রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ/দশম পরিচ্ছেদ

দশম পরিচ্ছেদ।

ব্রাহ্মসমাজের নবোত্থান।

১৮৬০ সাল হইতে ১৮৭০ সাল পর্য্যন্ত।

 এক্ষণে ১৮৬০ সাল হইতে ১৮৭০ পৰ্য্যন্ত এই কালের মধ্যে বঙ্গ-সমাজে যে যে বিশেষ আন্দোলনের তরঙ্গ উঠিয়াছিল তাহার কিছু কিছু নির্দ্দেশ করিতে প্রবৃত্ত হইতেছি। বলিতে গেলে রামমোহন রায়ের অভ্যুদয়, হিন্দুকালেজের প্রতিষ্ঠা, ব্রাহ্মসমাজের স্থাপন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও অক্ষয়কুমার দত্তের আবির্ভাব, মধুসূদন দত্তের প্রভাব প্রভৃতি ঘটনা-পরম্পরা দ্বারা বঙ্গসমাজে যে নব আকাঙ্ক্ষার উচ্ছ্বাস হইয়াছিল, তাহা এই কয়েক বৎসর আপনার কাজ করিয়া আসিতেছিল। এই ১৮৬০ সাল হইতে ১৮৭০ সালের মধ্যে তাহা আরও ঘনীভূত আকারে আপনাকে প্রকাশ করিয়াছিল। এই কালের মধ্যে নববঙ্গের কয়েকজন নূতন নেতা দেখা দিয়াছিলেন, এবং বঙ্গবাসীর চিত্ত ও চিন্তাকে নুতন পথে প্রবৃত্ত করিয়াছিলেন। তাঁহাদের সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত পর পরিচ্ছেদে প্রদত্ত হইবে। আপাততঃ তাঁহাদের কার্য্যের বিষয়ে কিছু আলোচনা করা যাইতেছে।

 এই কালের প্রথম ভাগে কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় নবোদীয়মান রবির ন্যায় বঙ্গাকাশে উঠিতে লাগিলেন; এবং তাঁহাকে আবেষ্টন করিয়া ব্রাহ্মসমাজও সূৰ্য্যমণ্ডলের ন্যায় মানব-চক্ষুর গোচর হইল। ১৮৫৬ সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় ধ্যান ধারণাতে বিশেষ ভাবে কিছুকাল যাপন করিবার আশয়ে সহর ত্যাগ করিয়া হিমালয় শিখরে গমন করেন। ১৮৫৮ সালের শেষভাগে তিনি সহরে প্রতিনিবৃত্ত হইলেন। তিনি আসিয়া দেখেন যে তাহার সহাধ্যায়ী বন্ধু প্যারীমোহন সেনের দ্বিতীয় পুত্র কেশবচন্দ্র সেন ব্রাহ্মসমাজে যোগ দিয়াছেন। ইহাতে তাঁহার হৃদয় আনন্দে নৃত্য করিয়া উঠিল। তিনি কেশবকে আপনার প্রেমালিঙ্গনের মধ্যে গ্রহণ করিলেন। উভয়ের যোগ মণি-কাঞ্চনের যোগের ন্যায় হইল। উভয়ে মিলিত হইয়া নব নব কাৰ্য্যে হস্তার্পণ করতে লাগিলেন।

 ১৮৫৯ সাল হইতে ব্রাহ্মসমাজে নবশক্তির সঞ্চার দেথা গেল। এক দিকে দেবেন্দ্রনাথ তাঁহার শৈলবাসকালের সাধনার চরম ফল সকল তাঁহার চিরস্মরণীয় উপদেশগুলির মধ্যে ব্যক্ত করিতে লাগিলেন। বাঙ্গালার মানুষ অধ্যাত্মতত্ত্বের এরূপ ব্যাখ্যা পূৰ্ব্বে কখনও শোনে নাই। সুতরাং সহরে ত্বরায় এই জনরব ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল যে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর গিরিশৃঙ্গ হইতে নামিয়া ব্রাহ্মসমাজকে জাগাইয়া তুলিয়াছেন। এই সংবাদে নানাশ্রেণীর লোক ব্রাহ্মসমাজের উপাসনার দিনে ভাঙ্গিয়া পড়িতে লাগিল। একদিনের উপদেশ শুনিয়া আমরা সাতদিন মন স্থির রাখিতে পরিতাম না। হদয়ে কি নব ভাব জাগিত! চক্ষে কি নুতন জগত আসিত! এই সকল উপদেশ গ্রন্থাকারে নিবদ্ধ হইয়া বঙ্গসাহিত্যের অমূল্য সম্পত্তি রূপে রহিয়াছে। আজ তাঁহাদের আদর না হউক একদিন হইবেই হইবে। এমন সুন্দর ভাষার এরূপ উচ্চ সত্য সকল যে ব্যক্ত হইতে পারে, ইহাই বঙ্গভাষার অসীম স্থিতিস্থাপকতার নিদর্শন। কিছু না হইলে ভাষার দিক দিয়া এই উপদেশগুলি বঙ্গীয় সাহিত্য-সেবীর পাঠ্য।

 অপরদিকে যুবক কেশবচন্দ্রের উৎসাহাগ্নি সকলের দৃষ্টিগোচর হইল। তিনি একাকী ব্রাহ্মমাজে প্রবেশ করিলেন না। তাঁহার পদবীর অনুসরণ করিয়া তাঁহার যৌবন-সুহৃদগণের অনেকে ব্রাহ্মসমাজে আসিয়া প্রৰিষ্ট হইলেন। ইহাদের প্রেমোজ্জ্বল হৃদয়ের সংস্পর্শে ব্রাহ্মসমাজে এক প্রকার নবশক্তির সঞ্চার হইল। দেবেন্দ্রনাথ ও কেশবচন্দ্র মিলিত হইয়া এই সময়ে কয়েক প্রকার কার্য্যের আয়োজন করিলেন। প্রথম যুবকগণের ধৰ্ম্ম শিক্ষার্থ ব্রান্ধবিদ্যালয় নামে একটী বিদ্যালয় স্থাপিত হইল। প্রতি রবিবার প্রাতে ঐ বিদ্যালয়ের অধিবেশন হইত; তাহাতে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ বাঙ্গালাতে এবং কেশবচন্ত্র সেন ইংরাজীতে উপদেশ দিতেন। ঐ সকল উপদেশ দ্বারা অনেক শিক্ষিত যুবক ব্রাহ্মসমাজের দিকে আকৃষ্ট হইল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সৰ্ব্বোচ্চ উপাধিধারী যুবকগণ ব্রাহ্মসমাজের সহিত হৃষ্ট হওয়াকে গৌরবের বিবর মনে করিতে লাগিল।

 দ্বিতীয় যাঁহার ব্রহ্মবিদ্যালয়ের দ্বারা আকৃষ্ট হইতে লাগিলেন, এবং তদগ্রেই যাহারা কেশবচঞ্জের অনুসরণ করিয়াছিলেন, তাহাদিগকে লইয়া কেশব এক সুহৃদগোষ্ঠী স্থাপন করিলেন; সপ্তাহের মধ্যে একদিন নিজভবনে তাঁহাদের সঙ্গে বিশ্রম্ভালাপের জন্য বসিতেন। সেখানে সৰ্ব্বপ্রকার ধৰ্ম্ম ও সামাজিক বিষয়ে কথাবাৰ্ত্তা হইত। দেবেন্দ্রনাথ পঞ্জাবীদিগের সুহৃদগোষ্ঠীর সঙ্গত সভা নাম দেখিয়া ইহার নাম সঙ্গত সভা রাখিলেন। এই সঙ্গত সভা ব্রাহ্মসমাজের নবশক্তির অদ্ভূত উৎসস্বরূপ হইল। যুবকসভ্যগণ সৰ্ব্বাস্তঃকরণের সহিত আত্মোন্নতি প্রার্থী হইয়া সঙ্গতের আলোচনাতে আপনাদিগকে নিক্ষেপ করিতেন, এবং যাহা কৰ্ত্তব্য বলিয়া নিৰ্দ্ধারিত হইত, তাহা সৰ্ব্বতোভাবে আচরণ করিবার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইয়া সভাস্থল পরিত্যাগ করিতেন। এক এক দিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অতিবাহিত হইয়া যাইত; তাহাদের জ্ঞান থাকিত না; রাত্রি ৯টার সময়ে বসিয়া হয়ত ২টার সময়ে সভাভঙ্গ হইত; কোথা দিয়া যে সময় যাইত কেহই বুঝিতে পারিত না। এরূপ আত্মোন্নতির জন্য বাকুলতা, এরূপ কৰ্ত্তব্যসাধনে দৃঢ় নিষ্ঠা, এরূপ সত্যানুসরণে চিত্তের একাগ্রতা, এরূপ হৃদয়স্থ বিশ্বাসে আত্মসমর্পণ, এরূপ ঈশ্বরে বিশ্বাস ও নির্ভর সচরাচর দেখা যায় না। অল্পদিনের মধ্যেই কেশবকে বেষ্টন করিয়া এক ঘননিবিষ্ট মণ্ডলী সৃষ্ট হইল। ১৮৬১ সালে কেশবচন্দ্র বিষয়কর্ম্ম হইতে অবসৃত হইয়া ব্রাহ্মধৰ্ম্ম গ্রচারে নিযুক্ত হইলে ইহাদের অনেকে তাঁহার অনুসরণ করিয়া চিরদারিদ্র্যে ঝাপ দিয়াছিলেন, এবং এখনও ইহাদের অনেকে ব্রাহ্মধৰ্ম্মপ্রচার কার্য্যে নিযুক্ত থাকিয়া ব্রাহ্মসমাজের শক্তির উৎস স্বরূপ হইয়া রহিয়াছেন।

 সঙ্গত সভার সভ্যগণ যে নবভাবে দীক্ষিত হইলেন তাহা এই যে হৃদয়ের বিশ্বাসকে কার্য্যে পরিণত করিতে হইবে, তদ্ব্যতীত ধৰ্ম্ম হয় না। এই ভাব অস্তরে প্রবল হওয়াতে ১৮৬১ সাল হইতে ব্রাহ্মধৰ্ম্মকে অনুষ্ঠানে পরিণত করিবার জন্য ব্যগ্রতা দৃষ্ট হইতে লাগিল। ঐ সালে দেবেন্দ্রনাথ তাঁহার দ্বিতীয় কন্যার বিবাহ ব্ৰাহ্মধৰ্ম্মের পদ্ধতি অনুসারে দিলেন। এদিকে যুবক ব্রাহ্মদলে অনেক ব্রাহ্মণের সস্তান জাতিভেদের চিহ্লস্বরূপ উপবীত পরিত্যাগ করিয়া নানা প্রকার সামাজিক নিগ্রহ ও নিৰ্য্যাতন সহ্য করিতে লাগিলেন। দেশমধ্যে মহা আন্দোলন উপস্থিত হইল। নবীন ব্রাহ্মগণ তাহাদের কার্য্যক্ষেত্র দিন দিন বিস্তৃত করিয়া তুলিতে লাগিলেন। প্রধানতঃ মনোমোহন ঘোষ ও কেশবচন্দ্র সেনের উৎসাহে ও দেবেন্দ্রনাথের অর্থসাহায্যে “ইণ্ডিয়ান মিরার” নামে এক সংবাদপত্র প্রকাশিত হইল; কলিকাতা কালেজ নামে এক উচ্চশ্রেণীর বিদ্যালয় স্থাপিত হইল, তাহা নবীন ব্রাহ্মদলের এক প্রধান আড্ডা হইয়া দাঁড়াইল; এবং সৰ্ব্ববিধ সদালোচনার জন্য ব্রাহ্মবন্ধু সভা নামে এক সভা স্থাপিত হইল। এই সময়ে অগ্রসর ব্রাহ্মদল স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের জন্য যাহা করিয়াছিলেন, তাহা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সমাজ সংস্কার বিষয়ে আলোচনা আরম্ভ হইলেই নারীজাতির উন্নতির প্রতি তাঁহাদের দৃষ্টি পড়ে। সংগতের অবলম্বিত প্রতিজ্ঞাগুলির মধ্যে নারীজাতির উন্নতিসাধনের চেষ্টা একটী প্রতিজ্ঞারূপে অবলম্বিত হয়। তদন্তুসারে নবীন ব্রান্ধগণ স্বীয় স্বীয় ভবনে, স্বীয় স্বীয় পত্নী, ভগিনী, কন্যা প্রভৃতির শিক্ষাবিধানে মনোযোগী হন। অনেকে সমস্ত দিন আফিসে গুরুতর শ্রম করিয়া আসিয়া সায়ংকালে স্বীর স্বীয় পত্নী বা ভগিনীর শিক্ষকতা কার্যো নিযুক্ত হইতেন। তদ্ভিন্ন ব্রাহ্মবন্ধু সভার সংশ্রবে একটা স্ত্রীশিক্ষাবিভাগ স্থাপন করিয়া অন্তঃপুরে স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের নানা উপায় অবলম্বন করেন; এবং তাঁহাদের কয়েকজনে মিলিত হইয়া “বামাবোধিনী পত্রিকা” নামে স্ত্রীপাঠ্য একখানি মাসিক পত্রিকা বাহির করিতে আরম্ভ করেন। সে পত্রিকা অদ্যাপি রহিয়াছে। প্রথম সম্পাদকের পরিবারগণ এখনও তাঁহাকে রক্ষা করিতেছেন।

 ১৮৬৪ সালে ব্রাহ্মিকা-সমাজ নামে নারীগণের জন্য একটা স্বতন্ত্র উপাসনাসমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়; এবং কেশবচন্দ্র তাহার আচার্য্যের কার্য্য করিতে থাকেন। ক্রমে নবীন ব্রাহ্মদলের মধ্যে এক অত্যগ্রসর দল দেখা দিলেন; তাঁহারা নারীজাতির উন্নতির জন্য পূৰ্ব্বোক্ত উপায় সকল অবলম্বন করিয়া সস্তুষ্ট রহিলেন না; কিন্তু আপনাপন পত্নীকে নববেশে সজ্জিত করিয়া প্রকাশ্যস্থানে গতায়াত করিতে আরম্ভ করিলেন তাহা লইয়া চারিদিকে মহাসমালোচনা আরম্ভ হইল। এই কালের শেষভাগে দেবেন্দ্রনাথের মধ্যম পুত্ৰ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় আপনার পত্নীকে লইয়া গবর্ণর জেনেরালের বাড়ীতে বন্ধু-সম্মিলনে যান, তাহাতেও স্ত্রী-স্বাধীনতা বিষয়ক আন্দোলনকে দেশমধ্যে প্রবল করিয়া তুলিয়াছিল।  যাহাহউক প্রাচীন দলের নেতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ও যুবকদলের নেতা কেশবচন্দ্র সেন, ইঁহাদের মধ্যে পরামর্শ ও কার্য্যের একতা বহুদিন রহিল না। নবীন ব্রাহ্মগণ অধিক দিন মুখে জাতিভেদের নিন্দ করিয়া এবং কাৰ্য্যতঃ উপবীত ত্যাগ করিয়া এবং সকল জাতি মিলিয়া একত্র পান ভোজন করিয়াও সস্তুষ্ট থাকিতে পারিলেন না। ১৮৬৪ সাল হইতেই তাঁহারা বিভিন্ন জাতীয় নরনারীর মধ্যে বিবাহসম্বন্ধ স্থাপন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন এবং এই ধূয়া ধরিলেন যে, উপবীতধারী ব্রাহ্মণ আচাৰ্য্যগণ বেদীতে বসিলে তাঁহারা উপাসনাতে যোগ দিতে পারেন না। দেবেন্দ্রনাথ এতদূর যাইতে প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি প্রথম প্রথম উপবীতত্যাগী উপাচাৰ্য্য নিযুক্ত করিতে অগ্রসর হইয়াছিলেন; কিন্তু নবীন ব্রাহ্মগণ যখন বিভিন্ন জাতীয় ব্যক্তিগণের মধ্যে বিবাহ সম্বন্ধ স্থাপন করিতে অগ্রসর হইলেন, তখন এ পথে ইহার কতদূর যাইতে পারে ভাবিয়া চমকিয়া গেলেন। তাঁহার রক্ষণশীল প্রকৃতি আর অগ্রসর হইতে চাহিল না। এই স্থলে প্রাচীন ও নবীন ব্রাহ্মদলে বিচ্ছেদ ঘটিল। অগ্রসর ব্রাহ্মদল স্বতন্ত্র কার্য্যক্ষেত্র করিলেন; “ধৰ্ম্মতত্ত্ব” নামে মাসিক পত্রিকা বাহির করিলেন এবং ১৮৬৬ সালের নবেম্বর মাসে দেবেন্দ্রনাথের সমাজ ত্যাগ করিয়া ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ নামে স্বতন্ত্র সমাজ স্থাপন করিলেন। তদবধি দেবেন্দ্রনাথের সমাজের নাম "আদি ব্রাহ্মসমাজ" হইল।

 ১৮৬৬ হইতে ১৮৭০ পর্য্যন্ত কালের মধ্যে অগ্রসর ব্রাহ্মদল মহোৎসাহে ব্রাহ্মধৰ্ম্মের বার্তা ভারতের নানা প্রদেশে প্রচার করিতে লাগিলেন। দেখিতে দেখিতে পঞ্জাব, সিন্ধু, বোম্বাই, মান্দ্রাজ, সৰ্ব্বত্র ব্রাহ্মসমাজ স্থাপিত হইল। কেশবচন্দ্র সেন শিক্ষিত ব্যক্তিগণের চিন্তার ও চর্চার অনেক অংশ অধিকার করিয়া ফেলিলেন।

 এইরূপে ব্রাহ্মসমাজের নবোত্থান দ্বারা বঙ্গসমাজে যখন আন্দোলনের তরঙ্গ উঠিয়াছিল, তখন সাহিত্যক্ষেত্রে নবশক্তির আবির্ভাব দেখা গেল। ইহার কিছু পূৰ্ব্বে নীলের হাঙ্গামা, নীলকরের অত্যাচার, প্রজাদের কষ্ট প্রভৃতি হিন্দুপেট্রিয়ট ও অপরাপর পত্রের দ্বারা আমাদের কর্ণগোচর হইয়াছিল। সে হাঙ্গামার বিবরণ অগ্ৰেই দিয়াছি। আমাদের মন যখন অল্পাধিক পরিমাণে উত্তেজিত, তখন ১৮৬০ সালের শেষভাগে "নীলদর্পণ" নাটক প্রকাশিত হইল। হঠাৎ যেন বঙ্গসমাজ ক্ষেত্রে উল্কাপাত হইল; এ নাটক কোথা হইতে কে প্রকাশ করিল, কিছুই জানা গেল না। এ নাটক প্রাচীন নাটকের চিরাবলম্বিত রীতি রক্ষা করিল কি না, সে বিচার করিবার সময় রহিল না; ঘটনা সকল সত্য কি না অনুসন্ধান করিবার সময় পাওয়া গেল না; নীলদর্পণ আমাদিগকে ব্যাপ্ত করিয়া ফেলিল; তোরাপ আমাদের ভালবাসা কাড়িয়া লইল; ক্ষেত্রমণির দুঃখে আমাদের রক্ত গরম হইয়া গেল; মনে হইতে লাগিল রোগ সাহেবকে যদি একবার পাই অন্য অস্ত্র না পাইলে যেন দাঁত দিয়া ছিড়িয়া খণ্ড খণ্ড করিতে পারি। এই নীলদর্পণকে অবলম্বন করিয়া লংএর কারাগার প্রভৃতির বিবরণ অগ্ৰেই দিয়াছি।

 মাইকেল মধুসূদন দত্ত, তাহার নাটক সকলে চিরন্তন রীতি ত্যাগ করিয়া যে নূতন পথ অবলম্বন করিয়াছিলেন. দীনবন্ধু সেই পথে আরও অগ্রসর হইলেন। এই নুতন রীতি ইংরাজী শিক্ষিত ব্যক্তিগণের পক্ষে অতীব স্পৃহণীয় হইল৷ পর পরিচ্ছেদে মিত্র মহাশয়ের জীবন-চরিতে পাঠকগণ দেখিতে পাইবেন যে তিনি কৰ্ম্মসূত্রে নানা দেশে, নানা জেলাতে ভ্রমণ করিয়াছিলেন। শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের মধ্যে আর কেহ তাঁহার ন্যায় নানা স্থানে নানা শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মিশিয়াছিলেন কি না সন্দেহ। তাঁহার এই ভূয়োদর্শন তাঁহার অঙ্কিত চরিত্র সকল সৃষ্টি করিতে সমর্থ হইয়াছিল। ইহার পরে দীনবন্ধু আরও যে সকল গ্রন্থ প্রণয়ন করেন তাঁহার বিবরণ তাঁহার জীবন-চরিতে দেওয়া গেল।

 দীনবন্ধু যেমন তাঁহার নাটকগুলির দ্বারা বঙ্গ সাহিতো নবভাব ও বাঙ্গালির মনে নবশক্তির সঞ্চার করিলেন, তেমনি এইকালের মধ্যে বঙ্গীয় সাহিতা জগতে আর এক প্রতিভাশালী পুরুষ দেখা দিলেন;—তিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। বঙ্গের অমরকবি মধুসূদন যেমন চিরাগত রীতি-পাশ ছিন্ন করতঃ বঙ্গীয় পদ্য সাহিত্যকে স্বাধীনতা মন্ত্রে দীক্ষিত করিয়া এক নব স্বাধীনতা, নব চিন্তা, নব আকাঙ্ক্ষা ও নবশক্তির অবতারণা করিলেন, গদ্য সাহিত্যে সেই কাৰ্য্য করিবার জন্য বঙ্কিম চন্দ্রের অভ্যূদয় হইল। তৎপূৰ্ব্বে বিদ্যাসাগর মহাশয় ও অক্ষয় কুমার দত্ত মহাশয়ের নেতৃত্বাধীনে বাঙ্গালা গদ্য সংস্কৃত-বহুল ও সংস্কৃত ব্যাকরণের রীত্যনুসারী হইয়া ধনীগৃহের রমণীগণের ন্যায় অলঙ্কারভাবে প্ৰপীড়িত হইয়াছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের অভ্যুদয়ের পূৰ্ব্বেও একদল ইংরাজী শিক্ষিত কাব্যানুরাগী লোক এই সংস্কৃত ভাষাভারে পীড়িত বঙ্গভাষাকে কিরূপে উদ্ধার করিবার প্রশ্বাস পাইতেছিলেন, এবং কিরূপে তাঁহারা আলালী ভাষা নামে একপ্রকার তাজা তাজা বাঙ্গালা ভাষার সৃষ্টি করিয়াছিলেন, তাহা অগ্ৰেই লিখিয়াছি। সুপ্রসিদ্ধ প্যারীচাঁদ মিত্র ও রাধানাথ শিকদার যে এই নব ভাষার জন্মদাতা ছিলেন; এবং তাঁহাদের প্রকাশিত “মাসিক পত্রিকা যে এই ভাষার ভেরীনিনাদ ছিল, তাহাও অগ্ৰে নির্দেশ করিয়াছি। কিন্তু ঐ “আলালী’ ভাষা গ্রাম্যতা দোষে কিছু অতিরিক্ত মাত্রায় দূষিত ছিল। যথা “টক্ টক্‌ পটাস পটাস মিয়াজান গাড়োয়ান এক এক বার গান করিতেছে—টিট্‌কারি দিতেছে, হাঃ শালার গরু বলিয়া লেজ' মুছড়াইয়া সপাৎ সপাৎ মারিতেছে।” ইত্যাদি ভাষা যে গ্রন্থে বা পত্রিকাতে মুদ্রিত হইলে গ্রাম্যতা দোষ ঘটে তাহা সকলেই অনুভব করিতে পারেন। সুতরাং এই আলালী ভাষা বঙ্গীয় পাঠক বৃন্দের সম্পূর্ণ ভাল লাগিত না।

 ইহার পরে হুতোমের নক্সা প্রকাশিত হয়। তাহাও প্রায় এই আলালী ভাষাতে লিখিত। কালীপ্রসন্ন সিংহ হুতোমের নক্সা লিখিয়া অমর হইয়াছেন। তাঁহার জীবন্ত হৃদয়গ্রাহী বাঙ্গালা আমাদিগকে বড়ই প্রীত করিয়াছিল। কিন্তু তাহাও গ্রাম্যতা দোষের উপরে উঠিতে পারে নাই।

 সন্ধিস্থলে বঙ্কিমচন্দ্র আবির্ভূত হইলেন। তিনি যৌবনের প্রারম্ভে ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত মহাশয়ের শিষ্যত্ব গ্রহণ করিয়া পদ্যরচনাতে সিদ্ধহস্ততা লাভ করিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন; কিন্তু মধুসূদনের দীপ্ত প্রভাতে আপনাকে পরীক্ষা করিয়া জানিতে পারিলেন যে সে পথ তাহাকে পরিত্যাগ করিতে হইবে। কিন্তু তিনি শুভক্ষণে গদ্যরচনাতে লেখনী নিয়োগ করিলেন। অচিরকালের মধ্যে বঙ্গের সাহিত্যাকাশে উজ্জ্বল তারকার ন্যায় বঙ্কিম দীপ্তি পাইতে লাগিলেন। বঙ্গবাসীয় চিন্তা ও চিত্তের উন্মেষ পক্ষে যত লোক সহায়তা করিয়াছেন তন্মধ্যে ইনি একজন অগ্রগণ্য ব্যক্তি।

 এই কালের মধ্যে নাটক ও উপন্যাস রচনা দ্বারা বঙ্গসমাজে যে পরিবর্তন ঘটাইয়াছিল তাহা কথঞ্চিৎ প্রদর্শন করিয়া আর এক সুমহৎ বিপ্লবের বিষয় উল্লেখ করিতে যাইতেছি। তাহা বঙ্গীয় সাহিত্যজগতে “সোমপ্রকাশের” অভ্যূদয়। ইংরাজ রাজ্যের প্রতিষ্ঠার পর হইতেই কিরূপে সংবাদপত্রের আবির্ভাব হইয়া, তাহা কত প্রকার অবস্থার মধ্য দিয়া চলিয়া আসিয়াছে তাহার বিবরণ অগ্ৰেই দিয়াছি। সংবাদপত্র প্রথমে ইংরাজদিগের দ্বারা সম্পাদিত হইতে আরম্ভ হয়। তৎপরে শ্রীরামপুরের মিশনারিগণ তাঁহাদের দর্পণ নামক পত্রের সৃষ্টি করিয়া বাঙ্গালা সংবাদ পত্রের পথ খুঁলিয়া দেন। কিন্তু “দর্পণ” ইংরাজদিগের দ্বারাই সম্পাদিত হইত এবং তাহার ভাষা ইংরাজ-লিখিত বাঙ্গালা হইত। প্রকৃত পক্ষে রাজা রামমোহন রায় এ দেশীয় দ্বারা লিখিত বাঙ্গালা সংবাদপত্রের পথ প্রদর্শক। তিনিই ১৮২১ সালে “সংবাদ কৌমুদী” নামে সাপ্তাহিক পত্র প্রকাশ করেন। ঐ “কৌমুদীতে জ্ঞাতব্য বিষয় অনেক খাতি। ইহা লোকশিক্ষার একটী প্রধান উপায় স্বরূপ ছিল। তৎপরে সতীদাহ নিবারণ বইয়া হিন্দু সমাজের সহিত যখন রাজার বিবাদ উপস্থিত । হয়, তখন হিন্দু ধর্মের পক্ষগণচন্দ্রিকা নামক প্রত্রিকা প্রকাশ করিয়া স্বধৰ্ম্ম রক্ষাতে ও সংস্কারার্থীদিগের সহিত বাকযুদ্ধে প্রবৃত্ত হন। কৌমুদী রামমোহন রায়ের মৃত্যুর পরেও কিছুদিন ছিল। চঞ্জিকা তৎপরেও বহুকাল জীবিত ছিল। চত্রিকার । আবির্ভাবের অল্পকাল : পরেই ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘প্রভাকর প্রকাশিত হয়। প্রভাকরের রাজত্ব যখন মধ্যাহ্ন• সর্বোর গায় দীপ্তিমান, তখন ১৮৪৩ : সালে ব্রাহ্মসমাজ কর্তৃক “তত্ত্ববোধিনী” পত্রিকা প্রকাশিত হয় ।

 তত্ত্ববোধিনী বঙ্গীয় পাঠকগণকে গভীর জ্ঞানের বিষয় সকলের আলোচনাতে প্রবৃত্ত করে ; এবং তদ্বারা বঙ্গসমাজে এক মহৎ পরিবর্তন আনয়ন করে। কিন্তু তত্ত্ববোধিনী ঠিক সংবাদ পত্র ছিল না। ধর্মতত্ত্বের আলোচনাই তাহার মুখ্য কাৰ্য্য ছিল। দৈনিক সংবাদ যোগাইবার ভার “প্রভাকর,” “ভাস্কর” প্রভৃতি পত্র সকল গ্রহণ করিয়াছিল । “ভাস্কর’ গুড় গুড়ে ভট্টাচাৰ্য্য বা গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য্য কর্তৃক সম্পাদিত হইত । এতদ্ব্যতীত সেই সময়ে আরও অনেকগুলি সংবাদ পত্র বাহির । হইয়াছিল। ১৮৫০ সালে মুদ্রিত এক তালিকা হইতে নিম্নলিখিত নামগুলি পাওয়া যায়। ; -যথা, মহাজন দর্পণ, চন্দ্রোদয়, রসরাজ, জ্ঞান দর্পণ, বঙ্গদূত, সাধুরঞ্জন, জ্ঞানসঞ্চারিণী, রস-সাগর, রঙ্গপুর বার্তাবহ, রসমুদগর, নিত্যধর্মাহু!ফ্রিকাও দুর্জ ন দমন মহানবমী।

 ইহাদের অধিকাংশ পরস্পরের প্রতি অভদ্র গালাগালিতে পূর্ণ হইত। প্রভাকরে ও ভাস্কয়ে এরূপ অভদ্র কটুক্তি চলিত যে তাহ৷ গুনিলে কাণে হাত দিতে হয়। প্রভাকর ও ভাস্করের পদবীর অনুসরণ করিয়া “রসরাজ ও “যেমন কৰ্ম্ম তেমনি ’ফল প্রভৃতি কতিপয় | পত্রে' এরপ কবির লড়াই আরম্ভ করিল যে, তাহার বর্ণনা অসাধ্য। মুখের বিষয় অচিয় কালের । মধ্যে দেশের লোকের নিন্দার বাণী উখিত হইল। চারিদিকে ছি ছি রব । উঠিয়া গেল। কবির লড়াইও পামিল্লা গেল।

 বোধ হয় এই ছি ছি, রবটা হৃদর্মে থাকাতেই এসময়ে শিক্ষিত ব্যক্তিগণ বাঙ্গালা সংবাদ পত্র পড়িতে বা বাঙ্গালা লিথিতে স্বণ বোধ করিতেন। তাহাদের মধ্যে যে কেহ সংবাদ পত্র প্রকাশ করিতে চাহিতেন, তিনি ইংরাজীতেই করিতেন। এই সকল ইংরাঙ্গী পুত্রের মধ্যে হরিশের Hindoo Patriot, starototim cotto Bengal Spectator, wishopsin costs: Hindoo Intelligencer, কিশোরীচঁাদ মিত্রের Indian Field সমধিক প্রসিদ্ধি লাভ করিস্থাছিল।

 ১৮৫৮ সালে সোমপ্রকাশের অভু্যদয়ের সময়েও এই ছিছি রবটা প্রবল ছিল। আমার বোধ হয় এই ছি ছিররটা নিবারণ করাই সোমপ্রকাশের জন্মের অন্ততম কারণ ছিল। ১৮৫• হইতে ১৮৫৮ সালের মধ্যে এই ছি ছি রব নিবারণের আরও চেষ্টা হইয়াছিল। কয়েকখানি উৎকৃষ্ট শ্রেণীর বাঙ্গালা সাময়িক পত্র প্রকাশ পাইয়াছিল। তন্মধ্যে সুবিখ্যাত ডাক্তার রাজেন্দ্রলাল মিত্রের সম্পাদিত “বিবিধার্থ সংগ্ৰহ” ও তৎপরে পরিবর্তিত আকারে প্রকাশিত “রহস্ত-সন্দর্ভ’ বিশেষ রূপে উল্লেখ যোগ্য। তাহা যদিও ঠিক সংবাদ পত্র ছিল না বটে, তথাপি মিত্ৰজ মহাশয় উক্তপত্রে গম্ভীর ভাষায় যে সকল মহামূল্য জ্ঞাতব্য বিষয় পাঠকগণের.গোচর করিতেন, তাহ পাঠ করিয়া আমরা বিশেষ উপকৃত হইতাম। সে প্রবন্ধগুলি চিরদিন আমাদের স্মৃতিতে রহিয়াছে।

 সোমপ্রকাশের অভু্যদয়ের প্রাকৃকালেই প্যারীচঁাদ মিত্র ও রাধানাথ শিকদারের “মাসিক পত্রিকা” প্রকাশিত হর। তাহাতে অনেক জ্ঞাতব্য বিষয় থাকিত বটে,কিন্তু তাহ “অীলালী ভাষাতে” লিখিত হইত, ইহা অগ্ৰেই বলিয়াছি। এই ক্ষেত্রে সোমপ্রকাশের আবির্ভাব। সে দিনের কথা আমাদের বেশ স্মরণ আছে। এ কাগজ কে বাহির করিল, এ কাগজ কে বাহির করিল, বলিয়া একটা রব উঠিয়া গেল। যেমন ভাষার লালিতা, তেমনি বিষয়ের গাম্ভীৰ্য্য। সংবাদ পত্রের এক নূতন পথ, বঙ্গসাহিত্যের এক নুতন যুগ প্রকাশ পাইল। বিদ্যাভূষণ জানিতেন তাহার উক্তির মূল্য কত। কাগজ . সাপ্তাহিক হইল, কিন্তু মূল্য হইল বার্ষিক দশ টাকা; তাহাও অগ্রিম দেয়। ইহাতেও সোমপ্রকাশ দেখিতে দেখিতে উঠিয়া গেল। ১৮৫৮ সালে প্রকাশিত হইলেও ১৮৬০ হইতে ઝ૧• সালের মধ্যে সোমপ্রকাশের প্রভাব মাধ্যন্দিন রেখাকে অতিক্রম করিয়াছিল "সেই কারণেই এই কালের মধ্যে তাহার উল্লেখ করিলাম।

 সোমপ্রকাশের পর আরও অনেক বাঙ্গাল সাপ্তাহিক পত্র প্রকাশিত হইয়াছে; ভাষার চটক ও রচনায় নিপুণতা আরও বাড়িাছ, রাজনীতির চর্চা ৰহুগুণ বাড়িয়াছে; কিন্তু তদানীন্তন সোমপ্রকাশের স্থান কেহই অধিকার করিতে পারেন নাই। ভিতরকার কথাটা এই, লিখিার শক্তির উপর সংবাদ পত্রের প্রভাব নির্ভর করে না, পশ্চাতে যে মানুষটা থাকে তাহারই উপরে অধিকাংশত: নির্ভর করে। সোমপ্রকাশের প্রভাবের মূল ছিলেন দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ। সেই তেজস্বিতাসেই মনুষ্যত্ব, সেই ঐকাস্তিকতাসেই কৰ্তব্য-পরাগণতাসেই সত্য নিষ্ঠা পশ্চাতে ছিল বলিরাই সোমপ্রকাশের প্রভাব দেশমধ্যে ব্যাপ্ত হইয়াছিল।

 তৎপরে উল্লেখ যোগ্য সামাজিক ঘটনা হোমিওপেথি রাজ্যে ডাঃ মহেন্দ্রলাল সরকারের পদার্পণ ও তঞ্জনিত আন্দোলন। কলিকাত৷ সহরে হোমিওপ্যাথির আবির্ভাব ও তৎসম্বন্ধে ওয়েলিংটন স্কোয়ারের দত্ত পরিবারের প্রসিদ্ধ রাজা বাবুর কার্য্য বিষয়ে অগ্ৰেই কিঞ্চিৎ বিবরণ দিয়াছিগ ডাক্তার বেরিণি সাহেবকে অবলম্বন করিয়া রাজাবাবু কাৰ্য্যক্ষেত্রে প্রায় একাকী দণ্ডাজ্জমান রহিয়াছিলেন। তাহারই সংশবে অ্যাসিয়া অনেকগুলি যুবক হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা প্ৰণালী অবলম্বন করিতেছিলেন। ইহাদের অনেকে পরে যশস্বী হইয়াছেন। তাহাদের মধ্যে অনেকে দেশ। বিদেশে হোমিওপ্যাথির বাৰ্ত্তা লইয়া যাইতেছিলেন। ইতিমধ্যে এক ঘটনা ঘটিল যাহাতে কলিকাতার শিক্ষিত সমাজকে প্রবলরূপে। আলোড়িত করিল; এবং তৎ সঙ্গে সঙ্গে হোমিওপ্যাথির পতাকাকে সৰ্ব্বজনের চক্ষের সমক্ষে উড়ন। করিল। ভাহা ডাক্তার মহেন্দ্রলাল সরকারের হোমিওপ্যাথি প্ৰণালী অবলম্বন। এলোপ্যাথির সহিত তুলনায় হোমিওপ্যাথি উৎকৃষ্টতর লোকেয় এ সংস্কার যে জন্মিল তাহা নহে, কিন্তু মত পরিবর্তনের সময় ডাক্তার সরকারের যে তেজ, যে সত্যনিষ্ঠা, যে মনুষ্যত্ব লোকে দেখিল, তাহাই সকলের চিত্তকে বিশেষরূপে উত্তেজিত করিয়াছিল; এবং বঙ্গবাসীর মনে এক নব ভাব আনিয়া দিয়া ছিল। এই সাহসী, সত্যপ্রিয় ও ধর্মানুরাগী পুরুষের জীবন-চরিত পর পরিচ্ছেদে প্রদত্ত হইল।

 তিনি ১৮৮৩ সাপে কলিকাত! মেডিকেল কালেঞ্জ হইতে এম, ডি, পরীক্ষাতে উত্তীর্ণ হইয়া সহরের অগ্রগণ্য চিকিৎসকদিগের মধ্যেস্থান প্রাপ্ত হন। ঐ সালেই প্রধানতঃ প্রসিদ্ধ ডাক্তার ওডীভ চক্রবর্তীর প্রষত্যুে, ব্রিটিশ মেডিকেল এসোসিএ শনের বঙ্গদেশীয় শাখা নামে একটী শাখা • সভা স্থাপিত হয়। ঐ সভার প্রতিষ্ঠার দিনে মহেন্দ্রলাল একটী বক্ত তা করেন, তাহাতে হোমিওপ্যাথির নিন্দা করেন। ঐ মিনাবাদ রাঁগা বাবুর চক্ষে পড়িলে, তিনি মহেন্দ্রলালের সহিত বিচার করিতে আরম্ভ করেন। ইতিমধ্যে একজন বন্ধু ইণ্ডিয়ান ফীড় নামক কাগজের মত মহেন্দ্রলালকে ( Morgang) মর্গান সাহেবের লিখিত হোমিওপেথি বিষয়ক গ্রন্থের সমালোচনা লিখিতে অনুরোধ করেন। সমালোচনার্থ ঐ গ্রন্থ পাঠ করিতে গিয়াই মহেন্দ্রলালের মনে হয় যে কাৰ্য্যতঃ হোমিওপেথি চিকিৎসা কিরূপ তাহ না দেখিয়া সমালোচনা করা তাহার পক্ষে কর্তব্য নহে। অতএব তিনি রাজা বাবুর সহিত র্তাহার কতকগুলি রোগীর চিকিৎসা দেখিতে আরম্ভ করেন। গ্রন্থ পাঠ করিতে করিতে এবং চিকিৎসা দেখিতে দেখিতে সরকার মহাশয়ের মত পরিবৰ্ত্তিত হইয়া গেল। হোমিওপেথিক .চিকিৎসা প্রণালীই উৎকৃষ্টতর প্রণালী বলিয়া মনে হইল। ১৮৬৬ সালের মধ্যে এই পরিবর্তন ঘটিল । ধখন তিনি মত পরিবর্তনের বিশিষ্ট কারণ পাইলেন তখন সহরের এলোপেথিক চিকিৎসকদলে তাহার বাৰ্ত্ত প্রকাশ করিতে ক্রটা করিলেন না। ১৮৬৭ সালের ১৬ই ফেব্রুয়ারি দিবসে ব্রিটিশ মেডিকাল এসোসিএশনের চতুর্থ সাম্বৎসরিক সভার অধিবেশন হইল। তাহাতে ডাক্তার সরকার এক বক্তৃতা পাঠ করিলেন, তাহাতে . প্রচলিত চিকিৎসা প্রণালীর অনির্দিষ্টত দোষ প্রদর্শন করিয়া হানিম্যান প্রদর্শিত প্রণালী উৎকৃষ্টতর বলিয়া ঘোষণা করিলেন। আর কোথায় যায় ! সাপের লেজে যেন পা পড়িল ! ডাক্তার ওরালার নামে একজন ইংরাজ ডাক্তার বলিলেন, “ডাক্তার সরকার থাম ধাম, আর একটী কথা বলিলে তোমাকে এ ঘর হতে বাহির করে দেব।” তৎপরে সহরের এলোগেধি দল ডাক্তার সরকারকে একঘরে করিল ; তিনি চিকিৎসক সভা কর্তৃক বর্জিত হইলেন, তিনি তাহা গ্রাহ করিলেন না। কলিকাতা তোলপাড় হইয়া যাইতে লাগিল। কিন্তু বঙ্গভূমি যেন এই বীরের পদভরে কঁাপিতে লাগিল। বাস্তবিক তাঞ্ছার সত্যপ্রিয়তা ও মনুষ্যত্ব তখন আমাদের মনকে অনেক উচ্চে তুলিয়াছিল। বিশ্বাস কর, "বাঙ্গালি যে ভারতের সকল প্রদেশের মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র হইয়াছে, তাহ এইসকল সত্যপ্রিয় তেজীয়ান বীষ্মপ্রকৃতিবিশিষ্ট মানুষের গুণে ।

 মহেন্দ্রলাল সরকার স্বীয় চরিত্রেয় প্রভাবে হোমিওপেথিকে কিরূপ উচু ' করিয়া উঠাইলেন, তাহ সুপ্রসিদ্ধ বেরি৭ি সাহেবের একটা কথাতেই প্রকাশ। তিনি যখন এদেশ পৱিত্যাগ করেন তখন তাহার হোমিওপাথ বন্ধুগণ তাহার অভ্যর্থনার জন্ত এক সভা করিয়াছিলেন । উক্ত সভাতে ডাক্তার বেরিণি, অপরাপর কৰা বলির শেষে বলিলেন, “আমার আর এখানে পাকিবার প্রয়োজন নাই। স্বৰ্য্য যখন উদিত হয় তখন চক্সের অন্তগমনই শোভা পায়। মছেজ বঙ্গাকাশে উধিত হইয়াছেন, এখন আমার অন্তগমনের সময় ! অতএব অপরাপর নেতাদিগের দ্যায় মহেঞ্জেলাল সরকার ও সে সময়ে কলিকাতাবাসীর ও সেই সঙ্গে সমগ্র বঙ্গবাসীর চিত্তকে প্রবলরূপে আন্দোলিত করিয়াছিলেন ।

 কেশবচন্দ্রের বক্তৃতা, দীনবন্ধুর নাটক, বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস, বিদ্যাভূষণ মহাশয়ের সোমপ্রকাশ, মহেন্দ্রলাল সরকারের হোমিওপেথি, এই সকলে এই কালের মধ্যে শিক্ষিত দলের মনে যেমন নবভাব আনিম্ন দিতেছিল, তেমনি আর এক কার্য্যের আয়োজন হইয়া নব আকাঙ্ক্ষার উদয় করিয়াছিল। তাহা “ষ্ঠাসনাল পেপার” নামক সাপ্তাহিক পত্রের সম্পাদক নবগোপাল মিত্র ' মহাশয়ের প্রতিষ্ঠিত, “জাতীয় মেলা’ নামক মেলা ও প্রদর্শনীর প্রতিষ্ঠা এবং দেশের সকল বিভাগের ও সকল শ্রেণীর নেতৃবৃন্দের তাহার সহিত যোগ। বঙ্গসমাজের ইতিবৃত্তে ইহা একটা প্রধান ঘটনা ; কারণ সেই যে বাঙ্গালির মনে জাতীর উন্নতির স্পৃহা জাগিয়াছে তাহ আর নিদ্রিত হয় নাই ।

 নবগোপাল মিত্র মহাশয়ের হৃদয় স্বদেশ-প্রেমে পূর্ণ ছিল। তিনি বহুদিন হইতে অনুভব করিয়া আসিতেছিলেন যে, দেশের লোকের দৃষ্টিকে বিদেশীয় রাজাদিগের প্রসাদ লাভের দিক হইতে ফিরাইয়া জাতীয় স্বাবলম্বনের দিকে আন কৰ্ত্তব্য । লোকে কথায় কথায় গবর্ণমেণ্টের দ্বারস্থ হয়, ইহা তাহার সহ হইত না । এজন্ত তিনি নিজ প্রচারিত সংবাদ পত্রে দুঃখ প্রকাশ করিতেন ; বন্ধু বান্ধবের নিকটে ক্ষোভ করিতেন ; এবং কি উপায়ে দেশের লোকের মনে জাতীয় স্বাবলম্বন প্রবৃত্তি প্রবল হয় সেই চিন্তা করিতেন। এই চিন্তার ফলস্বরূপ ১৭৮৮ শকের ( ১৮৬৭ খ্ৰীষ্টাব্দের ) চৈত্র সংক্রান্তিতে হিন্দুমেলার অধিবেশন হইল। গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় সম্পাদক ও নবগোপাল মিত্র মহাশয় সহকারী সম্পাদক হইলেন। . মেলার অধ্যক্ষগণ স্বদেশীয় উন্নতি, স্বদেশীয় সাহিত্যের বিকাশ, স্বদেশীয় সংগীতাদির চর্চা, স্বদেশীয় কুন্তী প্রভৃতির পুনর্বিকাশ, প্রভৃতির উৎসাহ नन করিবার জন্তfপ্রতিজ্ঞারূঢ় হইলেন। বর্ষে বর্ষে চৈত্র সংক্রাস্তিতে একটী মেলা খোলা স্থির হইল । দেশের অনেক মান্য গণ্য ব্যক্তি এইজন্ত অর্থ সাহায্য করিতে অগ্রসর হইলেন। উৎসাহদাতাদিগের মধ্যে রাজা কমলকৃষ্ণ বাহাদুর, বাবু রমানাথ ঠাকুর, বাবু কাশীশ্বর মিত্র, বাবু দুর্গাচরণ লাহ, বাবু প্যারীচরণ সরকার, বাবু গিরিশ্চন্দ্র ঘোষ, বাবু কৃষ্ণদাস পাল, বাবু স্বাজনারায়ণ বসু, বাবু দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর, পণ্ডিত জয়নারায়ণ তর্কপঞ্চানন পণ্ডিত ভারতচন্দ্র শিরোমণি, পণ্ডিত তারানাথ তর্কবাচস্পতি, প্রভৃতির নামের উল্লেখ দেখা যায় অতএব উদ্যোগকর্তৃগণ সকল বিভাগের মানুষকে সম্মিলিত করিতে ক্রটী করেন নাই।

 ১৮৬৮ সালে বেলগাছিয়ার সাতপুকুরের বাগানে মহাসমারোহে মেলার দ্বিতীয় অধিবেশন হয়। সেই দিন সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের প্রণীত স্বপ্রসিদ্ধ জাতীয় সংগীত “গাও ভারতের জয়” সুগায়কদিগের দ্বারা গীত হয়; আমরা কয়েকজন জাতীয় ভাবের উদ্দীপক কবিতা পাঠ করি; গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও নবগোপাল মিত্র মহাশয় মেলার উদ্দেশু সকলকে বুঝাইয়া দেন; এবং স্বজাতি-প্রেমিক সাহিত্যজগতে সুপরিচিত মনোমোহন বস্থ মহাশয় একটা হৃদয়গ্রাহী বক্তৃতা পাঠ করেন। মেলার প্রথম সম্পাদক গণেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় মেলার উদ্দেশু এই ভাবে বর্ণন করেন—“ভারতবর্ষের এই একটা প্রধান অভাব যে, আমাদের সকল কার্য্যেই আমরা রাজপুরুষগণের সাহায্য যাঙ্কা করি, ইহা কি সাধারণ লজ্জার বিষয়! কেন, আমরা কি মনুষ্য নহি? * * * অতএব যাহাতে এই আত্মনির্ভর ভারতবর্ষে স্থাপিত হয়, ভারতবর্ষে বদ্ধমূল হয়, তাহ এই মেলার দ্বিতীয় উদ্দেশু।” সংক্ষেপে বলিতে গেলে জাতীয় স্বাবলম্বন প্রবৃত্তিকে জাতীয় চিত্তে উদ্দীপ্ত করাই হিন্দুমেলার উদ্দেশু ছিল। মুখের বিযয় এই মেলার আয়োজনের দ্বারা সে উদ্দেশু বহুল পরিমাণে সাধিত হইয়াছে। ইহার পরে মনে মোহন বসু প্রভৃতি জাতীয় সংগীত য়চনা করিতে লাগিলেন; আমরা জাতীয় ভাবোদীপক কবিতা রচনা করিতে লাগিলাম; বিক্রমপুর হইতে দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায় আসিয়া আমাদের জাতীয় ভাবে যোগ দিলেন; এবং আগ্রার আনন্দচন্দ্র রায়, সংগীত রচনা -করিয়া দুঃখ করিলেন;—

কত কাল পরে বল ভারত রে!
দুখসাগর সাতারি পার হবে; ইত্যাদি।

 দেখিতে দেখিতে স্বদেশপ্রেম সৰ্ব্বত্র ব্যাপ্ত হইয়া পড়িল। ১৮৬৮ সালের পরেও হিন্দুমেলার কাজ অনেক দিন চলিয়াছিল। নবগোপাল বাবু ইহাকে জীবিত রাখিবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। ক্রমে তাহ উঠিয়া যায়।

 এই ১৮৬০ হইতে ১৮৭০ সালের মধ্যে কেবল যে কলিকাতা সমাজ নানা তরঙ্গে আন্দোলিত হইতেছিল তাহা নহে। বঙ্গদেশের অপরাপর প্রধান প্রধান স্থানেও আন্দোলন চলিতেছিল। তন্মধ্যে পূর্ববঙ্গের প্রধান স্থান ঢাকা সৰ্ব্বপ্রথমে উল্লেখযোগ্য। বলিতে গেলে পূর্ববঙ্গের সামাজিক আন্দোলন বহু পূৰ্ব্ব হইতেই আরম্ভ হইয়াছিল। কলিকাতাতে হিন্দুকলেজের প্রতিষ্ঠা ও ডিরোজিওর শিষ্যদলের অভু্যদয় দ্বারা সমাজক্ষেত্রে যেমন একদল প্রাচীনবিদ্বেষী শিক্ষিত যুবককে আবিভূত করিয়াছিল সেইরূপ ঢাকাতেও শিক্ষিত যুবকদলের মধ্যে এক সংস্কারার্থী দল দেখা দিয়াছিল। কলিকাতাতে যেমন প্রথম শিক্ষিত দলের অগ্রণীগণ কে মুসলমানের দোকানে প্রবেশ করিয়া রুট আনিতে ও খাইতে পারে তাহ দেখিবার চেষ্টা করিতেন, তেমনি চাকাতেও * প্রথম শিক্ষিত ব্যক্তিদিগের অগ্রণীগণ এই পরীক্ষা করিতেন যে কে মুসলমানের রুট খাইতে পারে বা কে চৰ্ম্মপান্থকার উপরে সন্দেশ রাখিয়া সৰ্ব্বাগ্রে তুলিয়া খাইতে পারে।

 ক্রমে ঢাকা কলেজ স্থাপিত হইয়া শিক্ষিতদলের সংখ্যা যতই বাড়িতে লাগিল, এবং কলিকাতার আন্দোলনের তরঙ্গ সকল যতই পূৰ্ব্ব বঙ্গে ব্যাপ্ত হইতে লাগিল, ততই ঢাকা সহরে নব নব কাৰ্য্যের সুত্রপাত হইতে লাগিল। ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন, বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন, বিধবা বিবাহের আন্দোলন প্রভৃতি সকল আন্দোলনই ক্রমে ক্রমে দেখা দিল ।

 এই প্রথম শিক্ষিত উৎসাহী যুবকবৃন্দের মধ্যে পরলোকগত স্বপ্রসিদ্ধ ডেপুটা মাজিষ্ট্রেট রামশঙ্কর সৈন, ভগবানচন্দ্র বন্থ, অভয়চরণ দাস, ঈশ্বর চন্দ্র সেন, অভয়াকুমার দত্ত, স্কুল সমুহের ইনস্পেক্টর দীননাথ সেন, ও পরবত্তী সময়ের কালীপ্রসন্ন ঘোষ প্রভৃতি অনেকে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছেন । কিন্তু পূৰ্ব্ববঙ্গে ধর্জ ও সমাজ সংস্কার বিষয়ে সৰ্ব্বাপেক্ষা একাগ্রতা দেখাইয়াছিলেন, দুই ব্যক্তি। প্রথম ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠা কৰ্ত্ত उवश्वॆत्र मिज, विडौब . কৌলীন্য প্রথার সংস্কার প্রয়াসী রাসবিহারী মুখোপাধ্যায়। ব্রজসুন্দর মিত্র মহাশয় ১৮৪৭ সালে নিজে ব্রাহ্মধৰ্ম্মে দীক্ষিত হইয়া ਕਿਭੂ ভবনে ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন করেন ; এবং অপরের অগ্রসর হইয় তাহার ভার আপনাদের হন্তে গ্রহণ ন করা পর্য্যন্ত নিজেই তাহার তার বহন করেন। এই কালের মধ্যে ঢাকাতেও ব্রাহ্মসমাজের নবোথান ও তৎসঙ্গে সঙ্গে স্বৰ্ব্ববিধ সামাজিক উন্নতি বিষয়ক বিষয়ের আন্দোলন দৃষ্ট হইয়াছিল ; এবং অভয়াচরণ দাস, দীননাথ সেন, কালীপ্রসন্ন ঘোৰ প্রভৃতি স্বদেশের উন্নতি সাধনে দেহ মন নিয়োগ করিয়াছিলেন। ইহারা সকলেই সে সময়ে ব্রাহ্মসমাজেয় সহিত সংস্থষ্ট ছিলেন। ব্রাহ্মসমাজই সে সময়ে প্রবল সামাজিক শক্তির উৎস স্বরূপ হইয়াছিল। সেই ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠা-কৰ্ত্ত ব্রজসুন্দর মিত্র মহাশয়ের সংক্ষিপ্ত জীবনবৃত্ত দেওয়া ঋইতেছেঃ

ব্রজসুন্দর মিত্র।

 এই সাধু পুরুষ বাঙ্গালী ১২২৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতৃহীন হইয়া তাঁহাকে বাল্যকাল পরাশ্রয়ে ও পরগৃহে যাপন করিতে হয়। তৎপরে * ইংরাজী শিক্ষার মানসে কলিকাতায় আসিয়া ঘোর দারিদ্র্যে ও কঠোর সংগ্রামে - কাল যাপন করেন। শিক্ষা লাঙ্গ করিবার পূৰ্ব্বেই সামান্ত বেতনে কাৰ্য্য আরম্ভ করেন। কিন্তু তাহাতে এরূপ স্বাভাবিক ধৰ্ম্মভীরুতা ও কর্তব্যপরায়ণতা ছিল “যে অচিরকালের মধ্যে উত্তরোত্তর পদোন্নতি হইয়া তিনি উচ্চপদে আরোহণ করেন। পদের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে স্বদেশের উন্নতির বাসনা তাহার মনে প্রবল হইতে থাকে। তাহার দৃষ্টি প্রথম ব্রাহ্মসমাজের দিকে আকৃষ্ট হয়। ১২৫৩ বা ১৮৪৭ সালে, তিনি কতিপয় বন্ধুকে উৎসাহিত করিয়া ঢাকা নগরে একটি ব্রাহ্মসমাজ স্থাপন করিলেন; এবং আত্মীয় স্বজনের নিবারণ ও ভয় প্রদর্শনের মধ্যে তাহার কার্য নিৰ্ব্বাহ করিতে লাগিলেন। কলিকাতা হইতে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয় বিবিধ প্রকারে সহায়তা করিতে প্রবৃত্ত হইলেন।

 ইহার পরে মিত্ৰজ মহাশয় সার্ভে ডেপুটা কালেকটরের পদে উন্নীত হইয়া কুমিল্লা প্রভৃতি স্থানে গমন করেন। তাহাতে কিছু দিনের জন্ত ব্রাহ্মসমাজের অবসাদ উপস্থিত হয়। ইহা দেখিয় তিনি নিজ বাসের জন্য ঢাকাতে একটা বাড়ী ক্রয় করেন এবং তাহার একাংশ ব্রাহ্মসমাজের কাৰ্য্যের জন্ত রাখেন। সেই সময়ে তাহারই উৎসাহে এবং দীননাথ সেন মহাশয়ের চেষ্টায় ঢাকা ব্রাহ্মসমাজের অধীনে একটা স্কুল স্থাপিত হয়; এবং কলিকাতা সমাজ হইতে প্রচারক অঘোরনাথ গুপ্ত ঐ স্কুলের একজন শিক্ষক রূপে এবং বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী, তাঁহার সহকারী রূপে প্রেরিত হন। ইহা বোধ হয় ১৮৬১ কিন্১৮৬২ সালে ঘটা থাকিবে। এই প্রচারক দ্বয়ের আবির্ভাব পুৰ্ব্ববঙ্গের যুবকলে নবভাবের উদ্দীপনা করিল। তাহারা দলৈ. দলে ব্রাহ্মসমাজের দিকে আকৃষ্ট হইতে লাগিল। ঢাকাতে মহা আন্দোলন উপস্থিত হইলু।

 এই আন্দোলন দেখিয়া প্রাচীনদলের ব্রাহ্মদিগের মধ্যে অনেকে সমাজের কার্ষ্যে নিরুৎসাহ হইলেন; কিন্তু ব্রজম্বন্দর বাবু পশ্চাৎপদ হইলেন না। তিনি সমান ভাবে যোগ দিয়া রছিলেন। কলিকাতাতে বিধবাবিবাহের আনোলন উপস্থিত হইলে তিনি বিদ্যাসাগর মহাশয়ের প্রণীত পুস্তক সকল নিজ ব্যয়ে মুদ্রিত করিয়া পূৰ্ব্ববঙ্গে বিতরণ করিয়াছিলেন। তাহার ফুলস্বরূপ এই কালের কিঞ্চিৎ পুৰ্ব্বে পূৰ্ব্ববঙ্গের শিক্ষিতদলের মধ্যে একটা বিধবাবিবাহের দল দেখা দেয়। র্তাহার কতিপয় ব্যক্তি স্বীয় স্বীয় নাম স্বাক্ষয় করিয়৷ এই সংস্কারকার্য্যের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইল্বাছিলেন ; এবং তাঁহাদের মধ্যে যিনি যেখানে গিয়াছেন, এই সংস্কারের পক্ষপাতিত্ব করিরছেন । ১৮৬২ সালে ব্রজসুন্দর বাবু স্বীর বিধবা কন্সার বিবাহ দিবার জন্য সকল আয়োজন করেন, কেবল র্তাহার জননী উদ্বন্ধনে প্রাণত্যাগ করিতে উদ্যত হওয়াতেই সে কার্য হইতে নিবৃত্ত হইতে হয় । এস্থলে ইহা উল্লেখযোগ্য যে উত্তরকালে জননী পরলোকগত হইলে তিনি স্বীয় কন্যাগণকে সুশিক্ষিত করিয়া ব্রাহ্মধৰ্ম্মের পদ্ধতি অনুসারে বিবাহ দিয়াছিলেন ।

 বোধ হয় এই সময়েই ব্রজমুন্দর বাবুর উৎসাহেও'র্তাহার বন্ধুগণের সাহায্যে ঢাকাতে একটা বালিকাবিদ্যালয় স্থাপিত হয়, যাহা পরে ১৮৭৫ সাল হইতে ‘ইডেন ফিমেল স্কুল’ নামে পরিচিত হইরাছে । ঢাকাতে স্ত্রীশিক্ষা বিষয়ে কিরূপ আন্দোলন উঠিয়াছিল তাহার প্রমাণ কালীপ্রসন্ন ঘোষ মহাশয়ের প্রণীত “নারীজাতি-বিষয়ক প্রস্তাব” নামক গ্রন্থ। ঐ গ্রন্থ পাঠ করিয়া নারীজাতির উন্নতি-প্রয়াসী ব্যক্তিগণ এক সময়ে প্রভূত বল লাভ করিয়াছিলেন। ১৮৬৪ সালে ব্রজসুন্দর বাবু স্বীয় গ্রামে একটী বালিকা-বিদ্যালয় স্থাপন করেন ; এবং অপরাপয় প্রকারে কুমিল্লা প্রভৃতি স্থানে স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারে প্রবৃত্ত থাকেন। এই রূপে নানা সৎকর্য্যে রত থাকিতে থাকিতে তিনি ১২৮২ সালে স্বর্গারোহণ করেন।

 অঘোরনাথ গুপ্ত ও বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামী ঢাকাতে যে তরঙ্গ তুলির দিয়াছিলেন তাহা আর থামিল না। কলিকাতার অনুকরণে ঢাকাতেও যুবকদলের জন্য একটা সঙ্গত সভা স্থাপিত হইল, এবং সেই সঙ্গতে বসির যুবকগণ নল মন্ত্রে দীক্ষিত হইতে লাগিলেন । ”

 এই ক্ষেত্রে কেশবচন্দ্র সেন মহাশয়ের আবির্ভাব হইল। ১৮৬৫ সালে তিনি ঢাকাতে পদার্পণ করিলেন। যে,উন্মাদিনী বক্তৃতাশক্তি কলিকাতার যুবকদলকে ক্ষেপাইয়া তুল্লিয়াছিল তাহ ঢাকা ও মরমনসিংহের যুবকগণকে মাতাইয়া তুলিল। দলৈ দলে যুবক ব্রাহ্মসমাজের দিকে যাবিত হইল। ইহার মধ্যে একটা মুসলমান যুবককে লইয়া তুমুল আন্দোলন উপস্থিত হইল। ঢাকা মঙ্গতের অগ্রসর সভ্যগণ র্তাহাকে লইয়৷ পান ভোজন করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। তাহা লইয়া ঘরে ঘরে বিবাদ বাধিয়া গেল। ব্রাহ্মদের ধোপাঁ নাপিত বন্ধ হইল। এমন কি মাঝি মাল্লারাও অনেক স্থলে তাহাদিগকে নৌকাতে তুলিতে ভয় পাইতে লাগিল। কিন্তু কিছুতেই ব্রাহ্মসমাজের শক্তিকে খৰ্ব্ব করিতে পারিল না। এই সকল আন্দোলনের মধ্যে ঢাকায় নূতন উপাসনা মন্দির নিৰ্ম্মিত হইল, এবং ১৮৬৯ সালের শেষভাগে কেশবচন্দ্র সেন মহাশয় গিয়া সেই মন্দির প্রতিষ্ঠা করিলেন ।

 ১৮৬০ হইতে ১৮৬৯ সালের মধ্যে ঢাকাতে যেমন এক দিকে ব্রাহ্মসমাজের অভু্যদয় হইয়া ধৰ্ম্মান্দোলন উপস্থিত হইল, তেমনি সৰ্ব্ববিধ সমাজ-সংস্কার কার্য্যে উৎসাহ দৃষ্ট হইতে লাগিল। কলিকাতার সোমপ্রকাশের ন্যায় “ঢাকা প্রকাশ” নামক সাপ্তাহিক পত্র প্রকাশিত হইয়া গোবিন্দপ্রসাদ রায় নামক একজন উদারচেতা ব্যক্তির হস্তে ন্তস্ত হইল। তিনি উন্নতি-শীল দলের মুখপাত্র স্বরূপ হইয়া ইহাতে সৰ্ব্ববিধ অগ্রসর মত প্রকাশ করিতে লাগিলেন । কেশবচন্দ্রের আবির্ভাব, ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গত, ব্রাহ্ম যুবকদিগের সাহসিকতা, এই সকলে প্রাচীন হিন্দুসমাজকে জাগাইয়া তুলিল। হিন্দুধৰ্ম্মের রক্ষার জন্য হিন্দুধৰ্ম্ম রক্ষণী সভা, ও “হিন্দু হিতৈষিণী” নামক সাপ্তাহিক কাগজ বাহির হইল। একদিকে “ঢাকা প্রকাশ” অপরদিকে হিন্দু হিতৈৰিণী এই উভয় পত্রে পূর্ববঙ্গবাসীদিগকে সজাগ করিয়া তুলিল ।

 এই কালের মধ্যে আর এক ব্যক্তি পূৰ্ব্ব-বঙ্গসমাজকে বিশেষরূপে আন্দোলিত করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। তাছার নাম রাসবিহারী মুখোপাধ্যার । ইনি কৌলীন্ত ও বৃহবিবাহপ্রথার উন্মুলনের জন্ত বদ্ধপরিকর হইয়া মহা সংগ্রাম করিয়াছিলেন। ইহার জীবনেয় সংক্ষিপ্ত বিবরণ এই ;–


রাসবিহারী মুখোপাধ্যায় ।

 ১২৩২ বঙ্গাৰে বিক্রমপুরের অন্তর্গত তারপাশা গ্রামে রাসবিহারী মুখেপাধ্যায়ের জন্ম হয়। অতি শৈশবেই ইনি পিতৃহীন হইয়। স্বীয় পিতৃব্যের আশ্রয়ে বৰ্দ্ধিত হন। বিদ্যা শিক্ষার ভাল বন্দোবস্ত না হওয়াতে ইংরাজী শিক্ষা দূরে থাকুক, বাঙ্গালা শিক্ষাও ভাল হয় নাই। ইহার পিতৃব্যও বোধ হয় সম্পন্ন অবস্থার লোক ছিলেন না ; তিনি দারিদ্রোর তাড়নায়, স্বীয় কোলীতের সাহায্যে ল্লাতুম্পুত্রকে ৮টা কুলীন কন্যার সহিত পরিণীত করেন। ক্ৰিয়ংকাল পরে কিঞ্চিৎ ঋঞ্চভার মস্তকে লইয়া রাসবিহারীকে স্বীয় পিতৃৰ্য হইতে পৃথক হইতে হয়। এই অবস্থাতে ঘোর দারিদ্র্যে পড়িয়া রাসবিহারী আরও ছয়ট কুলীন কস্তার পাণিগ্রহণ করেন ; এবং অর্থোপার্জনের আশয়ে ময়মনসিংহের কোনও জমিদারের অধীনে তহসিলদারী কৰ্ম্মে নিযুক্ত হন।

 ঐ কাজ করিতে করিতে র্তাহার হৃদয় মনের পরিবর্তন উপস্থিত হয়। শুনিতে পাওয়া যায় বাল্যকাল হইতেই তাহার কবিতা রচনা করিবার ও গান বাধিবার বাতিক ছিল । তাহ দ্বারা প্রেরিত হইয়া তিনি বাঙ্গালী ভাষার চর্চা করিতে এবং কবিতাদি প্রণয়ন করিতে আরম্ভ করেন। উপযুপিরি কয়েকখানি কবিতাগ্রন্থ ও প্রণয়ন করেন, এবং তাহার কয়েকখানি শিক্ষাবিভাগেও আদৃত হয়। অবশেষে বিদ্যাসাগর মহাশরের সীতার বনবাস পাঠ কুরির র্তাহার হৃদয় নারীজাতির দুঃখে কাদিয়া উঠে ; এবং শুনিতে পাওয়া যায় তিনি তাহার সারাংশ বাঙ্গাল কবিতাতে গ্রথিত করেন। এই সময় হইতে কুলীন কন্যাদিগের দুঃখের প্রতি র্তাহায় দৃষ্টি পড়ে এবং তিনি তাহাদেয় দুঃথ বর্ণনা করিয়া সংগীত রচনা পূৰ্ব্বক গ্রামে গ্রামে, কুলীনদিগের প্রধান প্রধান স্থানে, ভ্রমণ করিতে আরম্ভ করেন । "

 ১২৭৫ বঙ্গাব্দে তিনি আপনার হৃদগত ভাব “লল্লালী-সংশোধিনী” নামে একটা বক্তৃতাতে প্রকাশ করিয়া তাহা মুদ্রিত করলেন ! চারিদিকে আন্দোলন উঠিয়া গেল । এই নেশা তাহাকে দিন দিন এতই ঘিরিয়া লইতে লাগিল যে, তিনি আপনার তহসিলদারী কৰ্ম্ম আর রাখিতে পারিলেন না ; সামান্ত গ্রন্থাদির আয়েয় উপর নির্ভর করিয়া দ্বারে দ্বারে সভা সমিতিতে ঐ একই কথা বলিয়া ফিরিতে লাগিলেন । প্রথম প্রথম ব্রাহ্মণ সমাজে তিনি সৰ্ব্বত্রই নির্যাতন ভোগ করিতে লাগিলেন ; কিন্তু পরিণামে তাহার বিশুদ্ধচিত্তত ও চিত্তের একাগ্রত। দেখিয়া শিক্ষিত ব্যক্তিগণ র্তাহার পৃষ্ঠপোষক হইয়া উঠিলেন। “ঢাকা প্রকাশ” “হিন্দুহিতৈর্ষিণী” প্রভৃতি, এবং কলিকাতা হইতে পণ্ডিতবর ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও “সনাতনধৰ্ম্মরক্ষিণী সভা” প্রভৃতি র্তাহার সপক্ষতা করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের উৎসাহে ও সাহায্যে বহুবিবাহ নিষেধ করিবায় জল্প গবর্ণমেণ্টেয় নিকট এক আবেদন প্রেমিত হয়, দুঃখের বিষয় তাহা কার্য্যে পরিণত হয় নাই।

 রাসবিচারী মুখোপাধ্যায় মহাশয় কেবল মুখে সমাজ সংস্কারের উপদেশ দিয়া নিরস্ত হন নাই। ১২৮২ সালে কুলের পর্যায় ভঙ্গ করিয়া নিজ কন্যায় বিবাহ দেন। তৎপরে ১২৮৪ সালে আবার মেল ভঙ্গ করিয়া স্বীয় পুত্র ও কস্তার বিবাহ দেন। সদৃষ্টান্ত বৃথা যায় না। শুনিতে পাওয়া যায় ইহার অল্প পরেই ১২ জন নৈকষ্য কুলীন, ও ৮ জন শ্রোত্রীয় তাহার পদবীর অনুসরণ করেন। এই সকল সংস্কার কাৰ্য্যে ব্ৰতী থাকিতে থাকিতে ১৩-১ সালে মুখোপাধ্যায় মহাশয় স্বর্গারোহণ করেন। ভয় হয় তাহার সঙ্গে সঙ্গে উক্ত ংস্কার কার্য্য বা বিলীন হইয়া গেল। এ সকল ঘটনা পরবর্তী সময়ে ঘটিলেও এখানে উল্লেখ করিলাম।

 এই কালের মধ্যে পুৰ্ব্ববঙ্গের অপরাপর স্থানেও ধৰ্ম্ম ও সমাজ সংস্কারের আন্দোলন দৃষ্ট হইয়াছিল। তন্মধ্যে বরিশাল সৰ্ব্বপ্রধানরূপে উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালের হাইকোর্টের প্রসিদ্ধ উকীল দুর্গামোহন দাস মহাশয় এই সময়ে বরিশালে ওকালতি করিতেন। তিনি সৰ্ব্ববিধ ধৰ্ম্ম ও সমাজ সংস্কারের অনুরাগী লোক ছিলেন । র্তাহার প্রকৃতিতে এই একটা গুণ ছিল যে, তিনি আধাআধি কোনও কাজ করিতে পারিতেন না। যাহা ভাল বলিয়া বুঝিতেন তাহা প্রাণ দিয়া করিতেন, ক্ষতিলাভ গণনা করিতেন না । ব্রাহ্মধৰ্ম্মের প্রতি যখন র্তাহার অনুরাগ জন্মিল তখন তিনি বরিশালে ব্রাহ্মধৰ্ম্মের প্রতিষ্ঠার জন্য দৃঢ়সংকল্প হইলেন। স্বীয় ব্যয়ে কলিকাতা হইতে কতিপয় ব্রাহ্মপ্রচারককে সপরিবারে বরিশালে লইয়া গেলেন ; এবং তাহাদিগের দ্বারা ব্রাহ্মধৰ্ম্ম প্রচার ও ব্রাহ্মপরিবারের নারীগণের শিক্ষার উন্নতি বিধান করিবার চেষ্টা করিতে লাগিলেন । নবব্রাহ্মপ্রচারকদিগের সমাগমে, ব্রাহ্মসমাজ প্রতিষ্ঠিত হইয়া বরিশালে আগুন জ্বলিয়া উঠিল। অগ্রসর সংস্কারকগণ বিধবাবিবাহ, অসবর্ণ বিবাহ, স্ত্রীজাতিকে সামাজিক স্বাধীনতা দান, প্রভৃতি সৰ্ব্ববিধ সংস্কার কার্য্যে হ্ৰস্তাপণ করিতে লাগিলেন। অনেক বিধবার বিবাহ কাৰ্য্য সমাধা হহল; তন্মধ্যে দুর্গামোহন দাস মহাশয়ের বিমাতার বিবাহ সৰ্ব্বপ্রধানরূপে উল্লেখ-যোগ্য । নিজে উদ্যোগী হইয়া বিমাতার বিবাহ দেওয়া ইহার পূৰ্ব্বে ঘটে নাই, হয় ত পূৰ্ব্বে কেহ স্বপ্নেও দেখে নাই।" এই কার্যো শুধু বরিশাল কেন সমগ্র বঙ্গদেশ আন্দোলিত হইয়া যাইতে লাগিল। তৎপরে লাখুটিয়ার জমিদার পরিবারের खैरुखन যুবক স্বীয় সহধৰ্ম্মিণীকে লইয়া জেলার কমিশনর সাহেবের বাড়ীতে আহার করিতে গেলেন। তাহ লইর ও সংবাদপত্রে মহা আন্দোলন চলিল। বলিতে কি সেই যে বরিশাল পূৰ্ব্ববঙ্গের মধ্যে প্রধান স্থান অধিকার করিয়াছে, এখনও সে স্থান হইতে ভ্ৰষ্ট হয় নাই। এই সমুদয় চেষ্টা ও আন্দোলন প্রধানত: ১৮৬০ হইতে ১৮৭০ পৰ্য্যন্ত, এই কালের মধ্যে ঘটিয়াছিল।  এই কালের মধ্যে উত্তরবঙ্গের রঙ্গপুর বিভাগে যে জাতীয় জীবনের সঞ্চার দেখা গিয়াছিল তাহাও বিস্তৃত হওয়া কৰ্ত্তব্য নহে। পূৰ্ব্বেই উক্ত হইয়াছে যে মহাত্মা রাজা রামমোহন রায় বিষয় কৰ্ম্ম হইতে অবস্থত হইয়া কণিকাতাতে বসিবার পূৰ্ব্বে রঙ্গপুরকেই নিজ কাৰ্য্যক্ষেত্র করিয়াছিলেন। তখন রঙ্গপুর মাথা তুলিয়া উঠিতেছিল। মধ্যে কেন যে রঙ্গপুর কিছুদিন পশ্চাতে পড়িয়াছিল তাহ বলিতে পারি না। যাহা হউক রঙ্গপুর বিভাগে জাতীয় উন্নতির চেষ্টা কখনই বিরত হয় নাই। ১৮৩২ খ্ৰীষ্টাব্দে লর্ড উইলিয়াম, বেটিঙ্ক বাহাদুর রঙ্গপুরে গমন করেন। সেই সুযোগ পাইয়া রঙ্গপুরের মাজিষ্ট্রেট মিষ্টার দ্যাথানিয়েল জমিদারগণকে উৎসাহিত করিয়া “রঙ্গপুর জমিদার দিগের স্কুল” নামে একটা স্কুল স্থাপন করেন। কলিকাতাতে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার পরে কয়েক বৎসর ধরিয়া ঐ জমিদারফুলের ছাত্রগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইতে অসমর্থ হওয়াতে, •এই কালের প্রথম ভাগে, গবর্ণমেণ্ট নিজে ঐ স্কুলের ভার লইয়। তাহাকে রঙ্গপুর জেলা স্কুলে পরিণত করেন। তৎপরে পরবর্তী সময়ে ঐ স্কুলকে হাই স্কলে পরিণত করা হইয়াছিল, পরে কালেজ ক্লাস আবার উঠাইয়া দেওয়া হইয়াছে।

 রঙ্গপুরে ইংরাজী শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অপরাপুর দিকেও উন্নতির পৃহা দৃষ্ট হইতে থাকে। " ১৮৪৬ খ্ৰীষ্টাব্দে সদ্যঃপুষ্করিণীর জমিদার রাজমোহন রায় চৌধুরী মহাশর প্রথম মুদ্রাযন্ত্র স্থাপন করেন, এবং “রঙ্গপুর বার্তাবহ” নামে এক সাপ্তাহিক সংবাদপত্র প্রকাশ করিতে আরম্ভ করেন। এই রঙ্গপুর বার্তাবহু পরে কাকিনার জমিদার শম্ভুচন্দ্র রায় চৌধুরী মহাশয়ের হস্তে যায় এবং তিনি ইহাকে “রঙ্গপুর দিকপ্রকাশ” নামে প্রকাশ করিতে আরম্ভ করেন। যে কালের আলোচনা করিতেছি সে সময়ে কাকিনাই রঙ্গপুরের मण्था জ্ঞানালোচনা ও সদনুষ্ঠানাদির জন্য প্রধান স্থান হই উঠে। প্রথমে শম্ভুচন্দ্র, তৎপরে তাহার পুত্র রাজা মহিমারঞ্জন, ঐ মুখ্যাতি অর্জনের প্রধান কারণ হইয় উঠেন। শম্ভুচন্দ্রের সমুদয় কীৰ্ত্তির উল্লেখ নিম্প্রয়োজন। বাঙ্গালী ১২৭০ সালে মহিমারঞ্জন কাকিনতে এক যালিকা-বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১২৭৫ বঙ্গাব্দে কাকিন ব্রাহ্মসমাজ স্থাপিত হয়। ব্রাহ্মসমাজ রঙ্গপুরেও ব্যাপ্ত হইয়া ইহাকে উজ্জীবিত করে। ক্রমে রঙ্গপুর সহরেও একটা ব্রাহ্মসমাজ স্থাপিত এবং ব্রহ্মমন্দির নিৰ্ম্মিত হয়। মধ্যে রঙ্গপুরে জাতীয় জীবনের কিঞ্চিৎ স্নানতা হইয়াছিল। আবার রঙ্গপুর মাথা তুলি উঠিতেছে।