রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ/চতুর্দশ পরিচ্ছেদ

চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ

 কৰ্ম্ম হইতে অবসৃত হইয়া কৃষ্ণনগরে বসবার পর ১৮৬৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহিড়ী মহাশয়ের জ্যেষ্ঠ কন্যা লীলাবতার বিবাহ হয়। ডাক্তার তারিণীচরণ ভাদুড়ী নামক একজন এসিষ্ট্যাণ্ট সার্জ্জনের সহিত এই বিবাহ হয়। দেশীয় প্রচলিত রীতি-অনুসারে এ বিবাহ হয় নাই। লাহিড়ী মহাশয় নিজে ঈশ্বর সাক্ষী করিয়া কন্যা সম্প্রদান করিয়াছিলেন; এবং লীলাবতী তখন বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন।

 এই বিবাহ মহাসমারোহপূর্ব্বক সম্পন্ন হইয়া ছিল। নবদ্বীপাধিপতি মহারাজ সতীশচন্দ্র প্রভৃতি কৃষ্ণনগরের প্রায় সমস্ত সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি বিবাহস্থলে উপস্থিত ছিলেন। তদ্ভিন্ন কালকাতা হইতে কেশবচন্দ্র সেন, প্রতাপচন্দ্র মজুমদার, জ্যোতিরিন্দ্ৰ নাথ ঠাকুর, কালীচরণ ঘোষ প্রভৃতি অনেক ভদ্রলোক নিমন্ত্রিত হইয়া গিয়াছিলেন। কৃষ্ণনগরের লোকে লাহড়ী মহাশয়কে এমনি ভালবাসিত যে কি ইংরাজ কি বাঙ্গালি, এই গার্হস্থ্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত হইতে সাহায্য করিতে কেহই ক্রটী করেন নাই। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ রায় পরিবারের ভ্রাতৃগণ বিশেষ উল্লেখ-যোগ্য। রায় বাহাদুর ষদুনাথ রায়, কুমারনাথ রায়, কৃষ্ণনাথ য়ায়, ও দেবেন্দ্রনাথ রায় প্রভৃতি ভ্রাতৃগণ সদাশয়তার জন্য কৃষ্ণনগরে প্রসিদ্ধ। ইঁহাদের আতিথ্য ও সৌজন্য যাহারা একবার ভোগ করিয়াছেন, তাহারা কখনই তাহা বিস্তৃত হইবেন না, যেখানেই সাহায্যের প্রয়োজন, সেইখানেই সাহায্য করা যখন এই পরিবারস্থ ব্যক্তিদিগের স্বভাব, তখন লাহিড়ী মহাশরের কন্যার বিবাহে যে ইহার সাহায্য করিত্বে অগ্রসর হইবেন, তাহাতে আর বিচিত্র কি। লাহিড়ী মহাশয়কে ইহারা চিরদিন পরমাত্মীয় ও অভিভাবকস্বরূপ ভাবিয়া আসিয়াছেন। সুতরাং লীলাবতীর বিবাহকে ইহারা আপন স্বর্গীয় যদুনাথ রায়বাহাদুর দের নিজের গৃহের কন্যার বিবাহ জ্ঞান করিয়া কয় ভাই বুক দিয়া পড়িয়াছিলেন। আহারাদির উত্তমরূপ বন্দোবস্ত করা, নিমন্ত্রিত ব্যক্তিদিগের সমুচিত অভ্যর্থনা করা, প্রভৃতি সকল কার্য্যের ভার ইহারাই গ্রহণ করিয়াছিলেন। কোনও দিকে কিছুরই অপ্রতুল হয় নাই।

 লাহিড়ী মহাশয়ের পারিবারিক অনুষ্ঠানের কথা বলিতে গেলেই দুইটী কথা স্মরণ হয়; এবং প্রকৃত সাধুতার কি অপূৰ্ব্ব আকর্ষণ তাহা মনে হইয়া চক্ষের জল রাখা যায় না। প্রথম, ক্লষ্ণনগরের আপামর সাধারণ সকল শ্রেণীর লোকের তাঁহার প্রতি যে শ্রদ্ধা ভক্তি দেখিয়াছি, তাহা কোনও দিন ভুলিবার নহে। একটি ঘটনা আমি নিজে প্রত্যক্ষ করিয়াছিলাম, তাহা বলিতেছি। আমি একবার কৃষ্ণনগরে গিয়াছিলাম; তখন লাহিড়ী মহাশয় কৃষ্ণনগরে ছিলেন। আমি তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিয়া আমার এক বন্ধুর বাড়িতে যাইতেছি, পথে কতকগুলি নিম্নশ্রেণীর মানুষ দেখিলাম। তখন সায়াহ্নকাল; বোধ হইল তাহারা বাজার করিয়া ঘরে ফিরিয়া যাইতেছে। আমি তাহাদের পশ্চাৎ পশ্চাৎ যাইতেছি। হঠাৎ আমার মনে হইল, রামতনু বাবুর প্রতি ইহাদের কিরূপ ভাব একবার দেখি। এই ভবিয়া পশ্চাৎ হইতে জিজ্ঞাস করলাম "হে বাপু, তোমরা কি কৃষ্ণনগরের লোক?”

 উত্তর। আজ্ঞে, কৃষ্ণনগরেরই বলতে হবে, পাশের গ্রামের।

 প্রশ্ন। তোমরা কি রামতনু লাহিড়ীকে জান?

 উত্তর। কে? আমাদের বুড়ো লাহিড়ী বাবু? তাকে কে না জানে?

 প্রশ্ন। কেমন মানুষ?

 উত্তর। তিনি কি মানুষ? তিনি দেবতা।

 প্রশ্ন। সে কি হে! পৈতে ফেলা লোক, হাঁস মুরগী খান, দেবতা কেমন?

 অমনি মানুষগুলি ফিরিয়া দাঁড়াইল। "কে গা মশাই, আপনি বোধ হয় এদেশের মানুষ নন।”

 “না বাপু, আমি এদেশের মানুষ নই।"

 উত্তর। ও তাইতে, আপনি যে সব বলেন ও সব করা অন্যের পক্ষে দোষ, ওঁর পক্ষে দোষ নয়, উনি যা করেন তাই শোভা পায়।

 আমি একেবারে অবাক হইয়া গেলাম। পরে কতলোকের নিকট এই গল্প করিয়াছি।  বৃদ্ধ লাহিড়ী মহাশয়ের প্রতি কৃষ্ণনগরের সাধারণ লোকের যখন এই ভাব ছিল, তখন ভদ্রলোকদের কি ভাব ছিল, তাহা সকলেই অনুমান করিতে পারেন। সুতরাং সকল শ্রেণীর লোকেই তাঁহার কন্যার বিবাহে পরমানন্দিত হইয়াছিলেন, তাহাতে সন্দেহ নাই।

 তৎপরে দ্বিতীয় স্মরণ রাখিবার যোগ্য কথা, লাহিড়ী মহাশয়ের ছাত্রগণের তাহার প্রতি শ্রদ্ধা ভক্তি। ইহা স্মরণ করিলেও মন মুগ্ধ হয়। তিনি পেন্‌সন লইয়া কৰ্ম্ম হইতে অবসৃত হইয়া বসিলে এই গুরুভক্তির উজ্জ্বল প্রমাণ প্রাপ্ত হওয়া গেল। ইহা বলিতে কিছুই লজ্জা বোধ করিতেছি না, বরং আনন্দিত হইতেছি, তাঁহার পুরাতন ছাত্রগণের মধ্যে কেহ কেহ এই সময় হইতে ঠিক পুত্রের কাজ করিতে আরম্ভ করিলেন। তন্মধ্যে খ্যাতনামা স্বৰ্গীয় কালীচরণ ঘোষ মহাশয় সৰ্ব্বাগ্রগণ্য ছিলেন। ইনি নিজ গুরুর জন্য যাহা করিয়াছেন তাহার কিঞ্চিৎ উল্লেখ পরে করিব। অপরাপর অনুগত ছাত্রের মধ্যে অনেকে এখনও জীবিত আছেন। ইহার এখনও লাহিড়ী মহাশয়ের পরিবার পরিজনের পার্শ্বে দণ্ডায়মান আছেন; এবং সৰ্ব্ববিধ অবস্থায় উপদেশ, পরামর্শ, সাহায্যাদি দ্বারা জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার কার্য্য করিতেছেন। সুপ্রসিদ্ধ রাজা প্যারীমোহন মুখোপাধ্যায় এই শ্রেণীগণ্য। ইনি পৃষ্ঠপোষক না হইলে শরৎকুমার নিজ ব্যবসাতে যে পরিমাণে উন্নতি করিয়াছেন তাহা করিতে পারিতেন না। বালী উত্তরপাড়া স্কুলে লাহিড়ী মহাশয়ের যে স্মৃতিফলক রহিয়াছে, তাহা প্রধানতঃ ইহার গুরুভক্তির নিদর্শন। ধন্য গুরু! যাহাকে একবার দেখিয়া জীবনে ভোলা যায় না। ধন্য ছাত্র! যাহারা আমরণ গুরুকে হৃদয়ের উচ্চতম স্থানে রাখিয়া পূজা করিতে পারেন। গুরুশিষ্যের সম্বন্ধ বর্ত্তমান সময়ে যাহা দাঁড়াইতেছে তাহা স্মরণ করিয়া এই ছবির প্রতি দৃষ্টিপাত করিতেও মুখ হয়। এই সফল ছাত্রের কথা ভাবিলেও আনন্দ হয়।

 লাহিড়ী মহাশয়কে ও তাঁহায় পরিবার পরিজনকে ইহারা যে ভাবে পরিচৰ্য্যা করিয়া আসিয়াছেন, তাহার বর্ণনা হয় না। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় ছাত্র না হইয়াও বন্ধুতা ও প্রীতিসূত্রে লাহিড়ী মহাশয়কে এমনি প্রীতি ও শ্রদ্ধা করিতেন যে তাঁহার কোনও প্রকার অভাব জানিলেই সাহায্য দানে মুক্ত হস্ত ছিলেন।

 ১৮৬৯ সালের আগষ্ট মাসে লীলাবতী পুত্রের মুখ দর্শন করিলেন। অন্নপ্রাশনের সময় এই পুত্রের নাম চারুচন্দ্র রাখা হয়। সে সময়েও কৃষ্ণনগরের রাজা প্যারিমোহন মুখোপাধ্যায়, সি, এস্, আই। সকল শ্রেণীর লোককে নিমন্ত্ৰণ করিয়া অন্নপ্রাশন ক্রিয়াসমারোহের সহিত সম্পন্ন করা হইরাছিল।

 সে সময়ে কিছুদিনের জন্ত লাহিড়ী মহাশয় গোবরডাঙ্গার প্রসিদ্ধ ধনী পরিবার, মুখুয্যে বাবুদের, বাড়ীতে নাবালক পুত্ৰগণের অভিভাবকতা কার্য্যে নিযুক্ত ছিলেন। তাঁহার চরিত্রের খ্যাতি দেশমধ্যে এরূপ ব্যাপ্ত ছিল, যে অভিভাবক কাহাকে করা যাইবে, এই প্রশ্ন উঠিলে গবৰ্ণমেণ্টের পরামর্শক্রমে তাহাকেই নিযুক্ত করা হইয়াছিল। তিনি তদুপলক্ষে কিছুদিন গোবরডাঙ্গাতে বাণ করিয়াছিলেন। তিনি যেখানেই গিয়াছেন সেই খানেই আপনার স্কৃতি রাখিয় আঁসিয়াছেন। সুতরাং গোবরডাঙ্গাতেও যে নিজের স্মৃতি রাখিয়াছেন তাহ বলা বাহুল্য মাত্র। তাহার প্রমাণ স্বরূপ খাটুরা ব্রাহ্মসমাজের মুদিত বিবরণ হইতে নিম্নলিখিত কয়েক পক্তি উদ্ধৃত করিতেছি —

 “কৃষ্ণনগর নিবাসী স্বপ্রসিদ্ধ বাবু রামতনু লাহিড়ী, লেপ্টনাণ্ট গবর্ণর কর্তৃক গোবরডাঙ্গার নাবালক জমিদারগণের অভিভাবক নিযুক্ত হন। তাঁহার গোবরডাঙ্গায় অবস্থিতি, কালে তিনি সৰ্ব্বদা খাটুৱা-দত্তবাটীর ব্রাহ্মবন্ধুর সহিত সৰ্ব্ব-বিষয়ে যোগদান করিয়া যথেষ্ট উৎসাহ প্রদান করেন। একজন বিজ্ঞ প্রাচীন সন্ত্রান্ত লোক, চিয় প্রচলিত জাতি, কুসংস্কার প্রভৃতি অগ্রাহ করিয়া, যুবক ব্রান্ধের সহিত সকল বিষয়ে যোগদান করিতেছেন, ইহা পল্লীগ্রামের মধ্যে একটা সম্পূর্ণ নূতন ব্যাপার। তাঁহার এরূপ কাৰ্য্য দেখিয়া লোকে আশ্চৰ্য্যান্বিত হইত; কিন্তু তাঁহার প্রতি শ্রদ্ধাবশতঃ নিন্দ-স্বচক কোন কথা কেহ ব্যক্ত করিত না। যেরূপ লোক কখনও উপাসনায় যোগ দেন নাই, তাঁহার আহবানে এমন ব্যক্তিও সে সময়ে উপাসনায় যোগ দিয়াছেন। প্রাচীন সংস্কারাপন্ন যে সকল হিন্দুদিগের ব্রাহ্মদিগের সহিত বিচ্ছিন্ন ভাব ছিল, তিনি সেই সকল সন্ত্রান্ত হিন্দুদিগের প্রত্যেকের বাটতে গিয়া উদারভাবে মিশিয়া তাঁহাদিগের সদ্ভাব আকর্ষণ করিয়াছিলেন। তাহার অবস্থিতিতে এই প্রকারে যথেষ্ট উপকার হইরাছিল।”

 ১৮৬৯ সালে কলিকাতা সহরে লাহিড়ী মুহাশয়ের ভ্রাতুষ্পপুত্ৰী, পরলোকগত দ্বারকানাথ লাহিড়ী মহাশয়ের জ্যেষ্ঠ কন্যা, অন্নদায়িনীর বিবাহ ব্ৰাহ্মপদ্ধতিঅনুসারে সম্পন্ন হয়। অগ্ৰেই স্বশিরছি দ্বারকানাথ লাহিড়ী উত্তরকালে খ্ৰীষ্টীয় ধৰ্ম্মে দীক্ষিত হন। কিন্তু তাহার গৃহিণী বা কন্যাগণকে খ্ৰীষ্টীয় ধৰ্ম্মে দীক্ষিত করিবার পূৰ্ব্বেই তিনি এলোক হইতে অবস্বর্ত হন। পিতার মৃত্যুর পর তাহার হই কঠা অন্নদায়িনী ও রাধারাণী কলিকাতাতে আনীত হন ; এবং লাহিড়ী মহাশয়ের অভিভাবকতার অধীনে রক্ষিতা হন। ভূতরাং লাহিড়ী। মহাশয়, কঠাকওঁ হইয়া এই বিবাহক্রিয়া সম্পন্ন করেন। কলিকাতা নিবাসী সুপরিচিত ব্রাহ্ম হরগোপাল সরকারের সহিত অন্নদায়িনীর বিবাহ হর। এই সময় হইতে ব্রহ্মদিগের সহিত ও ব্রাহ্মসমাজের সহিত লাহিড়ী মহাশয়ের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠ বইতে আরম্ভ হয় । ১৮৬৯ সাল হইতে তিনি মধ্যে মধ্যে কঞ্চনগর হইতে কলিকাতাতে আসিতেন ; এবং প্রায় প্তাহার ভ্রাতুস্ত্রীদিগের গৃহে বাস । করিতেন। । সেই সম্পর্কে উন্নতিশীল ব্রাহ্মদলের সহিত তাহার আলাপ ও আত্মীয়তা বদ্ধিত হইতে থাকে। এই সময়ে আমিও তাহার সহিত পরিচিত হই। আমার বেশ স্মরণ আছে, যখন তিনি নব ব্ৰহ্মাদলকে দেখিলেন, তখন আননিত হইয়া সর্বদবলিতেন, ‘হাৱ! রসিককৃষ্ণ ও রামগোপাল । যদি এখন খাকিতেন, তাহা হইলে একবার এই যুব কদিগকে লাইয়া দেখাইয়া বলিতাম, “দেখ তোমরা দেশে যেরূপ অগ্রসর দল দেথিবীর জ্য প্রার্থনা করিয়াছিলে, সেরূপ দল দেখা দিয়াছে”।

 এই সময়ের কয়েক দিনের কয়েকটী ঘটনা আমার স্মৃতিতে আছে। প্রথম, অন্নদায়িনীর বিবাহের নিমন্ত্রণ পত্র যখন বাহির হয়, তখন তিনি। আমাদিগকে ঊাহার বন্ধুবান্ধবের একটী তালিকা প্রস্তুত করিতে বলিলেন। তাহার বন্ধু বান্ধব সকল শ্রেণীর মধ্যেই ছিলেন, এবং আমরা তাহাদের অনেকের নাম জানিতাম, সুতরাং আমরা একটা তালিকা প্রস্তুত করি লাম। পাঠ করিয়া তিনি তাহাতে অনেক নাম যোগ করিয়া দিলেন। কিছ কলিকাতার একজন প্রসিদ্ধ পদস্থ লোকের নাম আমাদের কৃত 'তালিকা হইতে কাটিয়া দিলেন। আমরা বিস্ময়াবিষ্ট হইয়া গেলাম। কারণ । উক্ত ভদ্রলোকটীর সহিত যে তাহার বিশেষ অাত্মীয়তা ‘আছে, তাহা আমরা মানিতাম। এমন কি প্রায় প্রতিদিন তাহার বাড়ীতে যাইতেন ; এবং সেখানে চা প্রভৃতি গাইতেন। নিমন্ত্ৰিত । ব্যক্তিদিগের তালিকা হইতে তাহার নাম তুলিয়া দেওয়াতে আমরা আশ্চৰ্য্য বোধ করিলাম। কারণ জিজ্ঞাসা করাতে আমাদিগকে কিছু ভাঙ্গিয়া বলিলেন না । এই মাত্র বলিলেন –"তোমাদের শুনিয়া কাজ নাই, আমি ওঁকে নিমন্ত্রণ করকে! না।” পরে পরম্পরাতে জানিতে পারিলাম, সেই ভদ্রলোকটী মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের ক্যার ৰিবাহে নিমন্ত্রিত হইয়া গিয়া ৰহ্মোপাসনা-কালে পার্থের ঘরে বসিয়া তামাক খাইয়াছিলেন এবং হাসিয়াছিলেন বলিয়া বর্জিত হইলেন। লাহিড়ী মহাশয় আমাদিগকে বর্জনের কারণ কোনও ক্রমেই বলিলেন না; কিন্তু শুনিলাম, সেই ভদ্রলোককে তাহ বলিয়াছিলেন। তিনি না কি কঁহাকে বলিয়াছিলেন—“তুমি এমনি হালকা লোক যে, যে ব্যক্তি তোমাকে বন্ধুভাবে ডাকিয়াছে, এবং তাহার জীবনের সর্বাপেক্ষা পবিত্র কাজ যাহাকে মনে করে তাহা করিতেছে, তুমি সে সময় টুকুর জন্যও গাম্ভীৰ্য্য, রাখিতে পুরিলে না! আমার ভাইবীর বিবাহে ঈশ্বরের নাম হুইবে আমি তোমাকে কিরূপে ডাকি?”

 বাস্তবিক “ঈশ্বরের নাম বৃথা লইও না”—এই উপদেশ তিনি এমনি পালন করিতেন, যে যেমন তেমন অবস্থাতে ঈশ্বরের নাম শুনিতে চাহিতেন না। একবার একজন বন্ধু একজন সুগায়ককে তাহার সহিত পরিচিত করিবার জন্ত আনিলেন। লাহিড়ী মহাশয় তখন চা খাইতেছিলেন। নবাগত ব্যক্তিটা উৎকৃষ্ট ব্রহ্মসংগীত করিতে পারেন শুনিয়া তিনি অতিশয় প্রীত হইলেন। বলিলেন “আমাকে একটা গান শোনাতে হবে।” যেই এই কথা বলা, অমনি গায়ক মহাশয় গুন গুন করিয়া স্বর ভজিত্বে প্রবৃত্ত হইলেন। ইহা দেখিয়া লাহিড়ী মহাশয় একেবারে অস্থির হইয়া উঠিলেন। বলিলেন—“মহাশয়! একটু বিলম্ব করুন, আমি যে 'ভগবানের নামু শুনিবার অবস্থাতে নাই।” এই বলিয়া চার সরঞ্জামগুলি সরাইয়া লইতে আদেশ করিলেন। তৎপরে চাদরধানি পাড়িয়া গুলে দিয়া গলবস্ত্র হইয়া বলিলেন,— “এখন গান করুন”। ঈশ্বরের নামে সে ভক্তি, সে হৃদয়ের আগ্রহ কি আর দেখিব! একদিনের কথা আর ভুলিব না। সেদিন প্রত্যুষে তিনি আমাকে অনুরোধ করিলেন যে স্বৰ্য্যোদয়ের পূৰ্ব্বে সকলকে লইয় ਾਂ তগবানের নাম করিতে হইবে। তাছাই করা গেল। আমরা চক্ষু খুলিয়া দেৰি, তিনি কখন উঠিয়া দাড়াইয়াছেন; গলবস্ত্র হইয়া চাদরখানি দুই ইস্তুের মধ্যে ধরিয়া আছেন; আর খেজুর গাছের নলি দিয়া যেরূপ রস পড়ে, তেমনি সেই শ্বেতবর্ণ শ্বশ্ৰু দিয়া টপ টপ করিয়া অশ্রু ঝরিতেছে। সমুদয় মুখখানি প্রেমের জাভাতে উজ্জ্বল। আমার যেন হঠাৎ মনে হইল, ছদ ভেদ করিয়া উপরকার কোনও লোক কুইতে কোনও উন্নত জগতের একটা জীবকে নামাইয়া দিয়াছে। আমি অনিমেষ-নয়নে সেই প্রেমেজ্জল মুখের দিকে চাহিয়া রছিলাম। যেদিন সে দৃপ্ত দেখিয়াছি তাঁহা, চিরদিন স্থতুিতে থাকিবে। এমন মাহুৰ কি ঈশ্বরোপাসনার সময় তালঘু দেখিলে মার্জন করিতে পারেন?  বন্ধুকে বর্জনের কারণ যে আমাদের নিকট কোনও প্রকারেই বলিলেন ন, তাহার মধ্যেও একটু কথা আছে। এ সম্বন্ধে তাহার নিয়ম এই ছিল যে, ষে কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে তাহার যাহা কিছু বলিবার থাকিত, তাহ সহজে সে ব্যক্তির অসাক্ষাতে অপরকে বলিতেন না। তাহার সম্মুখে তাহাকে বলিতেন, তাহাতে ফলাফল কিছুই গণনা করিতেন না। এজন্ত র্তাহার পরিচিত আত্মীয়দিগের মধ্যে কেহ কিছু অন্তঃস্থ করিলে র্তাহাকে অতিশয় ডরাইতেন। কারণ, তিনি বলিবার সময় কিছুই মনের ভাব গোপন করিতেন না।

 আর এক দিনের কথা স্মরণ আছে। একদিন প্রাতে লাহিড়ী মহাশয়ের সহিত গঙ্গার ধারে বেড়াইতে গিয়াছিলাম। ঘরে ফিরিবার সময়ে পথে তিনি বললেন—“একজন সাধু পুরুষকে দেখে আজকার দিনট-সার্থক করবে ?” আমি বলিলাম—“এর চেয়ে মুখের বিষয় আর কি আছে ?” তখন তিনি আমাকে একজন খ্ৰীষ্টীয় পাদরীর নিকট লইয়া গেলেন। সেখানে উপস্থিত হইয়া যে ভাবে তাহাকে আলিঙ্গন করিলেন, ও তাহার প্রতি যে প্রীতি ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করিলেন, তাহ দেখিয়া আমি মুগ্ধ হইয়া গেলাম। ফলতঃ লাহিড়ী মহাশয় যেখানেই অকৃত্রিম সাধুতা দেখিতেন সেইখানেই অকপটে আপনার প্রীতি ও শ্রদ্ধা দিতেন। র্তাহার কাছে হিন্দু, মুসলমান, খ্ৰীষ্টীয়ান বিচার ছিল না। অনেক দিন এরূপ হইয়াছে, তিনি কৃষ্ণনগর হইতে সহরে আসিয়াছেন, শুনিয়া আমরা তাহার অন্বেষণে বাহির হইলাম, গিয়া দেখি তিনি বাবু শু্যামাচরণ বিশ্বাসের বাড়ী দুই দিন রহিয়াছেন, অথবা কালীচরণ ঘোষের বাড়ীতে আছেন, অথবা কোনও খ্ৰীষ্টীয় বন্ধুর অতিথি হইয়। রহিয়াছেন। সৰ্ব্বশ্রেণীর, সৰ্ব্বসম্প্রদায়ের, মধ্যে র্তাহার বন্ধু ছিল ; সকল শ্রেণীর লোককেই তিনি ভালবাসিতেন । এই তাহার চরিত্রের আর একটা গুণ, যাহা দেখিয়া আমরা বড়ই মুগ্ধ হইতাম ।

 ১২৭৭ বঙ্গাব্দ (১৮৭৭ - ৩রা আষাঢ় দিবসে কৃষ্ণনগরে তাহার তৃতীয় পুত্র বিনয়কুমারের জন্ম হয় । তৎপুৰ্ব্বে ১৮৬৬ সালে আর একটী পুত্র সন্তান জন্মিয় অল্প বয়সেই ভাগলপুরে অবস্থিতিকালে গতামু হয়।

 ১৮৭২ সালে যখন উন্নতিশীল ব্রাহ্মদলে স্ত্রী-স্বাধীনতার আন্দোলন উপস্থিত হইল, তখন লাহিড়ী মহাশয় স্ত্রী-স্বাধীনতঃপক্ষীয়দিগের প্রতি ৰিশেষ অনুরাগ প্রদর্শন করিতে লাগিলেন। এই স্থত্রে হাইকোর্টের ভূতপূৰ্ব্ব বিচারপতি Sir J. B. Phear ঙ তাহার গৃহিণীর সহিত র্তাহার আলাপ পরিচয় ও আত্মীয়তা জন্মে। স্ত্রী-স্বাধীনতাদলের অগ্রণী হইয়া একুবার তিনি স্বীয় ভ্রাতুপুত্ৰাদিগকে লইয়। টাউন হলে কেশববাবুর বক্তৃতা শুনিতে গেলেন ; এবং তাহাদিগকে প্রকাশু স্থানে বসাইলেন । ইহাতে র্তাহার প্রাচীন বন্ধু প্যারীচাঁদ মিত্র তাহাকে তামাসা করিয়া বলিলেন—“কি হে রামতঃ ! বুড়ো বয়সে শিং ভেঙ্গে বাছুরের দলে মিশলে নাকি ?” লাহিড়ী মহাশয় টাউনহল হইতে আসিয়া আমাকে বলিলেন—“প্যারীর বোধ হয় ইচ্ছা ছিল মেয়েদের সঙ্গে পরিচিত হয়, কিন্তু ওরা হালকা লোক, আমি মেয়েদের ত্রিসীমায় আসত্যুে দিলাম ন৷ ” ইহাতেই সকলে বুঝিবেন তিনি অত্যগ্রসর হইয়াও আদব কায়দার প্রতি কিরূপ দৃষ্টি রাখিতেন।

 তৎপরে স্ত্রীস্বাধীনতা পক্ষীরগণ “হিন্দু মহিলা বিদ্যালর” নামে যে বিদ্যালয় স্থাপন করিলেন, তিনি আপনার দ্বিতীয়া কন্যা ইন্দুমতীকে সেই স্কুলে দিলেন। নারী জাতির প্রতি লাহিড়ী মহাশয়ের বিশেষ প্রতি ৪ শ্রদ্ধা ছিল। নারীগণের মধ্যে শিক্ষা-বিস্তারের জন্ত তিনি সৰ্ব্বদ। র্যগ্র ছিলেন । তিনি কলিকাতাতে আসিয়া আমাদের যে পরিবারের অতিথিরূপে বাস করিতেন, সে পরিবারের মহিলাগণের আনন্দের সীমা থাকিত না । কারণ, তাহার এই নিয়ম ছিল যে আহারাস্তে কিছুকাল বিশ্রামের পর, ছপর বেল পরিবারস্থ নারীগণকে এক ঘরে একত্র করিতন ; দানা প্রসঙ্গ উপস্থিত করির মুখে মুখে তাহাদিগকে অনেক ভাল ভাল বিষয় ওনাইতেন । কখনও বা নারীগণের মধ্যে কাহাকেও কোনও একটা বিষয় পড়িয়া শুনাইতে বলতেন। একজন পড়িতেন আর সকলে শুনিতেন ; তিনি মধ্যে মধ্যে পঠিত বিষয় অবলম্বন করিয়া মুখে মুখে আরও অনেক জ্ঞাতব্য বিষয় তাহদের গোচর করিতেন। এইরূপে তিনি দশদিন কোনও গৃহে থাকিলে সেখানকার হাওয়া আর এক প্রকার করিয়া তুলিতেন। কি পুরুষ, কি রমণী, সকলের যন এক উচ্চভূমিতে আরোহণ করিত।

 ১৮৭২ সালে কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় যখুন “ভারতাশ্রম” নামে আশ্রম প্রতিষ্ঠা করিলেন, তখন লাহিড়া মহাশয়ের ভ্রাতুপুত্রীদ্বয় অপরাপর পরিবারগণের সহিত সেখানে গিয়া বাস করিতে লাগিলেন। এই সময়ে লাহিড়ী মগ্নশয় মধ্যে মুধ্যে আশ্রমে আঁসিয়া.বাস করিতেন। কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় তাহার বৌবন-মুহৃদ' প্যারীমোহন সেমের পুত্র; সুতরাং তাহার প্রতি লাহিড়ী মহাশয়ের বিশেষ মেহ ছিল। কেবল স্নেহলহে, ঈশ্বর-ভক্ত মানুষ বলিয় তাহাকে আন্তরিক প্রতি ও শ্রদ্ধা করিতেন। আমরা অনেকবার দেখিয়াছি কেশববাবু উপাসনা করিতেছেন, তাহার কোনও একটা কথা শুনিয়া লাহিড়ী মহাশয় পাগলের মত হইয়া গিয়াছেন, স্থির হইয়া বসিতে পারিতেছেন না ; “ও. কেশব কি বললেন, ও কেশব কি বললেন” বলিয়া অস্থিয় হইয়া বেড়াইতেছেন। বলিতে কি তাহায় নিজের ভক্তিভাব এতই অধিক ছিল, যে অতিরিক্ত মনের আবেগ হইত বলিয়া তিনি আমাদের উপাসনাতে অনেক স্ময় বসিতেই পারতেন না।

 এই ত কেশব বাবুর প্রতি প্রতি ও শ্রদ্ধা, অথচ স্ত্রী-স্বাধীনতা পক্ষীয়দিগের হইয় তাহাকে উচিত কথা শুনাইতে ক্রটা করিতেন না। এই সকল কথা শুনিতে এক এক সময় এত রুক্ষ বোধ হইত যে অপরের অসহ্য হইয়া উঠিত। তিনি অন্তায়ের প্রতিবাদ করিতে কাহারও মুখাপেক্ষা করিতেন না। আশ্রমবাস-কালের একদিনের ঘটনা মনে আছে। একদিন রামতন্ত্র বাবু র্তাহার একজন পীড়িত বন্ধুকে দেখিতে গেলেন। দেখিয়া ফিরিয়া আসিলে, কাহাকে দেখিতে গিয়াছিলেন ও তিনি কেমন আছেন, জানিবার জন্ত আশ্রমবাসিনী মহিলাদিগের অনেকে আসিয়া তাহাকে ঘিরিয়া ফেলিলেন। তখন ঘটনাক্রমে আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। লাহিড়ী মহাশয় তাহার পীড়িত যৌবন-মুহৃদের নাম করিবামাত্র একজন মহিল৷ বলিয়া উঠিলেন— “ওমা ওমা, এমন মানুষকেও আপনি দেখতে যান ? সে যে লক্ষ্মীছাড়া লোক ” শুনিয়া লাহিড়ী মহাশয় প্রাণে বড় ব্যথা পাইলেন। কেন যে-ঐ মহিলা শুরূপ বলিলেন তাহা তিনি জানিতেন। র্তাহার সেই যৌবন-মুহৃদটী যৌবনকালে একজন ডেপুটী মাজিষ্ট্রেট ছিলেন । সেই সময় তিনি যেখানেই স্লাইতেন সেইখানেই তাহার স্বলিত-চরিত্র লোক বলিয়া অথ্যাতি হইত। ঐ মহিলাটী সেরূপ কোনও কোনও স্থানে থাকিয়া ঐরূপ অখ্যাতি অনেক দিন শুনিয়া আসিয়াছেন। কিন্তু সে অনেক দিনের কথা। তাছার পর তাহার স্বভাব-চরিত্র শুধরাইয়া গিয়াছে ; তিনি ধৰ্ম্মচিন্থাতে বিশেষভাবে মনোনিবেশ করিরাছেন ; তখন তিনি রাজকাৰ্য হইতে অবস্থত ও মৃত্যুশয্যাতে শয়ান ; এ সকল সংবাদ ঐ মহিলা জানিতুেন না । লাহিড়ী মহাশয় বলিলেন— “ঠাকুরুন। আপনি কেন তাকে লক্ষ্মীছাড়া লোক বললেন, তা আমি জানি। কিন্তু তার সে সব অনেক দিন ঘুচে গিয়েছে ; সে এখন বড় ভাল লোক হয়েছে ; কেবল ধৰ্ম্মের কথা নিয়েই আছে; বিশেষ সে মৃত্যুশয্যাতে পড়েছে, আমার কি যাওয়া উচিত নয়?” এই বলিয়। ঐ ব্যক্তির সহৃদয়ত, ধৰ্ম্মভীরুত, কৰ্ত্তব্যপরায়ণতার নিদর্শন-স্বরূপ এক একটা গল্প করিতে লাগিলেন। একটা গল্প শেষ হয়, আর ঐ মহিলাটার প্রতি দৃষ্টিক্ষেপ করিয়া বলেন-“ঠাকুরুন ঠিক করে বলুন এতটা আপনি করতে পারতেন কি না?” অমনি ঐ মহিলাটী বিনীতবদনে বলেন—“না এতটা বোধ হয় আমা দ্বারা হতো না।” এইরূপে কয়েকট দৃষ্টান্ত দিয়া শেষে বলিলেন—“দেখুন ঠাকুরুন! আমর; মানুষের মনটাই দেখি, ভালটা দেখি না। মন মানুষেরও ভালটা দেখতে হয়। ঈশ্বর যদি আমাদের মনটাই ধরেন, তাহলে কি আমরা পার পাই?”

 এই সময়ে লাহিড়ী মহাশয়ের দিন এক প্রকার মুখেই যাইতেছিল। উন্নতিশীল ব্রাহ্মদলকে পাইয়া তিনি অতিশয় প্রীত হইয়াছিলেন; এবং তাছাদের অনেক কাৰ্য্যে যোগ দিতেছিলেন। কেবল তাহাও নয়; স্বৰ্গীয় খ্যাতনাম ডাক্তার নবীনকৃষ্ণ মিত্রের ভ্রাতা যারাসতবাসী স্বপ্রসিদ্ধ কালীকৃষ্ণ মিত্র মহাশয় তখন কলিকাতাতে বাস করিতেন। তিনি শেষ দশায় এক প্রকার চলৎশক্তি—রহিত হইয়াছিলেন। কিন্তু স্বাভাবিক সাধুতা ও বিদ্যাবত্তার গুণে তাঁহার ভবন শিক্ষিত ব্যক্তিগণের একটা প্রধান আকর্ষণের স্থান ছিল। সেখানে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, প্রসন্নকুমার সর্বাধিকারী, শু্যামাচরণ দে, তারাপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়, রাধিকাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় ও তাঁহার ভ্রাতা রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়, প্রভৃতি নবরত্বের অধিষ্ঠান হইত। লাহিড়ী মহাশয় ১৮৭০ সাল হইতে মধ্যে মধ্যে সহরে আসিয়া সেই ক্ষেত্রে আরিভূত হইতেন; এবং সকলের পূজা লাভ করিতেন। প্যারীচরণ সরকায় এই নবরত্বের এক প্রধান রত্ন, ছিলেন। তিনি বহুকাল ধারাসাত স্কুলের প্রধান শিক্ষকরূপে প্রতিষ্ঠিত থাকেন। তৎপরে কলিকাতার হেয়ার স্কুলের প্রধান শিক্ষকরূপে আসিয়া শেষে প্রেসিডেন্সি কালেজের প্রোফেসারের পদে উন্নীত হইয়াছিলেন। কলিকাতাতেও তিনি বিবিধ সদনুষ্ঠানে আপনাকে নিযুক্ত করেন। প্রধানতঃ তাঁহারই উদ্যোগে কলেজেয় ছেলেদের জন্য বর্তমান ইডেন হষ্টেলের অনুরূপ একট আবাসবাটিক স্থাপিত হইয়াছিল; তিনি চোয়বাগানে একটা বালিকাবিদ্যালয় স্থাপন করেন; এডুকেশন গেজেটের সম্পাদকরূপে তিনি সকল সদনুষ্ঠানের উৎসাহ, দাতা ছিলেন; কিন্তু শিক্ষিতদলের মধ্যে স্বরাপান নিবারণের জন্ত তিনি যে চেষ্টা করিয়াছিলেন, সেই জন্যই তিনি অমুর কীৰ্ত্তি লাভ করিয়াছেন। এতদৰ্থে ১৮৬৩ সালে একটা স্বরাপান নিবারিণী সভা স্থাপনু করেন। এই সভা হইতে ইংরাজীতে Well-Wisher ও বাঙ্গালাতে হিতসাধক” নামে মাসিক পত্রিকা বাহির হইত ; তাছাতে সুরাপানের অনিষ্ঠকারিভাবিশেষরূপে প্রতিপাদিত হইত। তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র সেন প্রভৃতি বিশিষ্ট ব্যক্তিদিগকে এই কার্যোর সহায় করিয়া লইয়াছিলেন : ' বলিতে কি তিনিই আমাদিগকে সুরাপানের বিরোধী করিয়া রাখিরা গিয়াছেন। ১৮৭৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সরকার মহাশয় দেহত্যাগ করেন। মৃত্যুকাল পর্য্যস্ত দেশের হিতচিন্তা তাহার হৃদয়কে পরিত্যাগ করে নাই। তাহাকে লাহিড়ী মহাশয় বড় তাল বাসিতেন। ইহাদের সহবাসে তিনি বড়ই সুখী হইরাছিলেন । কিন্তু সে সুখ তাহার অধিক দিন থাকিল না । তাহার জ্যেষ্ঠপুত্র নবকুমার এই সময়ে মুখ্যাতির সহিত কলিকাতা মেডিকেল কলেজে পড়িতেছিলেন। বন্ধুবান্ধব আত্মীয় স্বজন সকলেই তাহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিয়াছিলেন হঠাৎ সে আশাতে নিরাশ হইতে হইল।

 এই সময়ে নবকুমারের যক্ষ্মারোগের লক্ষণ প্রকাশ পাইল । তিনি স্বীয় পাঠ্য বিষয়ে কৃতী হইবার জন্ত গুরুতর শ্রম করিতেন ! সে শ্রম সহ্য হইল না ! পূৰ্ব্বোক্ত উৎকট ব্যাধির সূঞ্চার হইল। লাহিড়ী মহাশয় সংবাদ পাইয়া কৃষ্ণনগর হইতে ছুটিয়া আসিলেন ; কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়কে সঙ্গে করিয়া নবকুমারের বাসাতে গেলেন ; এবং মেডিকেল কলেজের তদানীন্তন প্রিন্সিপাল ডাক্তার নৰ্ম্মান চিভার্সের সহিত সাক্ষাৎ করলেন। ১৮৫২-৫৩ সালে বালীতে অবস্থান কালে ডাক্তার চিভার্সের সহিত তাহার পরিচয় ও অস্ত্রীয়তা হয়। সেই আত্মীযুতাস্থত্রে ডাক্তায় চিভার্স এই সমরে তাহাকে বিধিমতে সাহায্য aকরিতে প্রবৃত্ত হইলেন। নবকুমারকে কালীচরণ ঘোষ মহাশয়ের বাসাতে লওয়া হইল। সেখানে রাৰ্থিয়া চিকিৎসা, শুশ্রুয, যত্নের দ্বারা যাহা হইতে পারে সকলি হইতে লাগিল ।

 কিন্তু কিছুতেই রোধের উপশম দেখা গেল না। অবশেলে তাহাকে কৃষ্ণনগরে লইয়া যাওয়া স্থির হইল। নবকুমার কৃষ্ণনগরে গেলেন, সেই সঙ্গে ইন্দুমতীকেও তাহার শুশ্ৰুষার জন্য যাইতে হইল। তিনি হিন্দু-মহিলা-বিদ্যালয়ে অতি উৎসাসের সহিত বিদ্যাশিক্ষা, করিতেছিলেন এবং সূৰ্ব্বজনেয় প্রিয় হইয়া রহিয়াছিলেন । কিন্তু জ্যেষ্ঠের দারুণ পীড়ার কথা শুনিয়া' 'অস্থির হুইয়া উঠিলেন । রোগীর সেবা করা ইন্দুমতীর যেন জন্মগত সিদ্ধবিদ্যা ছিল । যে ইন্দু অপরে পীড়িত হইলে দাসীর মত তাহার সেবা করিতেন, সেই ইন্দু কি আপনার জোঠের পীড়ার কথা শুনিয়া মুস্থির খাঁকিতে পারেন? মনে হইল বৃদ্ধা জননীর প্রতি সংসারের সকল কাজের ভার, দাদার সেবা করে। কে? তাই পড়াশুনা ছাড়িয়া, ভবিধাৎ উন্নতির স্বার বন্ধ করিয়াহয়ত পরিশ্রম করিবার জন্য বদ্ধপরিকর হইয়। কৃষ্ণনগরে গেলেন। কৃষ্ণনগর থাকিয়া বিশেষ উপকার না হওয়াতে বায়ু পরিবর্তনেয় জন্য নবকুমারকে ভাগলপুরে। লইয়া যাওয়া হইল। ইন্দুমতী শুশ্ৰষার ভার লইল্প সঙ্গে গেলেন।

 নবকুমার পীড়িত হওয়া অবধি পরিবার মধ্যে রোগের পর রোগ দেখা দিয়া সমগ্র পরিবারটীকে যেন উদ্বাস্তু করিয়া তুলিল।! লাহিড়ী মহাশয়ের নিজেস শরীর ইহার অনেক পূর্ব হইতেই সর্বদা অসুস্থ থাকিত। এক দিন অন্তর তাহার জরভাব হইত। সেই থারাপ দিনে তিনি নড়িতে চাহি তেন না; শয্যাস্থ থাকিতেন। তথন যে ভবনে থাকিতেন সেখানকার মহিলাদিগের কিছু কাজ বাড়িত। দিনের বেলা অধিকাংশ সময় একজন। না একজনকে নিকটে বসিয়া কিছু না কিছু তাল বিষয় পড়িয়া শুনাইতে। হইত। কলিকাতাতে যখন আমাদের সঙ্গে। থাকিতেন, তখন তাহার প্রাতুষ্প ত্রীরা, ইন্দুমতী সঙ্গে থাকিলে ইন্দুমতীঐ কাজ করিতেন। এক দিনের ঘটনা বলিতেছি। দিবা দ্বিপ্রহরের সময় তিনি শাঁন আছেন; প্রাতুষ্প ত্রী অন্নদা খুনীকে "ধৰ্মতত্ব” পত্রিকা পড়িয়া শুনাইতে নিযুক্ত করিয়াছেন। সেবারকার “ধৰ্ম্মতত্বে” কেশবচন্দ্র সেন মহাশমের সঙ্গ ত-সভার আলোচনায় বিবরণ ছিল। সেবারে সঙ্গতে রিপুদমন বিষয়ে আলোচনা হইয়াছিল। আলোচনার মধ্যে কেশববাবু বলিয়াছিলেন, যে রিপুগুলোর মধ্যে যেন পারি। বারিক সম্বন্ধ আছে। একটার ঘাড় ভাঙ্গিলে অন্যগুলোয় ভয় হয় বুবি বা আমাদেরও ঘাড় ভাঙ্গে; তারা ভয়ে কম-জোর হুইয়া পড়ে”। কেশববাবুর এই উক্তি গুলি ধৰ্ম্মৰ সঙ্গতের আলোচনার মধ্যে প্রকাশিত হইয়াছিল। কিন্তু তাহার সঙ্গে তার নাম ছিল না। অন্নদায়ি' যেই কথাগুলি পতিয়া ছেন, অমনি লাহিড়ী মহাশয় “ও কি কথাএমন কথা কে বলে?” বলিয়া গা ঝড়া দিয়া উঠিয়া বসিলেন। জরভাব আর মনে থাকিল না! খারাপ দিন কোথায় পলায়ন করিল!, সেই ভাঙব একেবারে বিভোর! বাড়ীর মহিলাদিগকে ডাকাইয়া সকলকে,সেই কথাগুলি শুনাইলেন। বলিলেন “ঠিক কথা! ঠিক কথা! একটা প্রবৃত্তিকে ঘে দমন করে ভার পক্ষে অ্যগুলো গমন কয়া সহজ হয়। এমন কথা কে বললে, এ কেশৰ না হয়ে যায় না, " মহিলারা ত আর সঙ্গতে ধান না, তারা এ সম্বন্ধে কোনও সংবাদ দিতে পারিলেন না। তখন আমি তাহার ভ্রাতুপুত্ৰীদিগের সহিত এক বাড়ীতে থাকিতাম। যেই আমি বৈকালে বাড়ীতে পা দিয়াছি, অমনি বলিলেন “ডাক ডাক শিবনাথকে ডাক, শুনি এমন কথা কে বললে।” আমার বস্ত্র পরিবর্তনের বিলম্ব সছিল না। আমি গিয়া দাড়াইলে বলিলেন—“মা পড়ে গুনাও ত!” উক্তিগুলি পুনরায় পঠিত হইলে আমি বলিলাম—“ও কথা কেশববাবু বলেছেন।” অমনি আনন্দ আর হৃদয়ে ধরে না,—“দেখেছ আমি বলেছি কেশব না হয়ে যায় না, সে বিন এমন কথা কে বলতে পারে।” সে দিন জরের কথা ভুলিয়া গেলেন; আয় শয়ন করিলেন না; আমাদের সঙ্গে রিপুদমন ও চরিঞ্জের উন্নতি বিষয়ে কথাবার্তা চলিল।

 সে সময়ে যে কেবল লাহিড়ী মহাশয়েরই শরীর অনুস্থ থাকিত তাহা নহে, তাহার দ্বিতীয় পুত্র শরৎকুমার, তাহার চতুর্থ পুত্র বিনয়, তাহার জ্যেষ্ঠ কন্য লীলাবতীর একমাত্র পুত্র চারুচন্দ্র, ইহাদের কাহায়ও না কাহারও অনুস্থতার জন্ত সৰ্ব্বদা ব্যস্ত থাকিতে হইত।

 প্রথমে ভাগলপুরে গিয়া নবকুমারের পীড়ার কিঞ্চিৎ উপশম দেখা গিয়াছিল। এমন কি তিনি অল্পে অল্পে চিকিৎসা ব্যবসাও আরম্ভ করিয়াছিলেন; এবং ১৮৭৫ সালের জুলাই মাসে শরৎকুমারের শীর অসুস্থ হওয়াতে তাহকেও আপনার কাছে লইয়া দুই ভাই বোনে তাহর শুশ্রুষাতে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। এদিকে পিতা মাতা অবশিষ্ট পরিবার লইয়া কৃষ্ণনগয়ে ছিলেন। দিন এক প্রকার মুখেই চলিতেছিল। এমন সময়ে ঐ সালের নবেম্বর মাসে দেশে এক নিদারুণ সংবাদ আসিল। লাহিড়ী মহাশয় তারে সংবাদ পাইলন যে "প্তাহার জামাত তারিণীচরণ, ভাদুড়ী হঠাৎ আত্মহত্যা করিয়াছেন। তিনি উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে কাশীপুর নামক স্থানে গবর্ণমেণ্ট ডিস্পেন্সেরির ডাক্তার ছিলেন। কেন যে হঠাৎ আত্মহত্যা করিলেন তাহার কারণ জানিতে পার গেল না। এই ঘটনাতে লাহিড়ী মহাশন্থের ছিন্ন ভিন্ন পরিবার যেন আরও ভয় হইয়া গেল। লীলাবতী পুত্রটি লইয়া এখন হইতে সম্পূর্ণরূপে পিতার উপরেই পড়িলেন। সেই শোকার্বী,কন্যার মুখ দর্শন কম্বিয় তাহার কোমল ওপ্রেমিক হৃদয় কিরূপ ব্যথিত হইতে লাগিল, তাহ সহজেই অনুমিত হইতে পারে।

 এদিকে এই দারূণ সংবাদ ভাগলপুরে পৌছিলে, নবকুমার ও ইন্দুমতী

Indumati Devi.jpg
স্বর্গীয়া ইন্দুমতী দেবী।

(৩৬৩ পৃষ্ঠা)

বৃদ্ধ পিতা মাতা, ও জ্যেষ্ঠ ভগিনীর জন্ত ব্যাকুল হইয়া উঠিলেন। তাহার আসিয়া সকলকে ভাগলপুরে লইয়া গেলেন । কিন্তু ভাঙ্গা কাচ যেমন আর যোড়া লাগে না, তেমনি যেন ইহাদের ভগ্ন পারিবারিক সুখ আর ষোড়া লাগিল না। কিছুদিন পরে পরিবার পরিজন বোধ হয় আবার কৃষ্ণনগরে আসিয়াছিলেন। নবকুমার ও ইন্দুমতী ভগলপুরেই রছিলেন। ইহার পরেই নবকুমারের পীড়া আবার বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। তাহার যক্ষ্মী ভীষণ আকার ধারণ করিল। এই সময়ে ইন্দুমতী কিরূপে ভ্রাতার সেবা করিরছিলেন, তাহ ভাবী তাইবোনের দৃষ্টান্তের জন্ত লিখিয়া রাখিবার মত কথা। . পরসেবা যে ইন্দুমতীর স্বাভাবিক ব্রত ছিল, পরের সেবা করিতে পাইলে যার আনন্দের সীমা থাকিত না, তার পক্ষে নিজ জ্যেষ্ঠ সহোদরের শুশ্রুষা যে কি হৃদয়ানন্দকর কার্য্য ছিল, তাহা আর কি বলিব। ইন্দুমতী একেবারে দেহ মন প্রাণ সেই কাৰ্য্যে নিক্ষেপ করিলেন। আমি ভাগলপুরের লোকের মুখে শুনিয়াছি, ষে অনেক দিন ইন্দুমতীর স্নানাৰ্দ্ৰ বস্ত্র অঙ্গেই শুকাইয়া গিয়াছে। নিজে রন্ধনাদি করিয়া ভ্রাতাকে খাওয়াইয়া, বাতাস করিয়া ঘুম পাড়াইয়া, স্নান করিতে গিয়াছেন, স্নান করিয়া আর্দ্রবস্ত্র পরিবর্তন করিতে যাইতেছেন, এমন সমরে ভ্রাতার কাশীর শব্দ ও কাতরধ্বনি শুনিলেন ; চাকর ছুটিয়া আসিয়া বলিল—“মুখ দিয়া রক্ত উঠিয়াছে, বাবু ডাকিতেছেন।” অমনি দৌড়িয়া গেলেন, ঔষধ খাওয়াইতে ও বাতাস করিতে করিতে অঙ্গের বস্ত্র অঙ্গেই শুকাইয় গেল। অনেক দিন এমন হইয়াছে, যে রন্ধন করিয়া বেলা দশটার সময় ভ্রাতাকে মন্ন ব্যঞ্জন দিয়াছেন, কোনও একটা জিনিস বা কাজ মনের মত না হওয়াতে নুবকুমার অন্ন ব্যঞ্জন ছুড়িয়া ফেলিয়া দিলেন ; তাহাতে ভগিনীর বিরক্তি বা দ্বিরুক্তি নাই, কেবল সেই বিশাল নয়নদ্বয় দিয়া দর দর ধারে জল পড়িতে লাগিল । বলিতে লাগিলেন—“দাদা ! তোমার যে খেতে দেরী হরে অমুখ বাড়বে।” আবার নুতন অন্ন ব্যঞ্জন রন্ধন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। নিজের ধাওরা দাওয়া মনে রছিল না। অনেক য়াত্রি অনিদ্রা অবস্থায় ইন্দুমতীর চক্ষের উপর দিয়া অতিবাহিত হইতে লাগিল। রাত্রে অনিদ্রা দিনে দুরন্ত শ্ৰম ! আমরা সকলেই ইন্দুমতীকে ভালবাসিত", যখন তাহার এই তপস্তার কথা শুনিলাম, তখন তাহার প্রতি প্রতি শ্রদ্ধা যেন দশগুণ বাড়িয়া গেল ; কিন্তু এত শ্রম সহিবে না ভাবিয়া সকলেই ভীত হইতে লাগিলাম ।

 যে ভয় করিয়াছিলাম তাঁহাই ঘটিল। এরূপ ভ্রাভার সেবা আর আধক দিন চলিল না। অচিরকালের মধ্যে ইলুমতী দারুণ যক্ষ রোগে আক্রান্ত श्ब्रां পড়িলেন। তখন ধর, ধর, খেকা থেক পড়িয়া গেল। পায়ে ও মন্তকে স্থই স্থানে এক সঙ্গে কৃষ্ণসৰ্পে দংশন করিলে যেমন হয় লাহিড়ী মহাশয়ের পরিবারের দশা যেন তেমনি হইল ? নবকুমারের পীড়া বরং রহিয়া বসিয়া বাড়িতেছিল; চোকে কাণে দেখিবার০শুনিবার অবসর দিতেছিল ; কিন্তু ইন্দুমতীর যক্ষা মণ্ডুকল্প,তিতে বাড়িতে লাগিল। ১৮৭৭ সালের মধ্যভাগে পীড়া এতই বাড়িয়া উঠিল, যে ঐ সালের অক্টোবর মাসে র্তাহাকে ভাগলপুর হইতে আরাতে লইয়া যাওয়া স্থির হইল। তখন শরৎকুমার ও লীলা ব্যতীত অপর সকলে আরাতে একত্র বাস করিতে লাগিলেন। অাঁরাতে গিয়া নবকুমার বা ইন্দুমতীর পীড়ার কোনও প্রকার উপশম না হউক, আর একটা দুর্ঘটনা, ঘটিল। লাহিড়ী মহাশয়ের সর্বকনিষ্ঠা কন্যা মৃদুমতী, আড়াই বৎসরের বালিকা, সেখানে বিষম জর-রোগে অকালে প্রাণত্যাগ করিল। এদিকে এক মাসের মধ্যেই ইন্দুমতীর জীবনের আশা চলিয়া গেল ; চিকিৎসকগণ জবাব দিলেন। এই সঙ্কটাবস্থায় পরম বন্ধু বিদ্যাসাগর মহাশয়ের পরামর্শে, ইন্দুমতীর অবসান কাল কৃষ্ণনগরে যাপন করিবার উদ্দেশে, লাহিড়ী মহাশয় পরিবার পরিজনকে লইয়া স্বদেশাভিমুখে যাত্রা করিলেন। তখন ইন্দুর এমন অবস্থা যে তাছাকে হুগলীতে নামাইয়া নৌকাযোগে কৃষ্ণনগরে লইরা যাইতে হইল ।

কৃষ্ণনগরে পৌঁছিয়া ইন্দুমতী শেষ - শ্য, মৃত্যু-শয্যা, পাতিলেন। লাহিড়ী মহাশয়ের পত্নীর কথা আর কি লিখিব। ংে, পাঠক ! যদি মানুষের হৃদয় থাকে তবে একবার ধারণা করিবার চেষ্টা কর, সেই ভয়হৃদর মাতা কি ভাবে সংসারের কাজ ও পীড়িত সন্তানদের সেবা চালাইতে লাগিলেন। সাধে কি নারী জাতীকে এত"শ্রদ্ধা করি, ইন্দুমতী মরিতে মরিতেও কেবল জ্যেষ্ঠ সহোদরের চিন্তাই করিতেন। পিতা, বা মাতা নিকটে আসিয়া বসিলে, সুস্থির হইয়া বসিতে দিতেন না ; বলিতেন, “তোমরা দাদাকে দেখ, তোমরা ধাদাকে দেখ, আমার কাছে বস্বার দরকায় নেই ; আমার কাছে দিীর আছেন।” এইরূপ প্রায় প্রতিদিন তুলিয়া দিতেন। ওদিকে নৰকুমার বুঝিলেন ভগিনীর আসন্নকাল উপস্থিত ; এবং ইন্দু তাহার জন্তই মরিতেছে ; সুতরাং তিনি নিজের অমুখ ভুলিয়া গির ভগিনীর শুশ্রুষার জন্য ব্যস্ত হইলেন। বার বার উঠিয়া ভগিনীকে দেখা, সময়ে ঔবধ পড়িতেছে

Gangamani Devi.jpg
পত্নী গঙ্গামণি দেবী।

কি না, যখন যাহা আবগুক তাহা ইতেছে কি না, এই সকল সংবাদ লওয়া, নিরস্তর এই কাজ চলিল। ইদুর রোগের উপশম কিসে হয় সে বিষয়ে অবিশ্ৰান্ত মনোযোগ দিতে লাগিলেন। যেন তাহার শক্তি থাকিলে মৃত্যুর মুখ হইতে ভগিনীকে ছিড়িয়া আনেন। কিন্তু হাঁয় কে কবে মৃত্যুর মুখ হইতে মানুষকে ছিড়িয়া আনিয়াছে! ইন্দুর জীবন নিৰ্ব্বাণোন্মুখ প্রদীপের ন্তায় ত্বরায় ক্ষীণ প্রভা ধারণ করিল ! অবশেষে ১৮৭৭ সালের ৪ঠা ডিসেম্বরের বিষম দিন উপস্থিত হইল। ঐ দিনে মৃত্যুর কিয়ংকাল পূৰ্ব্বে ইন্দুমতী পিতাকে দেখিবার জন্য ব্যগ্রত প্রকাশ করিতে লাগিলেন। ইন্দুমতী ভগিনীকে বলিলেন “দিদি। বাবাuক একবার ডাক ।” তখনি রামতনু বাবুকে ডাকিয় আনা হইল। তিনি আসিয়া দেখিলেন ইন্দু ছট ফট্‌ করিতেছেন ; ক্ষণকালও স্থির থাকিতে পারিতেছেন না। পিতা জিজ্ঞাসা করিলেন—“ইন্দু! কেন আমাকে ডেকেছ ?” ইন্দুমতী চক্ষু খুলিয়া পিতার মুখের দিকে চাহিয়া বলিলেন— “বাবা । আজ আমার কাছে বসে ; আজ আমাকে বড় অস্থির কর্চে।” লাহিড়ী মহাশয় নিকটে বসিয়া কস্তার হাতখানি নিজের হাতে লইরা বুলিলেন, “ইন্দু! আমাদের যা করবার ছিল করেছি, আৰু কিছু করবার নেই, এখন ঈশ্বরের নিকট প্রর্থনা কর যে তিনি তোমাকে ত্বরায় এ যাতনা হতে উদ্ধার করুন। ইন্দু বক্ষঃস্থলে দুইহাত তুলিয়া বণিলেন—“ঈশ্বর আমাকে ত্বরায় উদ্ধার কর।” তৎপরে পিতার মুখের দিকে চাহিয়া অনুমতি চাহিলেন, “বাব আধিবাই” ? লাহিড়ী মহাশয় বললেন “ষাও" ; অমনি ইন্দুমতী বক্ষের উপরে দুই হাত রাধির স্থির ভাব ধরিলেন ; সেই भूइण्डई প্রাণবায়ু ক্ষীণ দেহযষ্টি ছাড়িয়া গেল ।

 এই পারিবারিক বিপদে মানুষ দেখিতে পাইল রামতনু লাহিড়ীর মধ্যে কি জিনিস ছিল । ওরূপ সোণার চাদ মেয়ে চক্ষের সমক্ষে মিলাইয়া গেল, তাহাতে একটা ওঃ আঃ করা, বা শোকাশ বর্ষপ করা কিছুই করিলেন না। প্রত্যুত যখন তাহার গৃহিণী “মারে ইদুরে!” বলিয়। কাদিয়া উঠিলেন, তখন দৌড়িয়া গিয়া তাহার মুখ আবরণ করিলেন, —“কর কি, কর কি, ঈশ্বরকে ধন্যবাদ কর যে অনেক যন্ত্রণ হইতে তিনি তাকে শান্তিধ্যমে নিয়েছেল । এখন অধীর হও না; আর একটা সন্তান এখনো শ্বসছে; তার প্রতি কৰ্ত্তব্য এখনও বাকি আছে, এখন অধীর হ’লে তার সেবার ব্যাঘাত হবে ; সে যদি আর ছ মাস বঁাচতো আর দশদিন বঁাচবে না ; চল এখন তার সেবায় নিযুক্ত হই।”  বাস্তবিক ! এই বিশ্বাসী সাধুপুরুষ শোক জয় করিয়াছিলেন। আমি একজন বন্ধুর মুখে শুনিয়াছি যে ইন্দুমতীর মৃত্যুর কিছুদিন পরে একদিন লাহিড়ী মহাশয়ের অনুরোধ ক্রমে ইন্দুর শ্রীদ্ধোপলক্ষে ঈশ্বরোপাসনা হইল। উপাসনার মধ্যে লাহিড়ী মহাশয় হঠাৎ “ইন্দু বলিয়। দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলিয়৷ উঠিয়া গেলেন ; পরে দেখা গেল যে বস্ত্রাঞ্চলে নিজের অশ্র মুছিতেছেন। উপাসনা ভাঙ্গিলে উক্ত" বন্ধুটকে বলিলেন—“দেখ আমরা হাজার ঈশ্বরকে মঙ্গলময় বলি না কেন কাজে তাকে মঙ্গলময় বলিয়া ধরা কত কঠিন! আমি মাজ ইন্দুর জন্ত কেঁদে অবিশ্বাস প্রকাশ করলাম ; এটা কি সত্যু নয়, আমার ইন্দু এখন তার মঙ্গল ক্রোড়ে আছে, তবে কাদি কেন ?” বলিয়৷ এই ক্ষণিক শোক প্রকাশের জন্ত বহু দুঃখ প্রকাশ করিতে লাগিলেন। তৎপরেই ধীর স্থির, স্বকৰ্ত্তব্যসাধনে তৎপর।

 এদিকে ইন্দুমতী চলিয়া গেলে নবকুমার প্রাণে এমনি আঘাত পাইলেন যে র্তার জীবনের দিন ফুরাইয়া আসিতে লাগিল। সেই যে তিনি মৌনাবলম্বন করিলেন, সেই হইতে আর কেহ তাহাকে ভাল করিয়া হাসিতে দেখে নাই। ইন্দু তাহার জন্য কি করিয়াছে, পড়িয়া পড়িয়া তাহাই আয়ুপূৰ্ব্বিক ভাবিতে লাগিলেন। শেষ অবস্থায় তাহার মেজাজ খারাপ হইয়া ইন্দুকে কি ক্লেশ দিয়াছেন তাহা বোধ হয় চিন্তা করিতে লাগিলেন । মধ্যে মধ্যে দেখা যাইত তিনি বালিশে মুখ গুজিয়া আছেন, চক্ষের জলে বালিশ ভিজিয়া যাইতেছে। একবার তাহার শ্যুর পার্শ্বে একথও কাগজ কুড়াইয়া পাওয়া গেল, তাহাতে দেখা গেল সেই রুগ্ন, দুৰ্ব্বল ও ক্ষীণ হস্তে যেন কি লিখিতেছিলেন—অধিক .লিখিতে পারেন নাই। O! darling Sister ! বুলিয়া আরম্ভ করিয়ী সামান্ত দুই এক ছত্র লিখিয়াছেন। এ শোক নবকুমার সামলাইয়া উঠিতে পারিলেন না। ভাটার জলের স্তায় তাহারও জীবনের শক্তি তিল তিল করিয়া ফুরাইয়া আসিতে লাগিল। পিতা খাতা ও আত্মীয় স্বজনের সহস্ৰ চেষ্টা ও শুশ্লষাতে কিছু করিতে পারিল না। "অবশেষে ১৮৭৮ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর সেই দিন উপস্থিত হইল, যে দিন নবকুমারকে ৭ হারাইতে হইল।

 সে দিনকার অবস্থাও চিরস্মরণীয়। সেদিন যাহার উপস্থিত ছিলেন, র্তাহাদের মুখে যাহা শুনিয়াছি, তাহ মানুষে সহজে বিশ্বাস করিতে পারে না। নবকুমারের প্রাণবায়ু দেহকে পরিত্যাগ করিয়াছে, তাহার মৃতদেহ পড়িয়া রহিয়াছে, তৎপার্থে শোকাৰ্ত্ত মাত অচেতন হইয়া রহিয়াছেন ; এদিকে রামতনু নবকুমার লাহিড়ী । ஆ, த்1 বাবু পল্লীবাসী তাছার আত্মীয় সুপ্রসিদ্ধ কাৰ্ত্তিকেয়চন্দ্র রায়-মহাশয়ের একটা পুত্রকে ধরিয়া বাইরে প্রাঙ্গণস্থিত একটা বেঞ্চের উপরে বসিয়া তাহাকে সাস্থনা করিতেছেন। সে যুবকট নবকুমারকে এতই ভালবাসিত যে সে শোকে অধীর হইয়া উঠিয়াছে; কোনও ক্রমেই শোক সম্বরণ করিতে পারিতেছে না। রামতনু বাবু তাহকে বলিতেছেন “সে কি হে! তুমি শিক্ষিত লোক, সকল বোঝ, কোথায় তোমার জেঠাইমাকে বোঝাবে, শান্ত করবে, না তুমিই অধীর হয়ে গেল?” এমন সময়ে কয়েকজন যুবক আসিয়া উপস্থিত। তৎপূৰ্ব্বে তাঁহারা সপ্তাহে একদিন আসিয়া লাহিড়ী মহাশয়ের সহিত ধৰ্ম্মালাপ করিতেন। ঐজন্ত তাহদের একটী সঙ্গত সভার মত ছিল। সেই দিন উক্ত সভার অধিবেশনের দিন। তদনুসারে তাহারা উপস্থিত। তাঁহারা জনিতেন না, যে কিয়ৎকাল পূৰ্ব্বে নবকুমারের মৃত্যু হইয়াছে। তাহারা না জানিয়া ঘরে প্রবেশ করিতে যাইতেছেন, এমন সময়ে লাহিড়ী মহাশয় দ্রুতপদে গিয়া বলিলেন “দেখ, আজ এ বাড়ীতে সভার অধিবেশন হবে না; আমার ভুল হয়ে গিয়েছে, আগে সংবাদ পাঠান উচিত ছিল।” সকলে কারণ জিজ্ঞাসা করাতে তিনি ধীরভাবে বলিলেন “অল্পক্ষণ পূৰ্ব্বে নবকুমারের মৃত্যু হয়েছে, তার মৃতদেহ ঐ ঘরে পড়ে আছে, তোমরা যেওনা দেখলে কষ্ট হবে।” শুনে ত সকলে অবাক। শোকের চিকুমাত্রও নাই।

 বাস্তবিক, বাস্তবিক, এই সাধুপুরুষ শোকজয় করিয়াছিলেন। ইন্দু মতীর মৃত্যু হইলে আমি শোক প্রকাশ করিরা তাহাকে একখানি পত্র লিথিয়াছিলাম। আমি ইন্দুমতীকে অতিশয় ভালবাসিঙাম। ইন্দু অনেক जर्भब्र কৃষ্ণনগর হইতে আসিয়া আমাদের বাড়ীতে থাকিতেন; এবং আমাকে অতিশয় শ্রদ্ধা ভক্তি করিতেন। আমার স্মরণ আছে লাহিড়ী মহাশয়কে পত্র লিখিন্মর সময়, আমার পত্ৰখানি নেত্রজলে অনেক স্থলে সিক্ত হইয়া, পাঠের অযোগ্য হইয়া গিয়াছিল, আমাকে সেই সেই শব্দ আবার পরিস্কার করিয়া লিথিয় দিতে হইয়াছিল। কিন্তু লাহিড়ী মহাশরের নিকট হইতে যখন উত্তর আসিল, তখন আমি অবাক। দুই ছত্রে পত্র শেষ হইস্বাছে, এবং সে छ्हें इब ७३ মৰ্ম্মে-“প্রিয় শিবনাথ! আমাদের শোকে যে তুমি এতদূর শোকাৰ্ত্ত হইয়াছ, সে জন্ত তোমাকে ধন্যবাদ করি; কিন্তু এস আমরা সকলে ঈশ্বরকে ধন্তবাদ করি যে তিনি আমার কন্যাকে রোগযন্ত্রণ হইতে উদ্ধার করিয়াছেন।”  একজন বন্ধু ভাগলপুর হইতে, লিখিয়াছেন, যে আর হইতে ইন্দুমতীকে কৃষ্ণনগরে লওয়ার পর তিনি লাহিড়ী মহাশয়ের পত্রে সৰ্ব্বদা ইন্দুর সংবাদ পাইতেন। একবার লাহিড়ী মহাশয় এই মৰ্ম্মে লিখিলেন—“তুমি শুনিয়া স্বর্থী হইবে, ইন্দুমতীর রোগ যন্ত্রণা অ’র নাই, সে এখন বেশ সুখে আছে।” পত্র পড়িয় তাহার মনে হইল, সৌভাগ্যক্রমে কোনও অতর্কিত উপায়ে বোধ হয়, ইন্দুমতীর রোগের উপশম হইয়াছে। পরে অনুসন্ধানে জানিলেন যে ঐ সংবাদ ইন্দুর মৃত্যু সংবাদ। গীতাকার জ্ঞানী মানুষকে বিগত-শোক হইবার জন্য উপদেশ দিয়াছেন ; এই ত সেই উপদেশ জীবনে ফলিত দেখিয়াছি! বিশেষ আশ্চর্যের বিষয় এই যিনি মনের আবেগ বশতঃ ব্রহ্মোপাসনাস্থলে তাল করিয়া বসিতে পারিতেন না, ধিনি কাহারও সামান্ত ক্লে শ দেখিলে এত উত্তেজিত হইতেন, নিজের শোকের সময় তাহার এই ধীরতা ! প্রকৃত বিশ্বাসী ও ঈশ্বর-প্রেমিক মানুষে অসম্ভব সম্ভব হয় !

 বলিতে, কি, ঈশ্বরের মঙ্গলস্বরূপে র্তাহার এরূপ প্রগাঢ় বিশ্বাস ছিল যে কেহ শোকে অতিরিক্ত কাতর হইয়া কঁদিলে তাহার সহ হইত না । সে ব্যক্তিকে ঈশ্বরের মঙ্গল-স্বরূপের কথা শুনাইবার জন্ত ব্যগ্র হইতেন। এ বিষরে একদিনকার একটা ঘটনা আমার স্মরণ আছে। নবকুমাকের ও ইন্দুমতীর মৃত্যুর পর তিনি কলিকাতায় আদিয়া চাপাতলাতে একটা বাড়ী ভাড়া করিয়৷ কিছু কাল ছিলেন। সেই সময় একদিন আমি র্তাহায় সহিত সাক্ষাৎ করিতে গেলে আমাকে বলিলেন—“আমাদেয় পাশের বাড়ীতে এঘটী ছেলে মারা গিয়াছে, বাড়ীর লোক, পুরুষ স্ত্রী লোক, মিলিয়া কয়দিন কাদিতেছে । দেখ ঈশ্বরের মঙ্গল-স্বরূপে বিশ্বাস না থাকলে মাহুষের কি দশা হয়! আমি ওঁদের বাড়ীর পুরুষদগকে বুঝাতে গিয়েছিলাম। আমি গিয়ে বললাম, আপনারা ত পরকাল মানেন, একজন মঙ্গলকর্তা আছেন তাও ত মানেন, তবে এতদিন ধরে এত কাল্লা কাটি কেন করেন ? তাতে র্তার পুনর্জন্ম ও শাস্ত্রের কথা তুলেন ; আমি বললাম আমি মুর্থ মামুব, শাস্ত্র টাস্ত্র জানি না; এই বলে পালিয়ে এসেছি, তুমি শাস্ত্র জান, তুমি কি শাস্ত্রের বচন টচন তুলে ওদিগকে বুঝিয়ে দিতে পার, অতিরিক্ত শোক করা ধাৰ্ম্মিক লোকের পক্ষে উচিত নয় ?” আমি বলিলাম,—“ওঁরা যখন তর্ক তুলেছেন তখন বুঝাতে যাওয়া বৃথা।” বুঝাইতে আর যাওয়া হইল না। আমি এই সাধু পুরুষের ভাব দেখিয়া মনে মনে বিস্ময়াবিষ্ট হইয়। ঘরে আসিলাম ।  নবকুমার ও ইন্দু চলিয়া গেলে জননীর নিকট কৃষ্ণনগরের বাড়ী শ্মশানসমান হইল। তিনি কৃষ্ণনগরের প্রতি বিমুখ হইলেন। যেন জীবনের সকল স্বাদ আহ্লাদ কে হরণ করিয়া লইল! কোথায় গেলে ইন্দু নুবকুমারের সন্ধান পান, যেন মন সেইজন্য ব্যগ্র হইতে লাগিল। আর তাহাকে কৃষ্ণনগরে রাখা ভার হইল। ওদিকে কৃষ্ণনগরে ম্যালেরিয়া জ্বরের প্রকোপ আবার বৃদ্ধি পাইয়া সকলকে এমনি ব্যতিব্যস্ত করিয়া তুলিল, যে লাহিড়ী মহাশয় ১৮৮২ সাল হইতে কৃষ্ণনগরের যুবরাজের যে অভিভাবকতা করিতে ছিলেন, তাহা পরিত্যাগ করিয়া ১৮৮২ সালে সপরিবারে কলিকাতায় চলিয়া আসিলেন।