্তির উদ্ধার ও পরিরক্ষণের মানসে কলিকাতাতে আসিদ্মা বাস করিলেন; এব প্রধানরূপে ধর্ম ও সমাজ সংস্কারের কাৰ্য্যে ব্ৰতী হইলেন।

 রামমোহন রায় কলিকাতাতে প্রতিষ্ঠিত হইয়াই অপরাপর অভাবের মধ্যে ইংরাজী শিক্ষার অভাব অতিশয় অনুভব করিতে লাগিলেন। রামমোহন রায় কলিকাতাতে আসিলেই ডেবিড হেয়ারের সঙ্গে বন্ধুতা হইল। হেয়ার এদেশীয়দিগের মধ্যে ইংরাজীশিক্ষার অভাব বিষয়ে সর্বদা। চিন্তা করিতেন; এবং তাহার ঘড়ির দোকানে সমাগত ব্যক্তিদিগের সহিত সে বিষয়ে কথাবার্তা কহিতেন। রামমোহন রায়ের সহিত এ বিষয়ে প্তাহার সর্বদা কথোপকথন হইত। রামমোহন ধৰ্ম্ম বিষয়ে আলোচনা | করিবার জষ্ঠ্য। তাহার বস্তৃদিগকে লইয়া “আত্মীয় সভা” নামে যে সভা স্থাপন করিয়াছিলেন, ১৮১৬ সালে সেই সভার এক অধিবেশনে হেয়ার উপস্থিত ছিলেন। সেইদিন সভাভঙ্গ হওয়ার পর হেয়ার পুনরায় ইংরাজী শিক্ষার উপায় বিধানের প্রসঙ্গ উখাপন। করিলেন। কথোপকথনের পর স্থির হইল যে একটা ইংরাজী বিদ্যালয় স্থাপন করিবার চেষ্টা করা হইবে। সে সময়ে বৈদ্যনাথ মুখুযো নামক ইংরাজীশিক্ষিত একজন বাঙ্গালি ভদ্রলোক ছিলেন। তিনি পরবর্তীকাল-প্রসিদ্ধ হাইকোর্টের বিচারপতি অমুকুল মুখোপাধ্যায়ের পিতামহ। বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যার .সাত্মীয় সভার একজন সভা ছিলেন; এবং তাহার একটা। প্রধান কাজ এই ছিল যে তিনি সর্বদ পদস্থ ইংরাজদিগের ভবনে ভবনে। দেখা সাক্ষাৎ করিয়া বেড়াইতেন,। এবং সইরের, বিশেষতঃ দেশীয় বিভাগের, সকল সংবাদ দিতেন। অঞ্জুমান করা যান্ত্র, বৈঠ্যনাথ মুখুয্যেই হেয়ার ও রামমোহন মায়ের প্রস্তাবিত ইংরাজী বিভালয়ের সংবাদ তদানীন্তন মুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সার হাইড ইষ্ট (Sir Hyde East) মহোদম্নের নিকট উপস্থিত করিয়া থাকিবেন। তথন সার হাইড ইষ্ট মিজে ও বোধ হয় এ দেশীয়দিগের মধ্যে ইংরাজী শিক্ষার অভাব বিষয়ে চিন্তা করিতেছিরেন। সুতরাং বৈঙনাথের মুখে উক্ত প্রস্তাবের কথা শুনিবামাত্র তিনি অতীব উৎসাহিত হইয়া হেয়ার ও •রাম মোহন রায়কে ডাকিয়া পাঠাইলেন; এবং বৈদ্রনাথ মুখুয্যেকে কলিকাতার সন্ত্রাস্ত বাঙ্গালী ভদ্রলোকদিগের মনের ভাব জানিবার জন্ত নিয়োগ করিলেন। বৈদ্যনাথ যেখানে যেখানে যাইতে লাগিলেন,সকলেই মহা উৎসাহ প্রদর্শন করিতে লাগিলেন। তদনুসারে উক্ত ১৮১৬ সালের ১৪ই মে তারিখে সার হাইড ইষ্ট মহোদয়ের ভবনে সত্বরের বাঙ্গালি ভদ্রলোকদিগের একটী সভা হইল । তাহাতে একটা কালেজ স্থাপনের বিষয়ে অনেক আলোচনা হইল। সকলের উৎসাহাগ্নি যখন প্ৰজলিত, তখন হঠাৎ সংবাদ প্রচার হইল, যে রামমোহন রায় এই প্রস্তাবের মধ্যে আছেন, এবং তিনি প্রস্তাবিত কালেজ-কমিটীতে থাকিবেন । সে সময়ে সহরের হিন্দু ভদ্রলোকদিগের রামমোহন রায়ের প্রতি বিদ্বেষ-বুদ্ধি এমনি প্রবল ছিল যে এই সংবাদ প্রচার হইবামাত্ৰ সকলে বাকিয়া বসিলেন ; তবে এই কালেজের সহিত আমাদের কোনও সম্পর্ক থাকিবে না।” সার হাইড ইষ্ট মহা বিপদে পড়িয়া গেলেন। যে পুরুষদ্বয় এ বিষয়ে বিশেষ উৎসাহী, র্তাহাদের একজনকে কিরূপে পরিভ্যাগ করেন । তিনি নিরুপায় দেখিয়া ডেবিড হেয়ারকে ডাকিয়া পাঠাইলেন । হেয়ার র্তাহার বন্ধুকে বিলক্ষণ চিনিতেন। তিনি বলিলেন, “আপনি চিন্তা করিবেন না, রামমোহন রায় শুনিবামাত্র নিজেই কমিটী হইতে নিজের নাম তুলিয়া লইবেন।” তিনি যাহা ভাবিয়াছিলেন তাহাই ঘটিল। তিনি গিয়া রামমোহন রায়কে এই কথা বলিশামাত্র 'তিনি বলিলেন “সে কি কথা ! কমিটীতে আমার নাম থাকা কি এতই বড় কথা যে সেজন্য একটা ভাল কাজ নষ্ট করিতে হইবে ?” তিনি তৎক্ষণাৎ নিজের নাম তুলিয়া দিবার জন্ত সার হাইড ইষ্টকে পত্র লিখিলেন।

 ইহার পর উক্ত মাসের ২১শে তারিখে আবার এক সভা হইল, তাহাতে কালেজ স্থাপন করা স্থির হুইল ; এবং তদৰ্থ একটা কমিটী গঠন করা হইল। বৈদ্যনাথ মুখুয্যে ও লেফটেনেন্টু wife R (Lieutenant Irvine) at No son ইংরাজ উভয়ে উহার সম্পাদক হইলেন। কমিটীতে প্রথমে কুড়িজন এদেশীয় লোক ও দশজন ইংরাজ নিযুক্ত হইলেন । ১৮১৭ খ্ৰীষ্টাব্দের ২০শে জানুয়ারি গরাণহাট নামক স্থানে মহাবিদ্যালয় বা হিন্দু কালেজ খোলা হইল ।

 কেবল যে কলিকাতা সহরেই ইংরাজী শিক্ষা প্রবর্তিত করিবার জন্ত এইরূপ আয়োজন হইল তাহী নহে। এই সময়েই মফঃস্বলের নানা স্থানেও ইংরাজী শিক্ষার উপায়-বিধানের চেষ্টা হইতেছিল। গঙ্গাতীরবর্তী চুচুড়া সহরে রবার্ট মে (Robert May) নামক লণ্ডন মিশনারি সোসাইটভুক্ত একজন খ্ৰীষ্টীয় প্রচারক বাস করিতেন। তিনি ১৮১৪ সালে সেখানে একটা ইংরাজী স্কুল খোলেন। প্রথম দিন ১৬টী মাত্র বালক উপস্থিত হয়। কিন্তু ত্বরাপ্ত ছাত্র সংখ্যn বদ্ধিত হইতে লাগিল। অবশেষে হুগলীর কমিশনার মিষ্টর ফবস (Ir Forbes) ওলন্দাজদিগের পরিত্যক্ত পুরাতন , কেল্লাতে ভুলের জঠ । একটী প্রশস্ত ঘর দিলেন। । রেভরেও মে সেখানে স্কুল করিতে লাগিলেন। হুই এক বৎসরের মধ্যে আরও করেকটী শাখা স্কুল স্থাপিত হইয়া ঐ সকল স্কুলে প্রায় ৯৫১ জন বালক শিক্ষালাভ করিতে লাগিল। মিষ্টর ফর্বদ স্কুল গুলির উত্তরোত্তর উন্নতি দর্শনে প্রীত হইয়া গবৰ্ণমেন্টের নিকট হইতে মাসিক ৬০০ ছয় শত টাকা সাহায্য দে ওয়াইয়া দিলেন। রেভরেও মের চূচূড়ার। স্কুলগুলির উন্নতিদর্শনে উৎসাহিত হুইয়া বদ্ধমানের রাজা তেজচন্দ্র বাহাদুর আপনার প্রতিষ্ঠিত পাঠশালাটীকে ইংরাজী স্কুলে পরিণত করিলেন।

 ওদিকে শ্রীরামপুরে কেরী, মার্শম্যান প্রভৃতি মিশনারিগণ ইংরাজী শিক্ষার এই মহা-আন্দোলনের মধ্যে উদাসীন ছিলেন না। ১৮১৫ সালে তাহারাত্রীরামপুরে। তাহাদের সুপ্রসিদ্ধ কালেজের সূত্রপাত করিলেন । এতদ্ভিন্ন র্তাহারা রামমোহন। রায় ও দ্বারকানাথ ঠাকুরের সাহায্যে মান৷ স্থানে ইংরাজী স্কুল স্থাপন করিতে লাগিলেন। এরূপ জনশ্রুতি আছে যে রামমোহন রায় ধর্মবিহীন শিক্ষাকে বড় ভয় পাইতেন। । সেজ্য নব প্রতিষ্টিত হিল কালেজের ধর্মবিহীন শিক্ষাকে ভয়ের চক্ষে দেথিতেন। এ সম্বন্ধে একটী গল্প আছে। হিন্দুকালেজ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কিছুদিন পরে একজন আসিয়া তাহাকে বলিল —“দেওয়ানজি, অমুক আগে ছিল polytheist, তার পর হইয়াছিল liest, এখন হইয়াছে atheist. " রামমোহন রায় হাসিয়া বলিলেন,-“শেষে বোধ হয় হইবে best* । যাহা হউক তিনি মিশনারিদিগের ধর্মানুগত শিক্ষার পক্ষপাতী ছিলেন। সেই জন্ত ১৮৩ সালে আলেকজাণ্ডার ডফ আসিম্রা সাহায্য চাহিলেই তাহার স্কুল স্থাপনে বিশেষ সহায়ত৷ করিয়াছিলেন।

 এই সময়ে এদেশীয় ভদ্রলোকদিগের মধ্যে স্বীয় স্বীয় সস্তানদিগকে ইংরাজী শিক্ষা দিবার জন্য যথেষ্ট আগ্রহ দৃষ্ট হইয়াছিল । ১৮১৪ সালে, কাণীধামে জয়নারায়ণ ঘোষাল নানক একজন সম্রান্ত হিন্দু ভদ্রলোক মৃত্যুকালে লণ্ডন মিশনারি সোসাইটীর হস্তে ইংরাষ্ট্রী শিক্ষা বি স্তারের জন্ত বিংশতি সহস্র মুদ্রা দির। ঘান। . গবৰ্ণমেন্টকে ইংরাজী শিক্ষা দান বিষয়ে উদাসীন দেখিয়াই তিনি ঐ প্রকার করিরা পাকিবেন।

 এদেশে রাজপুরুষগণ অনেক সময়ে প্রজাবৃন্দের চিন্তারুচি, প্রবৃত্তি ও আকাঙ্ক বিষয়ে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ থাকিয়া কিরূপ দূরে দূরে বাস করেন তাহার অপরাপর প্রমাণের মধ্যে একট প্রমাণ এই যে, যখন দেশের সর্বত্র ইংরাজী শিক্ষার জন্ত এত আগ্রহ দৃষ্ট হইতে লাগিল, তখন গবর্ণর জেনেরাল ও তাঁহার গারিষদবর্গ কেবল প্রাচীন সংস্কৃত ও আরবী গ্রন্থের মুদ্রাঙ্কণ এবং নদীয় ও ত্রিহুতে সংস্কৃত কালেজ স্থাপনের প্রস্তাব লইয়া ব্যস্ত রহিলেন। নদীয়া ও জিহুতে সংস্কৃত কালেজ স্থাপিত হওয়া কৰ্ত্তব্য কি না, এই চিন্তা করিতে গিয়া তাহাদের বোধ হইল যে এতদূরে উক্ত কালেজদ্বয় স্থাপন করিলে তাঁহাদের পরিদর্শন, তত্ত্বাবধান ও উন্নতিবিধানাদি করিবার সুবিধা হইবে না। কাশীর কালেজ ও কলিকাতার মাদ্রাসা, এই উভয় বিদ্যালয়ের সমুচিত তত্ত্বাবধান করার কঠিনতাও কিয়ুৎপরিমাণে তাঁহাদের এই সংস্কারকে বলবান করিয়া থাকিবে। তখন তাঁহার কলিকাতাতে একটা সংস্কৃত কালেজ স্থাপনে কৃতসংকল্প হইলেন।

 ১৮২৩ সালে কমিটী অব পবলিক ইনষ্ট্রকৃশন নামে যে কমিটী স্থাপিত হয় তাহার প্রতি এই কালেজ স্থাপনের ভার অপিত হইল; এবং ১৮১৩ সাল হইতে যে বার্ষিক এক লক্ষ করিয়া টাকা জমিতেছিল তাহ। তাহীদের হস্তে অর্পিত হইল। তাঁহারা মহোৎসাহে সংস্কৃত কালেজ স্থাপন, ছাত্রদিগকে বৃত্তিদান, ও প্রাচীন সংস্কৃত ও আরবী গ্রন্থসকল মুদ্রাঙ্কণকার্যে অগ্রসর হইলেন। " এই সকল কার্য্যের জন্ত কিরূপ বায় হইতে লাগিল তাহার নিদর্শন স্বরূপ এই মাত্র বলিলেই যথেষ্ট হইবে, যে আরবী ‘আবিসেন্না’ নামক গ্রন্থ পুনমুদ্রিত করিতে প্রায় ২•,০০০ বিশ হাজার টাকা ব্যয় হইয়াছিল; এবং ছাত্রদিগের পাঠার্থ পারসী ভাষাতে যে সকল প্রাচীন গ্রন্থের অনুবাদ করা হইয়াছিল, হিসাব করিয়া দেখা গিয়াছে যে তাহার প্রত্যেক পৃষ্ঠাতে প্রায় ১৩ টাকা করিয়া ব্যয় পড়িয়াছিল। সেই সমুবাদিত গ্রন্থ সকল আবার ছাত্রেরা বুঝিতে অসমর্থ হওয়ার্তে তাঁহাদের ব্যাখ্যা করিবার জন্ত স্বয়ং অনুবাদককে মাসিক ৩•• তিন শত টাকা বেতন দিয়া রাখিতে হইয়াছিল। অপরদিকে মুদ্রিত ও অনুবাদিত গ্রন্থ সকল ক্রেতার অভাবে স্ত,পাকার হইয়া পড়িয়া রহিতে লাগিল। বহুকাল পরে কীটের মুণ হইতে যাহা বাচিল, তাহা কাগজের দরে বিক্রয় করিতে হইল। এই সকল কারণে অল্পকাল মধ্যেই কমিটীর সভ্যদিগের মধ্যে মতভেদ উপস্থিত হইল; তাহারা দুই-দল হইয়া পড়িলেন।

 ১৮২৩ সালে লর্ড আমহাষ্ট গবর্ণর জেনেরালের পদে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। রামমোহন রায় পূৰ্ব্ব হইতেই ইংরাজী সাহিত্য বিজ্ঞানাদি শিক্ষা দিবার বিষয়ে গবৰ্ণমেন্টের ঔদাসীন্ত দেথিয়। মনে মনে দুঃখিত ছিলেন। যখন দেখিহেন সে দিকে। মনোযোগী না হইয়া গবৰ্ণমেন্ট পূর্বোক্ত প্রকারে প্রাচীন বিখ্যার পুনরুদ্ধার কাৰ্য্যে প্রভূত অর্থ ব্যর। করিতে যাইতেছেন, তখন আর স্থির থাকিতে পারিলেন না। লর্ড আমহাপ্ত বাহাঙ্গরকে নিজের মনের ভাব। জানাইয়া একখানি পত্ৰ লিখিলেন। ঐ পত্রের শেষাংশ উদ্ধত করা যাইতেছে, দেখিলেই সকলে বুঝিতে পারিবেন যে শিক্ষা সম্বন্ধীয় যে সকল। উন্নত ভাব এখনও সম্পূর্ণরূপে এদেশীয়দিগের হৃদয়কে অধিকার করে নাই, এবং অল্পদিন হইল ইউরোপে প্রবল হইয়াছে, তাহ৷ সেই ক্ষণজন্মা যুগপ্রবর্তক মহাপুরুষ হৃদয়ে ধারণ করিয়াছিলেন।

 *If it had been intended to keep the British nation in ignorance of real knowledge, he Basoniaun philosophy w_uld not have been | allowed to displace the systen of the school mem. which was the best calculated to perpetuate ignorance. In the same naunor, the Sanskrit system of education wonld be the best calculated to keep this country in darkness, if su•h had boon whe policy of the British legislature. But as }he improvement of the natire population is the object of {overnment, it will conse|ently promote a nomy libera and ightoned system of interction. embracing Alathematics. Natural Philosophy, henistry, Anatomy, with other useful sinces, which may be accomplished with the sam pro|osch by employing a few gentlemen of talent and learning encated in Bhrope and providing a college furnishel with necessary books, instrgnents, and other apparatus.

 অর্থ—যদি ইংরাজ জাতিকে প্রকৃত জ্ঞান বিষয়ে অজ্ঞ রাধা উদ্দেশ্য হইত তাহা হইলে প্রাচীন স্কুলমেনদিগের অসার বিস্তার পরিবর্তে বেকনের প্রবর্তিত জ্ঞানকে প্রতিষ্টিত হইতে না দিলেই হইত, কারণ প্রাচীন জ্ঞানই অজ্ঞতাকে বাহাল রাখিত। সেইরূপ এদেশীরদিগকে অজ্ঞতার অন্ধকারে রাখা যদি গবৰ্ণমেন্টর আকাঙ্কা ও নীতি হয়, তাহা হইলে প্রাচীন সংস্কৃত ভাষাতে শিক্ষা দেওয়ার ত্যাগ তাহার উৎকৃষ্টতর উপায় আার নাই। তৎ পরিবর্ভে এদেশীরদিগের উন্নতিবিধান যখন গবৰ্ণমেন্টের লক্ষা, তখন শিক্ষা বিষয়ে উন্নত ও উদার রীতি অবলম্বন করা অবঠাক, যদ্দার অপরাপর বিধ য়ের সহিত, গণিত, জড় ও জীব বিজ্ঞান, রসারনতত্ত্ব, শারীরস্থান বিন্ধা অপরাপর প্রয়োজনীয় বিজ্ঞানাদির শিক্ষা দেওয়া যাইতে পারে। যে অর্থ এখন প্রস্তাবিত কাৰ্য্যে ব্যয় করিবার অভিপ্রায় করা হইয়াছে, তদ্দারা ইউরোপে শিক্ষিত কতিপয় প্রতিভাশালী ও জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিকে নিযুক্ত করিলে, ও ইংরাজী শিক্ষার জষ্ঠ্য একটী কালেজ স্থাপন করিলে, ও তৎসঙ্গে পুস্তকালয়, বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার যন্ত্রাদি, প্রয়োজনীয় পদার্থ সকল দিলেই পূর্বোক্ত উদ্দেপ্ত সিদ্ধ হইতে পারে।”

 সুবিখ্যাত বিশপ হিবার ( Bishop Hebor) এই পত্র লর্ড আমহাক্টের হন্তে অৰ্পণ করিয়াছিলেন। পত্রপানির প্রার্থনা পূর্ণ হইল না বটে, কিন্তু তাহার ফল স্বরূপ এই নিষ্কারণ হইল যে কলিকাতার মধ্যস্থলে যে সংস্কৃত কালেজ স্থাপিত হইবে, তাহার সঙ্গে পূর্ব-প্রতিষ্ঠিত মহাবিদ্যালয় বা হিন্দু কালেজের জন্য গৃহ নিৰ্ষিত হইবে। তদনুসারে ১৮২৪ সালের ২৫শে ফ্রেব্রুয়ারি সম্মিলিত কালেজ-গৃহদ্বয়ের ভিত্তি স্থাপিত হইল।

 এই সময়ে জার একটী পরিবর্তন ঘটে। হিন্দু কলেজের জ্য ইহার স্থাপনাকালে যে ১১৩১৭৯ টাকা মূলধন রূপে সংগৃহীত হয়, তাহ৷ জোসেফ বেরেটে নামক এক ইটালীদেশীয় সওদাগরের হস্তে ন্যস্ত ছিল। ১৮২৪ সালে বেরেটো কোম্পানি দেউলিয়া হইয়া যা ওয়াতে ঐ অর্থের অধিকাংশ নষ্ট হইয়া ২৩৫০০ টাকা মাত্র অবশিষ্ট থাকে। সুতরাং কালেজ কমিটী নিরুপায় চইয়। গবৰ্ণমেন্টের শরণiপন্ন হন॥ গবর্নমেন্ট সাহায্য দিতে প্রস্তুত হন, কিন্তু প্রস্তাব। করেন যে তাঁহাদের নিযুক্ত কোনও কচারীকে কালেজের। পরিদর্শকরূপে নিযুক্ত করিতে হইবে। তদনুসারে তঃানীন্তন কমিটী অব পবলিক ইনষ্ট্ৰকশনের সম্পাদক এইচ. এইচ উইলসন সাহেব প্রথম পরিদর্শক নিযুক্ত হন। গবৰ্ণমেন্ট প্রধমে মাসে ৯০০ শত টাকা, পরে ১৮৩০ খৃষ্টাক হুইতে ১২৫ • টাক্সা করিয়া সাহায্য দিতে থাকেন।

 "১৮২৮ সালে রামতনু লাহিড়ী মহাশয় স্কুল সোসাইনর স্কুল হইতে হিন্দ কালেজে আসিলেন। তখন এই নিয়ম ছিল, যে বর্ষে বর্ষে স্কুল সোসাইটির স্কুল হইতে অগ্রগণ্য ছাত্রেরা হিন্দু কালেজে আসিত। তাহাদের মধ্যে যাহাদের অবস্থা৷ মদ, তাহাদের বেতন স্কুল সোসাইট দিতেন॥ তাহারা অবৈতনিক ছাত্ররূপে হিন্দু কালেজে পাঠ করিত। ' লাহিড়ী মুকশিয় সেই শ্রেণীগণ্য ছাত্রহ্মপে "হিন্দুকালেজে আসিলেন। দিগম্বর মিত্রও সেই সঙ্গে আসিলেন।

তাঁহারা আাসিয়া চতুর্থ শ্রেণীতে ভর্তি হইলেন। এখানে যে সকল।
৮৭ পৃষ্ঠা

হেন্‌রী ভিভিয়ান্‌ ডিরোজিও।



By kind permission of Mr. J. P. Mitchell, Secratary of the Calcutta Historical Society. সহাধ্যায়ীর সহিত সম্মিলিত হইলেন, তন্মধ্যে রামগোপাল ঘোষ পরে স্ববিখ্যাত হইয়াছিলেন। রসিককৃষ্ণ মল্লিক, কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি তাহার পরবর্তী সময়ের যৌবনমুহৃদগণ তখন কেহ প্রথম শ্রেণীতে, কেহ দ্বিতীয় শ্রেণীতে, কেহ বা তৃতীয় শ্রেণীতে পাঠ করিতেছিলেন । হেনরী ভিভিয়ান ডিরোজিও (Henry Wivian Derozio) নামে একজন ফিরিঙ্গী যুবক, তখন ঐ শ্রেণীর শিক্ষক ছিলেন। বঙ্গের নবযুগ-প্রবর্তক এই অসাধারণ প্রতিভাশালী শিক্ষকের কিছু বিবরণ এখানেই দেওয়া আবশুক ।

হেনরী ভিভিয়ান ডিরোজিও ।

 ডিরোজিও ১৮০৯ খ্ৰীষ্টাব্দে কলিকাতা ইটালী পদ্মপুকুরের সন্নিহিত মামলালীর দরগা নামক এক ভবনে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি জাতিতে পোর্ভ গীজ বংশোৎপন্ন ফিরিঙ্গী। ইহার পিতা জে স্কট কোম্পানির সওদাগরী অফিসে একটা বড় কৰ্ম্ম করিতেন। ইহার আর দুই ভ্রাতা ও দুই ভগিনী ছিলেন। ডিরোজিওর পিতা স্বচ্ছল অবস্থাতে ফিরিঙ্গীসমাজে সন্ত্রমের সহিত বাস করিতেন । কিন্তু সে সময়ে ফিরিঙ্গসমাজের বালকগণ সংশিক্ষার অভাবে প্রায় বিপ্লত হইয়া উঠিত । ডিরোজিওর জ্যেষ্ঠ সহোদর ফ্রাঙ্ক কুসঙ্গে পড়িয়া বিপথে পদার্পণ করে ; এবং সকল কৰ্ম্মের বাহির হইয়া যায়। দ্বিতীয় ক্লডিয়ুসকে পিতা শিক্ষার্থ স্কটুলণ্ডে প্রেরণ করিয়াছিলেন। তাহার পরের সংবাদ জানি না। প্রথম ভগিনী সোফিয়। ১৭ বৎসর বয়সে গতাস্ক হন । সৰ্ব্বকনিষ্ঠা এমিলিয়া ডিরোজিওর প্রতি বিশেষ অমুরক্তা ও সকল বিষয়ে তাহার উৎসাহদায়িনী ছিলেন ।

 সে সময়ে ডেবিড ড্রমও নামে একজন স্কটুলগু দেশীয় লোক কলিকাতার ধৰ্ম্মতলাতে একটা স্কুল খুলিয়াছিলেন। এই ড্রমও সে সময়ের একজন বিখ্যাত ব্যক্তি ছিলেন। তাহার রচিত কবিতা সকল সে সময়ে অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছিল। তদ্ভিন্ন তিনি ইংরাজী সাহিত্য এবং দর্শনশাস্ত্রেও স্থপণ্ডিত ছিলেন। এরূপ শুনা যায় যে ধৰ্ম্মবিষয়ে আত্মীয় স্বজনের সহিত মতভেদ উপস্থিত হওয়াতে তিনি চিরদিনের মত জন্মভূমি পরিত্যাগ করিয়া এদেশে আসিয়াছিলেন । , যে স্বাধীন চিন্তার প্রভাবে ফরাসি বিপ্লবের অভু্যদয়, সেই স্বাধীন চিন্তা পূর্ণমাত্রায় তাহার , অন্তরে কার্য্য করিতেছিল। ড্রমও বিদ্যালয়ের দ্বার উদঘাটন করিলে কলিকাতাবাসী ইংরাজগণ , বলিতে লাগিলেন, সেখানে পড়িলে বালকগণ নাস্তিকতাতে বৰ্দ্ধিত হইবে। এই ভয়ে অনেকে শ্বীয় স্বীয় বালককে তাহার বিদ্যালয়ে প্রেরণ করিতেন না। ডিরোজিওর পিতামাতা সে ভয় করিয়ূেন না। বালক ডিরোজিও সেই স্কুলে ভৰ্ত্তি হইলেন।

 ড্রমণ্ডের প্রতিভার এক প্রকার জ্যোতি ছিল যাহাতে তিনি বালকদিগের চিত্তাকর্ষণ করিতে পারিতেন এবং স্বীয় হৃদয়ের ভাব তাহাদের হৃদয়ে ঢালিয়া দিতে, পারিতেন। তাঁহার সংস্রবে আসিয়া বালক ডিরোজিওর প্রতিভা ফুটিয়া উঠিল। চতুর্দশ বর্ষ বয়ঃক্রম কালে তিনি পাঠ সাঙ্গ করিয়া বাহির হইলেন। বাহির হইয়া কিছুদিন তাহার পিতার আফিসে কেরাণীগিরি কৰ্ম্মে নিযুক্ত থাকিলেন। তৎপরে কিছুদিন ভাগলপুরে তাহার এক মাসীর ভবনে বাস করেন। তাঁহার মাসী উইলসন নামক একজন নীলকর ইংরাজকে বিবাহ করিয়াছিলেন। ভাগলপুরে থাকিবার সময় বালক ডিরোজিও একাকী গঙ্গাতীরে বেড়াইতেন; এবং কবিতা রচনা করিতেন। তদ্ভিন্ন তাঁহার জ্ঞান-পৃহ এমনি প্রবল ছিল যে সেই অল্প বয়সে ইংরাজি সাহিত্য ও দর্শন সম্বন্ধীয় উৎকৃষ্ট উৎকৃষ্ট সমুদয় গ্রন্থাবলী আগ্রহের সহিত পাঠ করিতেন।

 সে সময়ে ডাক্তার গ্রান্ট ( Dr. Grant) নামে একজন ইংরাজ ইণ্ডিয়া গেজেট’ (India Gazette) নামে একখানি সংবাদ পত্র বাহির করিতেন। ঐ পত্রে ডিরোজিওর লিখিত কবিতা ও প্রবন্ধ সকল বাহির হইত। শুনিতে পাওয়া র্যায় সুবিধাত জৰ্ম্মান দার্শনিক ইমানুয়েল ক্যান্টের গ্রন্থ প্রকাশিত হইলে ডিরোজিও তাহার এক সমালোচনা বাহির করিয়াছিলেন, তাহা দেখিয়া সে সময়কার পণ্ডিতগণ বিক্ষিত হইয়। গিয়াছিলেন। তাহাতে এমন প্রখর ধীশক্তি ও স্বাধীন চিন্তার পরিচয় পাওয়া গিয়াছিল, যে সকলেই অনুভব করিয়াছিলেন যে লেখক, একজন সামান্ত ব্যক্তি নহেন। . ভাগলপুরে বাস কালে ডিরোজিও যে সকল কবিতা লিখিয়াছিলেন তন্মধ্যে Fakir of Jhungeera নামক কবিতাই সুপ্রসিদ্ধ। ভাগলপুরের সন্নিকটে নদীগর্ভস্থিত ঝঙ্গীরা নামক এক অঞ্জণ্যময় আশ্রমে এক ফকীর বাস করিতেন। তাঁহার আশ্রমকে উদ্দেশ করিয়াই ডিরোজিও উক্ত কবিতা রচনা করিয়াছিলেন। এই কবিতা প্রকাশিত হইলে, তদানীন্তন শিক্ষিত ইংরাজ ও বাঙ্গালি সমাজে ডিরোজিওর কবিত্ব-খ্যাতি প্রচার হইয়া গেল। ১৮২৮ খ্ৰীষ্টাব্দে ডিরোজিও তাহার কবিতাপুস্তক মুদ্রিত করিবার জন্য কলিকতাতে আসেন। সেই সময়ে হিন্দুকলেজে একটা শিক্ষকের পদ খালি হয়; স্কুল কমিটী সেই পদে ডিরোজিওকে নিযুক্ত করেন। ১৮২৮ সালের মার্চ মাসে তিনি ঐ পদে প্রতিষ্ঠিত হন।  ডিরোজিও চতুর্থ শ্রেণীর সাহিত্য ও ইতিহাসের শিক্ষক হইলেন বটে, কিন্তু চুম্বকে যেমন লৌহকে আকর্ষণ করে তৈমনি তিনিওঁ অপরাপর শ্রেণীর বালকদিগকে আকৃষ্ট করিলেন। তিনি স্কুলে পদার্পণ করিবামাত্র বালকগণ তাঁহার চারি দিকে ঘিরিত। তিনি তাহাদিগের সহিত কথা কহিতে ভালবাসিতেন। স্কুলের ছুটী হইয়া গেলেও অনেকক্ষণ বসিয়া তাহাদিগের পাঠে সাহায্য করিতেন; এবং নানা বিষয়ে তাহাদের সহিত কথোপকথন করিতেন। তাহার কথোপকথনের এই রীতি ছিল যে তিনি এক পক্ষ অবলম্বন করিয়া বালকদিগকে অপর পক্ষ অবলম্বন করিতে উৎসাহিত করিতেন; এবং স্বাধীন ভাবে তর্ক বিতর্ক করিতে দিতেন। এইরূপে বালকগণের স্বাধীন চিন্তা-শক্তি বিকাশ হুইতে লাগিল। তিনি কেবল স্কুলের ছুটীর পর বালকদিগের সহিত কথোপকথন করিয়া,তৃপ্ত হইতেন না: তাহাদিগকে আপনার বাড়ীতে যাইতে বলিতেন। সেখানে তাহাদিগের সহিত বয়স্ত তাবে মিশিতেন, নিজের জননী ও ভগিনী এমিলিয়ার সহিত তাহাদিগকে পরিচিত করিয়া দিতেন, এবং বিধিমতে আতিথ্য করিতেন। রামগোপাল ঘোষ, দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, মহেশচন্দ্র ঘোষ, প্রভৃতি কতিপয় বালক ডিরোজিওর ভবনে সৰ্ব্বদা গতায়াত করিত। এক দিনের ঘটনা লাহিড়ী মহাশয়ের মুখে শোনা গিয়াছে। একবার তিনি রামগোপাল ও দক্ষিণারঞ্জনের সঙ্গিত ডিরোজিওর ভবনে গিয়াছিলেন। সেখানে পূৰ্ব্বোক্ত দুই জমে তাহাকে চা খাইবার জন্য পীড়াপীড়ি করিয়া ধরিলেন। তিনি কুলীন ব্রাহ্মণের সন্তান ফিরিঙ্গীর বাড়ীতে চা খাইবেন, ইহা কি হইতে পারে? সুতরাং তিনি অস্বীকৃত হইলেন। দক্ষিণারঞ্জন অনুরোধ করিয়া সন্তুষ্ট না হইয়া বলপ্রয়োগ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তখন লাহিড়ী মহাশয় চীৎকার করিবার উপক্রম করাতে সে যাত্র রক্ষা পাইলেন। সকলে বুঝিতেই পারিতেছেন ডিরোজিওর ভবনে হিন্দুকলেজের অগ্রসর বালকদিগের হিন্দুসমাজ-নিষিদ্ধ গান ভোজনের অভ্যাস হইয়াছিল। &

 এই সময়কার আর একটা ঘটনা লাহিড়ী মহাশয় উল্লেখ করিয়াছেন। কেবল যে ডিরোজিওর ভবনে কলেজের বালকদিগের সন্মিলন হইত তাহা নহে। দক্ষিণারঞ্জনের উদ্যোগে .অপরাপর ইউৰোপীয়দিগের ভবনেও মধ্যে মধ্যে বালকদের নিমন্ত্রণ হইত। সে সময়ে হাবড়াতে রেভারেও হাউ (Rev. Hough) নামে একজন খ্ৰীষ্টীয় প্রচারক বাস করতেন। রামমোহন রায়ের বন্ধু আডামের সাহায্যে হাউ মহোদয়ের ভবনে এক দিন বালকদিগের সন্মিলন হয়। তাহার ক্যা, কুমারী হাউ, দক্ষিণারঞ্জনের প্ররোচনাতে লাহিড়ী মহাশয়কে এক গ্লাস শেরি পান করিতে দিলেন। দক্ষিণারঞ্জন আসিয়া কাণে কাণে বলিলেন, “ইংরাজ সমাজের এই নিয়ম যে ভদ্রমহিলারা কিছু আহার বা পান করিতে দিলে, তাহা আহার বা পান না করা অসভ্যতা, অতএব পান না কর, একধার ওষ্ঠাধরে স্পর্শ করা ও ”। লাহিড়ী মহাশয় অনিচ্ছাসত্ত্বে তাহাই করিলেন। এইরূপে কালেজের ছাত্ৰগণের মধ্যে সুরাপানের দ্বার উন্মুক্ত হইয়াছিল।

 কিরূপে প্রথম ইংরাজী-শিক্ষিত দলে সুরাপান প্রবেশ করিয়াছিল তাহার একটু ইতিবৃত্ত আছে। সে সময়ে মুরাপান করাকুসংস্কার ভঞ্জনের একটা প্রধান উপায়স্বরূপ ছিল। যিনি শাস্ত্র ও লোকাচারের বাধা অতিক্ৰম পূৰ্বক। প্রকাষ্ঠভাবে সুরাপান করিতে পারিতেন, তিনি সংস্কারকদলের মধ্যে অগ্রগণ্য ব্যক্তি বলিরা পরিগণিত হইতেন। স্বরং রাজা রামমোহন রায় পরোক্ষভাবে সুরাপান শিক্ষা বিষয়ে সহায়তা করিয়াছিলেন। তাহার এই নিম্নম ছিল যে তিনি রাত্রিকালে বন্ধুগণ সমভিব্যাহারে টেবিলে বসিয়া ইংরাজী রীতিতে থানা খাইতেন। ইহা হইতে এদেশীয় কোন কোনও ধনী পরিবারে রাত্রিকালে থানা খাইবার রীতি প্রবর্তিত হইয়াছিল। রাত্রিতে ভোজন করিবার সময় রামমোহন রায়ের। পরিমিতরূপে সুরাপান করিবার নিয়ম ছিল। তাহাকে কেহ কখনও পরিমিত সীমাকে লজঘন করিতে দেখে নাই। এ বিষয়ে তাহার প্রখর দৃষ্টি ছিল। এরূপ শোনা যায় একবার একজন শিষ্য কৌতুক দেখিবার নিমিত্ত প্রবঞ্চনা পূৰ্ব্বক প্তাহাকে একগ্লাস অধিক সুরা পান করাইয়াছিলেন বলিয়া তিনি ছয়মাস কাল তাহার মুথ দৰ্শন করেন নাই।

 রাজা বোধ হয় এ কথাটা চিন্ত! করিয়া দেখেন নাই যে, যাহা তাহার পক্ষে পরিমিত সীমার মধ্যে রক্ষা করা মুসাধ্য ছিল, তাহা অপরের পক্ষে সর্বনাশের কারণ হইতে পারে। পরবর্তী সময়ে ইহার ঘথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া গিয়াছে। এই সুরাপান নিবন্ধন আমরা অনেক ভাল ভাল লোক অকালে হারাইয়াছি। যাহা হউক, যে সময়ের কথা বলিতেছি সে সময়ে মুরাপান করা মুসংস্কারহীন সংস্কারকদিগের একটা প্রধান লক্ষণ হুইয়া, দাড়াইয়াছিল। ভক্তিভাজন রাজনারায়ণ বস্তু মহাশয়েয় মুখে শুনিরছি, যখন তিনি হিন্দুকালেজে। পাঠ করেন এবং তাহার বয়ঃক্রম ১৬১৭ বৎসরের অধিক হইবে না, তথনি তিনি। সুরাপান করিতে শিথিয়াছিলেন। তঁহার পিতা নন্দকিশোর বসু রামমোহন রায়ের একজন শিষ্য ছিলেন। নন্কিশোর বস্থ মহাশয় একদিন শুনিলেন যে তাঁহার পুত্র বন্ধুদের সঙ্গে মিশিয়া কখন কখনও অতিরিক্ত সুরাপান করে। তখন তিনি একদিন রাজনারায়ণ বাবুকে গোপনে ডাকিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন —“তুমি কি মদ খাও?” তিনি বলিলেন—“ই”। তখন, তাহার পিতা আলমারি খুলিয়া একটী বোতল ও একটা মদের গ্লাস বাহির করিলেন, এবং কিঞ্চিৎ স্বরা ঢালিয়া পুত্রকে পান করিতে দিলেন, এবং নিজে একটু পান করিলেন। বলিলেন—“ষখনি সুরাপান করিবে তখনি আমার সঙ্গে পান করিবে, অন্যত্র পান করিবে না।” তাহার সঙ্গে পান করিলে সন্তান সৰ্ব্বদ পরিমিত সীমার মধ্যেই থাকিবে, বোধ হয় এইরূপ চিন্তা করিয়াই ও প্রকার বলিয়া থাকিবেন। যাহা হউক, এতদ্বারা বুঝা যাইতেছে সে সময়কার সংস্কার পথে অগ্রসর ব্যক্তিগণ সুরাপানকে হীন চক্ষে দেখিতেন না। সুতরাং ডিরোজিওর শিষ্যগণ অপরাপর দিকে অগ্রসর হওয়ার দ্যায় সুরাপান বিষয়েও যে অগ্রসর হইয়াছিলেন, তাহা কিছুই আশ্চর্য্যের বিষয় নয়।

 ডিরোজিওর সংশ্রবে আসিয়া হিন্দু কলেজের ছাত্রগণের মনে মহা বিপ্লব ঘটতে লাগিল। তিনি তাহাদিগকে লইয়া একাডেমিক এসোসিএশন (Academic Association) নামে একটী সভা স্থাপন করিলেন। তিনি তাহার সভাপতিত্ব করিতেন, এবং তাহার শিষ্যদল প্রধান বক্তা হইত। এই সভা বঙ্গদেশের সামাজিক ইতিবৃত্তের একটা প্রধান ঘটনা। ইহার বিশেষ বিবরণ পর পরিচ্ছেদে দেওয়া যাইবে।

 কালেজের বালকগণের মধ্যে যে নব অগ্নি জুলিয়া উঠিল, যে নবজীবনের সঞ্চার হইল, তাহা নানাদিকে প্রকাশ পাইতে লাগিল। লাহিড়ী মহাশয় যখন তৃতীয় শ্রেণীতে উঠিলেন, তখমডিরোজিওর শিষ্যগণ একত্র হইয়া"Athenium" নামে এক মাসিক ইংরাজী পত্রিক বাহির করিলেস। প্রচলিত হিন্দুধৰ্ম্মকে আক্রমণ করা ইহার এক প্রধান কাজ ছিল। এই পত্রে মাধবচন্দ্র মল্লিক নামে একজন ছাত্র লিখিলেন—“If there is any thing that we hate from the bottom of our heart, it is Hindhism.”—“যদি হৃদয়ের অস্তস্তম তল হইতে কিছুকে ঘৃণা করি, তবে তাহ হিন্দুধৰ্ম্ম |” এরূপ শুনিতে পাওয়া যায়, હૈ পত্রিকার তুই সংখ্যা বাহির হইলেই ডাক্তার উইলসন তাহা বন্ধ করিয়া দিলেন।

 এই মাধবচন্দ্র মল্পিক পরে ডেপুটী কালেক্টর হইয়া কৃষ্ণনগরে গিয়াছিলেন। তাহার বিষয়ে কাৰ্ত্তিকেয় চন্দ্র রায় আত্ম-জীবনচরিতে এইরূপ লিথিয়াছেন : ‘কলিকাতা নিবাসী । মাধবচন্দ্র মল্লিক নামে হিন্দুকালেজের একজন মুশিক্ষিত ছাত্র এই জেলার ( নদীয়া জেলার ) ডেপুটী কালেক্টর হইঙ্গা আইসেন । রামতন্তু বাবুর সহিত তাঁহার বিশেষ বন্ধুতা থাকাতে, তিনি আমাদিগকে যথেষ্ট স্নেহ করিতেন, এবং অ্যাগরাও তাহাকে গুরুজনের ন্যায় জ্ঞান করিতাম। তিনি চাদড়কে নিজালয়ে স্ত্রপ্রসাদের স্কুল লইয়া গেলেন, এবং তাহার উন্নতিসাধনে বিশেষ যত্নবান হইলেন। । আর আমরা এখানকার যুবকবৃন্দ কুসংস্কার নিবারণের ও চরিত্রের সংশোধনের জন্ত যে উঠ্যোগ করিতেছিলাম, সে বিষয়ে বিস্তর সাহায্য করিতে লাগিলেন।

 পরে আবার বলিতেছেন;--

 “আমাদের দেশে বহুকাল হইতে । পান বিশেষ দোষাকর ও পাপ-জনক । বলিয়। কীর্তিত হইয়াছে; এবং মঠ্য পণ করিলে শরীর অপবিত্র হয়, এইরূপ বিশ্বাস এদেশস্থ লোকের মনে জন্মিয়াছে। কিন্তু আমাদের মনে এই স্থির হইল যে যখন এনন বুদ্ধিমান বিদ্বান ও সভ্যজাতীয়েরা ইহা অাদর । পূর্বক ব্যবহার করিতেছেন, তখন ইহা অহিত-জনক কখনই নহে । অতএব ইহা পান না করিলে, সভাতাই বা কিরূপে হইবে আর পূর্ব কুসংস্কারই বা কিরূপে । যাইবে ? হিস্কালেজের সুশিক্ষিত ছাত্ৰগণের মধ্যে যাহারা এদেশের সনাজ সংস্কার করিতে ব্ৰতী হইয়াছিলেন, তাহারা সকলেই সুরাপান করিতেন । পূর্বে বলিয়াছি, হিস্কালেজের সুশিক্ষিত মাধবচন্দ্র মল্লিক এথানে ডেপুটী কালেক্টর ছিলেন, এবং আমাদের প্রতি যথেষ্ট শ্নেহ করিতেন। আমরা চারি পাঁচ জন আত্মীয় কথন কথনও তাহার বাসায় আহারো সঙ্গে নৃত্ব নদিরা পান। করিতাম এবং বড়ই মুখী হইতাম” ।

 ইহাতেই 'সকলে অনুভব করিতে পারিবেন, এদেশের ভদ্রলোকের মধ্যে সুরাপানটা কি ভাবে প্রবেশ করিয়াছিল, এবং যাহারা প্রথমে এই পথের পণিক হন; তাহার৷ কি ভাবে সে পথে পদার্পণ করিয়াছিলেন। তাহারা ইহাকে কুসংস্কার-ভঙ্গন ও চরিত্রের উন্নতিসাধনের একটা প্রধান উপায় মনে করিতেন। ডিরোজিওর শিষ্যগণ এই ভাবেই ইহাকে অবলম্বন করেন।

 ক্রমে রামতনু লাহিড়ী মহাশয় প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত হইলেন। হিন্দু কালেজে পাঠকালে তিনি গ্যামপুকুরের বাসা পরিতাগ করিয়া পাথুরিয়াঘাটাতে, প্রসন্নকুমার ঠাকুরের বৈঠকখানার সন্নিকটে, আপনার জ্যেষ্ঠতাত ঠাকুরদাস লাহিড়ী মহাশয়ের প্রবাসভবনে গিয়া অবস্থিত হন। এই ঠাকুরদাস লাহিড়ী মহাশরের বিবরণ অগ্ৰে দিয়াছি। ইনি কলিকাতাতে নদীয় রাজের প্রতিনিধিরূপে বাস করিতেন। তখন লোকে হঁহাকে লাহিড়ী দেওয়ান বলিয়া ডাকিত। ইংরাজ কৰ্ম্মচারীদিগের সহিত নদীয় রাজের যে সমুদয় কারবার ছিল, তাহ ইনিই নিম্পন্ন করিতেন। ইনিও দেওরানদিগের বাড়ীতে বিবাহ করিরাছিলেন, স্বতরাং মাতার দিক দিয়া ইহঁর সহিত লাহিড়ী মহাশয়ের সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এখানে লাহিড়ী মহাশয় যে অধিককাল ছিলেন এরূপ বোধ হয় না; কারণ নিজে ভ্রাতৃদ্বয়কে লইয়া স্বতন্ত্র বাসা করিবার পূৰ্ব্বে তিনি স্বীয় জননীর মামাত ভাই হরিকুমার চৌধুরী মহাশয়ের ভবনে কিছুদি ছিলেন, এরূপ শুনিয়াছি।

 প্রথম শ্রেণীতে একবৎসর পাঠ করিয়া তিনি ছাত্রবৃত্তির প্রার্থী হইলেন। তৎকালে কৃতী ছাত্রদিগকে বিশেষ পরীক্ষা করিয়া বৃত্তি দেওয়া হইত। তিনি হেয়ারের নিকট বৃত্তি-প্রার্থী হইলে মহাত্মা হেয়ার তাহাকে কমিট অব পবলিক ইনষ্ট্রকৃশনের সেক্রেটারী ডাক্তার উইলসনের নিকট প্রেরণ করিলেন। ডাক্তার উইলসন সে সময়ে টাকশালের অধ্যক্ষ ছিলেন; এবং জেম্স্ প্রিন্সেপ নামে একজন সংস্কৃতজ্ঞ ইংরাজ তাহার সহকারী ছিলেন। ডাক্তার উইলসন প্রিন্সেপের উপরে রামতনু বাবুকে পরীক্ষা করিবার ভার অর্পণ করিলেন। প্রিন্সেপ পরীক্ষা করিয়া সন্তোষ প্রকাশ করিলে তিনি ১৬ টাকা রক্তি পাইলেন।

 বৃত্তি পাইয়াই তাহার মনে হইল যে রাধাবিলাস ও কালীচরণকে কলিকাতায় আনিয়া লেখা পড়া শিখাইতে হইবে। তদনুসারে কালেজের নিকটে স্বতন্ত্র বাসা করিয়া ভ্রাতৃদ্বয়কে কলিকাতায় আনিলেন। এখনকার সহিত তুলনায় তখন কলিকাতা বাসের ব্যয় স্বল্পই ছিল, তাহাতে সন্দেহ নাই; কিন্তু তাহা হইলেও ষোল টাকাতে তিন জনের বাস করিয়া থাকা বড় স্বসাধ্য ব্যাপার ছিল না। তাঁহার যে প্রকার ক্লেশে নি ধাত্র নির্মাহু করিতেন, শুনিলে এখনকার ছাত্রগণের কিছু জ্ঞানলাভ হইতে পারে। বাদাতে পাচক বা ভৃত্য ছিল না; ঘর ঝাড় দেওয়া, বাসন,মাজা, বাজার করা, কুটনা কোট, বাটনা বাট, রন্ধন করা প্রভৃতি সমুদয় কার্য আপনাদিগকেই নিৰ্ব্বাং করিতে হইত; প্রাতে ও রাত্রে দুইবার মাত্র আহার, মধ্যাহ্নে জল খাবারের পয়সা যুটিত না; কাহারও পায়ে জুতা ছিল না; সকলেই পাছকাহীন পদে স্কুলে যাইতেন। ইহার উপরে আবার এই সময় হইতে কেশব চন্দ্রের সাহায্য রহিত হইয়াছিল। কেন রহিত হইয়াছিল বলিতে পারি না; বোধ হয় কৃষ্ণনগরের বাড়ীতে বিবাহাদি দ্বারা পরিবার বৃদ্ধি। হওয়াতে ব্যয় বৃদ্ধি হইয়াছিল। লাহিড়ী মহাশয় বলিয়াছেন, যে তিনি এক এক সময়ে এরূপ অর্থকষ্টের মধ্যে পড়ি তেন যে ভাবিয়া কুল কিনারা পাইতেন না। একবার তাহার বন্ধু কৃষ্ণমোহন। বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিকট ৭৮ টাকা কক্ত করিলেন। তৎপরে একবার নিরু পায় হইয়া মহাত্মা হেক্সারের শরণাপন্ন হইতে হইল। হেয়ার, কাহাকেও বলি বেন না এই প্রতিজ্ঞা করাইয়া, তাহাকে কিছু অর্থ সাহায্য করিলেন। তিনি হেয়ারের জীবদ্দশাতে এ কথা কাহারও নিকট ব্যক্ত করেন নাই।

 এই হিন্কালেজের শিক্ষার সময়ের আর একটী স্মরণীয় ঘটনা আছে॥ এই সময়ে একবার তিনি বিষম ওলাউঠা রোগে আক্রান্ত হন। হেয়ার সংবাদ। পাইবামাত্র আসিয়া নিজেই তাহার চিকিৎসা করিতে প্রবৃত্ত হন। হেয়ারের নিকট নানাপ্রকার ঔষধ সর্বদাই থাকিত। একদিন হেয়ার সন্ধ্যার পর রোগীর সংবাদ না পাইয়া অধিক। রাত্রে লালদিঘীর নিকট হইতে হাটিয়াএক জঘন্ত্য, দুর্গন্ধময় গলির ভিতর রামতনু বাবুর বাসাতে আ.সয়া উপস্থিত হইলেন। প্রথমে বাসার লোকে তাহার কণ্ঠস্বর ও ইংরী ভাষা শুনিয়া মনে করিল, বুঝি কোনও মাতাল গোর। দ্বারে আঘাত করিতেছে, তাই দ্বার খুলিতে বিলম্ব করিতে লাগিল। হেয়ার তাহা বুঝিতে পারিয়া হিন্দীতে বলিলেন—“ডরো মত, হাম হেয়ার সাহেব হায়। তখন তাহার দ্বার খুলিল।

 হায় হায়! মানব-প্রেমিক হেয়ার এই বালকদিগকে যেরূপ ভালবাসিতেন, এবং তাহাদের জষ্ঠ্য যাহা করিতেন, পিতা মাতাও তাহার অধিক করে না।

 এই সময়েই ইহার অনুরূপ আর একটী ঘটনা ঘটে। একবার হিন্দু কালেজের একটি ছাত্র, চন্দ্রশেখর দেব, একদিন সন্ধ্যাকালে গ্রে সাহেবের ভবনে হেয়ারের সহিত সাক্ষাৎ করিতে গিয়াছিল। কথা কহিতে কহিতে সন্ধ্যা হইয়া . গেল। আবার মুষলধারাতে বৃষ্টি নামিল। হেয়ার বালক টীকে ছাড়িলেন না। নিজের মিঠাই ওয়ালার নিকট হইতে প্রচুর পত্রিমাণে মিঠাই খাওয়াইলেন; এবং নিজে ইত্যবসরে আহার করিয়া আইলেন॥ তৎপরে বৃষ্টি থামিলে বলিলেন;—"চল তোমাকে একটু জাগাইয়া দিয়া আসি, পথে গোরারা আছে তোমাকে একেলা যাইতে দিতে পারি না।! এই বলিয়া এক গাছি মোটা লাঠি। লইয়া চন্দ্রশেখরের সমভিবাহারী হইলেন। বহুবাজারের মোড়ে আসিয়া চন্দ্রশেখর বলিলেন—“আপনি আর আসিবেন না”; হেয়ার বলিলেন,—“না, চল মাধব দত্তের বাজারের নিকট দিয়া আসি।” আবার সঙ্গে সঙ্গে চলিলেন। কালেজের দীঘির কোণে আসিয়া বলিলেন—“আমি দাঁড়াইতেছি তুমি যাও।” চন্দ্রশেখর চলিয়া গেল। সে বালক তখন পটুয়াটোলা লেনে থাকিত। বালকটী আসিয়া দ্বার দিয়া বস্ত্র পরিবর্তন করিতেছে এমন সময়ে শোনা গেল কে দ্বারে আঘাত করিতেছে; লোকে দেখিল হেয়ার। হেয়ার জিজ্ঞাসা করিলেন,--Is Chunder in?” চন্দ্র কি পৌছিয়াছে?” হায় সে প্রেম কিরূপ যাহা এতদূর বালকটীর সঙ্গে আসিয়া ও তৃপ্ত হইতে পারে না, আবার ভাবে—ছেলেটা ঘরে পৌঁছিল কি না একবার দেখি।
 এই উদারচেতা সহৃদয় পুরুষের তত্ত্বাবধানে রামতনু হিন্দুকালেজে পড়িতে লাগিলেন।