রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ/ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ



ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ।

নব্যবঙ্গের তৃতীয় যুগের নেতৃবৃন্দ।


রাজনারায়ণ বসু

 প্রকৃত পক্ষে রাজনারায়ণ বসু মহাশয় নব্যবঙ্গের তৃতীয় যুগের মানুষ নহেন। ১৮৫১ সালে তিনি মেদিনীপুর জেলা স্কুলের হেড মাষ্টার হইয়া যান; এবং সেই সালেই তাঁহার প্রধান কাৰ্য্য আরম্ভ হয়। সে দিক দিয়া দেখিলে তাঁহার কার্য্যের উল্লেখ অগ্রেই করা উচিত ছিল। কিন্তু ১৮৭০ হইতে ১৮৭৯ সালের মধ্যে তাঁহার শক্তি বঙ্গসাহিত্যে ও বঙ্গদেশীয় জাতীয় চিন্তাতে প্রধান রূপে অনুভূত হয়, এইজন্য এই কালের নেতৃবৃন্দের মধ্যে তাঁহার নাম উল্লেখ করা যাইতেছে। তাঁহার জীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ এইঃ—

 ১৮২৬ সালের ১৭ই সেপ্টেম্বর দিবসে, কলিকাতার পাঁচ ক্রোশ দক্ষিণ পূৰ্ব্ববৰ্ত্তী বোড়াল গ্রামে, প্রসিদ্ধ বসু বংশে রাজনারায়ণ বসু মহাশয়ের জন্ম হয়। এই বোড়ালের বসুর কলকাতার আদিম অধিবাসী ছিলেন। ইংরাজেরা গোবিন্দপুরে যখন বর্ত্তমান কেল্লা নির্ন্মাণ করেন, তখন তত্ৰত্য বসু পারিবারকে বাহির সিমলাতে এওয়াজি জমি দিয়া সেখান হইতে উঠাইয়া দেন। কালক্রমে রাজনারায়ণ বসুর প্রপিতামহ শুকদেব বসু, কলিকাতা হইতে উঠিয়া গিয়া বোড়ালে বাস করেন। ইহার পিতামহ রামসুন্দর বসু, দয়া দাক্ষিণ্য, সদাশয়তা প্রভৃতির জন্য বিখ্যাত ছিলেন। পিতা নন্দকিশোর বসু বংশের সর্বজনপ্রশংসিত গুণসকলের অধিকারী হইয়াছিলেন; এবং তদুপরি মহাত্মা রাজা রামমোহন রায়ের সংশ্রবে আসিয়া ধৰ্ম্মসম্বন্ধে উদার ভাব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। তিনি রামমোহন রায়ের একজন অনুগত শিষ্য ছিলেন; এবং কিছুদিন রাজার প্রাইভেট সেক্রেটারির কাজ করিয়াছিলেন। ১৮৮৫ সালে তাঁহার মৃত্যু হয়। এরূপ কথিত আছে যে মৃত্যু শয্যাতে শয়ান হইয়া তিনি রামমোহন রায়ের কৃত শঙ্কর-ভাষ্যের অনুবাদ আনাইয়া পাঠ করাইয়াছিলেন; এবং ইংলণ্ডের ব্রিষ্টলনগরে ওঁকার জপিতে জপিতে যেমন রাজার মৃত্যু হইয়াছিল তেমনি ওঁকার জপিতে জপিতে ইহারও মৃত্যু হয়।

 রাজনারায়ণ বসু মহাশয় এই পিতার সন্তান। বাল্যকালে বোড়াল গ্রামেই গুরুমহাশয়ের পাঠশালে তাঁহার বিদ্যারম্ভ হয়। তখন কলিকাতার দক্ষিণ প্রদেশস্থ অনেক গ্রামের পাঠশালে বদ্ধমানের গুরু দেথা যাইত। এই গুরুরা আসিয়া ধনী গৃহস্থদের চণ্ডীমণ্ডপে পাঠশাল খুলিতেন। এক গুরু মহাশয়। ফুটি ঠেশান দিয়া বেত্র। হস্তে বসিতেন, সব্দার ছেলেরা তার সহকারীর কাজ করিত; নিম শ্রেণীর বালকদিগের শিকার সাহায্য করিত; গুরুমহাশয়ের পয়সাদি আদায় করিয়া দিত; তাহার পাকাদিকার্য্যের সাহায্য করিত; পলাতক বালকদিগকে ঋষ্ট্ৰিক্ষ্মা আানিত ইত্যাদি। এইরূপ পাঠশালে রাজনারায়ণ বস্তুর শিক্ষা আরম্ভ হইল।

 পাঠশালে কিছু দিন শিক্ষা করার পর, সাত বৎসর বয়সের সময়, পিতা তাহাকে কলিকাতাতে আানিয়া জার এক গুরুর পাঠশালে ভর্তি করিয়া দিলেন। সেখানে কিছু দিন থাকিয়া বন্ধুজ মহাশর বৌবাজারের শম্ভ মাস্টারের স্কুলে। ইংরাজী পড়িতে আরম্ভ করেন। সে সময়ে। ইংরাজি শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের। মধ্যে অনেকে নিজ নিজ পাড়ায় ছোট ছোট স্কুল খুলিয়া ছাত্র সংগ্রহ করিয়া। পড়াইতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। শঙু মাষ্টার তাহাদের মধ্যে একজন। ছিলেন। এই শঙু মাষ্টারের স্কুলে রাজনারায়ণ বাবুর ইংরাজী শিক্ষা আরম্ভ হইল; কিহ তাহা অধিক দিন থাকিল না। অচির কালের মধ্যে তাহার পিতা তাহাকে মহাত্মা ‘হেয়ারের স্কুলে। ভর্তি করিয়া দিলেন। চতুর্দশ বর্ষ। বরস পৰ্য্যন্ত তিনি সেখানে থাকেন। এই থানে থাকিতে থাকিতেই তাহার প্রতিভার লক্ষণ সকল প্রকাশ পাইতে লাগিল। স্কুলের বালকগণ মিলিয়া এক সদালোচনা সভা স্থাপন করিল। তাহাতে রাজনারায়ণ বাবু একজন প্রধান উদ্যোগী হইলেন; এবং তাহার এক অধিবেশনে Whether Science is preferable to Literature,“সাহিত্য অপেক্ষা বিজ্ঞান অধিক আদরণীয় কি না—এই বিষয়ে এক বন্ধ তা পাঠ করিলেন। গুনিতে পাওয়া যায় সে দিন কায় অধিবেশনে হেয়ার স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন; এবং টীহার বক্তত৷ গুনিয়া। অতিশয় প্রীত হইয়াছিলেব্ধ।

 হেয়ার তাহাকে ফ্রী বাগকরুপে হিল কলেজে প্রেয়ণ করেন। এই হিন্দু কলেজ পরে প্রেসিডেন্সি কলেজরূপে পরিণত হইয়াছে। হিন্দু কলেজে গিয়া৷ তিনি একদিকে যেমন প্রতিভাশালী ও কৃতিত্বসম্পন্ন শিক্ষকদিগের হতে পড়িলেন, তেমনি অপর দিকে এরপ | সকল সমাধ্যায়ী বন্ধু পাইলেন, যাহাদের দৃষ্টান্ত ও সহবাসে তাহার জ্ঞানপৃহা উদ্দীপ্ত হইতে লাগিল। শিক্ষকদিগের মধ্যে সাহিত্যে অধ্যাপক ন্য প্রসিদ্ধ ডি, এল, রিচার্ডসন, ও গণিতাধ্যাপক মিঠার রীজের নাম প্রধানরূপে উল্লেখযোগ্য। ডি, এল, রিচাডসনের বিবরণ অগ্রেই দেওয়া হইয়াছে। রীজ সাহেব এক সময়ে সুবিখ্যাত নেপোলিয়ান বোনাপার্টির সৈন্য দলে সামান্য একজন পদাতিক সৈনিক ছিলেন। তৎপরে নানা ঘটনা ও নানা অবস্থা অতিক্ৰম করিয়া অবশেষে হিন্দকালেজের গণিতাঁধ্যাপকের কাৰ্য্যে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিলেন। গণিতে তাহার মত “পণ্ডিত লোক প্রায় দেখা যায় না। তাঁহার সংস্রবে যে বেদন .ছাত্র একবার আসিয়াছে সেই তাঁহার। গণিতবিক্ষ্যা-পারদর্শিতা দেখিল্লা আশ্চর্যান্বিত হইয়াছে। কিন্তু রাজনারায়ণ বাবু চিরদিন। গণিতকে ডরাইতেন; সুতরাং রীজকে ঘমের মত দেখিতেন।

 যাহা হউক এই সময় প্রতিভাশালী শিক্ষকের সংস্রবে আসিয়া তাহার। চিত্তে জ্ঞানশূহ উদ্দীপ্ত হইল। অপর দিকে মাইকেল মধুস্থদন দত্ত, প্যারীচরণ সরকার, জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুর, ভূদেব মুখোপাধ্যায়, “ আনন্দ ঞ্চ বছ. জগদীশ নাথ রায়, ঈশ্বরচন্দ্র মিত্র প্রভৃতি পরবর্তীকালপ্রসিদ্ধ ব্যিিদগকে সহাধ্যায়ী রূপে পাইয়া তাহার আয়োশ্নতির বাসনা প্রবল হইল। তাহার ফলস্বরূপ তিনি কলেজের ভাল ভাল পারিতোষিক ও ছাত্রবৃত্তি প্রভৃতি পাইতে লাগিলেন। হিন্দুকলেজে পাঁচ বৎসর পাঠ করিয়া তিনি ১৮৪৪ সালে উত্ত হইলেন। পর বৎসর তাহার পিতার' দেহান্ত হইল। ১৮৪৬ সালে তিনি দেবেন্দ্রনাথ। ঠাকুর মহাশয়ের দ্বারা আকৃষ্ট হইয়া ব্রাহ্মসমাজে যোগ দিলেন; এবং উপনিষদের ইংরাজী অন্ধুবাদ করিয়াতত্ত্ববোধিনী পত্রিকা সম্পাদন বিষয়ে, অক্ষয়কুমার দত্ত মহাশয়ের সহায়ড়া করিতে প্রবৃত্ত হইলেন।

 ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত ঐ কাৰ্য্য করিয়াছিলেন। তৎপরে ইংলঙে দ্বারকানাথ ঠাকুর মহাশয়ের মৃত্যুর পর, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের বৈষরিক অবস্থা মন্দ হইলে, উপনিষদ অধুবাদকের পদ উঠিল্লা যাওয়াতে তাহারও ক গেল। তিনি প্রান্ধ দেড় বৎসর কাল বসিয়া রহিলেন। পরে ১৮৪৯ সালে তিনি কলিকাতা সংস্কৃত কালেজের দ্বিতীয় ইংরাজী শিক্ষকের পদে নিযুক্ত হইলেন। এই সময়কার স্মরণীর বিষয় একটী আছে। স্বংস্কৃত কলেজে যে তিনি কেবল ক্লাসের ছাত্রফিগকে ইংরাজী পড়াইতেন তাহা নছে, কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র বিন্য্যাসাগর, দ্বারকানাথ দ্বিধাভূষণ, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, রামগতি ত্যায়রত্ন প্রভৃতি পরবর্তী সময়- প্ৰসিদ্ধ ব্যক্তিগণও তাহার নিকট ইংরাজী পড়িতেন। এই সূত্রে। রাজনারায়ণ বাবুর সঙ্গে উহাদের আত্মীয়তা জন্মে।  ১৮৪৮ হইতে ১৮৫• এই কালের মধ্যে ব্রাহ্মসমাজের অবলম্বিত ধৰ্ম্ম বিশ্বাসে একটা মুমহং পরিবর্তন ঘটে, তাহাতে রাজনারায়ণ বাবুর একটু হাত ছিল বলিয়া তাহার উল্লেখ করা যাইতেছে —সে পরিবর্তনটী এই। তৎপূৰ্ব্বে ব্রাহ্মসমাজের সভ্যগণ বেদকে আপনাদের ধৰ্ম্মবিশ্বাসের অভ্রান্ত ভিত্তি বলিয়া প্রচার করিয়া আসিতেছিলেন। রাজনারায়ণ বাবুও সেইরূপ বিশ্বাস করিতেন; এবং প্রচার করিতেন। কিন্তু ডাক্তার ডফ প্রভৃতি খ্ৰীষ্টীয় প্রচারকগণের সহিত এই বিষয়ে বিচার উপস্থিত হইয়া তাহার ফল স্বরূপ ব্রাহ্মসমাজ মধ্যেও বিচার উপস্থিত হইল। কাশী হইতে চারিজন বেদজ্ঞ ছাত্র ফিরিয়া আসিলে এই বিচার আরও পাকিয়া উঠিল। রাজনারায়ণ বাবু যখন বেদে অভ্রান্ততাবাদ রক্ষা করা কঠিন বলিয়া অনুভব করিলেন, তখন অক্ষয়কুমার দত্ত মহাশয়ের সঙ্গে মিলিত হইয়া দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহিত বিচার উপস্থিত করিলেন। তাহার ফল স্বরূপ বেদের অভ্রান্ততাবাদ ব্রাহ্মসমাজের অবলম্বিত মত হইতে পরিত্যক্ত হইল; এবং মানবেয় ধৰ্ম্ম বিশ্বাসের ভিত্তি আত্ম-প্রত্যয়ের উপরে নিহিত হইল।

 ১৮৫১ সালের ফেব্ররারি মাসে তিনি মেদিনীপুর জেলা স্কুলের হেড মাষ্টার হইয়া যান। সেখানে তিনি ১৮৬৬ সালের মার্চ মাস পর্য্যন্ত ছিলেন। মেদিনীপুরে গিয়া ত্বাহার কার্যাশক্তি অদ্ভূত রূপে বিকাশ পাইল। তিনি দেশহিতকর নানা কার্য্যে ব্যাপৃত হইয়া পড়িলেন। সভার পর সভা এইরূপে এত প্রকার সভা সমিতি করিতে লাগিলেন, যে একবার সেখানকার একজন ভদ্রলোক র্তাহাকে বলিয়াছিলেন যে—আপনার সভার জালাতে আমরা অস্থির; এইবার সভানিবারিণী সভা নামে একটা সভা স্থাপন না করিলে আর চলিতেছে না। ঐ সভায় সভ্যদিগের প্রধান কাজ হুইবে, আপনাদের কোনও সভার সংবাদ পাইলেই লাঠি সোটা লইয়া উপস্থিত হওয়া।

 মেদিনীপুরে অবস্থান কালে রাজনারায়ণ বাবু প্রধানতঃ সাত প্রকার কার্য্যে হাত দিয়াছিলেন।

 (১ম) মেদিনীপুর জেলা স্কুলের উন্নতি সাধন।
 (২য়) মেদিনীপুর ব্রাহ্মসমাজের পুনঃ স্থাপন।
 (৩য়) জাতীয়-গৌরব-সম্পাদনী সভা স্থাপন।
 (৪) সুরাপান নিবারিণী সভা স্থাপন ' '
 (৫ম) বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন।
 (৬) ধৰ্ম্মতত্ত্ব দীপিকা গ্রন্থ প্রণয়ন।

 (৭) Defence of Brahmoism and of the Brahmo Somajato's পুস্তিকা প্রণয়ন।

 ইহার প্রত্যেকটর জন্য তাঁহাকে প্রভূত পরিশ্রম করিতে হইয়াছিল। প্রথমতঃ মেদিনীপুর জেলা স্কুলে তাহার পূৰ্ব্বে একজন ফিরিঙ্গী হেড মাষ্ট্যর ছিলেন। তাঁহার অধিকার কালে স্কুলটির অবস্থ শোচনীয় হইয়া দাড়াইয়াছিল। কি শিক্ষক কি ছাত্র কাহারও মনে উন্নতির স্পৃগ দৃষ্ট হয় নাই। বস্তুজ মহাশয় কাৰ্য্যভার গ্রহণ করিয়াই স্কুলটির সর্বাঙ্গীণ উন্নতি বিধানে আপনাকে নিয়োগ করিলেন। একদিকে শিক্ষকগণের সহিত প্রীতি ও শ্রদ্ধার সম্বন্ধ স্থাপন করিয়া তাঁহাদিগকে স্বীয় স্বীয় কার্যো উৎসাহিত করিরা তুলিলেন; অপরদিকে উৎকৃষ্টতর শিক্ষা প্রণালী প্রবর্তিত করিয়া ছাত্রগণকে শিক্ষা-বিষয়ে মনোযোগী করিয়া তুলিলেন। তিনি তাহার আত্ম-জীবন চরিতে বলিয়াছেন যে তিনি প্রথম প্রথম ছাত্রদিগকে শারীরিক শাস্তি দিতেন; কিন্তু ত্বরায় সে পথ পরিত্যাগ করিলেন। দেখিলেন যে শারীরিক শাস্তি অপেক্ষ প্রেমের দ্বারা বালকদিগের হৃদর আকর্ষণ করিলে অধিক কাজ করা যায়। সেইরূপে তিনি তাহাদিগকে আপনার দিকে আকৃষ্ট করিতে সমর্থ হইলেন। ইহার ফল আমরা পরবর্তী সময়ে দেখিয়াছ। অতি অল্প ছাত্রকেই গুরুর প্রতি এরূপ প্রতি ও শ্রদ্ধা স্থাপন করিতে দেখিয়ছি। উত্তর কালে তাহার ছাত্রদিগের অনেকে কৃতী ও যশস্বী হইয়া নানা বিভাগে নানা কাৰ্য্যে গিয়াছেন। প্রায় সকলেই মেদিনীপুরের ও রাজনারায়ণ বাবুর স্মৃতি হৃদয়ে দৃঢ়মুদ্রিত করিয়া লইয়া গিয়াছেন। এই ছাত্রেরাই, উত্তর কালে উদ্যোগী হইরা তাহদের গুরুভক্তির চিহ্নস্বরূপ মেদিনীপুর একটা আবাস বাট নির্মাণ করিয়া রাজনারায়ণ বাবুকে উপহার দিয়াছিলেন।

 র্তাহার দ্বিতীয় - কার্য ব্রাহ্মসমাজের পুনঃ স্থাপন। কোন্‌নগয় নিবাসী সুপ্রসিদ্ধ শিবচন্দ্র দেব মহাশয় যখন মেদিনীপুর ডিপুটী কালেক্টরের কাজ করেন, তখন তাঁহার উদ্যোগে সেখানে ব্রাহ্মসমাজ প্রথম স্থাপিত হয়। কিন্তু শিবচন্দ্র বাবু কৰ্ম্মস্থত্রে সে স্থান পরিতু্যাগ করিলে কিছুদিন পরে সে সমাজ উঠিয়া যায়। রাজনারায়ণ বাবু ১৮৫১ সানে মেদিনীপুরে পদার্পণ করিয়াই ১৮৫২ সালে সমাজের পুনঃ প্রতিষ্ঠা করেন; এবং নিজেই তাহার উপাসনাদি কাৰ্য্য করিতে প্রবৃত্ত হন। বলিতে গেলে এতৎসংক্রান্ত কাৰ্য্যই তাঁহার জীবনের প্রধান কাৰ্য্যরূপে গণ্য হইবার উপযুক্ত; এই সমাজের সংক্সৰে তিনি যে উপদেশাদি দিতে লাগিবেন, তাহ মুদ্রিত হইয়া দেশমধ্যে ব্রাহ্মধর্ম। প্রচারের পক্ষে বিশেষ সহায়তা করিতে লাগিল। ইহা স্বরণীর ঘটনা যে তাহার মেদিনীপুরের উপদেশ পাঠ করিয়াই সুপ্রসিদ্ধ কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় ব্রাহ্মসমাজের দিকে আকৃষ্ট হইস্লাছিলেন।

 অচির কালের মধ্যে ব্রাহ্মধর্ম বিষয়ে মেদিনীপুর বঙ্গদেশের মধ্যে একটা প্রধান স্থান হইয়া উঠিল। ‘বমুজ মহাশয় কেবল মুখে ব্রাহ্মধর্ম প্রচার করিয়া সন্তুষ্ট থাকিলেন না; কিন্তু ব্রাহ্মধর্ম অনুসারে পারিবারিক অনুষ্ঠান করিতে অগ্রসর হইলেন। অনুমান ১৮৬৪ কি ১৮৬৫ সালে ব্রাহ্মধর্মের পদ্ধতি অনুসারে। কৃষ্ণধন ঘোষ নামক একজন চিকিৎসাব্যবসায়ী যুবকের সহিত তাঁহার জৈাঙা। কন্যার বিবাহ হইল। এতদুপলক্ষে কলিকাতা হইতে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, কেশবচক্র সেন প্রভৃতি ব্রাহ্মসমাজের অগ্রণীগণ মেদিনীপুরে গমন করিলেন; এবং মেদিনীপুরস্থ সকল শ্ৰেণীর সন্ত্রাস্তবাক্তিগণ সমবেত হইলেন। সে অনুষ্ঠানের তরঙ্গ দেশের অপরাপর দ্যুম্নবৰ্ত্তী স্থানেও অনুভূত হইল।

 কিন্তু ব্রাহ্মধর্ম ও ব্রাহ্মসমাজ সম্বন্ধে রাজনারায়ণ বাবুর মেদিনীপুর বাস। কালেয় প্রধান কার্যা। “স্বপ্নতত্ত্বদীপিকা’ নামক গ্রন্থ প্রণয়ন। এই গ্রন্থ তিনি। ১৮৫৩ সালে আরম্ভ করিয়া ১৮৬৬ সালে শেষ করেন। বলিতে গেলে এই গ্রন্থ প্রণরন করিতে গিয়াই তিনি গুরতর শিরঃপীড়া দ্বারা আক্রান্ত হইয়া জন্মের মত অমুস্থ হইলেন। এই গ্রন্থে যে প্রভূত গবেষণা ও চিন্তায় পরিচর পাওয়া যায়, তাহা দেখিলে বিস্মিত হইতে হয়।

 তৎপরে উল্লেখ যোগ্য বিষয় জাতীয়-গৌরবসম্পাদনী সভা। দেশীয় শিক্ষিত দলের মধ্যে জাতীয় ভাব উদ্দীপ্ত করা এই সতার উদ্দেগ্য ছিল। এতৎসংস্রবে তিনি ইংরাজীতে ‘A society for the promotion of national feeling among the educated 'Natives of Bengal, নামে এক প্রস্তাবনা পত্র বাহির করিয়াছিলেন শুনিতে পাওয়া যায়, ঐ প্রস্তাবনা পত্র পাঠ করিয়াই হিন্দুমেলার প্রবর্তক নবগোপাল মিত্র মহাশল্পের মনে তাঁহার নিজের প্রতিষ্ঠিত জাতীয় সঙ্গ] ও জাতীয় মেলায় ভাব উদিত হয়। এই জাতীর-গৌরব সম্পাদনী সভা সংক্রান্ত একটা কৌতুকজন কে ম্যুণীয় বিষয় আছে। সে সময়ে। ইংরাজী শিক্ষিত ব্যক্তিগণের মধ্যে উঠিতে বসিতে নড়িতে' চড়িতে ইংরাজী ভাষা ব্যবহারের বাড়াবাড়ি দেখিয়া উক্ত সভার সভ্যগণ এই নিয়ম করিয়াছিলেন যে তাহারা পরস্পরের সহিত জলাপে বা চিঠি পত্রাদিতে ইংরাজীর পরিবর্তে বাঙ্গালা ভাষা ব্যবহার করূিবেন; পরস্পর সাক্ষাৎ হইলে good morning, বা good night৮এর পরিবর্তে “সুপ্রভাত ও “শুভরজনী” বলিবেন; কথা বাৰ্ত্তা কহিবার সমস্ক বাঙ্গালার সঙ্গে ইংরাজী মিশ্রিত করিবেন না; যদি কেহু ভুল ক্রমে ওরূপ করেন, তবে প্রত্যেক ইংরাজী বাক্যের জন্য এক এক পরসা জরিমানা দিতে হইবে।

 মুরাপান-নিবারিণী সভার বিষয়ে এইটুকু স্মরণীয় যে রাজনারায়ণ বাবুর। প্রভাবে মেদিনীপুরের সভ্রান্ত ব্যক্তিদিগের মধ্যে অনেকে মুরাপান ত্যাগ। করিয়াছিলেন। সে জ্য নাকি র্তাহার প্রতি মাতালদিগের মহ আক্রোশ উপস্থিত হয়॥ এই মেদিনীপুর বাস কালে তাহারই উদ্যোগে তাহার জ্যেষ্ঠতাত পুত্র। হর্গানারায়ণ এবং তাহার মধ্যম সহোদর মদনমোহন, বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মতানুসারে বিধবাবিবাহ করেন।

 ১৮৬৬ সালের মার্চ মাসে অতিরিক্ত মানসিক শ্রম বশতঃ র্তাহার মাথা ঘুরুণি আরম্ভ হইল। একদিন তিনি আর মাথায় লইয়া উঠিতে পারিলেন না। সেই শিরঃপীড়া উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাইতে লাগিল। অবশেষে তিনি কৰ্ম্ম হইতে অবসর গ্রহণ করিতে বাধ্য হইলেন। অবসৃত হইয়া প্রথমে কলিকাতাtত আসিয়া বাস করিলেন। তিনি কলিকাতাতে আাসিয়া প্রতিষ্ঠিত হইবা মাত্র। নব্য ও প্রাচীন ব্রাহ্মদল তাহাকে ঘিরিয়া লইল। শরীর একটু ভাল হইতে না হইতে তাহার আবার শ্রম আরম্ভ হইল। অতঃপর তিনি স৷ত প্রকার কার্য্যে হস্তাপণ করিয়াছিলেন —(১ম) ব্রাহ্মসমাজে নরপূজ৷ নিবারণের প্রয়াস; (২য়) হিন্দুধর্মের শ্ৰেষ্ঠতা বিষয়ক বক্ত, তা; (৩য়) সে কাল এ কাল বিষয়ে বড় তা; (৪র্থ) হিন্দুকালেজইউনিয়ান নামক শিক্ষিতদিগের সন্মিলনীর আয়োজন; (৫ম) বঙ্গভাষা ও ধল্প সাহিত্য বিষয়ে বক্ত তা; (৬৯) বৃদ্ধ হিন্দুর আশা (An old Hindu'Hope) নামক প্রবন্ধ প্রকাশ; (৭ম)সারধর্মবিষয়ে গ্রন্থ রচন॥

 ইহার সকলগুলিরই প্রভাব বঙ্গসমাজে অনুভূত হইয়াছিল; এবং কোন কোনওটীর শক্তি বহুদুর ব্যপ্ত হইয়াছিল। প্রথম, ১৮৬৮ সালে যথন কতিপয় অনুগত শিষ্য কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়ের পদধারণ কয়িয়া ক্ৰন্দন ও প্রার্থনা করিতে আরম্ভ করেন, এবং তমিবন্ধন ব্রাহ্মসমাজেয় মধ্যেই নরপূজার। আন্দোলন উপস্থিত হর, তখন রাজনারাযুণ ব মহাশগ্ন স্বাস্থ্যলাভেয় উদ্দেশে উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে বাস ’ করিতেছিলেন। তাহার সমক্ষেই পূর্বোক্ত প্রকার কোনও কোনও আচরণ ঘটে। তাছাতে তিনি (Brahmic Caution, Advice and Help) নামে একখানি পুস্তিকা প্রণয়ন করিয়া তাহার ব্রাহ্মবন্ধব্লিগকে সাবধান করেন; এবং ব্রাহ্মসমাজ মধ্যে নর পুজ! নিবারণ কৰুিড়ে প্রবৃত্ত হন।

 কিন্তু এই কালের মধ্যে তাহার হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠতা বিষয়ক বক্ত,তা লোকের দৃষ্টিকে বেঁরূপ আকৰ্ষণ করিয়াছিল এবং যে তরঙ্গ তুলিয়াছিল এরপ.অল্প রক্ত, তার ভাগ্যে দেথা গিয়াছে। ঐ ব -তা যে কারণে ও যে প্রকারে প্রদত্ত হয় তাহ৷ অগ্রে কিঞ্চিৎ বন করিয়াছি। ১৮৭১ সালে ১৩ নং, কর্ণওয়ালিস। ‘খ্রীট ভবনে তদনীন্তন ট্রেনিং একাডেমির গৃহে উহ৷। প্রদত্ত হইয়াছিল। নরগোপাল মিত্রের জাতীয় সভা ঐ বক্ততা দেওয়াইবার বিষরে প্রধান উগোশ্লী ছিলখ৪ এবং ভক্তিল্ডাজন. দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় সভাপতির আসন গ্রহণ। করিয়াছিলেন। ব্রাহ্মসমাজের মধ্যেব্রাহ্মবিবাহ-আইনের আন্দোলন উপস্থিত। কাওয়াজে, এবং কেশব বাবুর দলস্থ। ব্রাহ্মগণ তদুপলক্ষে তাহারা নিজে হিন্দুধৰ্ম বিশ্বাসী নহেন বলিয়াপরিচয় দেওয়াতে, আদি ব্রাহ্মসমাজের সহিত তাহাদের বিবাদ উপস্থিত হর। রাজনারামুণ বাবুর বক্তত৷ সেই বিবাদের প্রতিধাম মাত্র। কিন্তু ঐ বক্ত; তা এত চিন্তাপূৰ্ণ, সুযুক্তি-সঙ্গত ও জাতীস্ক ভাবপূর্ণ হইয়াছিল যে, বক্তত৷ হইবামাত্র চারিদিকে ধ্য ধন্ত রব উঠিয়া গেল। . আমার স্বৰ্গীয় ' মাতুল দ্বারকানাথ বিগ্যাভূষণ মহাশয় তাহার 'সোম প্রকাশে” লিখিলেন। যে হিন্দুধৰ্ম্ম নিৰ্ব্বাণোন্মুখ হইতেছিল রাজনারায়ণ বাবু তাহাকে রক্ষা করিলেন; সনাতন ধর্ম রক্ষিণী সভার সভাপতি কালীকৃষ্ণ দেব বাহাম্রর তাহাঁর অশেষ প্রশংসা করিয়া রাজনারায়ণ বাবুকে হিন্দুকুল-শিরোমণি বলিয়া বয়ণ করিবেন; কেহ কেহ ঊাহাকে কলির ব্যাস। বলিয়া স:স্বাধন। ঋরিতে লাগিলেন; মুদুর মাদ্রাজ হইতে ধ্য ধন্ত্য রব আসিঃত লাগিপ; এবং ইংলঙে টাইমস পত্রিকাতে ঐ বতার সামাংগ ও তাহার সশেষ প্রশংসা বাহির হইল। রাজনারাষুণ কাবু বঙ্গবাসীর চিত্তে অতি উচ্চ স্থান অধিকার ঋছিলেন। কেশব বাবু'পক্ষ হইয়া অীমরা কয়েক জন তহত্তরে বক্ততা করি পাম, কিন্তু সে কথা যেন কাহারও কৰ্ণে পোঁছিল না; বরং কেশব বাবুয় লেস্থা ব্ৰাহ্মগণ অহিন্দু বলিগ হিন্দু-সমাদের অবজ্ঞার তলে পড়িলেন।

 ২০০৫ সালে শ্বহারাজা বডীজমোহনের এমারেড বাউয়ার নামক উষ্ঠনে হিন্দু কালেজ’ইউনিয়ান নামে হি খালেজের ভূত-পুর্ব ও তানীন্তন ছাত্রদের এক 'সামূজি ক সম্মিলন স্থাপিত হয়। রাজনারায়ণ বাবু তাহার প্রধান উভৈৗগকর্তাহলেনঃ তিনি ঐ সভাতে হিন্দু কালেমের ইতিবৃত্ত বিষয়ে এক বক্তৃত করেন, তাহা হইতে আমরা মিঞ্চম দিয়ে প্রাচীন ইতিবৃত্তের অনেক কথা প্রাপ্ত হই।

 ১৮৭৯ সালে তিনি কলিকাতা পরিত্যাগ করিয়া দেওঘর নামক স্বাস্থ্যকর স্থানে গিয়া বাস করেন। সেখানে গিয়া বাৰ্দ্ধক্য ও শারীরিক হূৰ্বলতা সত্বেও দেশের কল্যাণ চিন্তাতে বিমুখ হন নাই। এখানে অবস্থিতি কালে তিনি *An Old Hindu's Hopes—"floan oltåla, food wroi” atta ইংরাজীতে একখানি পুস্তিক প্রচার করেন। তাছাতে স্বদেশবাসিগণকে এক” মহাহিন্দু-সমিতি গঠন করিতে অনুরোধ করেন। ঐ গ্রন্থ অনেকের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করে। বলিতে গেলে তাহাকে পরবর্তী কংগ্রেসের অথবা মহাধৰ্ম্মমণ্ডল নামক সভার পূর্বাভাস বলা যাইতে পারে। তাহাতে যে স্বদেশ ও স্বজাতি প্রেমের উদ্দীপনা দেখা যায় তাহ অতীব স্পৃহণীয়।

 ইহার পরে তিনি তাঙ্গুলোপহার’ নামে বাঙ্গালীতে একখানি ক্ষুদ্রকায় পুস্তিকা প্রণয়ন করেন; এবং সর্বশেষে সারধৰ্ম্মের লক্ষণ বিষয়ে ইংরাজীতে এক পুস্তিক প্রণয়ন করেন। এই পুস্তকে দেখা যায় যে তিনি ধৰ্ম্ম সম্বন্ধে অতি উচ্চ ও উদার স্থান অধিকার করিয়াছিলেন। আর বস্তুতঃ এই সময়ে তাহার নিকটে বসিলে একদিকে তাহায় ঈশ্বরে প্রগাঢ়,ভক্তি, জুপরদিকে সৰ্ব্বদেশীয় ও সৰ্ব্ব কালের সাধু ভক্তগণের প্রতি প্রগাঢ় শ্রদ্ধা, দেখিয়া বিম্মিত হইতে হইত। এক সময়ে তিনি ভারতীয় আর্য ঋষিগণের বচন উদ্ধৃত করিয়া তাহদের চরণে লুষ্ঠিত হইতেছেন; পরক্ষণেই হাফেজের বচনাবলি উদ্ভূত করিয়া ভক্তিতে গদগদ হইতেছেন; আবার হয়ত তৎপরক্ষণেই মাদাম গেঔর উক্তি সকল উদ্ধৃত করিয়া প্রেমশ্রি বর্ষণ করিতেছেন। তাঁহাকে। দেখিলে মনে হইত যেন তিনি ভক্তি-সুধাবনে ভৃঙ্গের দ্যায়, ফুলে ফুলে মধুপান করাই তাহার প্রধান কাজ।

 এরূপ অবস্থাতে যাহা স্বাভাবিক তাহাই ঘটিয়াছিল। তিনি সকল শ্রেণীর, সকল সম্প্রদায়ের, মানুষের পূজিত হইয়াছিলেন। একবার দেওঘরে উাহাকে দেখিতে যাইতেছি, মধুপুরে গাড়ি থামিলে বৈদ্যনাথের পাণ্ডার উপস্থিত—“মশাই কি বৈদ্যমাথে যাবেন?” উত্তর—“ই যাব।” প্রশ্ন— “আপনার পাণ্ড কে “উত্তর-“রাজনারায়ণ বস্থ।” পাণ্ড হাসিয়া বলিল"ণ্ড ত আমাদের দোসর বৈশ্বনাথ"। তাহার শেষ পীড়ার সংবাদ পাইবাগিং দেখি তাহার শুশ্ৰুষার জন্য একজন খ্ৰীষ্টীয়ান বন্ধু নিযুক্ত আছৈন; এবং“একজন হিন্দু সন্ন্যাসী তাহাকে দেখিবার জন্ত ও তাঁহার কাছে কুয়েক দিন থাকিবার জন্ত বৈনাথের নিকটস্থ তপো পাহাড় হইতে নামিয়া আসিয়াছেন। ইহা কিছুই• আশ্বৰ্য্য নয়, যে তাঁহার সহাধ্যায়ী বন্ধু প্রসিদ্ধ ভূদেব মুখোপাধ্যায় একবার নিজের গলদেশ হইতে উপবীত লইয়া তাহার গলে দিয়া বলিয়াছিলেন, “রাজনারায়ণ তুমিই প্রকৃত ব্রাহ্মণ, আমরা তোমার তুলনায় কিছুই নহি।”

 এইরূপে সৰ্ব্বশ্রেণীর,“সৰ্ব্ব সম্প্রদায়ের, সৰ্ব্বজনের খ্ৰীতি ও শ্রদ্ধায় প্রতিষ্ঠিত থাকিতে থাকিতে ১৮৯৯ সালে পক্ষাঘাত রোগে তিনি গতাস্থ হন। ইনি রামতনু লাহিড়ী মহাশয়ের একজন সন্মানিত বন্ধু ছিলেন।

আনন্দ মোহন বসু।

 চরিত্রবান মানুষই একটা জাতির প্রধান সম্পত্তি। কোন দেশে কহু ধন। ধাগ্য আছে, তাহা দিয়া সে দেশের মহত্ত্বের বিচার নহে, কিন্তু সে দেণ ক’ত চরিত্রবান্, গুণী, জ্ঞানী, মানুষকে জন্ম দিয়াছে, সাহিত্য বিজ্ঞান প্রভৃতিতে কত প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে, সদদুষ্ঠানে কত কৃতিত্ব লাভ করিয়াছে, এই সকলের দ্বারাই সেই মহত্ত্বের বিচার। বঙ্গদেশ যে নব্যভারতে গৌরবান্বিত হইরাছে তাহা ইহার ধন ধান্যের জ্য কখনই নহে। যে দেশ রামমোহন রায়কে জন্ম দিয়াছে, বাহাতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ত্যায় মানুষ দেখা দিয়াছে, যে দেশে। দেবেন্দ্ৰ নাথের স্বাধিত, কেশবের বাগিতারাজেন্দ্র লালের পাণ্ডিত্য। মহেঞ্জের সত্যানুয়াগ, বঙ্কিমের প্রতিভাকৃষ্ণদাসের কৃতিত্ব, আরও ছোট বড় কত কত ব্যক্তির মনুষ্যত্ব প্রকাশ পাইয়াছে, সে দেশ কি লোকচক্ষে বড় না হইয়া যায়! আনন্দ মোহন বস্তু, শিক্ষা ও সাধুতাতে এই গৌরবাম্বিত দলের। একজন অগ্রণী ব্যক্তি ছিলেন। নব্যবগের তৃতীয় যুগের নেতৃবৃনের মধ্যে তিনি একজন প্রধান পুরুষ। সুতরাং তাহার জীবন চরিত সংক্ষেপে বৰ্ণন করিতে। যাইতেছি:

 আনন্দমোহন বঙ্গের ময়মনসিংহ জেলাস্থিত জয়সিদ্ধি নামক গ্রামে ‘১৮৪৭ খ্রীষ্টাব্দে জন্ম গ্রহণ . ঝরেন। তাহার পিতার নাম পদ্মলোচন বস্তু। পদ্মলোচন ময়মনসিংহ নগরে। শেরেস্তাদারী কাজ করিতেন; এবং পদে ও সন্ত্রমে বড় লোক ছিলেন। হরমোহন ও'মোহিনী মোহন নামে পদ্মলোচন বসু

মহাশয়ের আর দুই পুত্র ছিলেন; হরমোহন সৰ্বজ্যেষ্ঠ এবং মোহিনী মোহন সর্ব্ব-কনিষ্ঠ,আানন্দমোহন দ্বিতীয়। 

Anandamohan Bose.jpg
স্বর্গীয় আনন্দ মোহন বসু।

(৩২৪ পৃষ্ঠা)

 আনন্দমোহনের পঠদ্দশাতেই প্তাহার পিতৃবিয়োগ হয়। তখন তাহায় বিধবা মাতা উমাকিশোরীর প্রতি তিন পুত্রের রক্ষা ও শিক্ষা প্রভৃতির ভার পড়ে। তিনি সে ভার সমুচিতরূপেই বহন করিয়াছিলেন॥ সেই ধৰ্মপরায়ণগ নারীর একদিকে যেমন সন্তানদিগের প্রতি প্রগাঢ় বাংসল্য ছিল, অপর দিকে তেমনি। তাহাদের চরিত্রের প্রতি প্ৰথর দৃষ্টি এবং শাসনশক্তিও প্রচুর ছিল। ফলতঃ এই সময় হইতে তিনি। কি রূপে একদিকে দক্ষতার সহিত আপনার বিষয় সম্পত্তি রক্ষা করিত লাগিলেন, এবং অপর দিকে সন্তানগণের রক্ষা ও শিক্ষাদির ব্যবস্থা করিতে লাগিলেন, তাহা যখন শ্রবণ করা যার তথন বিস্ময়াবিষ্ট হইতে হয়। 'মনে হয় এই সকল রমণী যদি সমুচিত শিক্ষা ও কাৰ্য্য করিবার সুবিধা লাভ করিতেন তাহা হইলে স্বীয় স্বীয় প্রদেশে এক একটী রক্তির উৎস স্বরূপ হইয়া দেশের কি মহোপকারই সাধন করিতে পারিতেন।

 ধৰ্ম্ম-পরায়ণতা আনন্দমোহনের মাতার চরিত্রের প্রধান লক্ষণ ছিল। তাহার দৃষ্টান্তস্বরূপ ছুইটী বিষয়ের উল্লেখ করিলেই যথেষ্ট হইবে। তাহার। পতির মৃত্যুর পর তিনি প্রায় পঞ্চাশ বৎসর জীবিত ছিলেন। এই দীর্ঘকালের মধ্যে তিনি তাহার পতির স্বতিকে হৃদরের অতি উচ্চ স্থানে ধারণ করিয়া ছিলেন। সামা্য কথোপকথনে যদি কেহ তাহার স্বৰ্গীয় পতির নাম উচ্চারণ করিত, উমাকিশোরী তৎক্ষণাং বক্তাকে ক্ষণকাল স্তব্ধ হইতে বলিতেন দুই কর যোড় করিয়া নিজ শিরে যাৱণ করিতেন; এবং উদ্দেশে স্বর্গীয় কৰ্ত্তাকে প্রণাম করিয়া তৎপরে অবশিষ্ট কথা শুনিতে প্রবৃত্ত হইতেন। এরূপ অসামাষ্ঠ্য পতিভক্তি কয়জন স্ত্রীলোকে দেখিতে পাওয়া যায়! তৎপরে তাহার বংশধরদিগের মুখে শুনিয়াছি, তাঁর সাধুভক্তি এমনি প্রবল ছিল যে তিনি গাড়ি করিয়াপথে যাইবার সমর যদি শুনিতে পাইডেন যে পথপার্ষে একজন মুসলমান পী:রর গোর রহিয়াছে, তাহ৷ হইলে কখনই তাহার সম্মুখ দিয়া গাড়ি হাকাইয়৷ যাইতেন না, গাড়ি হইতে। অবতরণ করিয়া গলবস্ত্ৰে সেই গোর প্রদক্ষিণ পূর্বক অপর দিকে গিয়৷ গাড়িতে। উঠিতেন। সঙ্গের বালক বাণিকার হাসিয়া বলিত “ঠাকুর মা ওকি, ওযে, মুসলমান পীর, তুমি যে হিন্দুর মেয়ে” তখন তিনি। বলিতেন—“সাধুর “আবার হিন্দু মুসলমান কি রে”? আমরা স্বচক্ষে দেখিয়াছি তাহার তিন পুত্রই এই সাধুভক্তি ও উদারতা প্রচুর পরিমাণে লাভ করিরাছিলেন। আর একটী ঘটনা আমাদের স্মৃতিতে মুদ্রিত রহিয়াছে। একবার ‘সার জন লরেন্স’ নামক এক জাহাজে অনেক সুপি জগন্নাপয় যাত্রী: পুরীতে: ঘাইতেছিল। বঙ্গোপনগরের মুখে রায় হুইয়া। ঐ জাহাজ জলমগ্ন হয়। সেই জাহীঙ্গে ৰঘুঙ্গ মহাশয়ের মাতার - যাইবার কথা। ছিল; কোন ও প্রতিবন্ধক বণতঃ যা ওয়া হয় নাই। তাহার পৌত্র পৌত্রীরা। যখন গিয়া। তাহাকে এই সংবাদ, দিয, বলিতে লগল—“ঠাকুর মা-ভাগ্যে তুমি সে জাহাজে যাও মাই, জাহাজ ডুবে এত লোক মরেছে।” তখন সেই সংবাদ শুনিয়া আনন্দ না। করিয়া উমাকিশোরী ক্ৰন্দন করিতে লাগিলেন “হায় না জানি আমার পূর্ধস্বন্মের কি পাপই আছে! আমি কেন সে জাহাজে থাকিলাম না? জগন্নাথের পথে যাদের প্রাণ যায় তার ত ধন্ত।”

 বলিতে গেলে শৈশব হইতেই আনন্দমোহন এই সাধুচক্তি ও ধৰ্ম নিষ্ঠার 'দৃষ্টান্ত প্ৰদৰ্শন করিতে লাগিলেন। কোনও সং বিষয়ের প্রসঙ্গ হইলেই পিপীলিকা যেরূপ মধু বিন্দুর দিকে আরুষ্ট হয়, তেমনি কিনি সেই দিকে আকৃষ্ট হইতেন; এবং ধর্মের বিধিবাবস্থা সকল পুপ্ৰানুপুরূপে পালন করিতেন।

 যেমন একদিকে ধর্মানুরাগ তেমনি অপস দিকে আশ্য প্রতিভা। পাঠে। অত্যর বালকেরই এ প্রকার অভিনিবেশ দেখা যাইত। . তাহার বয়ঃক্রম যখন | নয় বৎসরের অধিক হইবে ন৷ তখন তিনি ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হুইস্রা চারি টাকা বৃত্তি পাইলেন।; পাইয়া সয়মনসি:হ জেলা স্কুণে ইংরাজী পড়িতে আরম্ভ করিলেন॥ ১৮৬২ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষাতে উত্তীৰ্ণ হইয়! তিনি তৎকালীন প্রথম শ্রেণীর ১৮ টাকা বৃত্তি প্রাপ্ত হন।: শুনিয়াছি ইহার কিছুদিন পূর্বেই তাহার পিতৃবিয়োগ হয়; সেজষ্ঠ গোলমালে তাঁহার পরীক্ষার পূর্বে। তিন মাস পড়া হয় নাই।; তথাপি এই উচ্চস্থান অধিকার করিয়াছিলেন। এই সময়ে বা ইহার কিছু পরে প্রসিদ্ধ ডেপুটী মাজিটে ভগবানচন্দ্র বস্তু মহাশয়ের জ্যেষ্ঠা কন্যস্বর্ণপ্রভার সহিত তাহার বিবাহ হক্স। প্রবেশিকা পরীক্ষাতে উৰ্ত্তীণ হইয়া তিনি কলিকাতার প্রেনিডেমি কাণেজে আসেন; এবং এখানে এক-এ, বি-এ, এম-এ প্রভৃতি সমুদয় পদ্মীক্ষাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্থান অধিকার করিতে থাকেন এবং সর্বশ্রেষ্ঠ বৃত্তিও পারিতোষিকাদি ’ লাভ করেন।: এই সময়ে গাহার অঙ্কশাস্ত্রে। পারদর্শিতার খ্যাতি সৰ্বত্র ব্য’তম।

 ময়মনসিংহে গাকিতেই তিনি ব্রাহ্মসমাজের নাম শুনিয়ৰছিলেন এবং ক্রাসবিশেল্প: সংশ্রবে অসয়াছিলেন। কলিকাতাতে আসিয়া ..অপরাপয়। যুবকের চার তিনিওঁ কেশবচারোর বাক্সা -ব্রাহ্মসমাজের দিকে আকৃষ্ট:হন; এরং ১৮৮৯ সালে যখন ভারতবর্ষীয় ব্রহ্মমন্দিরের প্রতিচ্ছ৷ হয়, তখন জপর। কতিপয় বন্ধুর সহিত ব্রাহ্মধর্মে দীক্ষিত হন।

 কালেজ হইতে উত্তীৰ্ণ হইয়:ই. তিনি এঞ্জিনিয়ারিং কলেজে অশ্বাস্ত্রের, প্রোফেদারের, কর্ম পার!!, এই কৰ্ম্ম করিতে করতে তিনি রাজশ্চাদ”প্রেমৰ্চা বৃত্তি লাভ করেন; এবং সেই বৃত্তিবু টাকা বৃথ৷ ব্যবহার না করিয়া ইংলওগমনে ও নিজ শিক্ষার উন্নতিবিধানে নিয়োগ করিবার জন্তাকৃতসংকল্প হন। ১৮৭০ সালে কেশবচন্দ্র সেন মহাশূন্য যখন। বিলাতঘাত্রা করেন, তখন আনন্দমোহন ত৷হার সমভিবাহারী হন। ১৮৭৪ পর্যন্ত ইংলঙে থাকিয়া তিনি কেম্বিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন এবং তথ্যকার সর্বাচ্চ র্যাগলার উপাধি লাভ করেন। সেখানে বাস কালে তিনি যে কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা লইয়ই ব্যস্ত থাকিতেন তাহ। নহে। ভলণ্টিয়ার দলে প্রবেশ করিয়। যুদ্ধবিদ্যা শিক্ষ৷ করিতেন; ভারতহিতৈষী ফঃসট প্রভৃতির সহিত মিলিয়া ভারতীয় রাজনীতির আলোচনা করতেন; সভাসমিতিতে রাজনীতি বিষয়ে বক্ত, তাদ করি-তন; সুরাপাননিবাঁরিণী সভার সহিত যোগ দিয়া৷ আরাধানের বিরুদ্ধে সমর ঘোষণা করিতেন; এবং সর্বপ্রকারে আপনার হৃদয় মনের উন্নতিবিধানে নিযুক্ত থাকিতেন।

 ১৮৭৪ সালে তিনি বাঁৱিষ্টারি পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হইয়া দেশে ফিরিলেন। ফিরিয়া দেখেন, ব্রাহ্মসমাজে ভাবার সমর-ইন্দুভি বাঠি তেছে। খ্রীস্বাধীনতার আন্দোলন ও সমজের কার্যো নিমতন্ত্ৰ প্ৰণালী স্থাপনের আা:নাগন উঠিয়াছে। কিন্তু ওদংক যুকদলের উপরে ব্রাহ্মসমাজের শক্তি হ্রাস হইতেছে। কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়” যুবক দলের নেতৃত্ব হইতে অবসৃত হইয় যোগ, ভক্তি, রৈরাগ! প্রভৃতি লইয়া একান্তে সরিয়া পড়িতেছেন। ধভুজ মহাশয় এই অবস্থাতে প্রথমে ছাত্রদলকে’ এইয়া কাৰ্য্য আরম্ভ করিলেন। ছাত্রদিগের জ্য একটী সভাস্থাপন করিয়া বিবিধপ্রকারে তাহাদের উতিবিধানে নিযুক্ত হইলেন। অপরদিকে ব্রাহ্মনমাজের খ্রীস্বাধীনতাপক্ষীয় ও নিরমতন্ত্ৰ-পঙ্গীয় ব্যক্ৰিগণের সহিত মিলিত হইয়া উক্ত উভয় বিষয়ে সাহায্যকরিতে লাগিগেন তাহার ও স্বগীয় টুর্গান্দেহন যাদের সাহায্যে র্ঘাঁৰাধীনতাপনীয়গণের পূর্বপ্রতিষ্ঠিত ভারতমহিলা বিদ্যালয় পরিবপ্তিষ্ঠ হইয়া-ৰঙ্গমহিলাবিদ্যালয় নাম ধারণ করিল, এবং মহিলাগণের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করিঙে’ অগ্রসর হইল। এই বঙ্গমছিল! বিiিল পরে বেথুন খুলের সহিত মিলিত হইইবেথুন কালেক্সপোশরিণতহাংt,  এই ক্ষেত্রে স্বরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় রাজকাৰ্য হইতে অবসর পাইয়া কলিকাতাতে আসিলেন; এবং আনন্দমোহনের২২৫ সহিত মিলিত হইয়। রাজনীতি চর্চাতে নিমগ্ন হইলেন। সেই চর্চার ফলস্বরূপ ১৮৭৬ সালে ভারত-সভা Indian Association) স্থাপিত হইল। আনন্দমোহন তাহার প্রথম সেক্রেটারি হইলেন; এবং বহুদিন সেক্রেটারি ছিলেন।

 ব্রাহ্মসমাজে স্ত্রীস্বাধীনতার আন্দোলন, ও নিয়মতন্ত্র-প্রণালী স্থাপনের আন্দোলন পাকিয়া উঠিতে না উঠিতে ১৮৭৮ সালের মার্চ মাসে সুপ্রসিদ্ধ কুচবিহার বিবাহের আন্দোলন উঠিয়া গেল, এবং উন্নতিশীল ব্রাহ্মদল ভাঙ্গিয়া দুইভাগ হইয়া গেল। স্ত্রীস্বাধীনতার দল, নিয়মতন্ত্রের দল, ও কুচবিহার বিবাহের প্রতিবাদকারী দল, তিন দল মিলিত হইয়া সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ নামে এক নুতন সমাজ স্থাপন করিলেন।

 যাহারা সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন করিলেন, তাহারা আনন্দমোহনকে সারথি করিয়া কার্য্যে প্রবৃত্ত হইলেন। তিনিই ইহার প্রথম সভাপতি হইলেন। তৎপরে ইহার কার্য্যে তাহার যে প্রকার অবিশ্রান্ত মনোযোগ ও অক্লান্ত পরিশ্রম দেখা গেল তাঁহা স্মরণ করিলে আশ্চর্যান্বিত হইতে হয়। মানুষে কি এত খাটিতে পারে? ইহার কার্য্যপ্রণালী বিষয়ে চিন্তা ও বিচার করিতে করিতে এক এক দিন রাত্রি দুইটা বাজিয়া যাইত, আমরা আর বসিতে পারিতাম না, কিন্তু আনন্দমোহনের শ্রান্তি ক্লান্তি ছিল না। আমরা দেখিতাম ইহার কার্য্যে আত্মসমর্পণ করিয়া তিনি আপনার বারিষ্টারি ও ধনাগমের কথা ভুলিয়৷ যাইতেছেন। তাহন হইলে তাহার বিদ্যাবুদ্ধি দিয়া বিচার করিলে, ইহা নিশ্চিত বলা যায় যে তিনি বারিষ্টারির দ্বারা দেশের ধনীদিগের মধ্যে একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তি হইতে পারিতেন। ইহার পরে শিক্ষা বিভাগে তাহার কার্য আরম্ভ হইল। ১৮৭৭ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাহাকে সেনেটের একজন ফেলোরূপে বরণ করিলেন। ১৮৭৮ সালে তিনি সেনেট হইতে সিণ্ডিকেটে গেলেন। সিণ্ডিকেটের মেম্বররুপে দেশের শিক্ষানীতি গঠন বিষয়ে সহায়তা করিরা তিনি সন্তুষ্ট থাকিলেন না। ১৮৭৯ সালে ঐযুক্ত স্বরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কতিপয় ব্রাহ্মবন্ধুর সহিত মিলিয়া তিনি সিটাস্কুল নামে একটী স্কুল স্থাপন করিলেন। ঐ স্কুল ক্রমে সহরের একটা প্রধান কালেজরূপে পরিগণিত হইয়াছে। বস্থজ মহাশয় মৃত্যুর পূর্বকাল পর্যন্ত ঐ কলেজের তত্ত্বাবধান করিয়াছেন। ইহার কাৰ্য্যে তাঁহার অবিভ্রান্ত মনোযোগ ছিল। তাহার ইচ্ছা ছিল বে পুনার ফাও সন কালেজের ছাতৃমণ্ডলীর ন্যায় একটী ত্যাগশীল জাতৃমণ্ডলী গঠন করিয়া, তাহাদের হাতে কালেজটী দিয়া যান; কিন্তু ঐ কালেজ-সংসৃষ্ট। বন্ধুগণের প্রতিকূলতা বশতঃ তাহ৷ সম্পূৰ্ণ করিয়| উঠিতে পারেন নাই; অবশেষে কালেজটী। টুইডীড় করিম্ব সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের হস্তে দিয়া গিয়াছেন।

 ১৮৮৪ সালে গবৰ্ণর জেনেরাল লর্ড রিপনের বিশেষ অনুরোধে তিনি এডুকেশন কমিশনের সভ্য হন; এবং তাহার কার্য্য সমাধা করিবার জন্য যথেষ্ট পরিশ্রম করেন। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাহাকে আপনাদের প্রতিনিধি রূপে লেপ্টনাট গবৰ্ণরের ব্যবস্থাপক সভাতে প্রেরণ করেন। তদ্ভিন্ন গবৰ্ণমেন্ট তাহাকে উক্ত সভার সভ্যরূপে মনোনীত করেন। এতদ্ভিন্ন তিনি কলিকাতা। মিউনিসিপালিটীর কমিশনাররূপেও মনোনীত হইয়াছিলেন।

 বস্তুতঃ কিরূপে একজন মানুষ এত বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারি, তাহ৷ ভাবিলে আশ্চর্যান্বিত হইতে হয়। আমরা সকলে দেখিয়া আশ্চর্যান্বিত হইতাম যে যখন তিনি ব্রাহ্মসমাজে অবিশ্ৰান্ত থাটিতেছেন, সিটীকালেজে ও বিশ্ববিস্তা লয়ের সিণ্ডিকেটে পরিশ্রম করিতেছেন, লেপ্টনান্ট গবৰ্ণরের ব্যবস্থাপক সভাতে নুতন আইন প্রণয়ন বিষরে। পরামর্শ দিতেছেন, ভারতসভাতে রাজনীতির চিন্তা করিতেছেন, তখন জাবার। বন্ধুগণের সহিত মিলিৱা দেশের স্থনীতি ও সুরাপান নিবারণের জন্য পরিশ্রম করিতেছেন। মেট্ৰপলিটান টেম্পারেন্স ও পিউরিটী এসোসিএশানের তিনি সভাপতি ছিলেন। মুরাপান নিবারণ বিষয়ে। বড় চেষ্ট। তিনি যৌবনের প্রারম্ভ হইতে করিয়া আসিয়াছেন। পঠদশার। ইংলঙে গির। সেখানকার সুরাপান নিবারিণী সভার সভ্যগণের সহিত মিলিয়। কাজ করিয়াছেন; এখানে প্যারীচাদ সরকার ও কেশব চন্দ্র সেন মহাশয়ের সহিত মিলিয়৷ সুরাপান নিবারণের জন্য খাটিস্মাছেন এবংশেবদশাতে দেহে বত দিন শক্তি থাকিয়াছে, ততদিন এক্ষেত্রে পরিশ্রম করিয়াছেন।

 রাজনীতি বিভাগেও তাহার কার্য বড় অল্প ছিল না॥ অগ্ৰেই বলিয়াছি পঠদশাতে ইংলঙে গিয়৷ উদারনৈতিক ও .ভারতহিতৈষী ফসেট প্রভৃতির সহিত মিশিয়া৷ রাজনীতির চর্চা করিতেন। দেশে ফিরিয়া আসিয়াই দেখিলেন। সেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণীরু মাহুষদের জঠ কোনও রাজনৈতিক সভা নাই; তাই উভোগী হইয়া সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় প্রভৃতি বন্ধগণের সহিত একযোগে ১৮৭৬ সালে ভারত সভা স্থাপন করিলেন। ইহা অগ্রেই উক্ত হইয়াছে। তিনি প্রথম কয়েক বৎসর তারতসভার পরামর্শদাতা, নিৰ্বাহকৰ্ত্তাতত্বাবধায়ক সকলি। ছিলেন। পরে অপরেরা তাহাতে যোগ দিলে এবং কার্যভার গ্রহণ করিলে, তিনি কমিটীতে থাকিয়া চিরদিন ইহার কার্য্যের সহায়তা করিয়া আসিয়াছেন। তাসনাল কংগ্রেসের তিনি একজন উৎসাহী সভ্য ছিলেন। ইহার সকল পরামর্শের মধ্যে থাকিতেন; এবং একবার মাত্রাজ অধিবেশনে ইহার সভাপতির কার্য্য করিয়াছিলেন।

 এ সকল বলিলেও তিনি কিরূপ স্বদেশ-প্রেমিক ছিলেন, তাহা বলা। হইল না। তিনি বখনি যে স্থানে যে অবস্থাতে থাকিয়াছেন, স্বদেশের হিত চিন্ত| তাহার হৃদয়ের সৰ্ব্বোচ্চ স্থান অধিকার করিয়া থাকিয়াছে।

 ১৮৯৭ ১৮৯৮ সালে তাঁহার দুই পুত্রকে শিক্ষার জন্য ইংলঙে প্রেরণ করা আবভাক হয়। তখন বন্ধুজনের পরামর্শে তিনিও স্বাস্থ্যের জন্য তাহাদের। সঙ্গে গিয়াছিলেন। স্বাস্থ্যের জন্য গেলেন বটে, কিন্তু সেখানে গিরা ঐাহার স্বদেশপ্রেম তাহাকে মুস্থির থাকিতে দিল না। তিনি নগরে নগরে ভ্রমণ করিয়া, নানা সভাসমিতিতে ভারতের হঃখের কাহিনী বলিয়া বেড়াইতে লাগিলেন; এবং এদেশের প্রতি ইংলণ্ডীয় রাজনীতিজ্ঞগণের ও ইংরাজজাতির দৃষ্টি আকৰ্ষণ করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। বলিতে গেলে সেই গুরুতর। শ্ৰমেই তাহার শরীর ভাঙ্গিয়া পড়িল। তিনি দেশে ফিরিয়া আসিলে দেশবাসিগণ তাহার অভ্যর্থনার জঠ্য টাউনহলে'এক সভা করিলেন। সেই সভাতে বলিতে বলিতে তিনি অচৈত্য হইয়া পড়িলেন। বন্ধুগণ বুঝিলেন। কাল শক্র ধরিয়াছে। সেই যে কি এক রোগে দেখা দিল, তাহাতেই তাহার প্রাণ গেল। মধ্যে মধ্যে অচৈতন্য হইতেন; এবং কোনও বিষয়ে আার। পূর্বের তার ভাবিতে ও খাটতে পারিতেন না। চিকিৎসকগণ ও পরিবারবর্গ। তাহাকে চিন্তা ও শ্রম হইভে দূরে রাখিবার জন্য বিশেষ চেষ্টা করিতে লাগিলেন। কিন্তু চেষ্টা করিলে কি হইৰে? বে মানুষ চিরদিন আত্মাচিস্তা তুলিয়া স্বদেশের। হিতচিন্তা করিয়া আসিয়াছেন, তাহাকে কি সম্পূর্ণ নিবারণ করিল্লা রাখা যায় ! "১৯০৫ সালে ব্রাহ্মসমাজের মহোৎসবের সময় তিনি। কাহারও নিষেধ ন৷ শুনিয়া প্রায় সমস্ত দিন ব্রহ্মমন্দিরে ধৰ্মসাধন ও ধর্মালোচনার মধ্যে যাপন। করিতে গেলেন। রাত্রে বাড়ীতে আসিয়া! অ'হইয়া পড়িবোন। তদবধি তাহার দমদমস্থ ভবনে ও কলিকাতার বাসগৃহে তরে .তয়ে উiহাকে এক প্রকার বুদীদশাতে মাথা হইত; যাহাতে চিত্তের উত্ণেনা হয় এরপ কথা শোনান। হইত না; এবং ৰাহ্মসমাজের বন্ধুবান্ধব কম সাক্ষাৎ করিতেন। এইরূপে প্রার দেড় বৎসর কাটিয়া গেল! ইহার মধ্যে শেষকীৰ্ত্তি বঙ্গের অঙ্গচ্ছেদের সময় ফেডারেশন হলের ভিত্তিস্থাপন উপলক্ষে বক্ততা। বলিতে গেলে এক প্রকার মৃত্যু শয্যা হইতে লোকে তাহাকে বহিয়া লইয়া গেল। কিন্তু তিনি সেই অবস্থাতে গিয়া যাহা বলিলেন তাহার প্রত্যেক বাক্য অগ্নি উদগীরণ করিতে লাগিল। মানব-বাক্যের যে এরূপ উন্মাদিনী শক্তি থাকে, লোকে তাহ জানিত না। তিনি কি ভাবে যে ঐ সভাতে সভাপতিত্ব করিতে। গিয়াছিলেন, ভাহা তাহার বক্ত,তাতে উচ্চারিত নিম্নলিখিত প্রার্থনা হইতে জানিতে পার! যার।


প্রার্থনা

 And Thou, Oh God of this Ancient land, the protec tor and saviour of Arguounta and the Merciful Father of us all, by whatever name we call upon Thee, be with us on this day, and as a father gathereth his children under his arms, do Thou gather us under thy protecting and sanctifying care.

 ঐ বক্ত তান্তে তিনি একটী ঘোষণ-পত্র পাঠ করেন, তা হাতে এই ব্যক্ত হয়। যে, বঙ্গের অঙ্গচ্ছেদ করিয়া গবৰ্ণমেণ্ট যে অনিষ্ট সাধন করিয়াছেন, যথাসাধ্য সেই অনিষ্ট ফল নিবারণ করিবার জন্ত শিক্ষিত বাঙ্গালীগণ প্রতিজ্ঞারাঢ় হইতেছেন।

 বলিতে গেলে সেই ঘোষণাপত্র হইতেই বঙ্গদেশের মহা য়াজনৈতিক আন্দোলন উঠিল্লাgছ। আমরা সেই তরঙ্গের মধ্যে বাস করিতেছি। ইহার চরম ফল কি. দাড়াইবে ভাহা এখনও অনুভব করা যাইতেছে না।' আননমোহনেয়। ত্যায় পবিত্রচিত্ত, অকপট স্বদেশপ্রেমিক, চিত্মাণী, ও ভূমোদর্শনবিশিষ্ট নেতা এখন কাৰ্য্যক্ষেত্রে থাকিলে বিশেষ উপকার হইত সন্দেহ নাই। এই ফেডারেশন হলের ভিত্তিস্থাপনের পর আনলমোহন প্রায় এক বৎসর কাল জীবন্থতাবস্থাতে শ্যাশারী ছিলেন। তাহার মধ্যেও বালুবান্ধবের ও পরিবারবর্গের অজ্ঞাতসারে অমৃতবাজার পত্রিকা, প্রভৃতিতে লিথিতে ক্রটী করেন নাই। দেশের যে কল্যাণচিন্তা৷ fদন রাত্রি তাহার হৃদয়কে অধিকার করিয়ছিল, তাঁহা জীব” ভাবস্থাতেওর্তাহাকে ছাড়ে ন ই।

 অবশেষে ১৯০৭ সালের ২০ আগষ্ট প্রাতে প্রাণবন্তু তাহার রুগু ভগ্ন দেহকে পরিত্যাগ করিয়া গেল। ব্রাহ্মসমাজ একজন আগশ নেণ্ডা হান্নাইল; জননী জন্মভূমি একজন অকত্ৰিম ভক্ত সেবক হাৱাইলেন, বঙ্গদেশ একজন প্রতিভা শালী, ধীমান, মুখোজলকারী সন্তান হারাইলেন; এবং আমরা একজন অকপট, উদারচেতা, বিনয়ী, ঈশ্বর-ভক্ত বন্ধু হারাইলাম। দেশের লোক আলমোহনকে বুদ্ধিমান, যশস্বী, দেশহিতৈষী, সুবক্ত, কেজি র্যাংলার, ও লব্ধপ্রতিষ্ঠ বারিষ্টার বলিয়া জানিতেন, কিন্তু আনন্দমোহনের গৌরব সেখানে নহে। তাহার প্রধান .মহত্ব ও প্রধান আকর্ষণ র্তাহার পারিবারিক ও লামাজিক জীবনে ছিল। গোপনে, দৈনিক জীবনে, যাহারা তাহার সংশ্রবে আসিতেন, তাহারাই তাহার অকৃত্রিম সাধুতা দেখিয়া মুগ্ধ হইতেন। তাহার জীবনের ও চরিত্রের মূলে এই কথা ছিল যে, এ জীবন ঈশ্বরের ন্যস্ত নিধি স্বরূপ, ইহা তাহার কার্য্যেই ব্যবহৃত হওয়া উচিত।

 ব্রাহ্মসমাজের উৎসবাদিতে তাহার ভক্তি অশ্রশ্নবিত মুখ আমরা কখনই ভুলিব না। তিনি অতি অন্তরতম আত্মীয়দিগের নিকটও আপনার হৃদয়ের গভীরভাব সকল ব্যক্ত করিতে লজ্জা পাইতেন; পরিবার পরিজনবর্গও সকল সময়ে তাহ জানিতে পারিতেন না। তিনি মধ্যে মধ্যে কাজ কৰ্ম্ম ফেলিয়া সহরের বাহিরে নির্জন স্থানে গমন করিতেন; এবং দিনের পর দিন ঈশ্বর-চিন্তাতে যাপন করিতেন। নিজের দমদমস্থ ভবনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাঠালয়ে আবদ্ধ থাকিয়া ধৰ্ম্মচিন্তার যাপন করিতেন। সে সময়কর চিন্তা সকল মধ্যে মধ্যে আপনার দৈনিক লিপিতে লিখিয়া রাখতেন। তাহার মৃত্যুর পর সেই সকল দৈনিক লিপি দেখিয়া আমরা মহোপকার লাভ করিতেছি। এরূপ ধাৰ্ম্মিক গৃহস্থ, কৰ্ত্তব্যপরায়ণ পতি, সন্তানবৎসল পিতা, অকৃত্রিম মিত্র, বিনীত ও ঈশ্বরভক্ত সাধক, ও স্বদেশপ্রেমিক দেশ-সেবক, প্রায় দেখা যায় নH জ্ঞানে গভীরতা, প্রেমে বিশালত, চরিত্রে সংযম, কর্তব্যজ্ঞানে দৃঢ়তা, ঈশ্বরে ভক্তি ও মানৰে প্রেম এই মহৎ আদর্শ বর্ণে বর্ণে র্তাহাতে প্রতিফলিত হইয়াছিল।


দুর্গামোহনদাস।

 প্রসিদ্ধ বিক্রমপুর জেলার তেলিরবাগ গ্রামে বাঙ্গালা ১২৪৮ সালে দুর্গামোহন দাসের জন্ম হয়। তাহার পিতার নাম কাশীশ্বর দাস। কাশীশ্বর দাস মহাশয় বরিশালে ওকালতি করিতেন। দুর্গামোহন মল্পবয়সে যাতৃহীন হন। ভৎপরে কিছুদিন গ্রামে গুরুমহাশয়ের পাঠশালে পড়িয়া বরিশালে নীত হন। সেখানে ইংরাজী স্কুলে পড়িয়া জুনিয়ার স্কলার্সিপ প্রাপ্ত হন। সেই বৃত্তি পাইয় কলিকাতায় হিন্দুকালেজে আসেন; এবং কলিকাতার উপনগরবর্তী কালীঘাটে প্তাহার পিতৃব্য বীরেশ্বর দাস মহাশয়ের ভবনে থাকিয় পড়িতে থাকেন। হিন্দুকলেজে এক বৎসর থাকিয়া তিনি ঢাকাতে প্রেরিত হন। ... সেখান হইতে সিনিয়ার স্কলার্লিপ পাইয়া আবার কলিকাতায় আসেন। “

 প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়ন কালে ইতিহাসের অধ্যাপক এডওয়ার্ড কাউএলের সংশ্রবে আসিয়া ঐ সদাশয় ধাৰ্ম্মিক পুরুষের প্রতি তাহার প্রগাঢ় প্রীতি ও শ্রদ্ধা জন্মে। কাউএলকে যাহার কখনও একবার দেখিয়াছেন,তাহাঙ্ক। আর তাহাকে ভুলিতে পারেন নাই। তিনি জ্ঞানী, গুণী, ধাৰ্ম্মিক, সাধু পুরুষ ছিলেন। সংস্কৃত ভাষাতে র্তাহার প্রগাঢ় ব্যুৎপত্তি ছিল; এবং সেই কারণে গবর্ণমেণ্ট তাহাকে সংস্কৃত কলেজের প্রিন্সিপাল নিযুক্ত করিয়াছিলেন। পরে তিনি ইংলণ্ডে ফিরিয়া গিয়া কেন্থি,জ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতের অধ্যাপক হইয়াছিলেন। কাউএল খ্ৰীষ্টীয় ধৰ্ম্মে প্রগাঢ় বিশ্বাসী ছিলেন; এবং নিজ ভবনে সমাগত বালকদিগের সঙ্গে ধৰ্ম্ম বিষয়ে আলাপ করিতে ভাল বাসিতেন। দুর্গামোহনের সহাধ্যায়ী বন্ধুদিগের মধ্যে কেহ কেহ কাউএলের বাড়ীতে যাইতেন এবং তাহার সহিত ধৰ্ম্মবিষয়ে কথা বাৰ্ত্ত কহিতেন। ইহাদের মধ্যে ভগবান চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বিশেষ ভাবে উল্লেখ-যোগ্য। ইনি পরে বহুকাল খ্ৰীষ্টীয় মণ্ডলীকে মুশোভিত করিয়া বাস করিয়াছেন; এবং গবর্ণমেণ্টের বিচার বিভাগে অতি উচ্চপদে আরোহণ করিয়াছিলেন। ভগবান বাবুর ভাৱ দুর্গামোহন দাস মহাশয় ও কাউএল মহোদয়ের প্রভাবে খ্ৰীষ্টীয় ধৰ্ম্মের দিকে আকৃষ্ট হইয়াছিলেন। তখন তিনি ওকালতি পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হইয়া ওকালতিকাৰ্য্যে নিযুক্ত হইবার উপক্রম করিতেছেন। '

 দুর্গামোহনের চরিত্রের এই একটা গুণ ছিল যে তিনি বাহ একবার কর্তব্য বলিয়া নিৰ্দ্ধারণ করিতেন, অকুষ্ঠিত চিন্তে সেই দিকে অগ্রসর হইতেন, লোকের অনুরাগ বিরাগ গণনা করিতেন না।, “যখন খ্ৰীষ্টীয় ধর্মের দিকে তাহার্ষন কুকিল, তখন সে পথে পদার্পণের পূৰ্ব্বেস্বীয় বালিকা পত্নী ব্ৰহ্মমন্ত্রীকে লইয়া একজন খ্ৰীষ্টীয় পাদরী বন্ধুর বাড়ীতে তুলিলেন। কারণ পত্নীকে ত খ্ৰীষ্টীয় ধৰ্ম্ম জানান চাই, এবং সম্ভব হইলে তাহতে দীক্ষিত করা চাই। অভিপ্রায় ছিল যে তিনি নিজে খ্ৰীষ্টীর ধৰ্ম্ম বিষয়ে আরও কিছুদিন অনুসন্ধান করিয়া দুই জনে এক সঙ্গে ঐ ধৰ্ম্মে'দীক্ষিত হইবেন। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, বিধাতা ঘটান আর এক। ব্ৰহ্মময়ীকে খ্ৰীষ্টীয় পাদরীর বাড়ীতে রাখিণ্ডে গিয়া উহাকে স্ট্রীয় পিতৃব্যের ভবন হইতে তাড়িত হইতে হইল। তখন র্তাহার জ্যেষ্ঠ সহোদর হাইকোর্টের স্বপ্রসিদ্ধ উকীল কালীমোহন দাস মহাশয় বরিশালে ওকালতি করিতেন। তিনি র্তাহাকে আশ্রয়হীন জানিয়া বরিশালে নিজের নিকটে আহবান করিলেন; এবং তাহার হস্তে মার্কিন সাধু থিওডোর পার্কারের গ্রন্থগুলি অর্পণ করিয়া তাহা পাঠান্তে খ্ৰীষ্টান হওরা বিষয়ে স্থির করিতে অনুরোধ করিলেন। ঐ গ্রন্থগুলি মনোযোগের সাহিত পাঠ করিয়া দুর্গামোহনের মত পরিবর্তিত হইয়৷ গেল। তিনি প্রচলিত খ্ৰীষ্টীর ধৰ্ম্মের ভ্রম দর্শন করিলেন; এবং পার্কারের প্রদর্শিত উদার, আধ্যাত্মিক, ও সাৰ্ব্বভৌমিক একেশ্বর-বাদ অবলম্বন করিলেন।

 ইহা হইতেই তাহার চিত্ত ব্রাহ্মসমাজের দিকে আকৃষ্ট হইল। তিনি বরিশালে গিয়া কিছুদিন পরে ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন ও ব্রাহ্মধৰ্ম্ম প্রচারের জন্য উৎসাহী হইলেন। যে কথা সেই কাজ; যখন কাজ তখন পুরা পুরা কাজ; আধাআধি নহে; এই যাহার জীবনের মূলমন্ত্র ছিল, তিনি যখন ব্রাহ্মধৰ্ম্ম সাধনে ও ব্রাহ্মধৰ্ম্ম প্রচারে নিযুক্ত হইলেন তখন পুরা পূরি সেই কাজে মন দিলেন। নিজে বন্ধু বান্ধব গণের সহিত মিলিত হইয়া ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন করিয়া সন্তুষ্ট না থাকিয়, কলিকাতা হইতে কয়েক জন ব্রাহ্মপ্রচারককে লইয়া গিয়া ব্রাহ্ম ধৰ্ম্ম, প্রচারে প্রবৃত্ত হইলেন; এবং তাহাদের সাহায্যে ব্রাহ্মগণের পত্নীদিগকে শিক্ষিত করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। অচিরকালের মধ্যে বরিশাল ধৰ্ম্ম ও সমাজ সংস্কারের একটা কেন্দ্র স্বরূপ হইয়া দাড়াইল। নারীগণের শিক্ষা ও স্বাধীনতার জন্ত বরিশাল বঙ্গদেশে প্রসিদ্ধ হইয়া পড়িল। তাহার স্বৰ্গীয়া পত্নী ব্ৰহ্মময়ী সকল কাৰ্য্যে কাহার সহায় ও, উৎসাহদায়িনী হইয়া উঠিলেন। দেখিতে দেখিতে দিন দিন বরিশালে ব্রান্ধের “ও ব্রাহ্ম অনুষ্ঠানের সংখ্যা বাড়িতে লাগিল।

 এই কালের মধ্যে দুর্গামোহন এমন এক কার্য্যে অগ্রসর হইলেন, যাহা তাহার আত্মীর বন্ধুরা ও জগ্রে সম্ভব বলিয়া মনে করেন নাই। এই কালের প্রথম ভাগে পুৰ্ব্ববঙ্গের কতিপয় শিক্ষিত ব্যক্তি স্বাক্ষর করিয়া এই প্রতিজ্ঞাতে বদ্ধ হইয়াছিলেন যে র্তাহারা স্বীয় স্ত্রীয় স্থানে ও স্বীয় স্বীর বন্ধুবর্গের মধ্যে হিন্দু বিধবাগণের পুনবিবাহ ক্রিয়া সম্পন্ন করিবার চেষ্টা করিবেন। ঐ স্বাক্ষরকারাদিগের মধ্যে দুর্গামোহন একজন ছিলেন। অপর স্বাক্ষরকারীরা এবিষয়ে কি করিয়াছেন তাহ জানি না; কিন্তু দুর্গামোহনের যে কথা সেই কাজ। তিনি সংকল্প করিলেন যে তাহার এক বন্ধুর সহিত তাহার বিধবা বিমাতার বিবাহ দিবেন।

 এই সংকল্প প্রকাশ পাইলে তাহার আত্মীয় স্বজন অস্থির হইয়া উঠিলেন। তাহার বিমাতাকে’কৌশলে চুরী করিয়া কাশীধামে প্রেরণ করা হইল; এবং দুর্গামোহনের প্রতি কটুক্তি অত্যাচার নির্যাতন চলিতে লাগিল।, তিনি সমুদয় সহিয়া রছিলেন। কিন্তু বিমাতা হাতছাড়া হওয়াতে তাহার সংকল্প সাধন অসম্ভব জানিয়া সে বিষয়ে এক প্রকার নিরাশ হইলেন। কিন্তু তাহার ঐ বন্ধুর প্রতি তার বিমাতার অনুরাগ পূর্বেই অর্পিত হইয়াছিল। সুতরাং তিনি বন্দীদশাতে কাশীতে থাকিয়াকোনও কৌশলে দুর্গামোহন বাবুকে র্তাহার মনোগত ভাব জানাইলেন। তখন চোরের উপর বাটপাড়ি করিবার পরামর্শ স্থির হইল। অনেক ব্যয় ও অনেক কৌশলে বিমাতাকে কাশী হইতে চুরি করিয়া আনিয়া, বিখ্যাসাগর মহাশয়ের সাহায্যে, বিবাহ দেওয়া হইল। ও দিকে বরিশাল। ও সমস্ত বঙ্গদেশ তোল পাড় হইয়া যাইতে লাগিল। দাস মহাঁশল্পের মুথে গুনিয়াছি যে তখন তিনি আদালতে যাইবার জষ্ঠ্য বাহির হইলেই রাস্তার লোকে। বাপাত্ত করিয়া গালি দিত; এবং গাত্রে ধূলি নিক্ষেপ করিত। কিছু দিনের জন্য তাহার পসার একেবারে নষ্ট হইয়া গেল। এমন কি ছয় মাস কাল গবৰ্ণমেন্টের মোকদ্দমা ভিন্ন একটৗও বাহিরের মোকদ্দমা পান নাই। এ সকল কষ্ট তিনি হাসিয়া সহ করিতেন; একটীও কটক্তির দ্বিরুক্তি করিতেন না; বরং সময়ে অসময়ে তাহার বিরোধিগণের সাহাধ্যার্থ মুক্তহস্ত ছিলেন। এই সময়ে তাহার পত্নী ব্ৰহ্মমরী সকল নির্যাতনের মধ্যে তাহার সহায় হইলেন। নির্যাতনের তীব্রতা তাহাকে যত সহিতে হইত, দুর্গামোহন বাবুকে বরং ততটা সহিতে হইত না। কারণ দুর্গামোহন বাবু আদালনে যাইতেন; বন্ধুদের সঙ্গে মিশিতেন; লিপিতেন, পড়িতেন, বাহিরের ভাল চচ্চাতে থাকিতেন; কিন্তু ব্ৰহ্মামন্ত্রী রীত্রিদিন গৃহ পরিবারে আবদ্ধ থাকিতেন; পাড়ার লোকের সমালোচনা শুনিতেন; এবং আত্মীয়া মহিলাগণের গজনা সহ্য করিতেন। তথাপি একদিনও তাহার মুথ বিষৰ পদখা। বাইত’ না। এই সমরে তাহার স্থিরচিত্ততা দেখিয়া সকলে বিস্ময়াবিষ্ট হইত। তিনি সর্বদ। স্বীয় পতিকে তাহার সভীষ্ট পথে চলিতে উৎসাহিত করিতেন; এবং সর্ববিধ দেশহিতকয় কার্য্যে তাঁহার সঙ্গিনী হইতেন। ইহায়া কি ভাবে বিরোধিগণের অত্যাচার সহ করিতেন; এবং সকল সহিয়া তাহাদের সাহায্যাৰ্থ কিরূপ প্রস্তুত থাকিতেন, তাহার নিদর্শন স্বরূপ এই সময়কার একটিী ঘটনার। উল্লেখ কর৷ যইেতেছে। এই নির্যাতনের সময়ে হর্গামোহন বাবুর একটী সন্তান জন্মগ্রহণ করে। তাহার পত্নী বখন শিশু সস্তানের পালনে নিযুক্ত, তখন পার্থের বাড়ীর এক গৃহস্থের পল্লী একটী শিশুপুত্র রাখিয়া পরলোকগত হইলেন' সে ভদ্রলোকের অবস্থা মদ ছিল; তিনি শিওপুত্রের রক্ষার ও প্রতিপালনের বন্দোবস্ত করিতে অসমর্থ হইয়া মহাবিপদে পড়িলেন। পুত্ৰটী মারা যায়, রক্ষার উপায় নাই, এরূপ অবস্থাতে দুর্গামোহন ও ব্রহ্মময়ী তাহ৷। জানিতে পারিন্না শিওটীর রক্ষার ভার লইবার জন্ত ব্যগ্ৰ হইলেন। কিন্তু সে গৃহের। গৃহৰামী ছৰ্গামোহন দাস মহাশয়ের বিপক্ষগণের মধ্যে এক জন। অগ্রগণ্য ব্যক্তি ছিলেন। তাহা সত্বেও ইহারা শিওটার রক্ষার ভার লইতে চাহিলেন। গৃহস্থ ভদ্রলোকটী যেন বাচিয়া গেলেন; শিগুটী দাসগৃহে আসিল। ব্ৰহ্মমন্ত্রীএক পাঞ্চে নিজের সস্তান অপর পার্ষে প্রতিবেশীর শিও পুজটী লইয়া স্তনপান করাইতে প্রবৃত্ত হইলেন। এইরূপে শিশুটীর রক্ষা চলিল। ঘখের বিষয় সেটী অধিক দিন বাচে নাই।

 বিরোধিগণের প্রতি এইরূপ সঞ্জাব ও সৌজন্য দাস মহাশয়ের চিরদিন। ছিল। আমরা চিরদিন দেথিয়াছি সামাজিক নির্যাতন তিনি মনের ত্রিসীমাতে লইতেন না; তাহ৷ অপরিহার্য্য বলিয়া জানিতেন।; এবং অস্নানচিত্তে সহ করিতেন। তাহার উৎসাহ কথনও খর্ব হইত না। নিজের কর্তব্য সাধন করিয়াই তুষ্ট থাকিতেন, লোকের অনুরাগ বিরাগ গণনীয় মনে করিতেন না।

 এই সময়ের মধ্যে তাহার দৃষ্টান্ত ও প্ররোচনাতে বরিশালের নব্য যুবকদলের মধ্যে, বিশেষতঃ তাহাদের স্ত্রীগণের মধ্যে, উন্নতি-গৃহ৷ ও সৎসাহস প্রচুর পরুি মাণে দেখা গিয়াছিল। সেই সৎসাহসের নিদর্শনস্বরূপ বরিশালের নিকটস্থ লাখুটিয়া নামক স্থানের প্রসিদ্ধ জমিদার রাজচন্দ্র রায়ের পুত্রগণ এই সময় ব্রাহ্মসমাজে যোগ দিয়া সৰ্ব্ববিধ উন্নতির পৃষ্ঠপোষক হইলেন। তাহারা একদিন পত্নীসহ স্থানীয় কমিশনর সাহেবের ভবনে আহার করিতে গেলেন। ইহার পূর্বে ইংল্লাজের গৃহে খান , খাওয়া দূরে থাক বাঙ্গালি সম্ভান্ত ভদ্ৰগৃহের কুলাঙ্গনারা কোনও দিন অন্তঃপুরের বাহিরে সাসেন নাই। এই অসমসাহসিক কাৰ্য্য করাতে বরিশাল সহর, কেবল বরিশাল কেন সমস্ত বঙ্গদেশ, আন্দোলিত হইয়া বাইতে লাগিল। দাস মহাশয় নির্ভীক অটলভাবে দণ্ডায়মান রহিলেন। কেবল ইহাই নহে। ইহার পর বরিশালে দিন দিন বিভিন্ন জাতীর দিগের মধ্যে বিবাহ-সম্বন্ধ স্থাপিত হইতে লাগিল। বরিশাল তপ্ত খোলার মত হইয়া উঠিল। কলিকাতা হইতে জামর। সংবাদ পাইতে লাগিলাম বে বরিশালে অসম্ভব সম্ভৰ হইতেছে। কলিকাতার ব্রাহ্মগণ সেই দৃষ্টান্তে উংসাহিত হইয়া উঠিত লাগিলেন॥

 ১৮৭০ কি ১৮৭১ সালে গুর্গামোহন দাস মহাশয় হাইকোর্টে ওকালতি করিবার জন্য কলি কা তাতে আসিলেন। তিনি আসিয়া বসি বামাত্র কলি কাতার সমাজসংস্কারার্থী নবং ব্ৰ ক্ষণলের কেন্দ্র স্বরূপ হইলেন। তাঁহার ভবন ঐ সুবক দধের এক প্রধান আা ছা হইয়া উঠিল। তখন “অবল’বান্ধ ব” সম্পাদক দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় তাহার কীগ ঙ্গ লইয়া কলকা তাতে প্রতিষ্ঠিত হইয়! ছেন; এবং নারীজাতির শিক্ষা ও স্বাধীনত বিধযে আন্দোলনে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। দ্বারকানাথের পশ্চাতে পরবর্তী সময়ের ডেপুী কটে,ালারজেনারেল রজনীনাথ রায় প্রভৃতি একদল যুবক মাছেন। ইহার দুর্গামোহন দাসকে পাইয়া, ধোঁটার। ঙ্গোরে মেড়ার স্যায়, বগশালী হইয়া স্ত্রীশিক্ষা ও স্বী স্বাধীনতার জন্য বন্ধ-পরিকর হইলেন এবং ব্রাহ্মসমাজের মধোই প্রবল আন্দোলন উপস্থিত করিলেন।

 দে আন্দোলনের ইতিবৃত্ত গ:গ্রই বিরাছি। কেশববাবু ইহাদের অফুরোধে ভারতবর্ষীয় ব্রহ্মমন্দিরের মধ্যে। প্র কাগ্যস্থানে মহিলাগ:ণর বসিবার আসন নিৰ্দেশ করিতে যখন বিলৰ করিতে লাগিলেন, তখন এক দিন তুর্গামোহন। দাস মহঃশয়, এবং যতদূর স্মরণ হয় ডাক্তার অন্নদাচরণ খণ্ড গর মহাশয়, দ্ৰীয় স্বীয় পল্লী ও কমাগণ সহ, মন্দিরের উপাসনা কালে, পুণ্য-উপাসকগণের মধ্যে অগিয়া মাসন পরিগ্রহ করিলেন। অণনি ব্রাক্ষ দলের মধ্যে আন্দোলন উঠিয়া গেল। উপাসকমণ্ডলীর প্রাচীন সভ;গণ ঘোর আপত্তি উখাপন করিলেন। কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় বিপদে পড়িয়া গেলেন। তিন চিন্তা করিয়া একট। কিছু স্থির করিতে না করিতে দ্বিতীয় দিন পীনতাপক্ষীয়েরা আবার সপরিবারে মন্দিরে আসিয়া উপস্থিত হইলেন॥ ফে বরে মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক মহিলাগণকে সকলের মধ্যে বসিতে নিযেধ করলেন। iাহারা বিবাদ না করিয়া চলিয়া গেলেন। তদবধি তাহারা মন্দিরে মোসা পরি ত্যাগ করিলেন; এবং একটি স্বতন্ত্র সমাজ স্থাপন করিলেন। প্রথমে থাৎগির মহাশয়ের ভবনে। এই সমাজের অধিবেশন হইতে লাগিল। প্রতিবাদকারিগণ গিয়া তাহাদের। নবপ্রতিষ্ঠিত সমাজে উপাসনা করিবার জন্য মহৰ্ষি দেবেন্দ্রনাথকে ধরিলেন। যে কেহ উপাসনা করিতে চাকিত, তিনি নিতান্ত অসমর্থ ন৷ হইলে সে প্রার্থনা পূর্ণ করিতেন, দেবেন্দ্রনাথের এই নিয়ম ছিল; সুতরাং তিনি। আান মাত্র আসিয়া একদিন উপাসনা করিয়া নবসমাজের উৎসাহী সভা ৪৩ গণকে আশীৰ্ব্বাদ করিয়া গেলেন। ক্রমে ঐ সমাজ একটা স্বতন্ত্র বাড়ী ভাড়া করিয়া সেখানে উঠিয়া গেল।

 কেশবচন্দ্ৰ দেখিলেন তাহার সঙ্গের লোক দুই ভাগ হইয়া যায়, অনেক চিন্তা ওঁ প্রার্থনানন্তর তিনি ভারতবর্ষীয় ব্রহ্মমন্দিরের এক পাশ্বে স্ত্রীস্বাধীনতাপক্ষীয় পরিবার সকলের মহিলাগণের জন্ত পর্দার বাহিরে আসন নির্দেশ করিলেন। তাহ এক কোণে ও রেলের মধ্যে হওয়াতে যদিও ঐ দলের সকলের প্রীতিপ্রদ হইল না, তথাপি দাস মহাশয়ের পরামর্শানুসারে গাঙ্গুলি ভায়ার দল তাহতেই সন্তুষ্ট হইয়া, কিছুদিন পরেই স্বতন্ত্র সমাজ তুলিয়া দিলেন; এবং পুনরায় ব্ৰহ্মমন্দিরের উপাসনাতে আসিতে লাগিলেন।

 ইহার পয়ে ১৮৭২ সালে কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় “ভারত আশ্রম” স্থাপন করিয়া তাহাতে বয়ঃস্থ মহিলাদিগের জন্ত একটা স্কুল খুললেন। ব্রাহ্ম-পরিবার সকলের অনেক মহিলা তাহাতে ছাত্রী হইলেন। কিন্তু ঐ বিদ্যালয় স্ত্রীস্বাধীনতা পক্ষীয়দিগের মনঃপুত হইল না। কারণ ঐ বিদ্যালয়ে কেশববাৰু মহিলাদিগের শিক্ষার যে আদর্শ অবলম্বন করিয়াছিলেন, তাহা স্ত্রীস্বাধীনতা পক্ষায়গণের মতে প্রকৃত আদর্শ অপেক্ষ হান ছিল। কেশবচন্দ্র নারীদিগকে উচ্চ গণিত, জ্যামিতি লজিক, প্রভৃতি বিশ্ববিদ্যালয়েয় অবলম্বিত অনেক বিষয় শিক্ষা দেওয়া আবশ্যক বোধ করিতেন না। তিনি শিক্ষা বিষয়ে পুরুষে ওঁ নারীতে ভেদ রাখিতে চাহিতেন। নারীগণকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রীতি অনুসারে শিক্ষা দেওয়া উচিত বোধ করিতেন না। অপর পক্ষ ইহার বিরোধী ছিলেন। তাহারা নারীদিগকেও বিশ্ববিদ্যালরের অবলম্বত উচ্চশিক্ষা দিতে চাহতেন। স্বতরাং তাহার দ্বারকানাথ গাঙ্গুলির উদ্যোগে এবং দুর্গামোহন দাস মহাশয়ের অর্থসাহায্যে, অনুমান ১৮৭৩ সালে, কলিকাতার সন্নিহিত বালিগঞ্জ নামক স্থানে, কুমারী এক্রয়েডকে তত্ত্বাবধায়িকা করিয়', হিন্দু-মহিলা-বিদ্যালয় নামে নারীগণের উচ্চশিক্ষার জন্ত এক বোঁড়িং স্কুল স্থাপন করিলেন।

 দুর্গামোহন বাবু এই স্কুলে স্বীয় কন্যাদিগকে দিলেন। কেবল তাঁহা নহে, তাহার পত্নী এই স্কুলের বালিকাদিগের অনেকের মাতৃস্থান অধিকার করিলেন। छूैौद्ध निरन उंॉशब्र शृंश् বালিকাদের বিশ্রাম ও বিনোদনের স্থান হইত। সে সময়ে তাহার ভবনে পদার্পণ কয়িলেই দেখা য়াইত যে ব্রহ্মময়ী স্বীয় ও অপরের কম্ভাবৃন্দে পরিবৃত হইয়া রহিয়াছেন। তাহাকে আবেষ্টন করিয়া তাহদের কি মানন্দ। তিfও তাহ:দর কল্যাণ চিন্তাতে নিমগ্ন। কোণু ময়ের ভবিষ্যৎ কিরূপ হইবে, কার জন্ত কি করা উচিত, আমাদের সঙ্গে এই কথাই উপস্থিত করিতেন।

 এদিকে এই সময়ে পূৰ্ব্ববঙ্গের মান স্থান হইতে কতকগুলি হিন্দু বিধবা পলাইয়া ব্রাহ্মসমাজের আশ্রয়ে আসল তাহারা যায় কোথায়? দুর্গামোহন দাসের ভবন তাহদের পিতৃভবন স্বরূপ হইল। ব্রহ্মময়ীর পক্ষপুটের মধ্যে আশ্রয় প্রাপ্ত হইয়া তাহার শিক্ষা লাভ করিতে লাগিল। এই রিধবাদিগের অনেকে পরে পরিণীত হইয়া সৎপত্রিগত হইয়াছে।

 এইরূপ সদনুষ্ঠানে নিযুক্ত থাকিতে থাকিতে অনুমান ১৮৭৫ সালে ব্রহ্মময়ী এলোক’হইতে অবস্থত হইলেন। দুর্গামোহনের গৃহ শূন্ত হইল।

 ইহার পরে ১৮৭৮ সালে ব্রহ্মসমাজে দ্বিতীয় বিবাদ ঘটনা হইয়া সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ যখন স্থাপিত হয়, তখন দাস মহাশর ঐ সমাজ স্থাপনের উদ্যোগী পুরুষদিগের মধ্যে একজন অগ্রণী ব্যক্তি ছিলেন। * তদবধি বহুকাল ইহার কাণ্যের জঙ্গ তিনি প্রচুর অর্থ-সাহায্য করিরছিলেন। তাঁহার মৃত্যুর কিছুদিন পূৰ্ব্বে ইহার সভাপতিরূপে বৃত হইরাছিলেন। ১৮৮৮ সালে তিনি টুংগণ্ডে গমন করেন, এবং পীড়িত হইয়া দেশে প্রতিনিবৃত্ত হন। ইহার পরে তাহার তিন কন্ত সংপাত্রগত হইলে এবং তাহার তিন পুত্র बिलार्ड হইতে বারিমুর হইয়া আসিয়া স্বীয় স্বীয় কার্য্যে বর্সিলে, তিনি নিতান্ত একাকী হইয় পড়েন। সেই সময়ে ঢাকার কালীনারায়ণ গুপ্ত মহাশূরের এক বিধবা কন্যার পাণিগ্রহণ করেন। এই বিবাহেও তাহাকে নির্যাতন সহিতে হইয়াছিল। তাঁহার চিরাগত রীতি অনুসারে দুর্গামোহন সমুদয় নির্ধ্যাতন অক্সান-চিত্তে বহন করিলেন; এবং নব-পরিণীত পত্নীর সহিত সুখে কালাতিপাত করিতে লাগিলেন।

 কিন্তু এ সুখ অধিক কাল ভোগ করিতে পারিলেন না। কয়েক বৎসরেয় মধ্যেই তাহার স্বাস্থা ভগ্ন হইয়া গেল। তিনি স্বাস্থ্যলাভের আশার দেশ বিদেশে ভ্রমণ করিলেন। কিছুতেই আর ভগ্ন স্বাস্থ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হইল না। অবশেষে ১৮৯৭ সালের ১৯শে ডিসেম্বর ভবলীলা সম্বরণ করলেন।

 ইহঁার সহৃদয়তা ও মুক্তহস্ততা বন্ধুগণের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিল। যে কথা সেই কাজ; যদি ইনি কখনও মুগ্ধ দিয়া কিছু দিব বলিয়া কথা বাহির করিতেন আমরা জানিতাম দে টাকা ব্যায়ে আছে। দরিদ্রদিগের, বিশেষতঃ স্বীর পরিচিত দুঃস্থ ব্যক্তিগণের, সাহায্যাৰ্থ এরূপ মুক্তহস্ত দাতা অতি অল্পই দেখা গিয়াছে। ব্রাহ্মসমাজের কার্য্যে ইনি সহস্ৰ সহস্র টাকা দান করিয়াছেন। বন্ধুদের প্রতি কি প্রেম! মুথে মিষ্ট কথা বলিতে জানিতেন না; কার্য্যে অকৃত্রিম, তাল প্রেম প্রকাশিত হইত। তিনি মুখে সৰ্ব্বধাই বলিতেন “ধৰ্ম্মের উচু উচ্চ কথা অধিক জানি না; ধর্মের গৃঢ় তত্ত্ব অধিক বুঝি না; পার্কার দুই চারিশ কথা শিখাইয় গিয়াছেন, তাহাই ধ্যানে জ্ঞানে রাখিয়াছি,—একটা কথা এই, মনে, বাক্যে, কার্যে গাটি থাকিতে হইবে; দ্বিতীয় কথা এই জীবনের কৰ্ত্তব্য সুচারুরূপে পালন কম্বিয় ঈশ্বরের পূজার উপযুক্ত হইতে হইবে। “এরূপে জীী নের কৰ্ত্তব্য পালন করিতে অল্প লোককেই দেখিয়াছি। ব্রহ্মময়ীকে মুখী করিবার জন্য তাহ’য় সে ব্যগ্র তা দেখিয়াছি তাহা অতীব প্রশংসনীয়; তৎপরে নিজের অবস্থাতে পুত্র কন্যাদিগকে যত উৎকৃষ্ট শিক্ষা দেওয়া সম্ভব তাহা দিতে ক্রটি করেন নাই। তাঁহার দ্বিতীয় কন্যাকে কলিকাতা হইতে প্রবেশিকা পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ করিয়া মান্দাজে মেডিকেল কলেজে পাঠাইয়াছিলেন। ইনিই পরে স্থ প্রসিদ্ধ বৈজ্ঞানির ডাক্তার জে, সি, বসুর পত্নী হইয়াছেন। বন্ধুবান্ধবের প্রতি কৰ্ত্তব্য স্বদেশের প্রতি কৰ্ত্তব্য এসকল বিষয়ে ও তাহার আচরণ আদর্শ-স্থানীয় ছিল। সংক্ষেপে বলি এরূপ উদারচেতা, স্বজনবৎসল, কর্তব্যনিষ্ঠ ও স্বদেশপ্রেমিক মানুষ অল্পই দেখিয়াছি।

দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়।

 এইবার আ.ম এক বীরপুরুষের জীবনচরিত বর্ণন করিতে যাইতেছি। বাঙ্গালীর মধ্যে এরূপ সাহসী, দৃঢ়চেতা, অকুতোভয়, বীর প্রকৃতির মানুষ অল্পই দেখিয়াছি। ইহার নাম দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। কুলীনের দুর্গ বিক্রমপুর হইতে এই মানুষটা আসিমৃছিলেন; এবং কিছুকাল আমাদের সঙ্গে বাস করিয়াছিলেন। সেই কয়েক বৎসরের মধ্যে নিজের ছরি আমাদের হৃদয়পটে অবিনশ্বর অক্ষয়ে মুদ্রিত কারুয়া রাখিয়া গিয়াছেন।

 দ্বারকানাথ বাঙ্গাল ১২৫১ ও ইংরাজী ১৮৪৫ সালে ৯ই বৈশাখ দিবসে পুৰ্ব্ববঙ্গের বিক্রমপুর জেলার অন্তর্গত মাগুরখণ্ড গ্রামে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। ইহাদের বংশ স্ব প্রসিদ্ধ বেঘের 'কুলীন বংশ। এই বেঘের কুলীনগণ কুলমৰ্য্যাদাতে সৰ্ব্বশ্রেষ্ঠ। ইহাদের সহিত বিবুল্লাহ-সম্বন্ধ স্থাপন করিবার জন্য অপরাপর কুলীনের ব্যস্ত। স্বারকানাথের পিল্লা কৃষ্ণপ্রাণ গঙ্গোপাধ্যায় বিষয় ধৰ্ম্ম উপলক্ষে সে

Dwarkanath Ganguly.jpg

দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়

৩৪০ পৃষ্ঠা

B. KAR, BEE PRESS.

সময়ে ফরিদপুরে বাস করিতেন। তিনি পরদুঃখ কাতরতার জন্ত বন্ধুবান্ধবের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন। দ্বারকানাখ পিতার পরদুঃখকাতরতা প্রচুরমাত্রায় পাইয়াছিলেন; কিন্তু বোধ হয় তাহার তেজস্বিনী, মনস্বিনী, ধৰ্ম্মপরায়ণ মাতাই তাহার চরিত্রকে প্রধানরূপে গঠন করিয়াছিলেন। তাহার মাতার দৃঢ়চিত্তত বিষয়ে একটা জনশ্রুতি চলিত আছে। একবার তিনি তীর্থ দর্শনের মানলে জগন্নাথ ক্ষেত্রে যাইবার জন্য উৎসুক হইলেন। তিনি ধনীর কষ্ঠা ছিলেন; মনে করিলে যান বাহনাদির সাহায্যে নিজ অভিপ্রায় পূর্ণ করিতে পারিতেন; এবং তাহার পিতৃকুলও সেরূপ সাহায্য করিতে প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু দ্বীরকনাথের মাতার আত্মমর্যাদ জ্ঞান এমনি প্রবল ছিল যে কিছুতেই তাহতে সন্মত হইলেন না। অথচ আত্মীর স্বজনের অকুনর বিনরে সেই তীর্থ যাত্রা প্রত্যাগ করিতেও স্বীকৃত হইলেন না। যথা সময়ে তীর্থযাত্রা করলেন এবং নিজের পদদ্বয়ের সাহায্যে তাহা সমাধা করিলেন। দ্বারকানাথ সেই মাতার সন্তান, তাহতে উত্তরকালে আমরা যে আত্মমর্যাদাজ্ঞান দেখিরছি, তাহা মানুষে সচরাচর দেখা যার না। র্তাহার আত্মমর্য্যাদাতে আঘাত লাগিলে তিনি অবমাননকারীকে জানিতে দিতেন যে সিংহের সহিত তাহার কারবার। সে স্থলে এরূপে জানিতে দেওয়া সম্ভব হইত না সে স্থলে তিনি মনের আবেগে অচেতন হইয়া পড়িতেন।

 সে যাহা হউক, শৈশব গ্রামে গুরুমহাশয়ের পাঠশালে বিস্তাশিক্ষা আরম্ভ করি লন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তাহীর ইংরাজী শিখিবার বাসনা প্রবল হইল। তখন তাহার পিতার কৰ্ম্মস্থান ফরিদপুরে তাহাকে লইয়া যাওয়া হইল। কিন্তু সেখানে তাহার স্বাস্থ্য ভাঙ্গিয় পড়িল। বাধ্য হইয় তাহাকে , আবার মাগুরখণ্ডে ফিরিয়া আনা হইল। এই' অবস্থাতে র্তাহার অতিশয় বাগ্রতা বশতঃ তাহাকে গ্রামের নিকটবৰ্ত্তী কালীপাড়া গ্রামের ইংরাজী স্কুলে ভৰ্ত্তি করিয় দেওয়া হইল। তিনি নানা অসুবিধার মধ্যে সেখানে প্রবেশিক পরীক্ষার শ্রেণী পৰ্য্যন্ত পাঠ করিলেন। কিন্তু সে পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হইতে পারিলেন না। বাধ্য হইয়া কাজ কৰ্ম্মের চেষ্টাতে র্তাহাতে বিব্রত হইতে হইল। এই অবস্থাতে তিনি পর পর তিন স্থানে শিক্ষকতা কার্যে ব্রত ছিলেন; প্রথম, বিক্রমপুরের অন্তর্গত সোনারং, দ্বিতীয় ফরিদপুরস্থ ওলপুরে, তৃতীয় গোনসিং গ্রামের মাইনর স্কুলে।

 ইহার মধ্যে র্তাহার জীবনে এক মহা পরিবর্তন ঘটিল। তাছার বরংক্রম যখন ১৭ বৎসর তখন একদিন শুনিলেন যে এক হতভাগিনী বিপথগামিনী কুলীন ,কন্তাকে তাহার আত্মীয় স্বজন বিষ প্রয়োগ দ্বারা হত্যা করিয়াছে। এই দারুণু সংবাদ তাহার পরদুঃখকাতর প্রাণে শেলসম বাজিল। তিনি অনুসন্ধান করিয়া জানিলেন কুলীন কন্যাদিগকে এরূপে হত্যা করা বিরল ঘটনা নহে। তখন তাহার অন্তরাত্মা ক্ৰোধে দুঃখে অধীর হইরা গেল ! তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলেন যে, কুলীন-শ্রেষ্ঠ হইলেও তিনি বহু-বিবাহ রূপ গৰ্হিত কর্য্যে কখনও লিপ্ত হইবেন না। নিশ্চয় জানিতেন যে তাহার এরূপ প্রতিজ্ঞ রক্ষা করার ফল এই হইবে যে তাহার দুই অবিবাহিতা ভগিনীকে চিরকৌমার্য ধারণ করিতে হইবে; তাহা জানিয়াও তিনি ' নিজ প্রতিজ্ঞা দৃঢ় রাখিবার সংকল্প করিলেন, এবং সে সংকল্প রক্ষা করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন।

 ঐ কুলীন কস্তার হত্যাসংবাদ শ্রবণে কেবল যে বহুবিবাহের প্রতি তিনি জাতক্রোধ হইয়াছিলেন তাহী নহে, তাহার প্রাণ ভারতীয় নারীকুলের দুঃখ দুৰ্গতির বিষয় ভাবিয়া নিরতিশয় বাথিত হুইল। তিনি ভারতীয় নারীগণের অবস্থার উন্নতি বিষয়ে চিন্তু করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। ১৮৬৯ সালে যখন তিনি লোনসিং স্কুলে শিক্ষকতা করেন তখন মনের ভাব এইরূপ। সেইভাব লইয়া ঐ সালে তিনি “অবলাবান্ধব” নামে এক সপ্তাঙ্গিক পত্র বাহির করিলেন। কাগজ খানি ঢাকা হইতে প্রকাশিত হইতে লাগিল; এবং স্বপ্রসিদ্ধ ডেপুটী মাজিষ্ট্রেট ও ঢাকা ব্রাহ্মসমাজের অগ্রগণ্য সভ্য অভয়াকুমার দাস মহাশয়ের পুত্র প্রাণকুমার দাস প্রভৃতি কতিপয় উৎসাহী যুবক তাহার সহায় হইলেন। .প্রাণকুমার দাস একবার কলিকাতাতে আসিয়া আমাদের কয়েক জনকে “অবলা বান্ধবে” মধ্যে মধ্যে লিখিবর জন্ত প্রতিজ্ঞাবদ্ধ করিয়া গেলেন। আমরা “অবলাবান্ধব” পড়িয়া অবাক হইতে লাগিলাম। কোন রবর্তী গ্রাম হইতে এ কোন ব্যক্তি নারীজাতির শিক্ষা ও উন্নতি সম্বন্ধে এরূপ উদার মত ব্যক্ত করিতেছেন।

 ক্রমে গাঙ্গুলি ভায়া তার কলিকতাবাসী প্রবন্ধলেখক বন্ধুদিগকে দেখিবার জন্য একবার সহরে আসিলেন। আমরা আমাদের ‘হীরোকে দেখিয়া লইলাম! বন্ধু সমাগমে স্থির হইল যে অবলাবান্ধব কলিকাতায় তুলিয়া আন! হইবে। তদনুসারে ১৮৭০ সালে দ্বারকানাথ অবলাবান্ধব লইয়া কলিকাতায় আসিলেন। আসিয়া তাহার মহা পরিশ্রম আরম্ভ হইল। কলিকাতা আসাতে তিনি ঢাকার বন্ধুগণের সাহায্য হারাইলেন; কিন্তু কলিকাতাতে হঠাৎ সেরূপ সাহায্য পাইলেন না। অবলাবান্ধব সংক্রান্ত সমুদয় কাৰ্য্য তাহার একার স্কন্ধে পড়িয়া গেল। প্রবন্ধ লেখা, প্রাফ দেখা, লেবেল লেখা, বণ্টন করা প্রভৃতি প্রায় সকল কাৰ্য্যই একা • করিতে লাগিলেন। কিন্তু তাহাতেও পশ্চাৎপদ হইলেন না। আহলাদিতচিত্তে সমুদয় সহ করিতে লাগিলেন।

 ক্রমে তাঁহাকে বেষ্টন করিয়া ব্ৰাহ্মসমাজের মধ্যেই এক অবলাবান্ধব নারীহিতৈষী দল দেখা দিল। ব্রাহ্মসমাজের অপরাপর আলোচনা শু আন্দোলনের মধ্যে নারীগণের শিক্ষা ও সামাজিক স্বাধীনতা বিষয়ে আলোচনা ও আন্দোলন চলিল। যে ১৮৭১ সালে ব্রাহ্ম বালিকাদিগের বিবাহোপযুক্ত বয়স স্থির করিবার জন্ত মহা আন্দোলন উপস্থিত হইল, সেই ১৮৭১ সালেই তলে তলে ব্রাহ্মমহিলাদিগর শিক্ষা ও স্বাধীনতা বিষয়ে আন্দোলন চলিল। তাহা অগ্রেই বর্ণন করিয়াছি। ব্রাহ্মমহিলাগণের উপাসনামন্দিরে পরর্দার বাহিরে বসিবার অধিকার লইয়া এই আন্দোলন পাকিয়া উঠিল। কিরূপে ১৮৭২ সালে কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় ভারতাশ্রমে বয়স্থ বিদ্যালয় স্থাপন করিলেন; এবং কি কারণে অবলাবান্ধব দল তাহাতে যোগ দিলেন না, তাহ অগ্রে বর্ণন করিয়াছি। ১৮৭৩ সালে গাঙ্গুলী ভায় কুমারী এক্রয়ড নামক নবৃগিতা এক স্বশিক্ষিতা ইংরাজমহলাকে তত্ত্বাবধায়িকা করিয়া “হিন্দুমহিলা বিদ্যালয়” নামে বালিকাদিগের জন্য উচ্চশ্রেণীর এক বোডিং স্কুল স্থাপন করিলেন। তাহার জন্ত অর্থসংগ্ৰহ কয়, ষান বহুনাদির বন্দোবস্ত করা, পাঠাদির ব্যবস্থা করা, ছাত্রীনিবাসে ছাত্রীগণের আহারাদের ব্যবস্থা করা, তাহাদের পীড়াদির সময়ে চিকিৎসাদির বন্দোবস্ত কর, প্রভৃতি সমুদয় কাৰ্য্যের ভর এক গঙ্গোপাধ্যায়, মহাশয়ের উপর পড়িয়া গেল। তিনি আহলাদতচিত্তে সেই সকল শ্রম বহন করিতে লাগিলেন।” আমরা দেখিয়া পরস্পর বলাবলি করিতাম যে মানুষ এতদূর শ্রম করিতে পারে ইহাই আশ্চৰ্য্য।

 কুমারী এক্রয়েড বরিশালের জজ বেভেরিজ সাহেবের সহিত পরিণীত। হইলে ১৮৭৫ সালে ঐ হিন্দু মহিলাবিদ্যালয় বঙ্গমহিলা বিদ্যালয় রূপে পরিণত হয়, এবং কয়েক বংসর পরেই বেথুন কলেজের সহিত একীভূত হইয়া যায়।

 বঙ্গমহিলাবিদ্যালয় উঠিয়া গেলবটে কিন্তু দ্বারকানাথের কার্য শেষ হইল না। এদিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকদের রাজনীতি চর্চার জন্য ভারতসভা স্থাপিত হইল। এখান গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয়ের আর এক কাৰ্য্যক্ষেত্র খুলিল। কয়েক বৎসরের মধ্যেই তিনি ইহার সহকারী সম্পাদক হইয়া অসাধারণ প্রম করিতে লাগিলেন। মনোযোগপূর্বক রাজনৈতিক প্রশ্ন সকলের আলোচনা কর, সামের কুলীদিগের অবস্থা পরিদর্শন করা, সঞ্জীবনী সংবাদপত্রের কৃষ্টি ও সম্পাদন বিষয়ে সহায়তা করা, কংগ্রেগাদির কার্যের প্রধান ভার গ্রহণ করা ইত্যাদি নানা কার্যে তিনি ব্যাপৃত হইয়। প্লড়িলেন। তাঁহার প্রকৃতিই এই ছিল যে, যে কার্য্যে হাত-দিতেন তাঁহা প্রাণ মনের সহিত করতেন। একবার তিনি আসামের কুলীদিগের অবস্থা পরিদর্শনের জন্ত স্বয়ং আলামে গমন করিলেন। তখন বর্ষাকাল সমাগত ব্ৰহ্মপুত্র জলপূর্ণ হইয়া দুই ধার প্লাবিত করিতেছে; যাতায়াত দুঃসাধ্য, তাহাকে প্রতিনিবৃত্ত হইবার জন্ত কণ্ড অনুরোধ করা গেল, তাহার প্রতি কৰ্ণপাত করিলেন না; জলে ঝড়ে প্লাবনে স্বকাৰ্য সাধনে রত রছিলেন। একদিন পথে চলিতে চলিতে নদীর স্রোতে জলমগ্ন হইলেন। সে দিন অতি কষ্টে তাঁহার প্রাণ রক্ষা হইল। তথাপি তাহার উৎসাহ বা কাৰ্য্যতৎপরতার বিরাম হইল না। সেই কার্য্যেই প্রবৃত্ত রহিলেন। ওদিকে ইণ্ডিয়ান এসোসিএসনের সহকারী সম্পাদক দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি আসামে কেন, এই বলিয়া সৰ্ব্বত্রই গবর্ণমেণ্টের কৰ্ম্মচারিগণ সশঙ্কিত হুইয়া উঠিলেন।' তিনি যেখানেই যান সঙ্গে সঙ্গে পুলিস; অধিকাংশ স্থলে ডেপুটী কমিশনরগণ বাঙ্গালি ভদ্রলোকদিগের নিকট হইতে তাঁহার বিষয়েং বাদ সংগ্রহ করেন।

 এইরূপ অসুবিধার মধ্যে কাৰ্য্য করিয়াও তিনি চা-বাগানের কুলীদের বিষয়ে অনেক সংবাদ সংগ্ৰহ করিলেন; এবং সঞ্জীবনীতে প্রেরণ করিতে লাগিলেন। এই হতভাগ্য कुनौत्नत्व হরবস্থার বিষয়ে লোকে अक्क ছিল, তাহার প্রেরিত ংবাদে লোকের চিত্ত চমকিয়া উঠিল, কুলীদের রক্ষার জন্ত মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকদিগের মন ব্যাকুল হইয়া উঠিল। দিন দিন কুলীসংক্রান্ত মোকদ্দমার সংখ্যা বাড়িতে লাগিল। গবর্ণমেন্ট কুলী আইনের সংশোধন করিতে প্রবৃন্ত হইলেন। o কিন্তু ঐ আইন সংশোধন করিয়া ও এক্ষণে যাহা আছে তাহাও নির্দোষ নহে। এখনও হতভাগ্য কুলীগ ন জানিয়া আপনাদিগকে দাসত্বে বিক্রয় করিয়া বন্দীদশাতে দিন যাপন করিতেছে। আর দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় নাই, তাহদের জন্ত কাদিবার লোকৰ নাই।

 একদিকে গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয় যখন রাজনীতি, ক্ষেত্রে বীরের তায় কাৰ্য্য করিতেছিলেন। তখন তাহার হৃদয় ও তাঁহ’র আশ্চৰ্য্য কাৰ্য্যশক্তি আর একদিকে ব্যাপৃত ছিল। ১৮৭৮ সালে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহার প্রতিষ্ঠার সময় তিনি ইহার একজন প্রধান সারথি ছিলেন। প্রতিষ্ঠার পূৰ্ব্বে ইহার উদ্যোগকারী ব্রাহ্মগণ “সমালোচক” নামে একখানি সাপ্তহিক পত্ৰ প্রকাশ করেন। অল্পদিন পরেই তিনি তাহার সম্পাদকতা ভার গ্রহণ করিয়া তাহাতে অগ্নি উদগীরণ করিতে আরম্ভ করিলেন। কেবল তাহ নহে, সে সময়ের বিবাদ বিলম্বাদে তিনি অগ্রণী হইতে লাগিলেন। বিবঙ্গ অনেকেই করিয়াছিল, কিন্তু অপরের বিবাদে আর দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যান্ধের বিবাদে একটু প্রভেদ ছিল। অন্তে বিবাদ করে, এবং বিবাদের পশ্চাতে বিদ্বেষ রাখে; গাঙ্গুলি ভায়ার বিবাদে তীব্রত থাকিত, কটুক্তি থাকিত, উচিত কথা বলা থাকিত, শুনিলে মনে হইত শকুনি যেমন মৃত প্রাণীর পেট পা দিয়া চাপিয়া ভিতরকার নাড়িজুড়ি বাহির করে, তেমনি যেন তিনি বিপক্ষের পেটু চাপিয়া ঠোঁট দিয়া নাড়িভুড়ি বাহির করিতে পারেন, কিন্তু ফলতঃ বিদ্বেষবুদ্ধি তাহার মনের ত্রিসীমায় থাকিত না। তিনি বলিবার যাহা বলিলেন, প্রতিবাদীর মুখের উপরেই বলিলেন; করিবার যাহা করিলেন, দশজনের সমক্ষেই করিলেন; তৎপরেই আর কিছুই নাই, বিদ্বেষ লইয়া ঘরে আসিলেন না। এই গুণের জন্তই আমরা তাহাকে ভালবাসিতাম। তাঁহার কথা বা ব্যবহারে ক্লেশ পান নাই, এমন অল্প লোকই আমাদের মধ্যে আছেন; কিন্তু এসকল সত্ত্বেও তাহাকে অস্তরের সহিত শ্রদ্ধা করিতেন না, এমন কাহাকেও দেখি নাই। তিনি তৎপরে কয়েক বৎসর সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক ছিলেন।

 অবলাবান্ধব ও বঙ্গমহিলা বিদ্যালয় উঠিয়া গেলে তাহার নারীজাতির উন্নতি সম্বন্ধীয় কাৰ্য্য শেষ হয় নাই। কিছু দিন পূর্বে তাহার প্রথম পত্নীর মৃত্যু হইয়া, ছিল। তাহার পরে বহুদিন তিনি দীরপরিগ্রহ করেন নাই। অবশেষে তদানীন্তন লব্ধপ্রতিষ্ঠা উচ্চশিক্ষিত কাদম্বিনী বস্থায় পাণিগ্রহণ করেন। কুমারী কাদম্বিনী ১৮৮৩ সালে বি, এ, পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হন। গঙ্গোপাধ্যায় মহাশয় কিছুদিন পরে, তাহাকে বিবাহ করিয়া, তাহাকে মেডিকেল কলেজে ভৰ্ত্তি হইষায় জন্ত উৎসাহিত করিয়া তোলেন। প্রথমতঃ চাহারি প্ররোচনাতে কাদম্বিনী মেডিকেল কলেজে প্রবেশ করেন; এবং সেখান হইতে বাহির হইয়া চিকিৎসা বিদ্যা শিক্ষা “সমাধা করিবার জন্য ইংলণ্ডে গমন করেন; এবং সেখান হইতে উপাধিলাভ করিয়া স্বদেশে ফিরিয়া চিকিৎসা কার্য্যে প্রবৃত্ত হন।

 কেবল রাজনীতির চর্চা এবং ধৰ্ম্ম ও সমাজ সংস্কারেই যে গাঙ্গুলি মহাশয়েম সমগ্র সময় অতিবাহিত হইয়াছিল তাহ৷ নহে, এত কার্গের ব্যস্ততার মধ্যে। তিনি সাহিতারচনার সময় পাইয়াছিলেন। তাঁহার প্রণীত কোন কোনও গ্রন্থ বিশেষ সমারে পাইঃাছে। শীরনারী ও পুরুচির কুটীর” নামে তিনি দুইখানি উপন্যাস গ্রন্থ রচন) করিয়াছিলেন। এতদ্ভিন্ন “জীবনালেখ্য” নামে এক গ্রন্থে গর্গীয় দুর্গামোহন দাস মহাশয়ের প্রথমা পত্নী ব্ৰমন্ত্রীর জীবন চরিত ব্যক্ত করেন।; এবং বহু:িরশ্রম সহকারে ইংরাজী “ইয়ারবুক” নামক গ্রন্থের অনুকরণে “নববার্ষিকীনামে এক গ্রন্থ প্রণয়ন করেন। বঙ্গের অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তির জীবন চরিত তাহাতে প্রাপ্ত হওয়া যায়। এতদ্ভিন্ন তাহার। শিশুপাঠ্য কয়েক থানি গ্রন্থ আছে। এইরূপ নানা কাৰ্য্যে ব্যস্ত থাকিতে থাকিতে ১৮৯৮ সালের ১৩ই আষাঢ় দিবসে গুরুতর যকৃৎরোগে তিনি। গতাম্র হন।

মনোমোহন ঘোষ।

 ১৮৭০ হইতে ১৮৮০ পর্যন্ত এই কালের মধ্যে যে সকল সাধু পুরুষের শক্তি। বঙ্গসমাজে বিশেষরূপে অনুভূত হইয়াছিল, তাহাদের মধ্যে ক্ষু প্রসিদ্ধ মনোমোহন ঘোষ একজন। ‘কৃতী বারিস্টার, ও পদে সন্ত্ৰমে অগ্রগণ্য বলিয়াই যোহাকে আমরা জানিমাছিলাম তাহা নহে; স্বদেশ-হিতৈষী, সদাশয় ও সর্ব প্রকার সদসুষ্ঠানের উৎসাহদাত৷ বলিয়া তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিলেন। অগ্ৰেই বলিয়াছি ১৮৭৬ সালে যখন ভারতসভা প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তাহার ভবন ঐ সভার প্রধান | উদ্যোগী ব্যক্তিগণের সম্মিলনের স্থান ছিল। কেবল, তাহা নহে ঐ কালে নারীগণের উচ্চশিক্ষ। বিধানাথ যে কিছু আরোজন হইয়াছিল, তিনি। সে সকলের পৃষ্ঠপোষক ও.উৎসাহদাতা ছিলেন। এজন্য তাহাকে নব্যবঙ্গের এই তৃতীয় যুগের একজন নেতা বলিয়া গণনা করা যাইতে পারে।

 মনোমোহন ১৮৪৪ সালের ১৩ই মার্চ দিবসে পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুর জেলার অন্তর্গত এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন। তাহার পিতা স্বর্গীয় রামলোচন। ঘোষ সে কালের একজন সবজজ '? স্বদেশহিতৈষী ব্যক্তি বলিয়া লোকসমাজে। প্রসিদ্ধ ছিলেন। এরূপ: শুনিতে পাওয়া যায়, মামল্লোচন যৌবনকালে মহাত্মা রাজা রামমোহন রায়ের সংস্রবে অ্যাসিয়াপ্রীতি ও শ্রদ্ধাসূত্রে উক্ত মহাপুরুষের সুহিত বদ্ধ হইয়াছিঃলন; এবং তাহাঁর নিকট হইতে হৃদঙ্গ মনের উদার ভাব প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। মনোমোহন উত্তরাধিকারী স্বত্রে পিতার উদার ভাব লাভ করিয়াছিলেন।

 মনোমোহন বাল্যকালে নদীয়া জে লাস্থ কৃষ্ণনগর সহরে স্বীয় পিতার নিকট থাকিয়া কৃষ্ণনগর কলেজে ইংরাজী” শিক্ষা করেন। সেখান হইতে ১৮৫৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হন। তৎপূৰ্ব্বেই ১৮৫৮ সালে টাকী শ্ৰীপুরের বিখ্যাত রায়বংশের অন্ততম বংশধর শুামাচরণ রায়ের কল্লা স্বর্ণলতার সহিত তিনি পরিণয়-পাশে বদ্ধ হন। এই শ্রীপুরের রায়গণ সুপ্রসিদ্ধ বসন্ত রায়ের বংশজাত। কুলমর্যাদাতে ইহারা বঙ্গদেশের কায়স্থ-সমাজে অগ্রগণ্য। রামলোচন নিজে পদ-গৌরবে অগ্রগণ্য হইয়া এই সুপ্রসিদ্ধ কায়স্থ-পরিবারের সহিত বিবাহ সম্বন্ধ স্থাপন করিয়াছিলেন।

 অগ্ৰেই উল্লিখিত হইরাছে যে, সে সময়ে নীলের হাঙ্গামা ও আন্দোলনে সমগ্র বঙ্গদেশ ও বিশেষভাবে নদীয়া জেলা অতিশয় উত্তেজিত হইয়াছিল। নীলকরদিগের অত্যাচার ও প্রজাদের ধৰ্ম্মঘট উভয় চলিতেছিল। ঐ নীলের হাঙ্গামা বালক মনোমোহনের চিত্তকে উত্তেজিত করে। কৃষ্ণনগরে থাকিতে থাকিতে ১৮৬০ সালে, তিনি নীলকরদিগের বিরুদ্ধে লিখিতে আরম্ভ করেন। হিন্দুপেট্রিটের সম্পাদক হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় বিপজ্জালে खफूिड श्हेब अमृषटब প্রাণত্যাগ করাতে তাহ নাক উক্ত পত্রিকাতে যথাসময়ে প্রকাশিত হইতে পারে নাই; এবং তাহাই' নাকি মনোমোহনকে “ইণ্ডিয়ান মিরার” প্রকাশে উৎসাহিত করিয়াছিল।

 ১৮৬১ সাথে মেমোহন কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে পাঠ করিতে আসিলেন এবং এখানে আসিয়া নবোদীয়মান কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়ের সহিত বন্ধুতাস্থত্রে বদ্ধ হইলেন। ইহার দুই বন্ধুতে মিলিত হইয়া “ইণ্ডিয়ান মিরার” নামে পাক্ষিক সংবাদপত্র বাহির করিমে! তাহা এক্ষণে দৈনিক হইয়াছে; এবং কেশববাবুর পিতৃব্যপুত্র শ্ৰীযুক্ত নরেন্দ্রনাথ সেনের দ্বারা সম্পাদিত হইতেছে |

 ১৮৬১ সালে ঘোষজ মহাশয় সিবিল সার্কিস. পরীক্ষা দিবার জন্ত ইংলণ্ডে গমন করেন; এবং সেখানে চায় বৎসর বাস করেন। ইহার মধ্যে তিনি দুইবার সিবিল সাৰ্ব্বিশ পরীক্ষাতে উপস্থিত হন; কিন্তু পরীক্ষার নিয়মাদির পরিবর্তন ঘটাতে श्वश्रे অকৃতকাৰ্য্য হন। তৎপরে বারিষ্টারি পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হইয়। ১৮৬৬ সালের জুন মাসে স্বদেশে প্রতিনিবৃত্ত হন। এই সময়ে র্তাহার পিতার মৃত্যু হয়। ১৮৬৭ সালের প্রারম্ভ হইতে তিনি কলিকাতা হাইকোর্টে বারিটারি কার্ষ্য আরম্ভ করেন। বাষ্টিারি আরম্ভ করিবামাত্র তাহার প্রতিভা উক্ত কোর্টের জজদিগের এবং দেশের লোকের নয়নগোচর হইল। তিনি অল্পদিনের মধ্যে প্রতিষ্ঠা লাভ করিলেন; এবং ফৌজদারী মোকদম বিষয়ে একজন সুবিজ্ঞ বারিষ্টার হইয়া উঠিলেন। তিনি হাইকোর্টের সুপ্রসিদ্ধ বিচারপতি ফিয়ার সাহেব প্রভৃতি সন্ত্রান্ত ইংরাজগণের প্রিয়পাত্র হইলেন।

 কিন্তু যেজন্য তিনি বঙ্গদেশের উপকারী বন্ধুরূপে পরিগণিত হইলেন, তাহা তাঁহার স্বদেশ-হিতৈষিত। তিনি স্বদেশে পদার্পণ করিয়াই স্ত্রীশিক্ষার উন্নতি বিধান বিষয়ে মনোযোগী হইলেন। মৃত্যুকাল পর্য্যন্ত এবিষয়ে তাহার মনোযোগ অবিশ্রান্ত ছিল। তিনি মরণের দিন পর্যন্ত বেথুন কলেজের সম্পাদকের পদে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি বিলাত হইতে প্রতিনিবৃত্ত হইয়া প্রথমে আপনার পত্নীর শিক্ষার বিষয়ে মনোযোগী হইলেন। তখন স্বদেশীয়দিগের মধ্যে বালিকাদিগের উচ্চ শিক্ষার স্থান ছিল না। তিনি শিক্ষা-বিধানার্থ আপনার পত্নীকে লোরেটোকনভেণ্ট নামক সন্ন্যাসিনীদিগের আশ্রমে রাখিলেন। এই সময়ে তাহার যে সংযম, মিতাচার ও স্বকৰ্ত্তব্য-সাধনে দৃঢ়মতি দেখা গিয়াছিল, তাহ অতীব প্রশংসনীয়। কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়ের মুখে ঘোষজ মহাশয়ের এই সময়কার সাধুতা ও সত্যনিষ্ঠার ভূয়সী প্রশংসা শুনিয়াছি।

 পত্নীকে শিক্ষিত করিয়া লইয়া তিনি সংসার পাতিয়া বসিলেন; এবং বিবিধ প্রকারে স্বদেশের উন্নতি বিষয়ে মনোনিবেশ করিলেন। তন্মধ্যে একুট কাজ তিনি করিতে লাগিলেন যেজন্ত স্বদেশের লোকের অনুরাগভাজন হইলেন। যে সকল স্থলে তিনি দেখিতেন যে কোনও লোক রাজকৰ্ম্মচারীদের অবিচারে বা অত্যাচাৰুে ক্লেশ পাইতেছে, সে সকল স্থলে তাহদের পক্ষ। অবলম্বন করিয়া নিজের আইনজ্ঞতার দ্বারা তাহাদিগকে রক্ষা করিবার প্রয়াস পাইতেন। এজন্ত তিনি গুরুতর শ্রম করিতে কাতর হইতেন না। ঐ সকল মোকদম এরূপ দক্ষতার-সন্ধিত চালাইতেন যে অধিকাংশ স্থলেই জয়লাভ করিতেন; এবং দেশে ধন্য ধন্ত রৰ উঠিয়া, যাইত। এইরূপে তাহার পরিচালিত অনেক মোকদ্দমা আইনজ্ঞ ব্যক্তিদিগের মধ্যে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে।

 ১৮৭২ সালে নারীগণের উচ্চশিক্ষা লইয়া উন্নতিশীল ব্রাহ্মদলে যখন আন্দোলন উপস্থিত হইল, তখন তিনি উচ্চশিক্ষা পক্ষপাতিগণের পৃষ্ঠপোষক হইলেন। বঙ্গমহিলা বিদ্যালয়ের তত্ত্বাবধায়িক কুমারী এক্রয়েড এদেশে আসিয়া তাহারই ভবন আশ্রয় করিলেন; এবং সেখানে বসিয়া এদেশীয় নারীকুলের শিক্ষাবিধানের বিষয়ে পরামর্শ করিতে লাগিলেন। ইহা অগ্ৰেই উক্ত হইয়াছে।

 ১৮৭৬ সালে ভারতসভা যখন স্থাপিত হইল, তখন তিনি ইহার একজন প্রধান পরামর্শদাতা হইলেন; তাহার ভবন ইহার প্রতিষ্ঠাতাদিগের সন্মিলনের ক্ষেত্র হইল; এবং তিনি ইহার কার্য্য নিৰ্ব্বাহ বিষয়ে ইহার কৰ্ম্মচারীদিগকে সাহাফ করিতে লাগিলেন। তৎপরে ইণ্ডিয়ান কংগ্রেস স্থাপিত হইলে তিনি উৎসাহের সহিত রাজনীতির আন্দোলনে সাহায্য করিতে লাগলেন। কংগ্রেসের অবলম্বিত আলোচ্য বিষয় সকলের মধ্যে একটা বিষয় তিনি সৰ্ব্বপ্রথমে অবতারণা করেন; এবং দৃঢ়তার সহিত প্রচার করেন। তাহ বিচার ও শাসন বিভাগকে স্বতন্ত্র করা। রাজপুরুষগণ এতদিনের পর এই পরামর্শ অনুসারে কার্য্য করিবার জন্ত প্রস্তুত হইয়াছেন। কিন্তু মনোমোহন ঘোষ মহাশয় যে সময়ে এদিকে সকলের দৃষ্টিকে আকর্ষণ করিৰার চেষ্টা করিয়াছিলেন, তখন এবিষয়ে অনেকের झुष्ट ੋ নাই | हेश:ख्हे তাঁহার দূরদর্শিতা ও স্বজাতিপ্রেমের নিদর্শন পাওয়া যাইতেছে।

 ১৮৬৯ হইতে ১৮৮৫ সালের মধ্যে তিনি স্বদেশবাসিগণের চিত্তে স্বজাতি প্রেম উদ্দীপ্ত করিবার জন্ত নানা স্থানে বক্তৃতাদি করেন। ১৮৮৫ সালে তিনি স্বদেশীয়ুগণের প্রতিনিধিরূপে ইংলণ্ডে গমন করিয়া সে দেশের নানা স্থানে, ভারতের দুঃখ দুৰ্গতির বিষয়ে বক্তৃত করেন। সেই বক্তৃতার ফলে অনেকের দৃষ্টি ভারতবর্ষের দিকে আকৃষ্ট হয়; এবং ইংলণ্ডে उब्रडश्टेिउशै। দলের অঙ্গপুষ্টি ও তাঁহাদের প্রভাব বৃদ্ধি হয়।

 এইরূপে স্বদেশের হিত চিন্তাতে রত থাকিতে থাকিতে ১৮৯৬ সালে দারুণ পক্ষাঘাত রোগে তাহার মৃত্যু হয়। তাঁহার মাতৃভক্তি অতিশয় প্রগাঢ় ছিল। কলিকাতার বিষয় কৰ্ম্মে ব্যাপৃত থাকিবার সময়েও একটু অবসর পাইলেই জননীর চরণদর্শনের জন্ত কৃষ্ণনগরের বাড়ীতে যাইতেন; এবং মাতৃ সঙ্গে কয়েক দিন যাপন করিয়া আসিতেন। সেই নিয়মানুসারে ঐ বৎসরের অকৃটােবর মাসে পুজার বৃন্ধের সময় কৃষ্ণনগরের বাড়ীতে গমন করিয়াছিলেন। সেখানে একদিন হঠাৎ মাথাতে রক্ত উঠিয়া অচেতন হইয়া পড়েন। তাহার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রাণ বায়ু তাঁহার দেহকে পরিত্যাগ করিয়া যায়।

 এতদ্ভিন্ন এই কালের নেতৃবৃন্দের মধ্যে কেহ কেহ এখনও জীবিত আছেন; সেজন্য তাঁহাদের জীবন-চরিত ব্যক্ত করা গেল না।